নির্মলেন্দু গুণ : স্বাধীনোত্তর যুগে আপনার কাছে বাঙালি জাতীয় জীবনের কোন তারিখটিকে সবচাইতে প্রিয়, উল্লেখযোগ্য এবং সংগ্রামী প্রেরণায় সবচাইতে উদ্দীপনামূলক বলে মনে হয়?
মুনীর চৌধুরী : (গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করলেন) একুশে ফেব্রুয়ারি।
নির্মলেন্দু গুণ : ২১শে ফেব্রুয়ারি কি সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম ছিল, না পুনরুদ্ধারের?
মুনীর চৌধুরী : কেবল রক্ষা নয়, পুনরুদ্ধারেরও বটে।
নির্মলেন্দু গুণ : আপনি কি মনে করেন, এই সংগ্রাম শুধুমাত্র ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ ছিল, না রাজনৈতিক তথা বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটিও এর সাথে জড়িত ছিল?
মুনীর চৌধুরী : এ আন্দোলন প্রকৃত অবস্থায় এমন ছিল, বরং বলা চলে এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে সংস্কৃতির প্রশ্নটিকে ভিত্তি করেই আমাদের রাজনৈতিক অধিকার তথা অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটিই স্পষ্ট করে তুলেছিল। আর তাছাড়া রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এ তিনটা প্রশ্ন এত বেশি একসঙ্গে মিশে যায় যে, কোনোটাকেই বিচ্ছিন্ন বা আলাদা কবে দেখাটা সম্ভব নয়, উচিতও নয়।
নির্মলেন্দু গুণ : কিন্তু এই ভাষা আন্দোলনে শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ থেকে কি আপনার কখনও মনে হয়েছে যে, এর পেছনে ভাষার চাইতে অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিটিই বেশি সোচ্চার?
মুনীর চৌধুরী : (একটু চিন্তা করলেন, কপালে, মুখে তাঁর ডান হাতের আঙুলগুলো এলোমেলো খেলা করল কিছুক্ষণ— তারপর খুবই দৃঢ়স্বরে তিনি বললেন,) – হ্যাঁ । আমার সব সময়ই মনে হয়েছে ভাষাকে কেন্দ্র করে ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত আন্দোলনের এই যে বিস্তৃতি তার মধ্যে দরিদ্র-মধ্যবিত্ত ক্ষয়িষ্ণু পরিবারের ছেলেমেয়েদের অংশগ্রহণের এই যে উন্মাদনা, এর পেছনে, অর্থনৈতিক অব্যবস্থা অনেকাংশে দায়ী। তিনি ‘অনেকাংশে’ শব্দটা পাল্টে নিয়ে পুনর্ব্বার আরো জোর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন— বলা চলে মূল কারণ। তিনি উল্লেখ করেন; এই ভাষা আন্দোলনে মূলত মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ তাই নানা কারণে উল্লেখযোগ্য।
হুমায়ুন কবির: তাহলে, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক মুক্তি প্রশ্নটিকেই আমরা পুরোধা ধরে নিতে পারি।
নির্মলেন্দু গুণ: আপনাকে কবে কোথায় গ্রেফতার করা হয়?
মুনীর চৌধুরী : আমার তারিখটা মনে নেই— খুব সম্ভব ২৪শে ফেব্রুয়ারি ভোরে ২৭নং নীলক্ষেতের বাসা থেকে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে ।
হুমায়ুন কবির : এই কি আপনি প্রথম গ্রেফতার হলেন ?
মুনীর চৌধুরী : (হাসলেন তিনি, আমার মনে হলো এই মুহূর্তে তিনি অতীতের অনেক কিছু ভাবছেন) না, ১৯৪৯ সালের ৩রা জুন আমি প্রথম গ্রেফতার হই।
নির্মলেন্দু গুণ : অপরাধ?
মুনীর চৌধুরী : আমি তখন রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। রেল শ্রমিকরা তখন তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য হরতালের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হয়ত সে কারণেই আমাকে গ্রেফতার করা হয়। (রেলওয়ে শ্রমিক প্রসঙ্গে আমরা তাঁর কাছ থেকে সোমেন চন্দের কথা শুনলাম— সোমেন চন্দও একসময় রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নে জড়িত ছিলেন। তখন অবশ্য সোমেন চন্দ বেঁচে নেই। সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্টদের হাতে ঢাকার এই তরুণ সাহিত্যকর্মী নিহত হন।)
নির্মলেন্দু গুণ : আপনি এক সময়ে মার্কসবাদে বিশ্বাসী রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। কারাগারে বসে আপনি ‘কবর’ নাটিকা যখন রচনা করেন, তখন কি বাইরের আন্দোলনকে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার দিকে প্রবাহিত করার কথা ভাবতেন?
মুনীর চৌধুরী : প্রকৃতপক্ষে তখন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক ছিল না। ১৯৪৮-এর পর থেকেই আমার আত্মোপলব্ধি হয়েছিল যে, প্রত্যক্ষ রাজনীতি আমার ক্ষেত্র নয়।
নির্মলেন্দু গুণ : অর্থাৎ একজন শিক্ষাবিদ ও লেখক হিসেবে আপনার কার্যক্রম সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
মুনীর চৌধুরী : প্রধানত তাই।
নির্মলেন্দু গুণ : আপনি তখন ছাত্র, ১৯৪৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভাষা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে যে প্রথম ছাত্রসভা হয় তাতে আপনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন— আপনার কি মনে আছে, আপনি কী বলেছিলেন সেখানে ?
মুনীর চৌধুরী : আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম ঘটনাটা। বদরউদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ পড়ে আমি সেটা জানলাম— কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আমি ঠিক মনে করতে পারছি না, আমি হুবহু কিভাবে কী বলেছিলাম, তবে বক্তব্য নিশ্চয়ই ‘ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাধিকার দিতে হবে’— ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’— এই সবই ছিল। আমাদের বক্তব্য ছিল বাংলার পক্ষে লড়াই করা প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের জন্যই লড়াই।
নির্মলেন্দু গুণ : এমন কোনো ঘটনার কথা কি আপনার মনে পড়ে যা একুশের স্মৃতি মনে এলেই— হোক আপনার খুবই ব্যক্তিগত তবুও— যা একটি নতুন তাৎপর্য বহন করে, যা কোথায় আলোচিত হয় নি, খুব ব্যক্তিগত হয়েও যা ব্যক্তিকে অতিক্রম করে যায়?
মুনীর চৌধুরী : (কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন তিনি) তেমন কিছু মনে পড়ছে না; শুধু মনে পড়ছে, আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সবেমাত্র শিক্ষকতায় ঢুকেছি— সাইকেলে চড়ে ক্লাস করতে যেতাম । এগারটার সময় ক্লাস করে বাসায় ফিরছি। সাইকেলে থাকা অবস্থাতেই টিয়ার গ্যাস-এর শব্দ আমার কানে আসছিল— আমি বাসায় না গিয়ে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেই ফিরে যেতে চাইলাম। কিন্তু