“দুরভিসন্ধি প্রণোদিত হইয়া অনেকে বলেন, সাম্যবাদ ধর্মের শত্রু। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ধর্ম বিষয়ে আমরা যতদূর সম্ভব স্বাধীনতা ও পরমতসহিষ্ণুতা সমর্থন করিয়া থাকি। যে কেহ আমাদের নীতিতে বিশ্বাসবান হইবে, হিন্দু হউক মুসলমান হউক কি খ্রিষ্টান হউক বা বৌদ্ধ হউক, কোনো ধর্ম তাহার থাক বা না থাক, আমরা তাহাকে আমাদের দলে গ্রহণ করিব। অর্থাৎ, আমরা সকল ধর্মকেই স্বীকার করি। এবং কোনো ধর্ম না থাকাটাকেও, অর্থাৎ, নাস্তিকতাকেও একটি ধর্ম মনে করি।
কোনো কোনো মুসলমান নেতা এই অমূলক অপবাদ দিতেছেন যে, সাম্যবাদ ইসলামের শত্রু। প্রকৃত পক্ষে ইহা আদৌ সত্য নহে। বরং সাম্যবাদের চেয়ে ইসলামই ধনিকতন্ত্রের অধিকতর বিরোধী এবং যে পর্যন্ত একটি প্রাণীও অভুক্ত থাকিবে সে পর্যন্ত ধনিকের ব্যবসায় অর্থসঞ্চয় করিবার কোনো অধিকার নাই। এই জন্যই ‘জাকাত’ এর বাধ্যবাধকতা ন্যস্ত করা হইয়াছে।
নামাজের পরই কোরানে জাকাতের ওপর জোর দেয়া হইয়াছে। প্রথম খলিফা যাহারা ‘জাকাত’ দিতে অস্বীকার করিয়াছিল তাহাদের বিরুদ্ধে জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করিয়াছিলেন। পরিশ্রম বিনা শধু মূলধনের ওপর সুদগ্রহণ অন্যায়। এইজন্যই মুসলমানদের পক্ষে সুদ খাওয়া নিষেধ। কুশীদজীবী বিনা পরিশ্রমে টাকা ধার দেওয়া সুদ খায়। এই জন্যই ইসলাম ধর্ম সুদ গ্রহণকে এতো ঘৃণার চক্ষে দেখিয়াছেন। সাম্যবাদও এই সুদগ্রহণ ব্যপারটাকে অন্যায় বলিয়া ঘোষণা করিতেছে।”
সূত্র : লাঙল, ৭ই মাঘ, ১৩৩২, প্রথম খণ্ড, পঞ্চম সংখ্যা
নোট: ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কানপুরে ভারতীয় কমিউনিস্টদের (সাম্যবাদী) প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘লাঙল’ পত্রিকা সেই সম্মেলনের সংবাদ, সভাপতির অভিভাষণ এবং মৌলানা হসরৎ মোহানীর বক্তৃতা ফলাও করে ছেপেছিল। ‘লাঙল’-এর সূত্রে জানা যায়, সেই সম্মেলনে আরও অনেকের সাথে উপস্থিত ছিলেন ‘মৌলানা আজাদ শোভানি’ [সোবহানি], এবং ‘মৌলবী মুজঃফর আহম্মদ’। মৌলানা হসরৎ মোহানীর বক্তৃতা ‘সাম্যবাদ কি’ শিরোনামে ‘লাঙল’ পত্রিকা প্রকাশ করেছিল। সে লেখার ‘সাম্যবাদ ও ধর্ম’ নামক অংশটুকু ‘আখড়া’র পাঠকদের জন্য এখানে তুলে দেয়া হলো।
সাম্যবাদ ও ধর্ম