Skip to Content

২০২৪ সালের অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানে একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলো। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের পথে শুরু হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নতুন অভিযাত্রা। আমরা এখনও তৈরি হতে থাকা এই নতুন ইতিহাসের আলো-আঁধারে ভরা টানেল ধরে টলমল পায়ে হাঁটছি। আমাদের এই নতুন যাত্রার ফলাফল এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে নাই। 

বিগত স্বৈরাচারের আমলে যে বিপুল প্রতিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা আমাদের নতুন রাজনৈতিক বোধি ও সত্তাকে গঠন করছিল, পুরাতন রাজনৈতিক ভাষা, চিহ্ন ও বিধিব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা আনকোরা এজমালি ভাষা ও চিহ্নব্যবস্থা গড়ে তুলছিল, স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্রের ভাবাদর্শিক ভিত্তিগুলোকে ধ্বসিয়ে দিচ্ছিল প্রবলবেগে, আর মানুষের মুক্তির শাশ্বত আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে তুলছিল এক নতুন রাষ্ট্রকল্পের প্রস্তাবনায়—৫ আগস্ট ছিল সে-সবকিছুর একটা তুরীয় মুহূর্ত। আমাদের সে-সকল চিন্তা ও তৎপরতার এক অলৌকিক বিস্ফোরণ ছিল জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান। 

কিন্তু তারপর কী? জুলাইয়ের বিপুল জোয়ারে ভাটার টান লাগার পর আমরা দেখলাম, এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা ন্যূনতম কোনো ঐক্যমত্যে পৌঁছতে পারছি না। মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের যে লড়াইয়ে আমরা নেমেছিলাম, বাস্তব রাজনীতির জমিনে তার গন্তব্য কী হবে বা হওয়া উচিত? এ প্রশ্নের কোনো সামগ্রিক জবাব আমরা জনপরিসরে হাজির করতে পারিনি। ‘জুলাই সনদ’ এর এক ধরনের জবাব বটে; তবে সেটিও বিবিধ ধোঁয়াশা, অস্পষ্টতা, অনৈক্য ও অনিশ্চয়তায় কণ্টকাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। 

এরই মধ্যে শুরু হলো গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের নয়া সফর। এই পরিস্থিতিতে আমাদের বুদ্ধিজীবী, অ্যাকটিভিস্ট ও নাগরিক সমাজের জন্য সামনে রয়েছে বিশাল চ্যালেঞ্জ। 

একদিকে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের পুরোনো অংশ হারিয়ে গিয়েছে, গত রেজিমে জন্ম নেওয়া নতুন জাগ্রত অংশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ভিড়েছেন। অবিশ্বাস আর বিভাজনের হাইপার-পলিটিক্সই দখল করেছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী নাগরিক পরিসর। এই পরিস্থিতি অনুমেয় ছিল বটে; কিন্তু কাম্য ছিল না। এ পরিস্থিতিতে নতুন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লড়াই শুরু করতে হবে।

অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণের গুরুতর যজ্ঞ। আমাদের প্রজন্মের রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজমের পুরোটাই ঘটেছে ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরতান্ত্রিক রেজিমের আমলে। যে রাজনৈতিক ভাষায় আমরা স্বৈরাচারকে জবাব দিয়েছি, গণতান্ত্রিক রূপান্তরকালে বা গণতান্ত্রিক পর্যায়ে, আমাদের সেই ভাষা কেমন হবে বা হওয়া উচিত, সেটিও আমাদের নির্মাণ করতে হবে। এটা দীর্ঘমেয়াদি লড়াই। প্রায়ই আমাদের রাজনৈতিক ভাষাও ঠিক করে দেয় আমাদের দিশা। 

প্রবল প্রতাপশালী স্বৈরাচারকে ভেঙেচুরে গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য যে নতুন আনকোরা এজমালি ভাষা ও চিহ্নব্যবস্থা গড়ে তুলছিল জুলাইয়ের প্রজন্ম, তাকে এবার গণতান্ত্রিক পরিসরে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি নির্মাণের যোগ্য করে তুলতে হবে। যে স্বপ্ন, সাধ ও সাধনাকে ধারণ করার ফলে জুলাই সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল, তাকে এবার ভাষা, প্রতীক, শ্লোগান ও দেয়াল লিখনের জগত থেকে বাস্তবে মূর্ত করে তোলার মতো চিন্তাশৈলী, ভাষা-বিন্যাস ও কর্মকাঠামো আমাদের গড়ে তুলতে হবে। জুলাইয়ের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের প্রবল বন্যা যে বিপুল পলিমাটি ফেলে গেছে এই ভূখণ্ডে, সে মাটিতে এখন ধ্যানী কৃষকের নিমগ্নতা, সতর্কতা ও কুশলতায় ফলিয়ে তুলতে হবে বিপুল সোনালি ফসল। কাজটি কতোটা কঠিন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে আমরা নিঃসন্দেহে কিছুটা হলেও তা টের পেয়েছি। 

এই কঠিন, দুরূহ, কিন্তু অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ কাজটিই শুরু করতে চায় ‘আখড়া’। আখড়ায় যেমন সকল মত ও পথের মানুষের মধ্যে এক অবারিত, স্বতঃস্ফূর্ত, বিকেন্দ্রিত, সচকিত মোলাকাত ও মোকাবেলার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে নতুন মানুষ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির নয়া পরিসর, ঠিক তেমনই নানা মত-পথের স্বতঃস্ফূর্ত মিলন ও মন্থনের ফলেই জুলাই সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল। আমরা মিলন ও মন্থনের সেই সক্রিয়, স্বতঃস্ফূর্ত, এজমালি ও রুহানি ধারাকে অবলম্বন করেই খুঁজতে চাই মুক্তির নতুন দিশা। 

‘আখড়া’র এই আসমুদ্রহিমাচল মুসাফিরিতে আপনারাও যুক্ত হোন!

আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

‘আখড়া’র লক্ষ্য একটি মুক্ত, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের চিন্তা ও চর্চাকে এগিয়ে নেওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, সামাজিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নতুন চিন্তা, নতুন ভাষা ও নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর। বিভিন্ন মত, পথ ও অভিজ্ঞতার মানুষের মধ্যে উন্মুক্ত সংলাপ, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরি করা আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। তরুণদের স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা ও নাগরিক অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে দায়িত্বশীল চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করতে চাই।


প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষা ও চিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান করা আমাদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমাজের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ ও অভিজ্ঞতাকে আলোচনায় যুক্ত করে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ খুঁজতে চাই। মিলন, মন্থন, সংলাপ ও সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ‘আখড়া’ নতুন চিন্তা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি উন্মুক্ত পরিসর গড়ে তুলতে চায়।

আমরা যা নিয়ে কাজ করি

‘আখড়া’ ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি—মানুষ ও রাষ্ট্রকে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ নানা ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্য, ধ্রুপদী চিন্তা এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের ভাবনা আমাদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, রাষ্ট্র, ক্ষমতা, নাগরিকত্ব, সামাজিক ন্যায় ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে আমরা পাঠ, গবেষণা ও মুক্ত আলোচনা করি। সমকালীন সমাজের পরিবর্তন, তরুণ প্রজন্মের ভাবনা এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের নানা প্রশ্ন নিয়েও আমাদের কাজ চলবে। শিল্প, সংস্কৃতি, দেয়াললিখন, প্রকাশনা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমরা নতুন চিন্তা ও অভিব্যক্তির জায়গা তৈরি করতে চাই। বিভিন্ন মত ও অভিজ্ঞতার মানুষের অংশগ্রহণে আলোচনা, বিতর্ক ও মন্থনের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি। আমাদের কাজের মূল উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে মানুষের মুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা।