[সম্পাদকীয় নোট: শাতাল মৌফে হাল-জমানার নামজাদা পোস্ট-মার্কিস্ট তাত্ত্বিক। বেলজিয়ান এই পলিটিকাল সাইন্টিস্ট বর্তমানে ওয়েস্টমিনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। বিশেষত গ্রামসির চিন্তা ও পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের তত্ত্ব ব্যবহার করে তিনি তার রাজনৈতিক তত্ত্ব গড়ে তোলেন। বামপন্থী রাজনীতিকে ‘র্যাডিকাল গণতন্ত্র’ ধারণার আলোকে সংজ্ঞায়িত করার কাজ করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন যাবত। আর্নেস্তো লাক্লাউর সাথে যৌথভাবে রচিত Hegemony and Socialist Strategy কিতাবটি সবচেয়ে আলোচিত ও বহুল পঠিত। এছাড়াও তার গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের মধ্যে রয়েছে: Gramsci and Marxist Theory (ed. 1979), Dimensions of Radical Democracy (ed. 1992), The Return of the Political (1993), The Democratic Paradox (2000), On the Political (2005), Agonistics: Thinking the World Politically (2013), Podemos: In the Name of the People (2016), For a Left Populism (2018) ইত্যাদি। মৌফের সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল Agonistics: Thinking the World Politically (Verso, 2013) কিতাবের শেষাংশে (পৃ. ১২৯-৪৬)। সাক্ষাৎকারটি নেন এলক ওয়াগনার (Elkc Wagner); ২০০৭ সালে, লন্ডনে। এটি ২০০৭ সালেই একটি সংকলনে প্রথম প্রকাশিত হয় (Und jetzt?: Politik, Protest und Propaganda [And Now?: Politics, Protest and Propaganda], (ed.) Heinrich Geiselberger, Berlin: Suhrkamp, 2007)।]
প্রশ্ন: আপনার ও আর্নেস্তো লাক্লাউয়ের Hegemony and Socialist Strategy কিতাবটি বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে
এবং নয়া সামাজিক আন্দোলন (New Social Movements) সংক্রান্ত তত্ত্বের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এই কিতাবে আপনারা রাজনৈতিকতার (political) প্রকৃতি বিষয়ক সমসাময়িক আলাপে প্রবেশের জন্য মার্কসবাদী তত্ত্বকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। আপনি কি দয়া করে এই কিতাবের জেনেসিস এবং এর মৌলিক ধারণাগুলি সম্পর্কে কিছু বলবেন? বিশেষত আধিপত্য বা হেজেমনি ধারণার ভূমিকা এখানে কী ছিল?
মৌফে: Hegemony and Socialist Strategy কিতাব লেখার সময় আমাদের দুটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। একটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, অন্যটি ছিল তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি ছিল সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পটিকে নতুন করে সাজানো, যেন এটি বামপন্থী চিন্তাধারার সংকটের—তা সে কমিউনিস্ট বা সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক, যে সংস্করণেই হোক না কেন—উত্তর দিতে পারে। আমাদের মতে, ১৯৬০-এর দশক থেকে উদ্ভূত নতুন সামাজিক আন্দোলনগুলোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কারণে এই সংকট আংশিকভাবে সৃষ্টি হয়েছিল। এই আন্দোলনগুলোর বিশেষত্বকে মার্কসবাদ বা সোশ্যাল ডেমোক্রেসি কেউই বুঝতে পারছিল না। যে বিষয়গুলো শ্রেণিভিত্তিক ছিল না, বা কেবল অর্থনৈতিক শোষণের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না—আন্দোলনের এমন বিশেষত্ত্বগুলোকে ধরার জন্য একটি পদ্ধতির বিকাশ ঘটানোই ছিল আমাদের তাত্ত্বিক লক্ষ্য। আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে এর জন্য খোদ রাজনৈতিকতা সম্পর্কিত তত্ত্বের বিশদ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আমরা দুটি ভিন্ন তাত্ত্বিক পদ্ধতিকে একত্র করে এই ধরনের একটি তত্ত্ব দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি: দেরিদা, লাকাঁ, ফুকোদের (আমেরিকান প্রায়োগিকবাদ (American Pragmatism) ও উইটগেনস্টাইনও এতে আছেন) কল্যাণে উত্তর-কাঠামোবাদ থেকে পাওয়া সারবাদী (essentialist) চিন্তার ক্রিটিক; এবং গ্রামসির ‘হেজেমনি’ ধারণা থেকে পাওয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি। এই তাত্ত্বিক পদ্ধতিটি কখনো ‘পোস্ট-মার্কিস্ট’ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে, আবার ‘ডিসকোর্স তত্ত্ব’ নামেও চাউর হয়েছে।

প্রশ্ন: আপনাদের এই অ্যাপ্রোচের মূল ধারণাগুলি কী কী?
মৌফে: আমাদের এই অ্যাপ্রোচের দুটি প্রধান বর্গ আছে। প্রথমত, ‘বৈরিতা’র (antagonism) ধারণা এবং দ্বিতীয়ত, ‘আধিপত্য’ (hegemony) ধারণাটি। বৈরিতার ধারণাটি আমাদের চিন্তাধারায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দাবি করে যে, নেগেটিভিটি বা নেতিবাচকতা সমাজের গাঠনিক অংশ এবং একে কখনো ছাড়িয়ে যাওয়া যায় না। বৈরিতার ধারণাটি এমন এক সংঘাতের অস্তিত্বকে হাজির করে যার কোনো যৌক্তিক সমাধান নেই। এটি লিবারেলবাদী বহুত্ববাদের (liberal pluralism) চাইতে ভিন্ন আরেক বহুত্ববাদের ইশারা দেয়। নিৎশে বা ম্যাক্স ওয়েবার যেমন দাবি করেছিলেন, এই বহুত্ববাদ সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গির বা মতবাদের চূড়ান্ত কোনো সমঝোতার অসম্ভাব্যতাকেই নির্দেশ করে। পরবর্তীকালে, The Democratic Paradox কিতাবে আমি বৈরিতার এই অদম্য মাত্রাকে ‘রাজনৈতিকতা’ (the political) নামে অভিহিত করার প্রস্তাব করেছিলাম। আমি এটাকে ‘রাজনীতি’ (politics) থেকে আলাদা করে হাজির করেছিলাম। আমার মতে, রাজনীতি হচ্ছে মানব সহাবস্থানকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে নেওয়া বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি হল হেজেমনি। আমার ও লাক্লাউর কাছে রাজনৈতিকতা ব্যাখ্যার জন্য বৈরিতা ও হেজেমনি দুইটা গোড়ার ধারণা। এগুলো নিম্নোক্ত উপায়ে সম্পর্কিত। রাজনৈতিকতা ও বৈরিতার ‘সদা হাজিরা’ বিষয়ক চিন্তার জন্য কোনো চূড়ান্ত ময়দানের অভাব যেমন মেনে নিতে হবে, তেমনি সমস্ত ব্যবস্থার অনির্ণেয়তা ও অনিশ্চয়তার মাত্রাকেও স্বীকার করে নিতে হবে। আমাদের পরিভাষা অনুযায়ী, সকল সামাজিক ব্যবস্থার হেজেমনির ধরনের ওপর জোরারোপ করা। হেজেমনি বলতে বোঝানো হচ্ছে, প্রত্যেক সামাজিক ব্যবস্থার ক্ষমতা-সম্পর্কের এক অনিশ্চিত গড়নকে, যার কোনো চূড়ান্ত যৌক্তিক ভিত্তি নেই। সমাজ হচ্ছে সর্বদা একগুচ্ছ চর্চা বা অনুশীলনের ফল, যা কিনা একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস বা ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করে। এগুলোকেই হেজেমনিক চর্চা বলি। সবকিছুই সবসময় অন্যরকম হতে পারত। প্রতিটি বিন্যাস আদতে অন্যান্য সম্ভাবনাগুলোকে খারিজ করে দেয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। একটি বিশেষ ব্যবস্থা বা বিন্যাস হলো সর্বদা ক্ষমতা-সম্পর্কের একটি বিশেষ বিন্যাসের প্রকাশ। এই অর্থে প্রতিটি ব্যবস্থা বা অর্ডারই হলো রাজনৈতিক। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা-সম্পর্ক যে গড়ন তৈরি করে দেয়, তা ব্যতীত সেই বিন্যাস টিকে থাকতে পারে না। বাস্তবিক রাজনীতিতে এই তাত্ত্বিক বিষয়টির প্রভাব অনেক। আজকাল প্রায়শই বলা হয় যে, নিও-লিবারেলবাদী গ্লোবায়ন যেন এক অনিবার্য নিয়তি। খেয়াল করেন, মার্গারেট থ্যাচার কতবার ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘কোনো বিকল্প নেই’? দুর্ভাগ্যবশত, অনেক সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট এই দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নিয়েছিলেন এবং মনে করতেন যে, তাদের একমাত্র কাজ হলো গ্লোবায়নের এই তথাকথিত সহজাত বিন্যাসকে আরও একটু মানবিক উপায়ে পরিচালনা করা।
তবে, আমাদের পদ্ধতি অনুসারে, এটা স্পষ্ট যে প্রতিটি ব্যবস্থাই হলো রাজনৈতিক, যা ক্ষমতা-সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট হেজেমনিক বিন্যাসের ফল। গ্লোবায়নের বর্তমান অবস্থা আর যাই হোক, ‘সহজাত’/‘প্রাকৃতিক’ নয়—বরঞ্চ এটি হলো নিও-লিবারেলবাদী হেজেমনির ফল। এবং এটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা-সম্পর্কের মাধ্যমে গঠিত। এর অর্থ হলো, এটিকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে ও পরিবর্তন করা যেতে পারে এবং বিকল্পগুলোও আমাদের সামনে রয়েছে। বুঝতেই পারছেন, রাজনীতিতে কীভাবে কাজ/অ্যাক্ট করা হবে তার জন্য হেজেমনিক বিন্যাসের এই ধারণাটি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। এর মানে হচ্ছে, আপনি সর্বদা রাজনৈতিকভাবে জিনিসগুলো পরিবর্তন করতে পারেন, তার মানে আপনি এগুলোকে রূপান্তর করার জন্য সর্বদা ক্ষমতা-সম্পর্কে হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
প্রশ্ন: আজকের বিশ্বে হেজেমনি-ভিত্তিক ক্ষমতা-সম্পর্কের বিকল্প কল্পনা করার ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গির কী পরিণতি বা প্রভাব রয়েছে?
মৌফে: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রথমে এই ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যে, ‘কোনো একটি সহজাত বিন্যাস বিদ্যমান, যা নাকি কোন নৈর্ব্যক্তিক বস্তুনিষ্ঠ শক্তির বিকাশের ফল—তা সেটি উৎপাদনের শক্তিই হোক, ইতিহাসের নিয়মই হোক, অথবা চেতনার বিকাশই হোক’। এই ধরনের আরোপিত ধারনাগুলোকে প্রশ্ন করতে হবে। বিকল্প-গ্লোবায়নের (alter-globalization) স্লোগান ব্যবহার করে আমরা বলতে পারি, ‘আরেকটা দুনিয়া সম্ভব!’ (‘Another world is possible!’)। বস্তুত, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, আরেক ধরনের দুনিয়া সর্বদা সম্ভব এবং ‘কোনো কিছু পরিবর্তন করা যায় না’-মার্কা ভাবনা কখনোই মেনে নেওয়া উচিত না। সবসময়ই এমন কিছু বিকল্প থাকে, যাকে আধিপত্যশীল হেজেমনি আড়াল করে রাখে এবং, যাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যেতে পারে। হেজেমনির তত্ত্ব আদতে এই বিষয়টিই বুঝতে সাহায্য করে। প্রতিটি হেজেমনিক ব্যবস্থা প্রতিহত করা যায় কাউন্টার-হেজেমনিক অনুশীলনের মাধ্যমে, যেগুলো বিদ্যমান ব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করে বা ভেঙে নতুন এক ধরনের হেজেমনি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। আপনি যেমন স্পষ্টই বুঝতে পারছেন, এ ধরনের তত্ত্ব মুক্তিমুখীন রাজনীতির লক্ষ্য কল্পনা করার পদ্ধতির উপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যদি রাজনৈতিক সংগ্রাম সর্বদাই বিভিন্ন হেজেমনিক অনুশীলন ও বিভিন্ন হেজেমনিক প্রকল্পের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব হয়ে থাকে, তবে এর অর্থ হলো এমন কোনো পর্যায় নেই যেখানে বলা যাবে যে, ‘পরিপূর্ণ গণতন্ত্র’ নামক গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছি বলে দ্বন্দ্বের থেমে যাওয়া উচিত। এই কারণেই Hegemony and Socialist Strategy-তে আমরা বামপন্থী প্রকল্পটিকে ‘র্যাডিকাল এবং বহুত্ববাদী/প্লুরাল গণতন্ত্র’র দৃষ্টিকোণে পুনর্বিন্যস্ত করি, এবং জোর দিই যে, একে একটি অবিরাম প্রক্রিয়া হিসেবে বুঝতে হবে। আমরা বিদ্যমান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল পরিবর্তন বা র্যাডিকালকরণের কথা বলি, যেন স্বাধীনতা ও সাম্যের নীতিগুলো ধীরে ধীরে আরও অধিক সংখ্যক সামাজিক সম্পর্কে বাস্তব রূপ পায়। আমাদের লক্ষ্য ছিল, যেমন আগেই উল্লেখ করেছি, নতুন সামাজিক আন্দোলনগুলোর উত্থাপিত চাহিদাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা। আমাদের কাছে বামপন্থার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল নারীবাদী, বর্ণবাদ-বিরোধী ও সমকামী আন্দোলন এবং পরিবেশবাদীদের নতুন দাবিগুলোকে এমনভাবে সংগঠিত করা, যেন এগুলো শ্রেণিভিত্তিক দাবির সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত হয়। এই প্রেক্ষিতে Hegemony and Socialist Strategy-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল ‘চেইন অব ইকুইভ্যালেন্স’ (chain of equivalence) বা ‘সমতুল্যতার শৃঙ্খল’। কিছু উত্তরাধুনিক তাত্ত্বিক যেভাবে এসব সংগ্রামের মধ্যে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের কথা বলেছিলেন, তার বিপরীতে আমাদের যুক্তি ছিল যে, বামপন্থার উচিত এসব ভিন্ন ভিন্ন সংগ্রামের মধ্যে একটি ‘সমতুল্যতার শৃঙ্খল’ গড়ে তোলা; ফলে, শ্রমিকরা যখন তাদের দাবি তুলবেন, তখন তারা কৃষ্ণাঙ্গদের, অভিবাসীদের, নারীবাদীদের দাবিকেও বিবেচনায় আনবেন। একইভাবে, নারীবাদীরাও যেন কেবল লিঙ্গভিত্তিক ইস্যু নয়, বরং অন্যান্য গোষ্ঠীর দাবিগুলোকেও বিবেচনায় আনেন। এভাবেই গণতান্ত্রিক সংগ্রামের একটি বিস্তৃত ‘চেইন অব ইকুইভ্যালেন্স’ তৈরি হবে। আমাদের দাবি ছিল যে, বামপন্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত সকল গণতান্ত্রিক শক্তির একটি সম্মিলিত ইচ্ছা বা কালেক্টিভ উইল নির্মাণ করা, যেন গণতন্ত্রের র্যাডিকালকরণের দিকে অগ্রসর হওয়া যায় এবং একটি নতুন হেজেমনি প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমি র্যাডিকাল গণতন্ত্র প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করতে চাই। উন্নত পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সমাজে একটি অধিক ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়তে হলে লিবারেল ডেমোক্রেটিক কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে নতুন ব্যবস্থার সূচনা করা জরুরি বলে যে মত চাউর আছে, আমরা এর সাথে একমত নই। আমরা এখানে প্রচলিত লেনিনবাদী বিপ্লবী মডেলের সমালোচনা করে দাবি করছি যে, আধুনিক প্লুরালিস্ট গণতন্ত্রে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মাধ্যমেই গভীরতর গণতান্ত্রিক অগ্রগতি সম্ভব। আমাদের মতে আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর সমস্যা তাদের স্বাধীনতা ও সাম্যের নৈতিক-রাজনৈতিক নীতিতে নয়; বরং সমস্যা হলো এই নীতিগুলো বাস্তবে কার্যকর হয় না। তাই এসব সমাজে বামপন্থার কৌশল হওয়া উচিত এই নীতিগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, যার জন্য কোনও র্যাডিকাল বিচ্ছেদ বা ভাঙন প্রয়োজন নেই। বরং গ্রামশি যাকে ‘ওয়র অব পজিশন’ (‘war of position’ বা ‘অবস্থানগত যুদ্ধ’) বলেছেন, সেটার মাধ্যমে একটি নতুন হেজেমনি তৈরি করাই এখানে উপযুক্ত পথ।
প্রশ্ন: আজকের দিনে এই চেইন অফ ইকুইভ্যালেন্স কীভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করা যেতে পারে? শ্রমিক ইউনিয়নগুলি বা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি কেমন ভূমিকা পালন করতে পারে?
মৌফে: আজ গণতন্ত্রকে র্যাডিকালকরণের সম্ভাবনা ত্রিশ বছর আগের তুলনায় অনেক কম অনুকূল। যখন আমরা আমাদের বইটি লিখেছিলাম, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। বামপন্থী প্রকল্পের জন্য সমতুল্যতার শৃঙ্খল তৈরি করার প্রয়োজন আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিও-লিবারেলবাদ এই ক্ষেত্রটিকে গভীরভাবে রূপান্তরিত করেছে। আশির দশকের শুরুতে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সাধারণ জ্ঞান বা কমনসেন্স ব্যাপক ছিল। আমরা সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতির সমালোচনা করতাম এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির র্যাডিকালকরণের পক্ষে ছিলাম, কিন্তু কেউ ভাবেনি যে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির অর্জনগুলো এতটা ভঙ্গুর ছিল। এরপর থেকেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। রেগান ও থ্যাচারের রাজনীতির মাধ্যমে নিও-লিবারেলবাদ তার বিজয়যাত্রা শুরু করে এবং বিশ্বব্যাপী গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটেনে ‘থ্যাচারিজম’ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির হেজেমনিকে সরিয়ে দিয়ে নিও-লিবারেলবাদী হেজেমনি প্রতিষ্ঠা করে—যা আজও বহাল রয়েছে। আমরা এখন এমন এক পরিস্থিতিতে আছি, যেখানে একসময় যেসব কল্যাণরাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথেষ্ট গণতান্ত্রিক নয় বলে সমালোচনা করতাম, সেগুলোই রক্ষার জন্য লড়াই করতে বাধ্য হচ্ছি। সাম্প্রতিক সময়ে, এমনকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ডস্বরূপ নাগরিক অধিকারগুলোকেও, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর নামে আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে গণতন্ত্রকে র্যাডিকাল করার জন্য সংগ্রাম করার বদলে, আমরা এখন বাধ্য হচ্ছি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের আরও ধ্বংস ঠেকানোর জন্য লড়াই করতে। তাহলে কী করা যেতে পারে? আমার দৃষ্টিতে, সব প্রগতিশীল শক্তিকে নিয়ে একটি বৃহৎ ফ্রন্ট গড়ে তোলা জরুরি। ‘অ্যাটাক’ (Attac) বা ‘ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম’ (World Social Forum)-এর মতো সিভিল সোসাইটি আন্দোলনগুলোর উচিত প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা। একটি বিস্তৃত সমতুল্যতার শৃঙ্খল প্রয়োজন; যেন বিদ্যমান হেজেমনিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য প্রতিষ্ঠানগত মধ্যস্থতা তৈরি করা যায়।
আমাকে যে বিষয়টি উদ্বিগ্ন করে তা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে সামাজিক আন্দোলনগুলোর অনীহা। আমি বিকল্প-গ্লোবায়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, এবং দেখেছি যে এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো প্রতিষ্ঠিত সংগঠনগুলোর প্রতি অত্যন্ত নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। তারা হার্ডট (Michael Hardt) ও নেগ্রির (Antonio Negri) ধারণায় প্রভাবিত। তারা Empire (2000) এবং Multitude (Multitude: War and Democracy in the Age of Empire, 2004) কিতাবদ্বয়ে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সিভিল সোসাইটি আন্দোলনগুলোর উচিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলা। তাদের মতে, এসব ‘মোলার’ (molar) প্রতিষ্ঠান হলো ‘ধরপাকড়ের যন্ত্র’, এবং মূল রাজনৈতিক সংগ্রাম ঘটে ‘মলিকুলার’ (molecular) বা মাইক্রোপলিটিক্সের স্তরে। তাদের মতে, খোদ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত বিরোধগুলোই সাম্রাজ্যের পতন ঘটাবে এবং এতে ‘মাল্টিটিউড’ (multitude)-এর বিজয় আসবে। বাস্তবে তারা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদী (economic deterministic) মার্কসবাদকেই—যেখানে উৎপাদনশক্তির বৈপরীত্য নিজেই পুঁজিবাদের পতন ঘটাবে এবং সমাজতন্ত্রের বিজয় আসবে—নতুন শব্দচয়নে পুনরুৎপাদন করছেন। যেন কিছু করার নেই, অপেক্ষা কেবল পুঁজিবাদের অবসানের। Empire বইয়ের মূল দৃষ্টিভঙ্গিও একই; অবশ্যই, এটা নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে ‘অ-বস্তুগত শ্রম’ (immaterial labour) এবং বিপ্লবী শক্তি হিসেবে আর প্রলেতারিয়েত নয়, বরং ‘মাল্টিটিউড’-কে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এটি এখনও সেই পুরোনো নির্ধারণবাদই। এই কারণেই তারা বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্যে কোনো প্রকার রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করা প্রয়োজন—এই ধারণাটিকে প্রত্যাখ্যান করেন। আমি যাকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন মনে করি, তারা সেটিকে কখনোই উত্থাপন করেন না। ‘মাল্টিটিউড’ কীভাবে রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত হবে? তারা স্বীকার করেন যে বিভিন্ন আন্দোলনের লক্ষ্য ভিন্ন ভিন্ন; কিন্তু এসব পার্থক্যকে কীভাবে সংগঠিত বা একত্র করা যায়—এ প্রশ্ন তাদের আলোচনায় আসে না। বরং তাদের মতে, এই সংগ্রামগুলো সমন্বিত না হওয়াই ভালো, কারণ প্রতিটি সংগ্রাম সরাসরি সাম্রাজ্যের ভার্চুয়াল কেন্দ্রকে আঘাত করে। আমি মনে করি, এই দৃষ্টিভঙ্গি বিকল্প-গ্লোবায়ন আন্দোলনের বিভিন্ন অংশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, কারণ এটি আন্দোলনকারীদের মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নটিকে উপেক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে যে, কীভাবে ভিন্নতার মধ্য দিয়ে সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন সংগ্রামের মধ্যে একটি চেইন অফ ইকুইভ্যালেন্স তৈরি করা সম্ভব?
‘মোলার’ ও ‘মলিকুলার’ জিল দেল্যুজ (Gilles Deleuze) ও ফেলিক্স গাত্তারির (Félix Guattari) তৈরি করা দুটি ধারণা। তারা তাদের যৌথভাবে লেখা বিখ্যাত দুটি বই Anti-Oedipus এবং A Thousand Plateaus-এ এই ধারণা দুটো ব্যাখ্যা করেছেন। ‘মোলার’ বলতে বড়, দৃশ্যমান, স্থির, হায়ারার্কিকাল, সুনির্দিষ্ট, কেন্দ্রীভূত ও সামষ্টিক কাঠামোকে বোঝানো হয় (যেমন: রাষ্ট্র, সমাজ, শ্রেণি, ধর্ম ইত্যাদি)। আর ‘মলিকুলার’ বলতে বোঝানো হয় ক্ষুদ্র, অদৃশ্য, প্রবহমান, বিকেন্দ্রিক, পরিবর্তনশীল ও একক অংশকে (যেমন: মানুষের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি, দৈনন্দিন আদান-প্রদান, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষোভ বা বিদ্রোহ ইত্যাদি)। হার্ডট ও নেগ্রির মতে, পুরাতন মার্কিস্টদের ‘প্রোলেতারিয়েত’ কিংবা লিবারেলদের ‘পিপল’ বা ‘জনতা’ হল ‘মোলার’। আর নিও-লিবারেলবাদ ও গ্লোবায়নের যুগে গড়ে ওঠা নতুন, জটিল ও ভিন্ন ভিন্ন বর্গের আলাদা আলাদা মানুষেরা হল ‘মলিকুলার’। এই ‘মলিকুলার’ই তাদের ভাষায় ‘মাল্টিটিউড’। এই ‘মাল্টিটিউড’ কোনো একক সত্তার অধিকারী ‘জাতি’ বা ‘জনতা’ না; আবার তারা কোনো অর্থপূর্ণ সম্পর্কহীন বিশৃঙ্খল মবও না। এরা পরস্পরের সাথে নানা জটিল, তবে অর্থপূর্ণ ও বৈপ্লবিক সম্পর্কজালে যুক্ত আলাদা আলাদা একক। তাদের মতে, আধুনিক বিশ্বে ‘মোলার’ আর বিপ্লবী কর্তাসত্তাকে (revolutionary subject) ধারণ করতে পারছে না। এর বিপরীতে ‘মাল্টিটিউড’-ই হল বর্তমান সময়ে পরিবর্তনের এজেন্ট (the agent of change)। এবং এই ‘মাল্টিটিউড’ কোনো ধরনের ‘মোলার’ (যেমন: রাষ্ট্র)-এর সহায়তা ছাড়া নিজেরাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম। মৌফে এই পয়েন্টে তাদের সাথে দ্বিমত করেন। মৌফে ‘মলিকুলার’-কে গুরুত্ব দেন; তাদের বিল্পবী কর্তাসত্তাও স্বীকার করেন। তবে তিনি মনে করেন যে, এদের মধ্যে একটি সমতুল্যতার শৃঙ্খল তৈরির মাধ্যমে, পাল্টা-হেজেমনি তথা ‘মোলার’ তৈরি করতে হবে। এছাড়া এই ‘মাল্টিটিউড’ বা ‘মলিকুলার’ কার্যকর কিছু করতে পারবে না।—সম্পাদনা পর্ষদ

প্রশ্ন: আপনার সাম্প্রতিক কাজে নেগ্রি এবং হার্ডট-এর দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনার পাশাপাশি, বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের দ্বারা প্রস্তাবিত ‘রাজনৈতিকতা’ (the political) সংক্রান্ত কিছু প্রধান তত্ত্বের ক্রিটিকাল অনুসন্ধানের মাধ্যমে, আপনি আপনার অবস্থান আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। এর দ্বারা আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
মৌফে: Hegemony and Socialist Strategy কিতাব লেখার পর এবং রাজনৈতিকতার ক্ষেত্রে মার্কসবাদের ত্রুটিগুলি তুলে ধরার পর, আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে লিবারেলবাদেও এর সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় না, কারণ এর ‘রাজনৈতিকতা’ নিয়ে কোনো তত্ত্ব নেই। এই কারণেই আমি বিভিন্ন লিবারেল মডেল নিয়ে আলোচনা শুরু করি, বিশেষ করে সেই সময়ে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল: জন রলসের মডেল। আমার মতে, লিবারেল তত্ত্ব রাজনৈতিকতার প্রকৃতি অনুধাবন করতে না পারার দুটি প্রধান কারণ রয়েছে: প্রথমত, এর যুক্তিবাদ (rationalism); দ্বিতীয়ত, এর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (individualism)। র্যাশনালিজম এবং যুক্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত সমন্বয়ে পৌঁছানো সম্ভব—এই বিশ্বাস মানুষকে রাজনীতির অন্তর্নিহিত বৈরিতার সম্ভাবনাকে স্বীকার করতে বাধা দেয়। আর ইন্ডিভিজুয়ালিজম রাজনৈতিক পরিচয়গুলো কীভাবে গঠিত হয় তা বোঝার সুযোগ দেয় না—কারণ রাজনৈতিক পরিচয় সবসময়ই সমষ্টিগত পরিচয়, যা আমরা/তারা সম্পর্কের ভিত্তিতে গঠিত হয়। এছাড়াও, লিবারেল তত্ত্বে প্রভাবশালী র্যাশনালিজম ও ইন্ডিভিজুয়ালিজম রাজনীতিতে ‘আবেগ’—যা আমি ‘passions’ শব্দে বর্ণনা করেছি—এর ভূমিকাকে বোঝার সুযোগ দেয় না। রাজনৈতিক পরিচয় গঠনের ক্ষেত্রে এই আবেগগত মাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি ধরুন। জাতীয়তাবাদের গুরুত্ব বোঝাই সম্ভব নয়, যদি না অনুধাবন করা যায় যে সমষ্টিগত পরিচয় কীভাবে আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার সচলতার মাধ্যমে গঠিত হয়। এজন্যই লিবারেল চিন্তাধারা জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন প্রকাশকে বোঝা বা মোকাবিলার ক্ষেত্রে সবসময়ই সমস্যায় পড়েছে। লিবারেলদের কাছে যেকোনো কিছু—যা সমষ্টিগত মাত্রা বহন করে—তা আদিম, অযৌক্তিক; আধুনিক সমাজে যার আর কোনো স্থান নেই। এই তাত্ত্বিক অবস্থানগুলো বিবেচনায় নিলে আশ্চর্যের কিছু নেই যে লিবারেলরা রাজনৈতিকতার গতিশীলতা বোঝার ক্ষেত্রে অন্ধকারে থেকে যান।
প্রশ্ন: এবং এই প্রেক্ষাপটেই কি আপনি কার্ল স্মিটের কাজের প্রতি আগ্রহী হতে শুরু করেন?
মৌফে: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি অনুভব করেছিলাম, স্মিট লিবারেলবাদের যে সমালোচনা করেছেন, তা সত্যিই শক্তিশালী। আমি আরও দেখে অবাক হয়েছিলাম, ১৯২০-এর দশকে স্মিট তার The Concept of the Political বইতে লিবারেলবাদের যে সমালোচনা করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে লিবারেল চিন্তাধারার বিকাশের ফলে এখনও প্রাসঙ্গিক। তিনি যুক্তি দেন যে লিবারেলবাদ ‘রাজনৈতিকতা’ বিষয়টিকে যথাযথভাবে ধরতে পারে না; আর যখন সে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে চায়, তখন সে হয় অর্থনীতির ভাষা ব্যবহার করে, নয়তো নীতিশাস্ত্রের ভাষা ধার নেয়। এই কথাটি আজকের রাজনৈতিক তত্ত্বে প্রভাবশালী দুইটি গণতান্ত্রিক মডেলের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়—একদিকে রয়েছে ‘অ্যাগ্রিগেটিভ’ (aggregative) বা ‘সমষ্টিবাদী’ মডেল, অন্যদিকে ‘ডেলিবারেটিভ’ (deliberative) বা ‘আলোচনামূলক’ মডেল। অ্যাগ্রিগেটিভ মডেল রাজনীতির ক্ষেত্রটিকে মূলত অর্থনৈতিক শর্তে কল্পনা করে। এই মডেলের প্রতিক্রিয়াতেই রলস ও হাবারমাস ডেলিবারেটিভ গণতন্ত্রের বিকল্প ধারণা তৈরি করেন। কিন্তু ডেলিবারেটিভ মডেল রাজনীতিকে ভাবতে গিয়ে নৈতিক বা নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে; এবং ফলে রাজনীতির নিজস্ব কোনো তত্ত্ব হাজির করতে পারে না। তবে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, লিবারেলবাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে স্মিটের সমালোচনার সাথে একমত হলেও, আমার লক্ষ্য একেবারেই ভিন্ন। স্মিট লিবারেল বহুত্ববাদী গণতন্ত্রকে একটি অকার্যকর শাসনব্যবস্থা হিসেবে দেখেন, কারণ তার মতে, লিবারেলবাদ গণতন্ত্রকে খারিজ করে এবং গণতন্ত্রও লিবারেলবাদকে খারিজ করে দেয়। কিন্তু আমার কাজের একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হলো এমন একটি বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের ধারণা হাজির করা, যেখানে রাজনীতির মাত্রাটিকে নতুন করে ফিরিয়ে আনা যায়। এই কারণেই স্মিট আমার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমার একটি প্রবন্ধের শিরোনাম (‘with Schmitt against Schmitt’) এমন ইঙ্গিত দেয় যে, আমি স্মিটকে স্মিটের বিরুদ্ধেই চিন্তা করছি। স্মিটের প্রতি আমার উত্তর হলো গণতন্ত্রের ‘অ্যাগোনিস্টিক’ (agonistic) মডেল, যেখানে আমি ‘অ্যান্টাগনিজম’ (বৈরিতা) ও ‘অ্যাগোনিজম’ (প্রতিদ্বন্দ্বিতা)-এর মধ্যে পার্থক্য করি। আমার যুক্তির পথটি এমন: প্রথমেই আমি স্মিটের সঙ্গে একমত হয়ে রাজনীতির মধ্যে নিহিত বৈরিতামূলক মাত্রাটিকে স্বীকার করি—অর্থাৎ এমন সব বৈরিতা বা সংঘাতের স্থায়িত্ব, যার কোনো যুক্তিনির্ভর সমাধান নেই। দোস্ত/দুশমনি সম্পর্ক এমন এক ধরনের নেতিকরণের (negation) সঙ্গে যুক্ত, যাকে দ্বান্দ্বিকভাবে অতিক্রম করা যায় না। তবে এই বৈরিতামূলক সংঘাত বিভিন্ন রূপ নিতে পারে। একদিকে, এটি প্রকাশ পেতে পারে প্রকৃত অ্যান্টাগনিজমের রূপে—স্মিটিয় অর্থে দোস্ত বনাম দুশমন সম্পর্ক হিসেবে। এখানে স্মিট নিঃসন্দেহে সঠিক যে, এ ধরনের বৈরিতাকে কোনো রাজনৈতিক সমাজের ভেতরে সামলানো যায় না; কারণ তা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংঘের বিনাশ ডেকে আনে। কিন্তু এটা আরেকভাবেও প্রকাশ পেতে পারে, যাকে আমি বলি ‘অ্যাগোনিস্টিক’ বা ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’। অ্যাগোনিজমের ক্ষেত্রে সম্পর্কটি দোস্ত ও দুশমনের নয়; বরঞ্চ এটি প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক—যারা পরস্পরের দাবির বৈধতাকে স্বীকার করে। তারা জানে যে তাদের সংঘাতের কোনো যুক্তিসঙ্গত চূড়ান্ত সমাধান নেই, তবু তারা কিছু নিয়ম মেনে নেয়, যার ভেতর দিয়েই এই সংঘাত নিয়ন্ত্রিত হবে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে যা থাকে, তাকে বলা যায় এক ধরনের ‘সংঘাতপূর্ণ ঐকমত্য’ (conflictual consensus)—তারা তাদের রাজনৈতিক সমিতিকে সংগঠিত করা নৈতিক-রাজনৈতিক নীতিগুলোর বিষয়ে একমত থাকে, কিন্তু সেই নীতিগুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে। অ্যান্টাগনিজম ও অ্যাগোনিজমের মধ্যে এই পার্থক্য করার মাধ্যমে আমি একদিকে যেমন বৈরিতার অবলুপ্তিহীনতাকে স্বীকার করে নেই, অন্যদিকে তেমনি দেখাতে পারি যে, এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে খারিজের দিকে নিয়ে যায় না। বরং আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলি—অ্যাগোনিস্টিক সংগ্রাম শুধু গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণই নয়; আসলে এই সংগ্রামই বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিশেষত্ব গড়ে তোলে। এই কারণেই আমি গণতন্ত্রের অ্যাগোনিস্টিক মডেলকে অ্যাগ্রিগেটিভ ও ডেলিবারেটিভ মডেলের একটি বিকল্প হিসেবে হাজির করি। আমার মতে, এই মডেলের বড় সুবিধা হলো, এটি সামষ্টিক পরিচয় নির্মাণে আবেগ বা প্যাশনের ভূমিকাকে স্বীকার করে এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির গতিশীলতাকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি স্বীকার করে যে, স্পষ্টভাবে নির্ধারিত বিকল্পগুলোর চারপাশে বিভিন্ন ধরনের সামষ্টিক পরিচয় নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি করা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।
প্রশ্ন: উলরিখ বেক (Ulrich Beck) ও অ্যান্থনি গিডেন্স (Anthony Giddens) যে ‘কসমোপলিটান সেকেন্ড মডার্নিটি’ (cosmopolitan second modernity)-এর ধারণা উপস্থাপন করেছেন, তার সঙ্গে আপনার কাজকে আপনি কীভাবে আলাদা করে দেখেন?