পথে গিয়েই দেখলাম, সারা পথ ফাঁকা, থমথমে, ইপিআর-এর গাড়িগুলো যাচ্ছে-আসছে— বিশ্ববিদ্যালয় ভবন থেকে ইট-পাটকেল ছুঁড়ছে ছেলেরা। একেবারে গুলি চালানোর পূর্ব অবস্থা। একজন পুলিশ সার্জেন্ট আমাকে সাইকেলসমেত থামাল— ‘ভাগো হিয়াসে’। আমি রেগে গিয়ে বলতে চাইলাম— আই এম এ ভার্সিটি টিচার। মূর্খ পুলিশের কানে সেটা অর্থহীন শোনাল। পেছন থেকে লাঠি দিয়ে আঘাত করল একজন পুলিশ— আমি মাটিতে পড়ে গিয়েছিলাম। আজকে সেই দিনের কথা মনে করেই আমার ড. জোহার কথা মনে পড়ছে। জোহা সেটা সহ্য করতে পারেননি— আর পারে নি বলেই জীবন দিয়ে তাঁকে চলে যেতে হলো। সাইকেলে উঠিয়ে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে পুলিশ আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল— আমি ভিসির কাছে গিয়ে নালিশ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু যাবার পথেই শুনলাম গুলির শব্দ। তার পর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়লো ছাত্র হত্যার সংবাদ, যার কাছে আমার নিজের সংবাদ মনে হচ্ছিল অর্থহীন।
(পুলিশের অত্যাচারের কথা শুনেই একটু উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল হুমায়ুন, সে সঙ্গে সঙ্গেই ড. জোহার হত্যাকারীদের সমুচিত শাস্তি বিধানের দাবি জানানোর জন্যে মুনীর চৌধুরীর প্রতি আহ্বান জানাল এবং আমাকে এ তথ্যটি ভালোভাবে লিপিবদ্ধ করার অনুরোধ জানাল।]
নির্মলেন্দু গুণ : একুশের শহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করেও বলছি—- আমার মনে হয়, আমাদের দেশে আসাদই প্রথম রাজনীতি সচেতন শহীদ। একুশে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের কেউই রাজনীতি-সচেতন ছিলেন না— আপনি কি স্বীকার করেন, কিম্বা এঁদের মধ্যে কেউ রাজনীতি সচেতন ছিলেন বলে আপনার মনে পড়ে ?
মুনীর চৌধুরী : আমার তেমন মনে পড়ে না— তবে রাজনীতি সচেতন শহীদ বলতে আসাদকেই বোঝায়। এই প্রসঙ্গে তিনি শহীদ আবদুল মালেকের নামও উল্লেখ করেন এবং আক্ষেপ করে বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারিতে আরো অনেক বেশি লোক শহীদ হয়েছে বলে আমার ধারণা। শহীদদের একটা প্রামাণিক দলিল তৈরি করা উচিত।
নির্মলেন্দু গুণ : যারা একুশের ভাষা আন্দোলনে হিন্দুদের হস্তক্ষেপ ও স্বার্থ আবিষ্কার করে আপনাদের বিরোধিতা করেছিলেন, আপনার কি ধারণা তারা আজও ধর্মের নামে বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে বিকৃতি করার কাজে লিপ্ত রয়েছে? এদের বিরুদ্ধে কি আপনি সচেতন?
মুনীর চৌধুরী : নিশ্চয়ই আছে এবং আমি অনেকের মতো এদের বিরুদ্ধে সচেতন। যদিও আগের চেয়ে এদের কণ্ঠ খুবই ক্ষীণ তবুও সরকারি পর্যায়ে এরা অনেক বড় বড় পদ অলঙ্কৃত করে রয়েছে। সুতরাং এদের বিরুদ্ধে সচেতন থাকাটা সবারই উচিত।
নির্মলেন্দু গুণ : বাংলা একাডেমী তার সাহিত্য পুরস্কারের নাম ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সাহিত্য পুরস্কার’ রাখা ঠিক করেছেন। আপনি কি এটাকে একটা শুভ পদক্ষেপ বলে মনে করেন এবং আদমজী, দাউদ প্রভৃতি শিল্পপতিগোষ্ঠী পরিচালিত প্রদত্ত পুরস্কারের নাম পরিবর্তন করার বা এসব পুরস্কার বর্জন করার যে দাবি উচ্চারিত হচ্ছে, আপনি কি তা সমর্থন করেন?
মুনীর চৌধুরী : হতে পারে এটা একটা শুভ পদক্ষেপ কিন্তু বিরাট পদক্ষেপ বলে আমি মনে করি না। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, বাংলা উন্নয়ন বোর্ড গণসমর্থন অর্জন করার জন্য একুশের সংকলনকে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে— রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক-গায়িকাদের ডেকে নিয়ে পুরস্কার দিয়েছেন।
নির্মলেন্দু গুণ : অর্থাৎ অনেকে সময়ের সাথে সুর মিলিয়ে রঙ বদলাচ্ছে বলে আপনার ধারণা!
মুনীর চৌধুরী : সে জন্যেই বলছিলাম— যে পর্যন্ত আমাদের সমাজজীবনে প্রচলিত ব্যবস্থাকে অস্বীকার করতে না পারছি, সে পর্যন্ত কোনো ব্যাপারেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না।
(আদমজী, দাউদ পুরস্কার সম্পর্কে তিনি বলেন, সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া এগুলো বর্জন করার খুব বেশি অর্থ হয় না। কেননা, নাম পরিবর্তনই বড় কথা নয়। তিনি স্বীকার করেন, আদমজী পুরস্কারে কোনো সময়ই সাহিত্যমূল্য রক্ষিত হয় নি; এতে লেখকের আর্থিক লাভ ছাড়া অন্য কিছুই হয় না। এই পুরস্কার লাভে কোনোই গৌরব নেই। কোনো লেখক যদি পুরস্কার বর্জন করেন তিনি তাঁকে শ্রদ্ধা করবেন। এটা লেখকের জীবন-চেতনার উপর নির্ভর করে। রাজনৈতিক কর্মী না হলে যে-কোনো লেখকের যে-কোনো দেশীয় পুরস্কার গ্রহণেও তার আপত্তি নেই। তিনি কথা প্রসঙ্গে বলেন,) আদমজী পুরস্কার চালু হবার প্রথম বৎসর আলাউদ্দীন আল-আজাদকে কবিতার জন্য পুরস্কার দেবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আলাউদ্দিন আল-আজাদ তখন জেলে— পুলিশ রিপোর্ট আজাদের বিরুদ্ধে থাকার জন্যে রাইটার্স গিল্ডের তৎকালীন কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত রশীদ করীমের মতো সাম্প্রদায়িক লেখককে আদমজী পুরস্কার দিয়ে দেন। রাজনৈতিক গোলমালের ভয়ে আমার ‘কবর’কেও আদমজী পুরস্কার দেয়া হয় নি। সুতরাং বলা চলে, আদমজী ইত্যাদি পুরস্কার গ্রহণে আর্থিক লাভ ছাড়া অন্য কোনো সম্মান নেই।
নির্মলেন্দু গুণ : প্রেস ট্রাস্টের অবলুপ্তির দাবিকে আপনি সমর্থন করেন ?
মুনীর চৌধুরী : কোনো প্রতিষ্ঠানকেই প্রতিষ্ঠানগত দিক থেকে বিচার করা কঠিন— এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যাকে সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিমুক্ত বলা চলে। এখানে পরিচালনার ভার নিয়ে প্রশ্ন। প্রেস ট্রাস্টের পত্রিকা বলেই আমি দৈনিক পাকিস্তানে’র নিন্দায় বিশ্বাসী নই ।
নির্মলেন্দু গুণ : ট্রাস্টের কোনো কোনো পত্রিকা কি বাঙালি স্বার্থ ও সংস্কৃতি বিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক ভূমিকা গ্রহণ করে নি?
মুনীর চৌধুরী : স্বীকার করি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জনগণের মুখোশ পরিহিত অন্যান্য পত্রিকার কথাও ভাবতে হবে— এসব ভাবলে প্রেস ট্রাস্টকে কেবল একা দায়ী করা চলে না। (ট্রাস্টভুক্ত নয় এমন একটা ইংরাজি দৈনিকের কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন,) এই পত্রিকা বরাবর গণবিরোধী ভূমিকা নিয়েছে এবং এখনও গণবিরোধী কাজ করে যাচ্ছে।
নির্মলেন্দু গুণ : বাংলা ছাড়াই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় চালু করার নিন্দে করে ড. এনামুল হক যে বিবৃতি দিয়েছেন। তাঁর মতো আপনিও কি মনে করেন যে, এটা রূপান্তরিত সাম্প্রদায়িক ও সংস্কৃতি-বিরোধী একটি ষড়যন্ত্রের নামান্তর মাত্র ?
মুনীর চৌধুরী : আমি ড. এনামুল হকের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত এবং আমি জানি, এটা পূর্বপরিকল্পিত। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুসলিম শব্দটিও খসবে এবং বাংলাও পূর্ণ উদ্যমে চালু হবে।
নির্মলেন্দু গুণ : সম্প্রতি কবি জসীমউদ্দিন সাহেব পত্রিকায় একটি বিবৃতির মাধ্যমে বিএনআর-কে সমর্থন করেছেন— অথচ জনমত এর অবলুপ্তির দাবি করছেন। আপনার বক্তব্য কী?
মুনীর চৌধুরী : এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক যে, জসীমউদ্দীন সাহেব অনেকদিন যাবত (হয়ত বার্ধক্যও একটা কারণ হতে পারে) এমন অনেক কাজ করছেন যাকে কোনোক্রমেই শুভ ও স্বাস্থ্যকর বলা যায় না। এই বিবৃতিটি শুধু এই প্রমাণ করে যে, জসীমউদ্দীন সাহেব বিএনআর পরিচালকের স্তাবক দলভূক্ত। তাঁর বিবৃতিতে দেশের জনশ্রদ্ধ লেখকদের হেয় প্রতিপন্ন করার যে মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে তা নিন্দনীয়।
নির্মলেন্দু গুণ : এতো হলো জসীমউদ্দীন সাহেবের বিবৃতি সম্পর্কে অনেকের মতোই আপনারও বক্তব্য— কিন্তু বিএনআর সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।
মুনীর চৌধুরী : কোনো সংগঠনের প্রতিই আমার কোনো সংগঠনগত বিক্ষোভ নেই, যদি না সে সংগঠন গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। বিএনআর-এর বিরুদ্ধে অমার যা বক্তব্য তা হলো এর পরিচালনার ভার অধিকাংশ সময়ই অসৎ লোকদের হাতে ন্যস্ত ছিল—
নির্মলেন্দু গুণ : এবং এখনও আছে।
মুনীর চৌধুরী : হ্যাঁ, আমি বিএনআর-এর অবলুপ্তির কথাও বলি না— তাঁর পরিচালকের অপসারণের কথাও বলি না। আমার দাবি বিএনআর সরকারি অর্থ নিয়ে যে অপচয় এবং উদ্দেশ্যমূলক পক্ষপাতিত্বপূর্ণ কার্যকলাপ এতদিন চালিয়ে গেছে, তার একটা সুষ্ঠু হিসাব-নিকাশ ও বিহিত হওয়া প্রয়োজন।
নির্মলেন্দু গুণ : সাহিত্য-সংস্কৃতির নামে বিএনআর সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা এবং সাহিত্য পদবাচ্য নয় এমন অনেক লেখকের পুস্তক প্রকাশের নামে যে অযাচিত অর্থ বরাদ্ধ করেছে— আপনি তার সম্পর্কে অবহিত আছে নিশ্চয়ই?
মুনীর চৌধুরী : আমি জানি এবং জানি বলেই এর একটা তদন্ত অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে আমি মনে করি। আমি জানি এমন অখ্যাত অজ্ঞাত লেখক আছেন যাদের রচনা বাজারে বিক্রি হয় না অথচ বিএনআর সেসব পুস্তকের মধ্যে হঠাৎ করে ইসলামের আলো দেখতে পেয়ে বহু অর্থের বিনিময়ে পুনঃপ্রকাশে লেখককে সম্মানিত করেছে। তাই এর পরিকল্পিত গণবিরোধী ভূমিকা সম্পর্কে আমি নিঃসন্দেহ।
নির্মলেন্দু গুণ : বাংলা একাডেমীর প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানের কথা আপনার মনে আছে কি?
মুনীর চৌধুরী : হ্যাঁ, তখন যুক্তফ্রন্ট সরকার হয়েছে দেশে। আমি জেল থেকে সবেমাত্র বের হয়েছি অথচ আমি আমন্ত্রিত হইনি। আমি বাংলা একাডেমীর গেট পর্যন্ত গিয়েছিলাম, আশা ছিল, কেউ নিশ্চয়ই এগিয়ে এসে নিয়ে যাবে, কিন্তু কেউ আসে নি, আমি ফিরে এসেছিলাম। (আমরা সবাই তখন হেসে উঠেছিলাম, তিনিও যোগ দিলেন)
হুমায়ুন কবির : এটার পেছনে কোনো হীন উদ্দেশ্য ছিল বলে আপনি মনে করেন— কিম্বা আপনি ছাড়াও আরো কেউ কেউ কি এরকম আমন্ত্রণ পাননি?
মুনীর চৌধুরী : আমি সবার কথা জানি না। তবে আমি ছাড়াও শ্রীরণেশ দাশগুপ্ত এবং সরদার ফজলুল করিমও নিমন্ত্রণ পান নি বলে আমার মনে পড়ে।
(আমাদের আলোচনা অনেক দীর্ঘায়িত হয়ে যাচ্ছিল। তিনি আমাকে অন্য আর একদিন আসার কথা বলছিলেন— তখন রাত অনেক হয়ে গেছে। আরো কিছু প্রশ্ন করার থাকলেও অগত্যা আমি শেষ প্রশ্ন করলাম তাঁকে।)
নির্মলেন্দু গুণ : দেশে আকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলার সঙ্গে যদি সৎ সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাহলে মিলিতভাবে কোনো সাহিত্য সম্মেলন আহ্বানের উদ্যোগ নেবার কথা চিন্তা করছেন কি?
মুনীর চৌধুরী : এ ব্যাপারে এখন কোনো মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ হিসেবে— এই ভাষার উল্লেখযোগ্য লেখকদের প্রতি আমার সঙ্গত কারণেই শ্রদ্ধা অপরিসীম। তবে এ ধরনের কোনো সাহিত্য সম্মেলনের উদ্যোগ কেবলমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরেই সম্ভব। পরিবর্তিত রাজনৈতিক অবস্থার জন্যেই নয়— এর আগ থেকেও আমি যে দাবিটা জানিয়ে আসছিলাম, তা হলো দুই বঙ্গের রাজনৈতিক সম্পর্ক যাই থাকুক না কেন, তা যেন আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশের অন্তরায় না হয় । বাংলাভাষায় লিখিত পুস্তক, চলচ্চিত্র, গান সবই আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিকাশে অপরিহার্য শব্দের আদান-প্রদানে রাজনীতি যেন আমাদের অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়। আর আমার মনে হয়, সৎ সম্পর্ক গড়ে ওঠলে উদ্যোক্তার অভাব হবে না।
সূত্র : আনিসুজ্জামান সম্পাদিত, মুনীর চৌধুরী রচনাসগ্র ১, অন্যপ্রকাশ
[নোট: ২৭ নভেম্বর শহিদ মুনীর চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ। জন্মদিনে বাংলাদেশের, বাংলা ভাষার এই লেখক ও চিন্তককে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে ‘আখড়া’। ‘আখড়া’র পাঠকদের জন্য আজ থাকছে মুনীর চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার।]
মুনীর চৌধুরীর কথোপকথন