Skip to Content

জন রলসের ‘আ থিওরি অফ জাস্টিস’ 


[নোট: আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে জন রলস অন্যতম প্রভাবশালী ও যুগান্তকারী চিন্তাবিদ। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘এ থিওরি অফ জাস্টিস’ (১৯৭১) সামাজিক ইনসাফ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সমতার মৌলিক প্রশ্নগুলোকে এক নতুন আদলে পুনরুজ্জীবিত করে। উপযোগবাদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি ইনসাফপূর্ণ ও ন্যায্য সমাজ কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব, রলস তা অত্যন্ত সুসংহতভাবে তুলে ধরেছেন। ‘আখড়া’ থেকে পূর্বে রুশোসহ অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রচিন্তকদের চিন্তার সংক্ষিপ্তসার প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজকে জন রলসের ‘এ থিওরি অফ জাস্টিস’ কিতাবের মূল ভাবনার একটি সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা হলো। এটি ফিলিপো ডিওনিগি ও জেরোমি ক্লেইডোস্টির যৌথভাবে লিখিত ‘An Analysis of John Rawls’s A Theory of Justice’ পুস্তিকাটির নির্বাচিত কিছু অংশের অনুবাদ। এআই-এর সহায়তায় এই অনুবাদ সম্পন্ন করে, সম্পাদনার মাধ্যমে সম্পূর্ণ পাঠটি প্রস্তুত করেছে আখড়া টিম।]

★ জন রলস কে ছিলেন?

আ থিওরি অফ জাস্টিস (১৯৭১)-এর লেখক জন রলস ১৯২১ সালে মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোর শহরের এক উচ্চ-মধ্যবিত্ত খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন নামকরা উকিল এবং তাঁর মা ছিলেন স্থানীয় ‘লীগ অফ উইমেন ভোটার্স’-এর প্রেসিডেন্ট। 

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে আন্ডারগ্রাজুয়েট পড়ার সময়ে রলস আমেরিকান দার্শনিক নরম্যান ম্যালকমের চিন্তাধারার সংস্পর্শে আসেন। ম্যালকম ছিলেন অস্ট্রিয়ান দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইনের শাগরেদ। ভিটগেনস্টাইন খেয়াল করেছিলেন—মানুষের চিন্তাভাবনায় ভাষা এক মস্ত বড় ভূমিকা পালন করে। এই চিন্তাটিই পরবর্তীতে রলসের মধ্যে এক গভীর একাডেমিক তাগিদ তৈরি করে—সমাজ কীভাবে ‘জাস্টিস’ বা ‘ইনসাফ’ শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যা করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে।

প্রিন্সটনে রলসের শিক্ষাজীবন রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি এক গভীর ধর্মীয় আবেগে আচ্ছন্ন ছিল। তিনি ধর্মতত্ত্ব বা থিওলজি নিয়ে পড়াশোনা করে যাজক হওয়ার চিন্তাভাবনাও করেছিলেন। কিন্তু রলসের বয়স যখন ২০, তখন আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর দু’বছর পর রলস প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরাসরি ফৌজি ডিউটিতে যোগ দেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তাঁর এই সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের ধর্মীয় ঈমান ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ফলে তিনি একটি ভালো ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ কল্পনা করার জন্য বিকল্প কোনো পথ খুঁজতে শুরু করেন।

এই মাকসাদ হাসিলের সবচেয়ে ভালো উপায় হিসেবে রাজনৈতিক দর্শনকে বেছে নিয়ে রলস শিক্ষকতা ও গবেষণার দুনিয়ায় পা রাখেন। ১৯৬২ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি) এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেন।

২০০২ সালে ইন্তেকালের আগের দশকগুলোতে জন রলস তাঁর যামানার অন্যতম প্রভাবশালী এবং বহুল-উদ্ধৃত রাজনৈতিক চিন্তাবিদের মর্যাদা লাভ করেন। তাঁর প্রথম বই, আ থিওরি অফ জাস্টিস, ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়। বহু বিতর্ক, সমালোচনা এবং সর্বজনীন কদর পাওয়া এই নন্দিত বইটিই রাজনৈতিক দার্শনিক হিসেবে ব্যাপক সুনাম এনে দেয় তাকে।

★ লেখকের পটভূমি

১৯৭১ সালে যখন আ থিওরি অফ জাস্টিস প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন আমেরিকান সমাজ দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল; আর এর ধারাবাহিকতায়ই বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সহিংস সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এর মাত্র কয়েক বছর আগেই দেশটিতে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের (সিভিল রাইটস মুভমেন্ট) বিকাশ ঘটে। এই আন্দোলন আমেরিকার জাতিগত সংখ্যালঘুদের দুঃখ-দুর্দশাকে জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে সফলভাবে নিয়ে আসে। 

আন্তর্জাতিক ময়দানে দেশটি তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে মগ্ন ছিল। এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিস্ট উত্তর ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামের হয়ে যুদ্ধ করে, যা টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত প্রথম যুদ্ধ ছিল। প্রথমবারের মতো আমেরিকার সাধারণ মানুষ যুদ্ধের সহিংস বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে এই যুদ্ধ সমাজকে বিভক্ত করে ফেলে। অনেকেই ইনসাফের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ধারণাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে এবং সমাজে ইনসাফের মূল অনুভূতিই একেবারে কেঁপে ওঠে—যা আ থিওরি অফ জাস্টিস বইটিতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

তবে এই বইয়ে মানুষের যৌথ প্রচেষ্টায় কোনো সাধারণ মাকসাদ হাসিলের যে ক্ষমতা, সে-সংক্রান্ত সচেতনতাও বিদ্যমান। ১৯৬০-এর দশকটি যেমন মহা-উত্তাল এক সময় ছিল, তেমনি এটি ছিল সামাজিক সাফল্য ও আদর্শবাদের এক অনন্য জমানা। ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন ‘সিভিল রাইটস অ্যাক্ট’-এ দস্তখত করে তা আইনে পরিণত করেন। প্রথমবারের মতো দেশের সমস্ত নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধার ওয়াদা করা হয়: জাতিগত বৈষম্যের শিকার না হয়েই মানুষ ভোট দিতে, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এবং স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়। চার বছর পর, ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে অ্যাপোলোর চাঁদে অবতরণের ঘটনা ঘটে। মাত্র এক দশক আগে যা অসম্ভব বলে মনে করা হতো, আমেরিকানরা তা হাসিল করে দেখাচ্ছিল।

আ থিওরি অফ জাস্টিস আসলেই তার সময়ের এক বাস্তব প্রতিফলন। রলস এখানে ভালোত্ব এবং ইনসাফ সম্পর্কিত মৌলিক ধারণাগুলো নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছেন, তেমনি আবার তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে তা হাসিল করা সম্ভব।

★ ‘আ থিওরি অফ জাস্টিস’ কী বলেছিল? 

আ থিওরি অফ জাস্টিস বইটিতে জন রলসের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইনসাফ নিয়ে মানুষের চিন্তা করার একটা নতুন পথ তৈরি করা। তিনি মূলত ইউটিলিটারিয়ান (উপযোগবাদী) দর্শনের বিকল্প হিসেবে নিজের ভাবনা পেশ করতে চেয়েছিলেন। ইউটিলিটারিয়ানিজম মনে করে, কোনো কাজের ভালো-মন্দ বিচার করা উচিত তার ফলাফলের ভিত্তিতে; অর্থাৎ যে কাজ সর্বাধিক মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি ফায়দা বয়ে আনে, সেটাই ‘উত্তম’ কাজ। রলস যখন আ থিওরি অফ জাস্টিস লিখছেন, তখন এই ইউটিলিটারিয়ান চিন্তাভাবনার মস্ত বড় কদর ছিল, কিন্তু রলস এর বিরোধিতা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইউটিলিটারিয়ানিজম শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের ফায়দার কথাই ভাবে, ব্যক্তির নিজস্ব কল্যাণ বা ভালো থাকাকে আমলে নেয় না। রলসের মতে, এই মানসিকতা সমাজে জুলুম ও ভোগান্তির দরজা খুলে দেয়।

ইউটিলিটারিয়ানিজমের জায়গা পূরণ করতে রলস পুরনো ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির রেওয়াজকে আবার নতুন করে বাঁচিয়ে তোলেন। উদারনৈতিক (লিবারেল) রাজনৈতিক ঐতিহ্যে ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়, আর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট হলো সেই ঐতিহ্যেরই এক মূল ভিত্তি। এর আসল কথা হলো—রাষ্ট্র এবং তার প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে এক অনুলিখিত বা অলিখিত চুক্তি রয়েছে। চুক্তিটি হলো: ব্যক্তি তার ন্যাচারাল বা সহজাত স্বাধীনতার কিছু অংশে (সহজ কথায়, যখন খুশি যা ইচ্ছা তা-ই করার স্বাধীনতা) ছাড় দেবে; আর তার বদলে রাষ্ট্র এমন এক সমাজ কায়েম করবে যা সেই ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেবে।

রলসের চোখে আদর্শ সমাজের ছবিটা হলো ইনসাফের অনুভূতিসম্পন্ন মুক্ত ও যুক্তিবাদী মানুষের একটি সমাগম। এটি তাঁর পুরো কাজেরই এক বুনিয়াদি ধারণা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমাজের এই সদস্যরা—যাদের তিনি ‘আগে বাড়ার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার এক উদ্যোগ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন—সবাই মিলে এমন কিছু নীতিতে একমত হবে যা একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজের ভিত্তি তৈরি করবে। রলস ইনসাফকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘ফেয়ারনেস’ বা ন্যায্যতার নিরিখে; তাঁর কাছে ইনসাফ গড়ে ওঠা উচিত এমন কিছু শর্ত ও কায়েদা-কানুনের ওপর, যা সবাই সমানভাবে ন্যায্য বলে মনে করে। সমাজের ‘মৌলিক কাঠামো’ বা বুনিয়াদ হিসেবে ইনসাফ কীভাবে কাজ করবে—অর্থাৎ মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মৌলিক মূল্যবোধগুলো কীভাবে কায়েম থাকবে—সেটাই তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয়।

রলসের মতে, একটি খাঁটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ সেটাই, যাকে তার সমস্ত নাগরিক ইনসাফপূর্ণ মনে করবে—তা সে সমাজে যে কোনো সামাজিক শ্রেণী, দ্বীনি আকীদা বা আখলাকী (নৈতিক) বিশ্বাসই থাক না কেন। কিন্তু নিজের অবস্থান বা দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ আসলে কেমন হতে পারে, তা একজন মানুষের পক্ষে একা কল্পনা করা বেশ কঠিন। তাই রলস তাঁর পাঠকদের এই সহমর্মিতার জায়গায় পৌঁছাতে সাহায্য করার জন্য কিছু বিশেষ তরিকা বা চিন্তার পরীক্ষা (thought experiments) পেশ করেছেন। সামাজিক ইনসাফ এবং এর আসল মানে কী—তা নিয়ে সবাই যেন চিন্তাভাবনা করতে পারে, সে জন্য তিনি আরও কিছু ধারণা দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি হলো ‘রিফ্লেক্টিভ ইকুইলিব্রিয়াম’ (প্রতিফলিত ভারসাম্য)—অর্থাৎ ইনসাফ সম্পর্কিত মানবিক বুঝ-জ্ঞানকে বারবার প্রশ্ন করা ও পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে গড়ে তোলা, যতক্ষণ না তা একটা সুষম জায়গায় এসে পৌঁছে।

রলসের আরেকটি নতুন ধারণা হলো ‘ডিফারেন্স প্রিন্সিপল’ বা বৈষম্য নীতি। তিনি যুক্তি দেন যে, একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজেও ধন-সম্পদের অসামঞ্জস্যতা বা বৈষম্য বরদাশত করা যেতে পারে, যদি সেই বৈষম্য সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য ফায়দা বয়ে আনে। উদাহরণস্বরূপ—যোগ্যতাসম্পন্ন কাউকে সার্জন বা ডাক্তার হওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে উৎসাহিত করা সমাজের জন্যই ফায়দাজনক হতে পারে, কারণ পরবর্তীতে তাঁর কাজ পুরো সমাজের উপকার করবে। তবে রলস এখানে শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেন যে, এই বেশি অর্থ উপার্জনের পথ বা চাকরিগুলো যেন সবার জন্য মেধার ভিত্তিতে খোলা থাকে।

রলসের এই তরিকার আসল গুরুত্ব হলো দ্বীনি ও সাংস্কৃতিক নিরপেক্ষতার দাবির মধ্যে: সমাজের প্রতিটি সদস্যের এটা বিশ্বাস করা উচিত যে তাদের সমাজ পুরোপুরি ইনসাফপূর্ণ। রলসের এই অনন্য পদ্ধতি মানুষকে মর্যাদার দিক থেকে জন্মগতভাবে সমান বলে মনে করে, কিন্তু একই সাথে এটাও স্বীকার করে যে মানুষের যোগ্যতা সমান হয় না। সমাজের কল্যাণে কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে। আর তাই, এমনকি একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজেও বৈষম্য বা তফাৎ থাকতে পারে।

★ গ্রন্থের প্রেক্ষাপট 

১৯৭১ সালে যখন জন রলস ‘আ থিওরি অফ জাস্টিস’ প্রকাশ করেন, তখন রাজনৈতিক তত্ত্বের একাডেমিক দুনিয়া এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হতো স্নায়ুযুদ্ধ দিয়ে। এই লড়াই পুঁজিবাদী আর কমিউনিস্ট—দুই দুনিয়াকে আলাদা করে দিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র এই ভাবাদর্শিক যুদ্ধে কোনো না কোনো পক্ষ নিতে বাধ্য হচ্ছিল। দুই ক্যাম্পই মনে করত সমাজ পরিচালনা করার সঠিক নিয়ম কেবল তাদেরই জানা আছে। দুই পক্ষই নিজ নিজ মতবাদের পক্ষে ইউটিলিটারিয়ান বা উপযোগবাদী দর্শনের দোহাই দিত। উভয় পক্ষেরই যুক্তি ছিল এই যে—তাদের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটিই সর্বাধিক মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি ফায়দা বয়ে আনবে, যদিও এতে কিছু মানুষের লোকসান বা ক্ষতি হওয়াটা একেবারেই অনিবার্য।

কিন্তু রলস এমন এক রাজনৈতিক তত্ত্ব চেয়েছিলেন যা ব্যক্তির কোনো ক্ষতি না করেই সমাজের জন্য ভালো ফলাফল বয়ে আনবে। তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন: ‘মানুষ যেভাবে নিজ বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় তার জন্য কোনটা ভালো... ঠিক তেমনি একদল মানুষকেও একবারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদের কাছে কোনটা ইনসাফ আর কোনটা জুলুম বা অনাচার হিসেবে গণ্য হবে।’ 

বিদ্যমান রাজনৈতিক ভাবধারাগুলোর এই চরমপন্থা থেকে বের হয়ে একটা মধ্যম পথ খোঁজার জন্য রলস সাহায্য নেন ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির ভাবধারার। ইংরেজ দার্শনিক জন লক এবং সুইজারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া দার্শনিক জাঁ-জাক রুশোর লেখনিতে এই ধারণার খোঁজ পাওয়া যায়। সামাজিক চুক্তি হলো এক পারস্পরিক ফায়দাযুক্ত সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মানুষের মধ্যকার একটি অলিখিত সহযোগিতার বায়াত বা চুক্তি। 

তবে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ঐতিহ্য অনুসরণ করে রলস এর সাথে এক নৈতিক মাত্রা যোগ করেন। তাঁর শুরুর বুনিয়াদটি ছিল সমাজে একটি ইনসাফপূর্ণ ও ন্যায্য জীবন যাপন করার জন্য মানুষের যৌক্তিক বাসনা। এ থিওরি অফ জাস্টিস বইটিতে তিনি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যা যেকোনো সমাজ ইনসাফ কায়েম করার জন্য ব্যবহার করতে পারে। রলসের মতে, এই ব্যবস্থা যেকোনো সময়ে যেকোনো সমাজে প্রয়োগ করা সম্ভব।

★ আলাপের সাধারণ পরিসর

রলস বারবার কান্টের হাওয়ালা দিয়েছেন। কান্ট ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী চিন্তাবিদ, যিনি তাঁর দ্য মেটাফিজিক্স অফ মোরালস (১৭৯৭)-এর মতো কাজের জন্য বিশেষ মশহুর ছিলেন। সেই বইয়ে কান্ট কাল্পনিক কিছু পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছিলেন কীভাবে বুদ্ধিমান মানুষ এমন কিছু নৈতিক ধারণা তৈরি করতে পারে, যা পুরো সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়। 

রলস কান্টের এই কথা মেনে নেন যে, যৌক্তিক বা র‍্যাশনাল মানুষেরা হলো ‘স্বায়ত্তশাসিত নৈতিক সত্তা’—অর্থাৎ, নিজের মতো করে ভালো-মন্দের তফাৎ বোঝার পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের রয়েছে। রলস কান্টের একটা মূল পদ্ধতিও ব্যবহার করেছেন: তিনি পাঠকদের একটি কাল্পনিক পরিস্থিতিতে দাঁড় করান এবং সেই তত্ত্বের নিরিখে তাঁদের কাছে জানতে চান—একটি রাষ্ট্র ইনসাফপূর্ণ, ন্যায্য এবং ভালো হওয়ার আসল মানে কী।

রলস স্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, এ থিওরি অফ জাস্টিস মূলত রাজনৈতিক তত্ত্বের উপযোগবাদী ধারণার এক নতুন বিকল্প পেশ করার চেষ্টা করেছে। তাঁর বইয়ের ভূমিকায় তিনি যুক্তি দেন, ইউটিলিটারিয়ানিজম বা উপযোগবাদ যে এত জনপ্রিয় হয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল এর শুরুর চিন্তাবিদদের বিচক্ষণতা। রলস বলেন, ব্রিটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম, অ্যাডাম স্মিথ এবং জেরোমি বেনথাম সবাই ছিলেন প্রথম সারির সামাজিক চিন্তাবিদ ও অর্থনীতিবিদ। কিন্তু তাঁর মতে, তাঁদের দেওয়া নৈতিক তত্ত্বগুলোতে স্পষ্টতার অভাব ছিল। কঠোর উপযোগবাদের সাথে বাস্তব নৈতিকতার মেলবন্ধন ঘটানো অনেক ক্ষেত্রেই বেশ দুষ্কর।

উদাহরণস্বরূপ: বেনথামের মতবাদ মেনে কোনো রাষ্ট্র যদি খাদ্য বা অর্থের সংকটে পড়ে, তবে তারা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল বা অকর্মণ্য মানুষদের না খাইয়ে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে রাষ্ট্রের সেই সম্পদ বেঁচে যাবে, যা তারা সমাজের কাজে সক্রিয় অবদান রাখা মানুষদের পেছনে খরচ করতে পারবে। কিন্তু রলস বলেন, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের এভাবে কুরবানি দেওয়ার ধারণার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ করবে। বেশিরভাগ সমাজই এই দুর্বল গোষ্ঠীগুলোকে বিশেষ নজর ও খাতির করে থাকে। তাই এ থিওরি অফ জাস্টিস বইয়ে রলসের আসল উদ্দেশ্য ছিল উপযোগবাদের মোকাবিলায় একটি ‘কার্যকর ও সুশৃঙ্খল নৈতিক ধারণা’ দাঁড় করানো।

★ একাডেমিক প্রভাবসমূহ

জন রলস অত্যন্ত খোলা মনে স্বীকার করেছেন যে কোন কোন ব্যক্তি এবং দর্শন তাঁর কাজকে প্রভাবিত করেছে। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইনসাফের একটি সঠিক সংজ্ঞা দেওয়া এবং তার মাধ্যমে মানুষকে একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ গঠনে সাহায্য করা। ইতিহাসের বহু চিন্তাবিদই এই একই লক্ষ্যের পেছনে কাজ করেছেন। বস্তুত, রলস নিজেই লিখেছেন যে তাঁর ‘মূল ভাবনাগুলো সনাতন এবং সবার পরিচিত।’ 

সপ্তদশ শতকের দার্শনিক লক ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যকার চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি যুক্তি দেন, মানুষ এই শর্তেই চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে রাষ্ট্র তাদের ‘জীবন, স্বাধীনতা এবং জায়গাজমি’ হেফাজত করার সুযোগ দেবে। লকের এই চিন্তার সম্পূরক হিসেবে যুক্ত হয় রুশোর ধারণা। রুশো মনে করতেন মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সমাজ তাকে দাস বানিয়ে ফেলে। রুশোর মতে, সমাজ মানুষকে নিজের শাসন নিজে করতে দেয় না বা নিজস্ব নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে দেয় না।

এই ধারার শেষ কড়িটি জুড়ে দেন কান্ট। তিনি যুক্তি দেন, মানুষকে কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের উসিলা বা মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং মানুষ নিজেই এক চূড়ান্ত লক্ষ্য—যে ধারণাকে তিনি 'ক্যাটাগরিক্যাল ইমপারেটিভ' বলে অভিহিত করেছেন। কান্টের মতে, এই পথ ধরে মানুষ নিজের বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করতে পারে যে তারা অন্যের কাছ থেকে কেমন আচরণ আশা করে। প্রতিটি মানুষের মর্যাদা কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা নিয়েই ছিল তাঁর মূল আগ্রহ।

এই দার্শনিকদের রলসের ওপর গভীর প্রভাব ছিল। তবে এর পাশাপাশি রলস অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ডের এক প্রাণবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক মহল বা আড্ডার অংশ ছিলেন। তিনি তাঁর সমসাময়িক বেশ কয়েকজন পণ্ডিতের কথা উল্লেখ করেছেন যারা তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভারতে জন্ম নেওয়া দার্শনিক অমর্ত্য সেন, আমেরিকান দার্শনিক রবার্ট নজিক এবং লাটভিয়ান বংশোদ্ভূত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক জুডিথ শ্কলারের মতো প্রখ্যাত মনীষীরা। যদিও নজিক রলসের ধারণার সমালোচনা করেছিলেন, তবুও রলস স্বীকার করেছেন যে সেই সমালোচনা তাঁর বেশ কাজে এসেছিল। অন্যদিকে অমর্ত্য সেন এবং জুডিথ শ্কলার দুজনই রলসের অনেক চিন্তাভাবনা নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছেন।

★ মূখ্য বিষয়বস্তু

এ থিওরি অফ জাস্টিস বইটিতে জন রলস ইনসাফকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘ফেয়ারনেস’ বা ন্যায্যতার নিরিখে। তাঁর চোখে একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ হলো সেটি, যার কেন্দ্রে থাকবে সবার জন্য সমান নাগরিকত্ব এবং সমান সুযোগ-সুবিধা। এই ভাবনাগুলোকে বিশদভাবে খতিয়ে দেখতে তিনি "রিফ্লেক্টিভ ইকুইলিব্রিয়াম" (প্রতিফলিত ভারসাম্য) নামক একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এই তরিকা অনুযায়ী, তিনি প্রথমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমস্যা বা বিতর্ক তুলে ধরেন, সে বিষয়ে প্রচলিত মতামতগুলো যাচাই করেন, তাদের শক্তি ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ করেন এবং তারপর সেই অনুযায়ী নিজের চিন্তাভাবনাগুলোকে পরিমার্জন করেন। এই প্রক্রিয়ার ফলে তাঁর নিজস্ব তত্ত্ব আরও সুষম ও শক্ত বুনিয়াদী রূপ পায়। রলস তাঁর পুরো কাজটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন: ইনসাফের মূল তত্ত্ব, ইনসাফপূর্ণ সমাজ ও সরকারের প্রতিষ্ঠানসমূহ, এবং ইনসাফপূর্ণ সমাজের শেষ উদ্দেশ্য বা কাঙ্ক্ষিত পরিণতি।

রলসের এই কাজের মূল প্রেরণা ছিল ইউটিলিটারিয়ান (উপযোগবাদী) রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রতি তাঁর চরম অসন্তোষ। তিনি যুক্তি দেন যে, নীতি-নৈতিকতার দাবি করা সত্ত্বেও উপযোগবাদ এমন কিছু পলিসি বা নীতি তৈরি করতে পারে যা ঘোর নৈতিকতাবিরোধী। কারণ, এটি মানুষকে বিভিন্ন গুণের গুরুত্ব সাজানোর কোনো পথ দেখায় না, এমনকি সমাজে কোন গুণগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত তা ঠিক করারও কোনো তরিকা দেয় না। তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, সমাজের জন্য কোনটা সবচেয়ে বেশি ফায়দাজনক—সে বিষয়ে সবার ঐক্যমতে পৌঁছানোর মতো কোনো ব্যবস্থা উপযোগবাদে নেই।

অন্যদিকে, ইনটিউশনিজমের (সজ্ঞাবাদ—অর্থাৎ নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে কোনো দার্শনিক বিষয়ের ভালো-মন্দ মেপে সমাধানের পথ খোঁজার প্রক্রিয়া) ব্যক্তিগত ও পক্ষপাতমূলক স্বভাবের কারণে একে সামাজিক নীতিতে প্রয়োগ করা মোটেও সমীচীন নয়। রলস উপযোগবাদের এই দুর্বলতাগুলো তুলে ধরে নিজের বিকল্প ভাবনা পেশ করেন: তিনি যুক্তি দেন যে স্বাধীনতা হতে হবে যতদূর সম্ভব ব্যাপক, আর তা কেবল তখনই সীমিত করা যাবে যখন একজনের স্বাধীনতার ব্যবহার অন্য কারও স্বাধীনতায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

★ ধারণাগুলোর বিস্তার 

বইয়ের শুরুতে রলস ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের ‘আলোকায়নের যুগ’ থেকে শুরু করে ‘শিল্প বিপ্লবের যুগ’ পর্যন্ত উপযোগবাদী ও সজ্ঞাবাদী ধারণার বিকাশ তুলে ধরেন।

তিনি যুক্তি দেন, একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার জন্য মানুষকে প্রথমে কল্পনা করতে হবে—সমাজে নিজের পদমর্যাদা বা অবস্থান কী হবে তা না জেনে তারা কেমন সমাজ তৈরি করত। এই অবস্থাকে তিনি ‘অরিজিনাল পজিশন’ (আদি হালত) বলে ডেকেছেন। এর জন্য একটি বিশেষ কল্পিত অজ্ঞতার প্রয়োজন, যাকে তিনি বলেন ‘ভেল অফ ইগনোরেঞ্চ’ বা ‘অজ্ঞানতার পর্দা’। এটি বেশ কঠিন এক প্রক্রিয়া; সমাজ কাঠামোর একেবারে তলানিতে নিজের অবস্থান কল্পনা করা মোটেও সহজ কথা নয়। রলস যেন তাঁর পাঠকদের চোখে পট্টি বেঁধে, মন পরিষ্কার করে একদম নতুন এক কাল্পনিক সমাজে নিজেদের অবস্থান ঠিক করতে বলছেন।

রলসের মতে, এই চর্চার মধ্য দিয়ে একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজের দুটি মূল নীতি স্বতঃসিদ্ধ হয়ে ওঠে: প্রথমত, আইনের চোখে সব মানুষকে সমান নাগরিক হতে হবে; এবং দ্বিতীয়ত, সামাজিক পার্থক্য বা বৈষম্য কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন তা পুরো সমাজের জন্য আরও ফায়দাজনক বা কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে। তবে এই গ্রহণযোগ্যতার শর্ত হলো—উঁচু পদমর্যাদা বা বেশি বেতনের চাকরি পাওয়ার পথ সবার জন্য সমানভাবে খোলা থাকতে হবে। এটাকে প্রায়ই ‘ডিফারেন্স প্রিন্সিপল’ বলা হয়।

রলস তাঁর তরিকার এই ধারণা ও ফলাফলগুলোকে উপযোগবাদের সাথে তুলনা করে দেখিয়েছেন।

তাঁর বইয়ের প্রথম ভাগটি যদি হয় মূলত দার্শনিক আলোচনা, তবে দ্বিতীয় ভাগটি পুরোপুরি রাজনৈতিক। এখানে রলস স্বাধীনতা বা লিবার্টির সংজ্ঞা দিয়েছেন এবং এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর এই চিন্তাভাবনা দার্শনিক জন লকের ভাবধারার খুব কাছাকাছি। তবে রলস এখানে যে নতুনত্ব এনেছেন তা হলো, তিনি কান্টের নৈতিক দর্শনের সাথে এই স্বাধীনতার ধারণাকে মিলিয়ে দিয়েছেন। এটি তাঁর কাজকে এক দারুণ নৈতিক আমেজ দিয়েছে: রলসের কাছে ইনসাফকে ন্যায্যতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সমতুল্য করাটা কেবল একটি যুক্তিযুক্ত কাজই নয়, বরং এটাই সঠিক ও পরম কর্তব্য। বইয়ের এই অংশে অর্থনীতি, সম্পদের বণ্টন এবং সামাজিক দায়িত্বের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। রলস এখানে ‘সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স’ (নাগরিক অনানুগত্য) এবং ‘কনসায়েনশাস রিফিউজাল’ (বিবেকের তাড়নায় ফৌজি ডিউটি বা সামরিক সেবা গ্রহণে অস্বীকৃতি)-এর মতো বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছেন, যা তৎকালীন আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষ প্রভাব নির্দেশ করে।

তৃতীয় ভাগে রলস দ্বীনি বা ধর্মীয় ধারণার বদলে যৌক্তিক ও নিরপেক্ষ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নীতি-নৈতিকতা নিয়ে চিন্তা করার একটি পথ দেখিয়েছেন। তবে সমালোচকরা বলতে পারেন যে, তাঁর এই নৈতিক যুক্তিগুলো একদম নিরপেক্ষ নয়, বরং এটি রলসের নিজস্ব ব্যক্তিগত নৈতিক পছন্দেরই প্রতিচ্ছবি। রলস নিজেও বইটিতে মনস্তত্ত্ব এবং মানুষের জীবনের অর্থ খোঁজার বাসনা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

★ অন্যান্য বিষয়বস্তু

জন রলস-এর এ থিওরি অফ জাস্টিস বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বা গৌণ ভাবনা হলো তাঁর একটি কাল্পনিক চিন্তা—যাকে তিনি ‘অরিজিনাল পজিশন’ (আদি হালত) বলে ডেকেছেন। ইনসাফের আসল স্বভাব এবং রাষ্ট্রের সাথে এর সম্পর্ক কেমন, তা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তিনি এই কাল্পনিক অনুশীলনের সাহায্য নিয়েছেন। 

রলস বেশ কিছু বিশেষ তরীকা ব্যবহার করেছেন, যাতে পাঠকেরা সমাজে তাদের নিজস্ব পদমর্যাদা বা অবস্থানের সীমানা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। এর ফলে সমাজে তাদের অবস্থান যেখানেই হোক না কেন—একজন সাধারণ মানুষের চোখে খাঁটি ইনসাফ আসলে কেমন দেখাবে, তা তারা নিরপেক্ষভাবে অনুধাবন করতে পারেন। 

সমাজে নিজের এই পদমর্যাদা, দৌলত বা ধন-সম্পদ, পেশা, যোগ্যতা, আক্কেল-বুদ্ধি, এমনকি ব্যক্তিগত নৈতিক পছন্দের অজ্ঞতার হালতকে তিনি ‘ভেল অফ ইগনোরেঞ্চ’ (অজ্ঞানতার পর্দা) বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি হলো, এই মূল অবস্থানে দাঁড়িয়ে চিন্তা করলে যে কেউই ইনসাফের আসল সুরত নিয়ে একই ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারবে। কারণ এই মূল অবস্থানটি ‘সেইসব আকস্মিক ও অস্থায়ী বিষয়গুলোর জ্ঞানকে বাদ দিয়ে দেয়, যা মানুষকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং অন্ধ সংস্কার বা পক্ষপাতের দিকে ঠেলে দেয়।’

এই কিতাবের আরেকটি মূল ধারণা হলো ‘রিফ্লেক্টিভ ইকুইলিব্রিয়াম’ : বারবার পুরনো ভাবনায় ফিরে যাওয়া, তাদের শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং সেই অনুযায়ী নিজের চিন্তাগুলোকে নতুন করে সাজিয়ে নেওয়া। যদিও এই বিষয় নিয়ে বইটিতে খুব বেশি দীর্ঘ আলোচনা করা হয়নি, কিন্তু রলসের প্রতিটি যুক্তির ভেতরেই এর প্রভাব গভীরভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। এ থিওরি অফ জাস্টিস বইটি বেশ দীর্ঘ এবং কিছু কিছু জায়গায় কিছুটা পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হতে পারে, তবে এই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে মূলত রলসের নিজের চিন্তাগুলোকে বারবার ছেঁকে ও পরিমার্জন করে একটি সুষম ভারসাম্যে (প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার আলোচনার পর যা অর্জিত হয়) পৌঁছানোর চেষ্টার কারণে।

রলসের এই গৌণ ধারণাগুলোকে আলাদা করে দেখা বেশ কঠিন। এগুলো একে অপরের সাথে গভীরভাবে পেঁচিয়ে রয়েছে এবং রলস তাঁর ভাবনার বিকাশ কীভাবে ঘটেছে তা পাঠককে বোঝাতে এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সহজ কথায়, ইনসাফ ও ন্যায্যতা নিয়ে তাঁর মূল ভাবনার রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছে এই অনুষঙ্গী ধারণাগুলোই।

★ ধারণাগুলোর বিস্তার 

রলস বিশ্বাস করেন যে, সামাজিক ইনসাফ নিয়ে মানুষকে এক সর্বজনীন ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করার জন্য তাঁর এই ‘অরিজিনাল পজিশন’-এর ধারণাটি অত্যন্ত জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে এই মূল অবস্থানটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক কাঠামো। তবে এই ধারণার সমালোচনা করে অনেকেই বলেছেন—বাস্তবে এমন একটা অবস্থা কল্পনা করা একেবারেই অসম্ভব। 

জবাবে রলস বলেন: ‘আদি হালতের এই কাল্পনিক স্বভাব একটি প্রশ্ন তোলে: নৈতিক বা অন্য যেকোনো কারণে আমরা কেন এতে আগ্রহী হব? উত্তরটি মনে করে দেখুন: এই পরিস্থিতি বর্ণনা করতে যেসব শর্ত ব্যবহার করা হয়েছে, তা আমরা বাস্তবেও মেনে চলি। আর যদি আমরা তা মেনে না-ও চলি, তবে দার্শনিক আলোচনার মাধ্যমে আমাদের তা মানতে রাজি করানো সম্ভব।’

রলসের এই বক্তব্যটি অবিশ্বাস্য রকমের আত্মবিশ্বাসে ভরা। তিনি দীর্ঘ বছর ধরে ইনসাফ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন। তাঁর গবেষণা ও চিন্তার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সতর্ক ও সুশৃঙ্খল। এর ফলে তিনি একটি মস্ত বড় অনুমান করে বসেন যে—অন্য যেকোনো মানুষ যদি একইভাবে সতর্কতার সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, তবে তারাও ঠিক একই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছাবে।

তাহলে এই ‘আদি হালত’-এর কাল্পনিক পরীক্ষার পেছনে এত খাটুনির দরকার কী? কারণ আমরা ইতিমধ্যেই এর বুনিয়াদী শর্তগুলো মেনে নিয়েছি; আর যদি তা না-ও মেনে থাকি, তবে রলস আমাদের বুঝিয়ে রাজি করিয়ে ফেলতে পারবেন যে তাঁর শর্তগুলোই একদম সঠিক!

এখানে একটা বড় আইরনি হলো—রলস যেসব রাজনৈতিক ভাবাদর্শকে সবচেয়ে শক্তভাবে খারিজ করে দিয়েছিলেন, তার অন্যতম একটি হলো মার্ক্সবাদ; অথচ সেই মার্ক্সবাদও ঠিক একই ধরনের একটা অনুমান করে থাকে। তারা মনে করে, যারা মার্ক্সবাদ মানছে না তারা মূলত ‘ফাল্স কনশাসনেস’ প্রভাবে রয়েছে। সমাজের বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একবার সঠিক  শিক্ষা পেয়ে গেলে, তারা বাধ্য হয়েই কার্ল মার্ক্সের সাথে একমত হবে। এই দিক থেকে দেখলে, রলসের এই তত্ত্বের মধ্যেও একটি নির্দিষ্ট ভাবাদর্শ বা আইডোলজি হয়ে ওঠার ঝুঁকি থেকে যায়—যা নিজের শর্তাবলি নিয়ে চরম নিশ্চিত এবং তার দেওয়া বাতলানো পথ বাস্তবায়নে ভীষণ একগুঁয়ে।

★ উপেক্ষিত দিকগুলো

এ থিওরি অফ জাস্টিস বইয়ের তৃতীয় ভাগটি রলসের পুরো রচনার মধ্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত অংশগুলোর একটি। এখানে রলস নৈতিক মনস্তত্ত্বের (মোরাল সাইকোলজি) সাথে ইনসাফের কী সম্পর্ক, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং ‘সেন্টিমেন্ট অফ জাস্টিস’ বা 'ইনসাফের অনুভূতি'-র ধারণা পেশ করেছেন। এর আসল কথা হলো—একটি নির্দিষ্ট সমাজের সদস্যরা ইনসাফ সম্পর্কে একটি সাধারণ ও যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে। 

এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় রলস এমন একটি সমাজের পরিণতির দিকে নজর দিয়েছেন, যেখানে সবার মধ্যে ইনসাফের এই যৌথ বুঝ-জ্ঞান বিদ্যমান। তাঁর যুক্তি হলো, যখন ইনসাফ নিয়ে কোনো সমাজের ধ্যান-ধারণা তাদের সামাজিক মূল্যবোধের সাথে মিলে যায়, তখন সেই সমাজকে একটি 'সুশৃঙ্খল সমাজ' (ওয়েল-অর্ডারড সোসাইটি) বলা চলে। আর এমন একটি সুশৃঙ্খল সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। রলস আরও দাবি করেন যে, মানুষের মধ্যে যখন ইনসাফের এক যৌথ অনুভূতি থাকে, তখন তা সমাজকে একটি সাধারণ সামাজিক কল্যাণ হিসেবে ইনসাফের পথে টিকে থাকতে সাহায্য করে।

খুব সম্প্রতি গবেষকরা রলসের তত্ত্বের এই অংশটি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছেন। এর একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হলো আমেরিকান দার্শনিক পল উইথম্যানের কাজ। তাঁর গবেষণাটি রলসের মূল ইনসাফের তত্ত্ব থেকে পরবর্তীতে তাঁর লেখা ‘পলিটিক্যাল লিবারেলিজম’ সংক্রান্ত ভাবনার দিকে যে রূপান্তর ঘটেছিল, তা বিশ্লেষণ করে। উইথম্যান যুক্তি দেন যে, এ থিওরি অফ জাস্টিস বইটি অনেকেই যতটা চরম ব্যক্তিকৈন্দ্রিক এবং কান্টীয় (ইমানুয়েল কান্টের ভাবধারানির্ভর) বলে মনে করেন, বাস্তবে এটি ততটা নয়। তিনি রলসের ‘স্থিতিশীলতা' এবং ‘ইনসাফের অনুভূতি’ সংক্রান্ত ধারণাগুলো ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে, রলসের দর্শন মূলত মানুষের এক গভীর ‘ইনসাফ-বোধ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি বলতে মূলত মানুষের সেই আত্মিক ও নৈতিক ক্ষমতাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে তারা একটি যৌথ নৈতিকতা গড়ে তোলে এবং যার ওপর ভিত্তি করেই একটি সুশৃঙ্খল সমাজের মূল স্থিতিশীলতা টিকে থাকে।

★ রলসের যুক্তির মূল্যায়ন

এ থিওরি অফ জাস্টিস বইটিতে জন রলস ধরে নিয়েছেন যে তাঁর এই তত্ত্ব একটি 'সুশৃঙ্খল সমাজ'-এর (ওয়েল-অর্ডারড সোসাইটি) জন্য প্রযোজ্য—তবে দুনিয়ার সব সমাজ যে রলসের বাতলানো 'সুশৃঙ্খল'-এর শর্ত মেনে চলবে, তা না-ও হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, এমন একটি সমাজের কথা ধরা যাক যা শ্রেণীবদ্ধ এবং যার পুরো কাঠামো একটি সর্বব্যাপী নৈতিক ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে (যেমন: এমন কোনো রাজতন্ত্র, যেখানে নাগরিকদের মর্যাদা ও অসামঞ্জস্যতা কেবল তাদের যোগ্যতা বা দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় না)। তা সত্ত্বেও, সেই সমাজ তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের একটা সম্মানজনক নিশ্চয়তা দিতে পারে। রলস তাঁর পরবর্তী বই দ্য ল অফ পিপলস-এ এই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি একটি কাল্পনিক রাষ্ট্রের উদাহরণ দেন: 'কাজানিস্তান'। রলস যুক্তি দেন যে উদারপন্থীদের (লিবারেলদের) উচিত হবে না এই সমাজের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো বা হস্তক্ষেপ করা, কারণ তা লিবারেলদের সহনশীলতার মূলনীতির পরিপন্থী হবে। এই উদাহরণটি রলসের তত্ত্বের সেই সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে, যা দাবি করে তাঁর তত্ত্ব সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য।

আমেরিকান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক চার্লস বেটস এবং জার্মান দার্শনিক থমাস পগির মতো গবেষকেরা (ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে) যুক্তি দিয়েছেন যে, রলসের সমান স্বাধীনতা এবং ডিফারেন্স প্রিন্সিপল আন্তর্জাতিকভাবেও প্রয়োগ করা সম্ভব। রলসের নিজস্ব মতের বিপরীতে গিয়ে বেটস ও পগি বলেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সাংস্কৃতিক ফারাক বা তফাৎ কখনোই সর্বজনীন মানবাধিকার (যেমন: সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার) এবং বৈশ্বিক সামাজিক ইনসাফ কায়েমের পথে বাধা হতে পারে না। অবশ্য দ্য ল অফ পিপলস বইতে রলস দাবি করেছেন, কেবল মৌলিক মানবাধিকারগুলোই সর্বজনীন।

এমনকি যাঁরা রলসের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন, তাঁরাও তাঁর কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁর অন্যতম প্রখর সমালোচক, কানাডীয় বংশোদ্ভূত মার্ক্সবাদী দার্শনিক জেরাল্ড কোহেন লিখেছেন: ‘পশ্চিমের রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে বড়জোর দুটি কিতাবকে ‘এ থিওরি অফ জাস্টিস’-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাবি করা যেতে পারে: প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ এবং হবসের ‘লেভিয়াথান’।’ 

প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই এ থিওরি অফ জাস্টিস বইটিকে একটি আবশ্যিক ও মৌলিক পাঠ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। রলসের এই চিন্তাভাবনা রাজনৈতিক তত্ত্বের মূল নজরকে উপযোগবাদী থেকে সরিয়ে ব্যক্তির নিজস্ব কল্যাণের দিকে ঘুরিয়ে দেয়।

রাজনৈতিক তত্ত্বকে উপযোগবাদ থেকে সরিয়ে নেওয়ার যে বাসনা তাঁর ছিল, তাতে তিনি কামিয়াব হয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু তাঁর চিন্তাভাবনা ইনসাফ কায়েমের ক্ষেত্রে একটি সর্বজনীন ব্লুপ্রিন্ট বা নিখুঁত নকশা পেশ করতে পেরেছে—এই আশাকে বৈশ্বিক রাজনীতির পরবর্তী গতিধারা বেশ বড় পরীক্ষার মুখে ফেলে দেয়। সর্বজনীনতা যে সব সময় কোনো রাজনৈতিক তত্ত্বের মূল লক্ষ্য হবে, তা নয়; কিংবা প্রতিটি সমাজই যে শাসনব্যবস্থার একটি সর্বজনীন মডেল হাসিল করতে চাইবে, তাও নয়। স্নায়ু যুদ্ধ হয়তো এই বাস্তবতাকে কিছুদিনের জন্য আড়াল করে রেখেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমেরিকা—দুই পক্ষই দুনিয়াকে এটা বোঝাতে চেয়েছিল যে তাদের ব্যবস্থাই সমাজ পরিচালনার সেরা পথ। দুটি দেশই বিশ্বাস করত যে তাদের জিনিসই পুরো দুনিয়াকে উপহার দেওয়া উচিত। রলস অবশ্য মার্ক্সবাদ বা লিবারেলিজমে দেখানো ইতিহাসের কোনো পূর্বনির্ধারিত চূড়ান্ত পরিণতির বিশ্বাসকে খারিজ করে দিয়েছিলেন; তবুও তিনি শেষ পর্যন্ত সেই একই সর্বজনীনতার প্রবণতায় ফিরে যান। দীর্ঘ দুই দশক ধরে ইনসাফ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার পর, রলস বেশ জোর দিয়েই দাবি করেন যে তাঁর দেওয়া সিদ্ধান্তগুলো এমন, যে কোনো আক্কেলমান্দ বা যৌক্তিক মানুষ চিন্তাভাবনা করলে ঠিক একই ফলাফলে এসে পৌঁছাবে।

এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, ‘এ থিওরি অফ জাস্টিস’ বিশ শতকের শেষভাগের রাজনৈতিক তত্ত্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজ হিসেবে নিজের মাকাম কায়েম করে নেয়। নোবেল বিজয়ী দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতো প্রখ্যাত চিন্তাবিদদের গবেষণায় এটি আজও অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বহাল রয়েছে।

★ কিছু সীমাবদ্ধতা

নিজের তত্ত্ব সারা দুনিয়ায় একইভাবে প্রযোজ্য কি না—এই বিতর্কিত বিষয়টি নিয়ে রলস তাঁর পরবর্তী কাজগুলোতে বেশ চিন্তাভাবনা করেছেন। দ্য ল অফ পিপলস বইয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ইনসাফ নিয়ে নিজের চিন্তাভাবনা পেশ করেন। অন্যান্য গবেষকরাও এই বিষয়ে বাহাস করেছেন যে, তাঁর তত্ত্ব কি সত্যিই বিশ্বব্যাপী প্রয়োগ করা সম্ভব, নাকি এটি কেবল পশ্চিমা বা ঐতিহ্যগতভাবে উদারনৈতিক সমাজগুলোর জন্যই কার্যকর।

এ থিওরি অফ জাস্টিস বইয়ে রলস আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর ধারণা প্রয়োগের বিষয়টি আলোচনা করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর আদি হালতের কাল্পনিক পরীক্ষাটি কেবল ইনসাফের প্রথম নীতিকেই সঠিক প্রমাণ করে: তা হলো প্রতিটি জাতির সমানভাবে স্বাধীন থাকার অধিকার। এই অর্থে রলসের তত্ত্ব সর্বজনীন; এটি স্বীকার করে যে প্রতিটি জাতির নিজস্ব আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মরক্ষার পূর্ণ আজাদী থাকা উচিত।

তবে রলস বলেন, ইনসাফের দ্বিতীয় নীতিটি—অর্থাৎ সুযোগ-সুবিধা ও সম্পদ বণ্টনের নীতিটি—সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য নয়। কারণ এটি এমন এক কওম বা সমাজ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে, যাদের মধ্যে ইনসাফ নিয়ে একটি যৌথ অনুভূতি রয়েছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সংস্থাও—যা যৌথ ইউরোপীয় মূল্যবোধ ও পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে করা হয়—এই সম্পদ বণ্টনের জায়গায় এসে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সরকারি তহবিল ভাগাভাগি এবং সঠিক সরকারি খরচের নীতি ঠিক করার ক্ষেত্রে একটি ইনসাফপূর্ণ ব্যবস্থা কায়েম করা অত্যন্ত কঠিন। এই বিষয়টি রলসের সর্বজনীন ইনসাফের নীতির সীমানাকে বেশ সংকুচিত করে, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তা খণ্ডনও করে।

সম্ভবত এমনটিই বাস্তব যে, এই নীতিগুলো কেবল একটি লিবারেল সমাজের ভেতরের কাঠামোর জন্যই প্রযোজ্য—যেখানে সমাজের সমস্ত সদস্য ইনসাফ সম্পর্কে প্রায় একই ধরনের চিন্তাভাবনা ভাগ করে নেয়।

★ সমালোচনা

১৯৭১ সালে জন রলসের এ থিওরি অফ জাস্টিস প্রকাশের মাত্র কয়েক বছর পর, আমেরিকান দার্শনিক রবার্ট নজিক রলসের ভাবনার বিরুদ্ধে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করেন। ট্যাক্স বা কর আরোপ এবং সম্পদ পুনরায় বণ্টনের মাধ্যমে সমাজকে আরও সমান করার যে ধারণা রলস দিয়েছিলেন, নজিক তার ঘোর বিরোধিতা করেন। পরবর্তীতে 'কমিউনিটেরিয়ান' চিন্তাবিদদের কাছ থেকেও তীব্র সমালোচনা আসে। কমুনিটেরিয়ানরা এই ধারণা একবাক্যে খারিজ করে দেন যে, মানুষ যে সমাজ বা গোষ্ঠীতে বাস করে তার বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে নিজস্ব নৈতিক ধারণা গড়ে তুলতে পারে।

স্কটিশ দার্শনিক অ্যালাসডাইয়ার ম্যাকইন্টায়ার এবং কানাডিয়ান দার্শনিক চার্লস টেলরের মতো কমুনিটেরিয়ান চিন্তাবিদরা রলসের তত্ত্বের আসল বুনিয়াদ নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। মানুষ যে পুরোপুরি বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে নৈতিক চিন্তাভাবনা করতে সক্ষম—এই ধারণার সমালোচনা করে তারা বলেন, রলস যে ‘দ্য রাইট’ এর ধারণাকে ‘দ্য গুড’ ওপরে স্থান দিয়েছেন, তা সমস্যাযুক্ত।

ম্যাকইন্টায়ারের যুক্তি হলো, একজন মানুষের নৈতিক ভাবনাকে তার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে আলাদা করে দেখা অসম্ভব। তাই ‘রাইট’ কী —সে বিষয়ে গোটা মানবজাতির একটি সর্বজনীন সম্মতি রয়েছে বলে দাবি করাটা ইতিহাসবিচ্ছিন্ন এবং বিভ্রান্তিকর। একইভাবে টেলর বলেন, সমাজ থেকে নীতি-নৈতিকতাকে বিচ্ছিন্ন করা অবাস্তব; সহজ কথায়, সমাজের জন্য যেটা 'সঠিক' বা রাইট, তাকে ব্যক্তির জন্য যেটা ‘ভালো বা কল্যাণকর’ তা থেকে আলাদা করা যায় না। রলসের আরেক কমুনিটেরিয়ান সমালোচক আমেরিকান দার্শনিক মাইকেল স্যান্ডেল রলসের ‘আদি হালত’-এর ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। স্যান্ডেল যুক্তি দেন, নির্দিষ্ট সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে কোনো মানুষের পক্ষে নিরপেক্ষ নৈতিক চিন্তা করা একেবারেই অসম্ভব।

বামপন্থী চিন্তাবিদদের কাছ থেকেও রলস সমালোচনার মুখে পড়েন। মার্ক্সবাদী গবেষক জেরাল্ড কোহেন যুক্তি দেন যে, রলসের সমতার ধারণাটি যথেষ্ট সমতাবাদী (ইগ্যালিটেরিয়ান) নয়। কোহেনের মতে, ইনসাফের একটি খাঁটি সমতাবাদী তত্ত্ব কখনোই সেই পরিমাণ বৈষম্যকে মেনে নিতে পারে না, যা রলসের ডিফারেন্স প্রিন্সিপল ছাড় দিয়েছে। সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের ফায়দা হবে—এই দোহাই দিয়ে বৈষম্যকে বরদাশত করার রলসীয় ধারণাকে তিনি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন।

★ প্রতিক্রিয়াসমূহ

রলস বিভিন্ন বক্তৃতা, প্রবন্ধ এবং ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এ থিওরি অফ জাস্টিস-এর সংশোধিত সংস্করণে তাঁর সমালোচকদের জবাব দিয়েছেন। সমালোচনার জবাবে তাঁর তরিকা ছিল—যেসব সমালোচনা তাঁর তত্ত্বকে দুর্বল করে দিতে পারে সেগুলোকে সানন্দে গ্রহণ করা, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং যেখানে সমালোচনা সঠিক মনে হয়েছে সেখানে নিজের চিন্তায় পরিমার্জন আনা। তিনি পাল্টা যুক্তিও পেশ করেছিলেন, যা একাডেমিক দুনিয়ায় নতুন আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।

বইটির সংশোধিত সংস্করণে রলস ব্রিটিশ দার্শনিক এইচ. এল. এ. হার্টের করা শুরুর দিকের সমালোচনার জবাব দেন। হার্ট রলসের 'স্বাধীনতার' ধারণায় কিছু গলদ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এর জবাবে রলস তাঁর স্বাধীনতার সংজ্ঞায় কিছু পরিবর্তন আনেন। অন্যান্য গবেষণাপত্র ও বক্তৃতায় রলস তাঁর কমুনিটেরিয়ান সমালোচকদেরও জবাব দিয়েছেন।

তাঁর প্রবন্ধ সংকলন পলিটিক্যাল লিবারেলিজম-এ রলস উল্লেখ করেন যে, তাঁর এই তত্ত্বটি মূলত পলিটিক্যাল লিবারেলিজমের একটি তত্ত্ব। এর মানে হলো, তিনি কেবল রাজনৈতিক ময়দানের নিরিখে নীতি-নৈতিকতা নিয়ে কথা বলছেন। এটি মানুষের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বা নৈতিক বিশ্বাসের সাথে সংঘর্ষে জড়ায় না—যতক্ষণ না সেই বিশ্বাসগুলো ইনসাফের মূল নীতি লঙ্ঘন করে। পলিটিক্যাল লিবারেলিজম কোনো পরম বা সর্বব্যাপী নৈতিক মতবাদ নয় (যেমনটা বিভিন্ন দ্বীন বা ধর্ম হয়ে থাকে); বরং এটি বহুত্ববাদকে (প্লুরালিজম) মেনে নেয়—এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা ভিন্ন ভিন্ন জাতিগত বা ধর্মীয় পটভূমির মানুষদের একসাথে থাকার সুযোগ দেয়।

এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করার পর রলস তাঁর তত্ত্বের মূল বুনিয়াদে অবিচল থাকেন; সমাজের ভেতরের ইনসাফ নিয়ে তাঁর যে আসল ধারণা, তাতে তিনি কোনো বড় পরিবর্তন আনেননি।

★ ভিন্নমত এবং ঐকমত্য

আমরা যেমনটা দেখেছি, রলসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনাগুলো এসেছিল কমুনিটেরিয়ান চিন্তাবিদদের কাছ থেকেই। বিশেষ করে দার্শনিক মাইকেল স্যান্ডেল এবং চার্লস টেলরের যুক্তিগুলো অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। তাঁরা দেখিয়েছেন যে, মানুষের কল্যাণ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা থাকে এবং এই ধারণাই ইনসাফ ও সঠিকতার মূল ভিত্তি তৈরি করে। এই যুক্তিটি রলসের সেই ভাবনার উল্টো—যেখানে বলা হয়েছিল একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজে 'সঠিকতা' সব সময় 'কল্যাণ বা ভালো'-র ওপরে স্থান পাবে।

সম্ভবত রলসের তত্ত্বে সবচেয়ে বড় সংযোজন ঘটেছিল তাঁর দ্য ল অফ পিপলস বইটি প্রকাশের মাধ্যমে। এখানে তিনি তাঁর ইনসাফের মৌলিক তত্ত্বকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে যান। এ থিওরি অফ জাস্টিস বইয়ে সংক্ষেপে যে আন্তর্জাতিক ইনসাফের কথা বলা হয়েছিল, এই কিতাবে তিনি তাকে আরও সমৃদ্ধ ও পরিমার্জিত করেন। তবে এই পরিবর্তনগুলো কেবল অন্য পন্ডিতদের সমালোচনার কারণে ঘটেনি; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানে নিজের তত্ত্বের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা রলস নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন।

গবেষকদের সাধারণ মত হলো—রলসের তত্ত্বের ওপর যত সমালোচনাই আসুক না কেন, কোনো সমালোচনাই তাঁর এই মহান সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দিতে পারেনি। রাজনৈতিক তত্ত্বের দুনিয়ায় জন রলসের কাজ আজও অন্যতম সেরা ও সফল গবেষণা হিসেবে গণ্য হয়। রলসের সমালোচকরা আজও সক্রিয় এবং তারা তাদের সমালোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন—তবে তাঁর এই কাজ আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রধান রেফারেন্স হিসেবে কায়েম রয়েছে, যা নতুন চিন্তাভাবনা ও বিতর্কের দুয়ার উন্মুক্ত করে দেয়।

★ সমকালীন গবেষণায়

যেসব গবেষক ও পণ্ডিত জন রলসকে তাঁদের চিন্তাভাবনার মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে মানেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চার্লস বেটস, থমাস পগি, আমেরিকান দার্শনিক থমাস নাগেল, থমাস স্ক্যানলন, জোশুয়া কোহেন, স্যামুয়েল ফ্রিম্যান ও পল উইথম্যান এবং আইরিশ দার্শনিক অনোরা ও’নিল।

চার্লস বেটস, আমেরিকান দার্শনিক মার্থা নুসবম এবং ব্রিটিশ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সাইমন ক্যানির মতো কসমোপলিটান বা বিশ্বজনীন চিন্তাবিদগণ রলসের ভাবধারা ব্যবহার করে বৈশ্বিক ইনসাফের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন। এই বাহাস বা বিতর্কের বড় একটি অংশ দাঁড়িয়ে আছে রলসের ‘দ্য ল অফ পিপলস; বইয়ে তুলে ধরা আন্তর্জাতিক ইনসাফ সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিটি ইনসাফের পরোক্ষ ও পর্যাপ্ত মানদণ্ডের নিশ্চয়তা দেয় কি না—তার ওপর। এই আলোচনায় অবদান রাখা আরেকজন প্রভাবশালী মনীষী হলেন ভারতে জন্ম নেওয়া দার্শনিক অমর্ত্য সেন, যিনি বৈষম্যের সমস্যা এবং কীভাবে গরিবী বা দারিদ্র্য পরিমাপ করা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

যদিও বৈশ্বিক ইনসাফ ও বৈষম্যের বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে, তবে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ইন্টারজেনারেশনাল জাস্টিসের মতো নতুন নতুন বিষয়গুলো এখনো ধীরে ধীরে সামনে আসছে। ব্রিটিশ দার্শনিক ব্রায়ান ব্যারি আন্তঃপ্রজন্মীয় বিষয়গুলোর নিরিখে রলসের তত্ত্বের সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরেছেন, তবে এই বাহাস ও চর্চা ভবিষ্যতেও নতুন নতুনরূপে জারি থাকবে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন নতুন প্রেক্ষাপটে ইনসাফের দাবি বারবার উঠতেই থাকবে।

একইভাবে, একটি ইনসাফপূর্ণ যুদ্ধের (জাস্ট ওয়ার) প্রশ্নটি শত শত বছরের পুরনো হলেও, ২০০০ সালের পর থেকে শুরু হওয়া ‘নতুন যুদ্ধগুলো’ যুদ্ধের নৈতিকতা এবং তার কায়েদা-কানুন নিয়ে নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রলস যদিও তাঁর বইতে সরাসরি এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে যাননি, তবুও তাঁর তত্ত্ব যে বুনিয়াদী রূপরেখা পেশ করে, তা ব্যবহার করে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সম্ভব।

★ সংক্ষিপ্তসার

এ থিওরি অফ জাস্টিস বইটি সামাজিক ইনসাফের ধারণায় আগ্রহী বিভিন্ন ক্ষেত্রের গবেষক ও জ্ঞানচর্চাকারীদের অনুপ্রাণিত করেছিল এবং আজও করে যাচ্ছে। দার্শনিক, আইনপ্রণেতা, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকারী, মানবাধিকার কর্মী এবং আরও বহু পেশার মানুষ রলসের এই কাজের মাধ্যমে যেমন প্রেরণা পেয়েছেন, তেমনি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হয়েছেন। তাঁর এই মৌলিক ও উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি এমন এক সমাজ গঠনের ওপর জোর দেয়, যা তার প্রতিটি নাগরিকের সর্বত্তম যত্ন নেয়। অন্যান্য অনেক রাজনৈতিক দার্শনিকের মতো না হয়ে, রলস তাঁর পাঠকদের দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে তাঁর মতো করে চিন্তার চর্চা করতে হয়। এটি পাঠকদের নিজেদের মতো করে কল্পনা করার সুযোগ দেয়—সমাজ কাঠামোর একেবারে তলানিতে থাকলেও তারা নিজেরা যে সমাজে বাস করতে ইচ্ছুক, তা হাসিল করতে কোন ধরণের প্রতিষ্ঠান ও নিয়ম-কানুন সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।

১৯৭১ সালে লেখা হলেও, রলসের এই কাল্পনিক চিন্তাগুলো এবং তা থেকে তিনি যেসব ধারণা বের করে এনেছেন, তা হয়তো আজকের দিনে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি উপযোগী। বিশ্বায়ন (গ্লোবালাইজেশন), পরিবেশের অবক্ষয়, কর্মসংস্থানের বদলানো ধরন এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান শক্তি—এই বিষয়গুলোর কারণে আজ মানুষের ইনসাফ, সমতা ও ন্যায্যতা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা ভীষণ দরকার। যেমনটা রলস নিজে যুক্তি দিয়ে বলেছেন: ‘চিন্তার ব্যবস্থার জন্য সত্য যেমন প্রথম গুণ, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও ইনসাফ ঠিক তেমনি প্রথম এবং পরম গুণ।’

এ থিওরি অফ জাস্টিস এমন এক অমর সৃষ্টি হয়ে থাকবে, যা তাঁর পাঠকদের প্রতিনিয়ত নতুন ভাবনার খোরাক জোগাবে, দার্শনিক চিন্তায় উদ্দীপিত করবে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।