মৌফে: আমার অ্যাগোনিস্টিক মডেল অনুযায়ী এটা স্পষ্ট যে গণতান্ত্রিক রাজনীতি অবশ্যই দলীয় বা পক্ষাবলম্বী (partisan) হতে হবে। এই কারণেই আমি উলরিখ বেক ও অ্যান্থনি গিডেন্সের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করি। তারা মনে করেন, রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক (adversarial) মডেল এখন অচল হয়ে গেছে এবং আমাদের বাম-ডান বিভাজনের বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। কিন্তু আমার কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। আমার মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক কাঠামোই গণতান্ত্রিক রাজনীতির মৌলিক উপাদান। অবশ্যই, আমাদের বাম-ডান বিভাজনকে কোনো প্রকার সারবাদী জায়গা থেকে কল্পনা করা উচিত নয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময় ও প্রেক্ষাপটে এই ধারণাগুলোর অর্থ নতুনভাবে নির্ধারিত হয়। কিন্তু বাম-ডান পার্থক্যের আসল তাৎপর্য হলো, সমাজে বিভাজনের অস্তিত্বকে স্বীকার করা এবং এমন সব বিরোধকে মেনে নেওয়া, যেগুলো যুক্তিবাদী সংলাপের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। আমি অস্বীকার করি না যে, সাম্প্রতিক সময়ে বাম ও ডানের মধ্যকার সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বেক ও গিডেন্স যেখানে এটিকে গণতন্ত্রের অগ্রগতি বলে মনে করেন, আমি সেখানে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে এটি কোনো অনিবার্য বা ইতিবাচক অগ্রগতি নয়, বরঞ্চ এটি এমন একটি প্রবণতা, যা প্রতিহত করা দরকার। কারণ এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। মধ্য-বাম এবং মধ্য-ডানের গণতান্ত্রিক দলগুলির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিলীন হয়ে যাওয়ার ফল হলো মানুষের রাজনীতিতে আগ্রহ কমে যাওয়া। ভোটদানের হার উদ্বেগজনকভাবে কমে যাওয়াই তার প্রমাণ। এর কারণ হলো বেশিরভাগ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল কেন্দ্রের দিকে এত বেশি সরে এসেছে যে তারা বিদ্যমান আধিপত্যশীল ব্যবস্থার কোনো বিকল্প হাজির করতে পারছে না। মানুষ যে রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য প্রয়োজন মানুষের সামনে বাস্তব বিকল্প তুলে ধরা। গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ হয়, যখন নাগরিকরা অনুভব করেন যে তাদের সামনে প্রকৃত পছন্দের সুযোগ আছে। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার জন্য মানুষকে অনুভব করতে হয় যে সত্যিই কোনো কিছু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, কিছু বদলানোর সম্ভাবনা আছে। গণতান্ত্রিক দলগুলির প্রতি বর্তমান এই অনীহা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য খুবই খারাপ। বেশ কয়েকটি দেশে এটি ডানপন্থী পপুলিস্ট দলের উত্থানে সুবিধা করে দিয়েছে। তারা নিজেদেরকে একমাত্র বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরে এবং দাবি করে যে তারাই মূলধারার দলগুলোর কাছে ‘উপেক্ষিত জনগণ’-এর কণ্ঠস্বর। ২০০২ সালে ফ্রান্সে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে কী ঘটেছিল, মনে আছে? সেখানে (উগ্র ডানপন্থী) ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেতা জ্যঁ-মারি ল্য পেন (Jean-Marie Le Pen) দ্বিতীয় স্থান দখল করে সমাজতন্ত্রী প্রার্থী লিওনেল জসপাঁকে (Lionel Jospin) ছিটকে দেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এতে হতবাক হয়েছিলাম, তবে বিস্মিত হইনি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় আমি ছাত্রদের সঙ্গে রসিকতা করে বলতাম—শিরাক আর জসপাঁর মধ্যে পার্থক্যটা আসলে কোকা-কোলা আর পেপসির পার্থক্যের মতো। বাস্তবেই জসপাঁ জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, তার কর্মসূচি কোনো সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি নয়। এর ফলেই অনেক মানুষ প্রথম রাউন্ডে তাকে ভোট দিতে পারেননি। অন্যদিকে, অসন্তুষ্ট বহু ভোটার ল্য পেনের দিকে ঝুঁকে পড়েন, কারণ তিনি কৌশলী পপুলিস্ট ভাষা ব্যবহার করে নিজেকে এমন একজন হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যিনি ক্ষমতাসীন উদাসীন অভিজাতদের বিরুদ্ধে ‘জনগণ’-এর পক্ষে কথা বলছেন। আজ যে ‘মধ্যপন্থার ঐকমত্য’-ভিত্তিক রাজনীতিকে উদযাপন করা হচ্ছে, তা আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই ‘উত্তর-রাজনৈতিক’ বা ‘পোস্ট-পলিটিকাল’ (post-political) যুগচেতনা ডানপন্থী পপুলিস্ট উত্থানের জন্য এক অত্যন্ত উর্বর জমি তৈরি করছে।
জাক শিরাক (Jacques Chirac); ঐ নির্বাচনে মধ্য-ডানপন্থী কনজার্ভেটিভ আরপিআর (Rally for the Republic) পার্টি থেকে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

প্রশ্ন: আপনি রাজনীতিকে ক্রমশ নৈতিকীকরণ (moralization) করার প্রবণতার কথাও বলেছেন, যেখানে বাম ও ডানের বিরোধকে ‘ভালো বনাম মন্দ’-এর বিরোধ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। বিষয়টি কি একটু ব্যাখ্যা করবেন?
মৌফে : আপনার প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে আমি বাম-ডান বিভাজন ঝাপসা হয়ে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতির কথা বলতে চাই। যখন গণতান্ত্রিক রাজনীতি মানুষকে কোনো সামষ্টিক রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয় না, তখন আমরা দেখি মানুষ অন্য ধরনের সামষ্টিক পরিচয়ের খোঁজ করতে শুরু করে। এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো—ধর্মভিত্তিক পরিচয়ের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, বিশেষ করে মুসলিম অভিবাসীদের মধ্যে। ফ্রান্সে পরিচালিত বহু সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, কমিউনিস্ট পার্টির পতনের সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষত নিম্নদক্ষ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভূমিকা ক্রমেই বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক দল যেখানে আগে মানুষের ‘আমরা’ বোধ তৈরি করত, সেখানে এখন ধর্ম অনেক ক্ষেত্রে সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিচয়ের জায়গায় ধর্মীয় পরিচয় এসে দাঁড়াচ্ছে। অন্য প্রেক্ষাপটে আবার দেখা যায়, বাম-ডান রাজনৈতিক বিভাজনের মাধ্যমে যে সামষ্টিক পরিচয় তৈরি হতো, তার অভাব পূরণ হচ্ছে আঞ্চলিকতাবাদী বা জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের মাধ্যমে। আমার মতে, এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য মোটেও ভালো নয়। কারণ এসব পরিচয় অ্যাগোনিস্টিক বিতর্কের জন্য উপযোগী ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে না। এই কারণেই আমি মনে করি, এটা ভীষণ ভুল ধারণা যে আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, মানুষ আর কোনো সামষ্টিক পরিচয়ের প্রয়োজন অনুভব করে না। বাস্তবতা ঠিক তার বিপরীত। ‘আমরা বনাম তারা’—এই বিভাজন সামাজিক জীবনের একটি মৌলিক উপাদান। গণতান্ত্রিক রাজনীতির কাজ হলো এমন ভাষা, অনুশীলন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যার মাধ্যমে এই বিভাজনকে রাজনৈতিকভাবে গঠন করা যায়। বিভিন্ন ধরনের নাগরিকত্বের ধারণার মধ্য দিয়েই এই কাজটি সম্পন্ন হওয়া উচিত।
এখন আসি ‘রাজনীতির নৈতিকীকরণ’ (moralization of politics) প্রসঙ্গে। আমি যা বলছি তা হলো—অনেকে মনে করেন, বাম-ডান বিভাজন দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এখন আর ‘আমরা বনাম তারা’ ধরনের কোনো রাজনীতি নেই। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এই বিভাজন এখনো রয়ে গেছে, শুধু তার রূপ বদলেছে। আজ এই বিভাজন রাজনৈতিক ভাষায় নয়, নৈতিক ভাষায় গঠিত হচ্ছে। অর্থাৎ, বাম-ডান পার্থক্যের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে ‘সঠিক-ভুল’, ‘ভালো-মন্দ’-এর বিভাজন। এর মানে হলো—রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক চরিত্র রয়ে গেছে, কিন্তু এখন তা পরিচালিত হচ্ছে নৈতিক ভাষায়। এখানে রাজনীতি আর মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব নয়; বরং ‘আমরা ভালো গণতান্ত্রিক মানুষ’ বনাম ‘ওরা খারাপ মানুষ’—এই ধরনের নৈতিক শ্রেণিবিভাগে পরিণত হয়েছে। ডানপন্থী পপুলিস্ট দলগুলোর উত্থান নিয়ে যে প্রতিক্রিয়াগুলো দেখা যায়, সেগুলো এর ভালো উদাহরণ। অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বদলে নৈতিক নিন্দাই প্রধান হয়ে ওঠে। ডানপন্থীদের উত্থানের কারণ বোঝার চেষ্টা না করে তথাকথিত ‘ভালো’ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো কেবল তাদের বিরুদ্ধে ‘কর্ডন স্যানিতেয়ার’ (cordon sanitaire) বা রাজনৈতিক বয়কটের ডাক দেয়—যেন তারা কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং ‘বাদামি প্লেগ’। আরেকটি উদাহরণ হলো জর্জ ডব্লিউ বুশের বক্তব্য, যেখানে তিনি সভ্য ‘আমরা’-কে বর্বর ‘তারা’-র বিপরীতে দাঁড় করান। এভাবেই রাজনৈতিক বিরোধকে নৈতিক শত্রুতায় রূপান্তর করা হয়। আমি একেই বলি রাজনীতির নৈতিকীকরণ। আজ আমরা এটি নানা ক্ষেত্রেই স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি—সমাজ যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করতে এবং সেগুলোর রাজনৈতিক সমাধান কল্পনা করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলে ক্রমেই আরও বেশি সংখ্যক বিষয়কে নৈতিক ভাষায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। অবশ্যই এটি গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। কারণ যখন প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং নৈতিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন তাকে আর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা যায় না—সে হয়ে ওঠে শত্রু। আর ‘মন্দ’ বলে চিহ্নিত শত্রুর সঙ্গে কোনো অ্যাগোনিস্টিক বিতর্ক সম্ভব নয়। তার সঙ্গে তর্ক করা যায় না, মতবিনিময় করা যায় না, তাকে কেবল নির্মূল করাই একমাত্র পথ বলে মনে করা হয়।
প্রশ্ন: রাজনীতির নৈতিকীকরণের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা কী? ঘটনা ব্যাখ্যা করার সময় নৈতিক ভাষা ব্যবহার করা কি গণমাধ্যমের স্বাভাবিক প্রবণতা নয়? আর আজকাল কি অধিকাংশ রাজনৈতিক লড়াই গণমাধ্যমেই সংঘটিত হয় না, অথবা অন্তত গণমাধ্যমের মাধ্যমেই প্রকাশ পায় না, এবং এর ফলে রাজনৈতিক সংগ্রামের চরিত্রটাই কি বদলে যাচ্ছে না?
মৌফে : নিশ্চয়ই, গণমাধ্যম এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ রাজনৈতিক সাবজেক্টিভিটি বা সত্তা গঠনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্রই হলো মিডিয়া। তবে আমি মনে করি, একে প্রধান দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা ভুল হবে—বিশেষ করে বামপন্থীদের রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে না পারার জন্য গণমাধ্যমকে দায়ী করাটা ভুল। গণমাধ্যম মূলত সমাজেরই দর্পন। যদি সমাজে সত্যিকার অর্থে একটি অ্যাগোনিস্টিক বিতর্ক বিদ্যমান থাকত, তবে গণমাধ্যম সেটিও প্রতিফলিত করত। নিঃসন্দেহে অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নিও-লিবারেলবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এটি একটি বড় সমস্যা। কিন্তু তাই বলে তারা সর্বশক্তিমান নয়। এর প্রমাণ আমরা দেখতে পাই ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের ইউরোপীয় সংবিধান বিষয়ক গণভোটে। সেখানে প্রধান গণমাধ্যমগুলো সংবিধানের পক্ষে প্রচার চালালেও জনগণ ‘না’ ভোট দিয়েছিল। অর্থাৎ, ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে গণমাধ্যম তাদের মত চাপিয়ে দিতে পারেনি। আরেকটি উদাহরণ হলো ইতালিতে বার্লুসকোনির (Silvio Berlusconi) পরাজয়—যদিও তিনি গণমাধ্যমের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রাখতেন। এসব উদাহরণ দেখায় যে গণমাধ্যম যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তারা একাই রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে না। এই কারণেই আমি মনে করি, গণমাধ্যমকে কেবল দোষারোপ না করে বামপন্থীদের উচিত এটিকে একটি সংগ্রামের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা—যেখানে আধিপত্যের লড়াই চালানো যায়। নতুন গণমাধ্যমের বিকাশের ফলে আজ মানুষের পক্ষে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা এবং অ্যাগোনিস্টিক কৌশল গড়ে তোলা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমি মনে করি যে, ‘আর্টিস্টিক অ্যাক্টিভিজম’ (artistic activism) থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘অ্যাক্ট আপ’ (ACT UP)-এর সঙ্গে যুক্ত অনেক কর্মী এইডস সংকটকে কেন্দ্র করে প্রচারাভিযান চালিয়েছিলেন, যেখানে তারা বিজ্ঞাপন ও মার্কেটিংয়ের কৌশল ব্যবহার করে সামাজিক সমালোচনা তুলে ধরেন। তারা এমন সব ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট তৈরি করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল এইডস-সংক্রান্ত রাজনৈতিক সমস্যাগুলো—যেমন বর্ণবাদ, সমকাম-বিদ্বেষ এবং বৃহৎ ওষুধ কোম্পানিগুলোর ক্ষমতা—জনসমক্ষে তুলে ধরা। এটি ছিল আধিপত্যশীল যোগাযোগ-ভাষার এক ধরনের ‘বিদ্রোহী পুনর্দখল’ (subversive re-appropriation)। উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্কের ‘গ্রান ফিউরি কালেক্টিভ’ (Gran Fury Collective)-এর কথা বলা যায়। তারা বিজ্ঞাপনের ভাষা ও নান্দনিকতা ব্যবহার করে তীব্র রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়েছিল। বাসে বাসে প্রদর্শিত তাদের একটি বিখ্যাত পোস্টার ছিল ‘Kissing Doesn’t Kill’ (১৯৮৯)—যেটি দেখতে ছিল বেনেটনের (Benetton Group; একটি ইতালিয়ান পোশাক কোম্পানি) বিজ্ঞাপনের মতো। এতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত তিনটি যুগলকে দেখানো হয়—একটি বিষমকামী, একটি সমকামী নারী যুগল এবং একটি সমকামী পুরুষ যুগল। পোস্টারে লেখা ছিল: “চুমু মৃত্যু ডেকে আনে না; লোভ আর উদাসীনতাই তা আনে।” আজও আমরা নিও-লিবারেলবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামে গণমাধ্যমের সৃজনশীল ব্যবহারের বহু উদাহরণ দেখতে পাই। এর একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত হলো ‘দ্য ইয়েস মেন’ (The Yes Men) গোষ্ঠী এবং তাদের ‘আইডেন্টিটি কারেকশন’ (identity correction) কৌশল। তারা আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা সেজে জনসমক্ষে হাজির হয়ে তাদের নীতির গোপন ও অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে। গণমাধ্যমের ক্ষমতাকে স্বীকার করা মানে শুধু তার প্রভাব মেনে নেওয়া নয়—বরং সেই ক্ষমতাকে ঘুরিয়ে ব্যবহার করার সম্ভাবনাকেও চিনে নেওয়া। আমার মতে, বামপন্থীদের আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কল্পনাশক্তি, গণমাধ্যমকে কীভাবে একটি অ্যাগোনিস্টিক রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে নতুন করে ভাবা।
প্রশ্ন: আজকের ব্যবহারিক রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর দিকে তাকালে কোন বিষয়গুলো আপনার চিন্তাকে অনুপ্রাণিত করে? কোন ধরনের ইস্যু ও আন্দোলনগুলো আপনার ‘রাজনৈতিকতা’ ধারণার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পর্কিত বলে মনে হয়?
মৌফে : আজকের দিনে বামপন্থার জন্য সবচেয়ে জরুরি সংগ্রাম হলো নিও-লিবারেলবাদের বিকল্প কল্পনা করা। সারা বিশ্বের বহু কর্মী ও তাত্ত্বিক এই কাজেই যুক্ত আছেন, এবং লাতিন আমেরিকার মতো কিছু অঞ্চলে এই দিক থেকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে। আমি অবশ্যই স্বীকার করি যে, এই সংগ্রামের একটি বৈশ্বিক মাত্রা আছে; এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ ও সংহতি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে একই সঙ্গে আমি বিশ্বাস করি, সমস্যাগুলোকে প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে আলাদাভাবে উত্থাপন ও মোকাবিলা করতে হবে। এটি বলার মানে এই নয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশগত সংকটের মতো বিষয়গুলো বৈশ্বিকভাবে মোকাবিলা করা যায় না—সেগুলো অবশ্যই আন্তর্জাতিক স্তরের সমাধান দাবি করে। কিন্তু শুধু বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জোর দিয়ে, পৃথিবীতে যে বিভিন্ন ধরনের জীবনধারা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে, সেগুলোকে অস্বীকার করা একটি ভুল। এখানেই আমি আবার কার্ল স্মিটের সঙ্গে একমত, বিশ্ব কোনো ‘ইউনিভার্স’ (universe) নয়, বরং একটি ‘প্লুরিভার্স’ (pluri-verse)। অর্থাৎ, একটিমাত্র সর্বজনীন মডেল নেই। আমি বিশ্বাস করি না যে গণতন্ত্রের এমন কোনো একক রূপ আছে, যা সব জায়গায় সমানভাবে প্রযোজ্য। ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক ধারণার বাস্তবায়নও ভিন্ন হবে। ইউরোপে বসবাসকারী আমাদের জন্য সূচনাবিন্দু কখনোই বিশ্বের অন্য প্রান্তের মানুষের মতো হতে পারে না। বৈশ্বিক সমাধানের ভান না করে আমাদের উচিত নিজেদের সমাজের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা, সেই পথেই আমরা গণতন্ত্রের সামগ্রিক সংগ্রামে অবদান রাখতে পারি। আজকের ইউরোপে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বাম-ডান রাজনৈতিক বিভাজনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং একটি অ্যাগোনিস্টিক গণতন্ত্রের শর্ত তৈরি করা। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এটি কেবল ইউরোপীয় স্তরেই সম্ভব। সে কারণেই বামপন্থার রাজনীতিতে ইউরোপীয় মাত্রাকে কেন্দ্রীয় জায়গা দিতে হবে। ইউরোপের বিভিন্ন বামপন্থী শক্তির উচিত পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং একসঙ্গে কাজ করা, যেন এমন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ইউরোপ গড়ে ওঠে, যা নিও-লিবারেলবাদের বিকল্প দিতে পারে এবং একটি ভিন্ন সামাজিক মডেল সামনে আনতে পারে। আজ আমরা যে সংকটের মুখোমুখি, তার বড় একটি কারণ হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে আমরা একটি একমেরুকেন্দ্রিক (unipolar) বিশ্বের মধ্যে বসবাস করছি। যুক্তরাষ্ট্র তার অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্যের মাধ্যমে নিজের মডেল সারা বিশ্বে চাপিয়ে দিতে চাইছে এবং যারা এই মডেলের বিরোধিতা করছে, তাদের ‘সভ্যতার শত্রু’ বলে চিহ্নিত করছে। আমি On the Political গ্রন্থে যেমন বলেছি, যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বৈধ প্রতিরোধের পথ না থাকাই আজ আমরা যে সহিংস প্রতিক্রিয়াগুলো দেখতে পাচ্ছি, তার অন্যতম কারণ। যারা মনে করেন আমাদের সমস্যার সমাধান ‘কসমোপলিটান গণতন্ত্র’-এর মধ্যেই রয়েছে, আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। আমার কাছে এটি এক ধরনের অরাজনৈতিক বিভ্রম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের দরকার একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক (multipolar) বিশ্বব্যবস্থা। এই কারণেই ইউরোপের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়া, যাতে সে চীন বা ভারতের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির পাশে দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বে আজ সত্যিই ইউরোপের প্রতি একটি প্রত্যাশা আছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার। এখন সময় এসেছে বামপন্থীরা ইউরোপকে নিও-লিবারেলবাদের ‘ট্রোজান হর্স’ ভাবা বন্ধ করে, একটি ইউরোপীয় বামপন্থী প্রকল্প নির্মাণে মনোযোগ দেওয়ার।
আপনাকে ধন্যবাদ।
তর্জমা: মিনহাজুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসনে স্নাতক। সম্পাদিত গ্রন্থ: পনেরো সমন্বয়কের সাক্ষাৎকার (২০২৫, ইউপিএল)। ই-মেইল: minhazul27583@gmail.com
শাতাল মৌফের সাক্ষাৎকার- রাজনৈতিকতা, হেজেমনি এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতি