Skip to Content

আমাদের ভাষা ও সাহিত্য

মুহম্মদ আব্দুল হাই
29 নভেম্বর, 2025 by
Administrator
| No comments yet

সারা পাকিস্তানে কেন, পূর্ব্ব পাকিস্তানেও উর্দুই হবে এখানকার প্রাদেশিক সরকারের ভাষা এ প্রচেষ্টা পূর্ব বাংলার মাটীতে সফল হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা— এ ধারণা অনেকেরই ছিল এবং এখনও আছে। সে যা হোক, বহু রক্তাক্ত সংগ্রামের পর সম্প্রতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইন সভায় পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক ভাষা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের ভাষা বাংলাকে উর্দুর সংগে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেবার কথা ঘোষিত হয়েছে। বিশ বছর পর ইংরেজীর বদলে বাংলা ও উর্দু সমভাবেই রাষ্ট্রভাষারূপে গৃহীত হবে। আর এ বিশ বছর ধরে বাংলাসহ আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে সমৃদ্ধ ক'রে তুলবার সাধনা চলবে।

সময়ের দিক থেকে বিশ বছর কম নয়। এর মধ্যে দেশের চেহারায় এবং মানুষের মনে নানা পরিবর্তন হ’তে পারে। পশ্চিম-পাকিস্তানীদের বিশেষ ক’রে পাঞ্জাবীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যে তীব্র বিরোধিতা ক’রে এসেছেন এবং এখনও করছেন তাতে ইন্ধন জুগিয়েছে আমাদেরই দেশের মধ্যে ভাষা ও সাহিত্য সম্বন্ধে নানা মতামত।

বাঙালী মুসলমানের ভাষা বাংলা হওয়া উচিত কিনা এবং হলে তার রূপ কি হবে? আরবী পারসী মেশানো, সংস্কৃত প্রভাবান্বিত, না এ কালের পরিবর্তিত পরিপ্রেক্ষিতে উর্দু বাংলা মেশানো খিঁচুড়ি ভাষা? আর তার সাহিত্যই বা কি হবে? ইসলামী? না পশ্চিম-বাংলা ঘেঁষা? না বাংলার মাটীতে ‘বাঙাল-ইসলামী’, না অন্য কিছু? এ নিয়ে পাকিস্তান হবার পর থেকেই তর্ক চলে আসছে। এ তর্ককে কেন্দ্র ক’রে সাহিত্যিকদের মধ্যে যেমন কাদা ছুড়াছুড়ি হয়েছে, তেমন পানিও কম ঘোলা হয়নি।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রয়োজনেই এ সমস্যার উদ্ভব নয়, মুসলিম বাংলার এ প্রায় সুদীর্ঘ সাতশ বছরের সমস্যা; বর্তমান রাজনৈতিক তাগিদে নতুন করে মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠেছে।

সুতরাং আমাদের মধ্যে একদল ভাবছেন বাংলা ভাষাকে একেবারে বাদ দিয়ে উর্দুকে বরণ করা যখন সম্ভব হলোনা, তখন প্রচুর আরবী ফারসী তথা উর্দু শব্দ আমদানি করে, বাংলার বর্ণমালা পর্যন্ত পাল্টে দিয়ে বাংলাকে ধীরে ধীরে উর্দুর সমপর্যায়ে টেনে তুলতে হবে। এঁরা হলেন চরমপন্থী। নরমপন্থীরা মনে করেন বড় রকমের রাজনৈতিক বিবর্তন প্রতি দেশেরই জাতীয় জীবনে একটা পরিবর্তন এনে দেয়। তাই আমরা যখন পাকিস্তান অর্জনে সফলকাম হরেছি তখন পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ বাংলাভাষা ও সাহিত্যে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। তার জন্য আস্ফালনের প্রয়োজন নেই, ভাষাকে আজই ঢেলে সাজাবার তাগিদ নেই, আর বাংলা বর্ণমালাকে গঙ্গা পার করে পশ্চিম বাংলার ‘কুফরস্তানে’ ঠেলে দিয়ে হুরুফুল কোরাণের ভাঁওতায় উর্দু অক্ষর গ্রহন করারও ‘জরুরাত’ নেই। পাকিস্তান রাষ্ট্রের উন্নতির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্যও ধীরে ধীরে পাকিস্তানী (পূর্ব পাকিস্তানী অবশ্য) ছাপ বহন করবে।

নরমপন্থীরা উগ্রপন্থীদের মত গ্রহণ করতে পারছেন না; তবে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গীতে তাঁদের উদ্দেশ্য যে সাধু সে জন্য তাঁদের বুদ্ধির তারিফ করছেন। তাঁদের মত গ্রহণ করলে অনতিদূর ভবিষ্যতে আমাদের কি বদহাল হবে সে কথা ভেবে তাঁরা বলছেন, এতবড় একটা ‘Experiment’ করতে গিয়ে কমপক্ষে বিশ কি পঁচিশ বছর কাটবে; তাতে বাংলার কুলধর্মও ঠিক থাকবেনা, আমাদের ভাষাও উর্দু হবেনা। এক কিম্ভুৎকিমাকার মিশ্রনোৎপন্ন ভাষায় না গঠিত হবে আমাদের সত্যিকার সাহিত্য, না পাবো আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা। এই প্রয়োগ পরীক্ষার বিফলতায় আমাদের জাতির (বাঙালী মুসলিম) মনে গভীর নৈরাশ্য দেখা দেবে। আর রাজনৈতিক অবস্থার জন্যই ভেতরে ভেতরে উর্দুটাও আমাদের গা সওয়া হয়ে উঠবে। তখন একদিন আইনের জোরেই হোক কিংবা মানসিক বিকারের ফলেই হোক উর্দুকে শুধু জীবিকা অর্জনের ভাষা রূপে নয়, আমাদের কথ্য লেখা, শিক্ষার মাধ্যম ও সাহিত্যের ভাষারূপে উৎসব ক’রে বরণ করে নেওয়া হবে। তারপর পূর্ববাংলায় চলবে উর্দুর সাধনা। এখানকার মুসলমানের মাতৃভাষা কি তামাদ্দুনিক ভাষা উর্দু নয় ব’লেই সেখানেও সুফল ফলবেনা; অথচ এত বছরে পশ্চিম পাকিস্তান যাবে শিক্ষা-দীক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বহুদূরে এগিয়ে। আমরা হবো তখন ওদের বোঝা স্বরূপ, হবো অশ্রদ্ধার পাত্র। দু-নৌকয় পা দিয়ে সে অবস্থায় আমাদের বাঁচা তো দূরের কথা, শান্তিতে মরবারও আর ফুরসৎ থাকবে না।

প্রথমে যা বলছিলাম। আজকের পাকিস্তান ও তার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বপাকিস্তান আর মধ্য যুগের মুসলমান আমলের সারা ভারতবর্ষের বাদশাহী, আর সেই পটভূমিতে অখণ্ড বঙ্গদেশ। সেদিনও বাঙালী মুসলমানের সামনে সমস্যা ছিল— তার ভাষাই বা কি আর কোন ভাষাতেই বা সে সাহিত্য রচনা করবে। সেদিনও এদেশবাসী অথচ বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে এমনি দুই দল ছিল। এক দল বাংলা বর্জন ক’রে কি জানি কোন্ মুসলমানী ভাষায় সাহিত্য রচনা করতে চেয়েছিল। তারাও আজকের দিনের উগ্রপন্থীদের মতো বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সেবী নরমপন্থীদের বিদ্রূপ করতে ছাড়েনি, আর বাংলাভাষা ও সাহিত্যকেও আপনার ব’লে গ্রহণ করেনি। মনে হয় এ ধরনের এক অশান্ত পরিবেশের মধ্যে পড়েই আজকের নরমপন্থীদের মতো ষোড়শ শতকের বাঙালী মুসলমান কবি সৈয়দ সুলতান তাঁর ‘রসুল বিজয়’ কাব্যের ভূমিকায় অতি দুঃখের সংগে লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন—

কত দেশে কত ভাসে কোরানের কতা।

দিন মোহম্মদী বুজি দেয়ন্ত বেবস্তা॥

কৰ্ম্মদোষে বঙ্গেতে বঙালী উৎপন।

না বুজে বাঙালী, সবে আরবী বচন॥

বঙ্গদেশি সকলেরে কিরূপে বুজাইব।

বাঙালী আরব ভাষায় বুজাইতে নারিব॥

জারে জেই ভাসে প্রভু করিছে সৃজন।

সেই ভাস তাহার অমূল্য সেই ধন॥


কতকাল আগেকার কবির এই উক্তি; অথচ শেষের দুই পংক্তির মর্ম আজই যেন বিশেষভাবে আমাদের উপলব্ধি করতে হচ্ছে। এরই সংগে বিচার্য অসংখ্য মোল্লা মৌলবী অধ্যুষিত নোয়াখালী জেলার সন্দীপ নামক সাধুরাম পল্লীনিবাসী সপ্তদশ শতাব্দীর মুসলমান কবি আবদুল হাকিমের ক্ষমাহীন সতর্ক উক্তি। ক্ষোভে ও দুঃখে তিনি লিখেছিলেন—

যে সবে বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সবার কিবা রীতি নির্ণয় না জানি॥ মাতা-পিতামহ-ক্রমে বঙ্গেতে বসতি।

দেশীভাষা উপদেশ মনে হিত অতি॥

দেশীভাষা বিদ্যা যার মনে না যুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগি কেন বিদেশে না যায়॥


তিন শ’ বছর আগেকার মুসলমান-যুগের নামেমাত্র দিল্লীর অধীন একরকম স্বাধীন বাঙলার মুসলমান আর আজকের আমাদের বহু-বাঞ্ছিত পাকিস্তানের করাচীর বাঁধনপুষ্ট পূর্ববঙ্গের মুসলমান। বহুশত বৎসরের ব্যবধানেও বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপারে বাঙালী মুসলমানের মানসিকতার কোন পরিবর্তন হয়েছে কি? আমাদের পূর্ব পুরুষদের অদূরদর্শিতার জন্য এ যুগের মুসলমান আমরা কৃপা ছাড়া তাঁদের আর কি করতে পারি? এখনও যদি আমরা এ অনাবশ্যক কলহকোন্দল বন্ধ ক’রে আমাদের আপন সাহিত্য সৃষ্টি করতে মন না দিই তাহ’লে আমাদেরই ভবিষ্যৎ বংশধরেরা কি ঠিক একালের উর্দু বাংলার ঝগড়া ও তদজনিত সৃষ্টির বিফলতার কথা স্মরণ ক’রে আমাদের দিক থেকে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে না?

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ইতিহাস আলোচনা ক’রলে দেখি মুসলমানের পক্ষে বাংলা সাহিত্য সেবা করার বাধা ছিল যথেষ্ট; সে বাধা তার আপন রাজশক্তির দিক থেকে আসেনি— এসেছে তার সমাজের উগ্রপন্থী অদূরদর্শীদের কাছ থেকে। তবু দেখা যায় সমগ্র মধ্যযুগ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাতশ’ বছর ধরে বাঙালী মুসলমান বাংলা ভাষাতেই সাহিত্য সৃষ্টি করেছে। ভাল হোক, মন্দ হোক তার সেই সাহিত্যের মধ্যেই মুসলমানের চিরন্তন বৈশিষ্ট্যের ছাপ সে ধরে রাখতে পেরেছে। মুসলমানের ‘জঙ্গনামা’; তার ‘কাসাসোল আম্বিয়া’, ‘মারফতি গান’ এবং ‘পদ্মাবতী’ কি ‘লোরচন্দ্রানী’ এবং সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ সম্পদ পুঁথি সাহিত্য মুসলমানী ভাবধারা ও জীবনাদর্শ আজও বহন করছে। সত্য কথা বলতে কি পুঁথি সাহিত্যকে আমরা আজ যে দৃষ্টিতেই দেখিনা কেন, বাঙলার মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলো যেমন বাঙালী হিন্দুর জীবন পিপাসা মিটিয়েছিল, তেমনি মুসলমানের পুঁথি সাহিত্যও মুসলিম জীবনের আশা আকাঙ্খার পরিতৃপ্তি সাধন করে মহা-কাব্যোচিত গৌরব নিয়েই তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এযুগের দৃষ্টি ভঙ্গীতে বিচার করলে মানুষের জীবনের উপরে ভিত্তি লাভ করে দাঁড়ায়নি ব’লে যেমন পুঁথি সাহিত্যের তেমনি মঙ্গল কাব্যের মূল্য অবশ্য কমে আসবে; কিন্তু একথা সত্য যে হিন্দুর যেমন পদাবলী সাহিত্য মুসলমানের মারফতী গান, তেমনি হিন্দুর মঙ্গলকাব্যের পাশে একমাত্র এই বিরাট পুঁথি সাহিত্যের ভাণ্ডারই সেকালের বাঙালী মুসলমানকে সম্মান ও গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। সেকালের বাঙালী মুসলমান সৃষ্টি প্রতিভায় বাঙালী হিন্দুর তুলনায় কিছু কম ছিল না— পুঁথি সাহিত্যই তার প্রমাণ।

বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও বাঙলা দেশে ইংরেজ আগমনের পূর্বপর্যন্ত মুসলমানেরা যে ধারায় বাঙলা সাহিত্য সৃষ্টি ক’রেছে, দেশের রাজশক্তি মুসলমানদের হাতে থাকার জন্য তার সবটা না হলেও অনেকটা বাঙালী হিন্দুও তার সাহিত্য সৃষ্টির জন্য গ্রহণ করেছে। মোটামুটি মুসলমানযুগে হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত বাংলা সাহিত্যে যে মুসলমান প্রভাব দেখি, ঐতিহাসিকের বিচারে এদেশ ও জাতির অতীত নিরূপণ করতে তাঁর মূল্য কিন্তু কম নয়।

সামাজিক ও ব্যবহারিক জীবনে অত্যন্ত সুস্থ ও সহজ রাজনৈতিক চেতনা এবং সাম্য মৈত্রী ও প্রীতি জনিত ভাব ছড়িয়ে ইসলাম যেমন ভারতবর্ষের জাতিভেদ পীড়িত ও অত্যাচার জর্জরিত অগণিত মানুষকে আপন স্নেহচ্ছায়ায় আশ্রয় দিয়েছে, তেমনি এ দেশ তার জাতিধর্মকে বাঁচাতে গিয়ে রামানন্দ কবীর নানক এবং চৈতন্য প্রমুখ সাধক ও উদার মতাবলম্বী ও মধ্যপন্থীর জন্ম— হিন্দুর জীবনে এও যেমন ইসলামের পরোক্ষ প্রভাব, তেমনি বাঙালী জীবনে ও বাঙলার হিন্দুমুসলিমের মিলিত সাহিত্যে চিন্তাধারার দিক দিয়ে সুফী প্রভাবও ইসলাম তথা মুসলমানের দান। এ দান পরোক্ষ-ভাবে হলেও হিন্দুর বৈষ্ণব সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে ছাড়েনি। এ ছাড়া বাংলায় উপাখ্যান কাব্যরচনা হিন্দুমুসলমানের ফারসী চর্চার সমসূত্রেই এদেশে এসেছে।

চিন্তাধারা বা ভাব জীবনের দিক থেকে সমগ্র বাংলা সাহিত্যে মুসলমান প্রভাব যতটা আশা করা গেছিল অবশ্য ততটা হয়নি, কিন্তু হিন্দুমুসলমান নির্বিশেষে বাঙালীর ব্যবহারিক জীবনে মুসলমান প্রভাব যথেষ্টই বলতে হবে। বাঙালীর ঘরের আসবাব, তার পোষাক পরিচ্ছদ, তার বিলাসিতার উপকরণ, তার অসুখের এলাজ, তার বড়মানুষি খেলার সরঞ্জাম, মাসান্তের মাহিনা, গাড়ীঘোড়ায় চড়ার রেওয়াজ, তার তেজারত, জমি জমার বন্দোবস্ত, তার আদালতের মামলা মোকদ্দমা, তার পরিচায়ক পদ ও পদবী, এমনকি তার দৈনন্দিন জীবনের জবানও বহুদিকে মুসলমান প্রভাব দ্বারা শাসিত। বাঙলার সাহিত্য তার এ নজীর আজও বহন করে চলেছে।

বৃটিশপূর্ব যুগের বাঙালী জীবন ও সাহিত্যে তো বটেই, ইংরেজী আমলের সাহিত্যেও মুসলমান প্রভাব কম নেই। সেকালের ভারতচন্দ্রের ‘যাবনী মিশাল’ ভাষা না হয় বাদই দিলাম, উনবিংশ শতাব্দীর গঠন যুগের লেখক প্যাঁরিচাদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এবং ‘হুতোমপ্যাচার নক্সা’ পড়তে গিয়ে আরবী ফারসী শব্দের যথেষ্ট ছড়াছড়ি দেখা যায়। আলালের প্রায় প্রতি পংক্তিতেই আরবী ফারসী শব্দের এত অধিক ভিড় রয়েছে যে, আজকালকার ভাল আরবী ফারসী জানা লোকেরও পিলে চমকে ওঠে। অতদূরে কি, এহেন যে বঙ্কিম, তার মতো লেখকের রচনাতেও ফারসী ও তার সমসূত্রে আরবী শব্দ বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে।

হিন্দু অবশ্য তার নিজের দৃষ্টি দিয়েই এ যুগে মুসলমানের জন্যও সাহিত্য সৃষ্টি করে গেছে। হিন্দু গিরীশচন্দ্র কোরান শরীফের ও হাদিস শরীফের প্রথম অনুবাদক, হযরত মোহম্মদের (সা.) প্রথম জীবনী লেখক; মুসলমান সাধকগণের প্রথম জীবনী প্রচারক। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সিরাজ ও মীরকাসিমের প্রথম কলঙ্ক মোচক। অধ্যাপক যদুনাথ সরকার, রামপ্রাণ গুপ্ত ইসলামের ইতিহাস লেখক; সত্যেন দত্ত ও মোহিতলাল বাংলার মুসলিম কৃষ্টির রূপকার ও কবি। এ যুগের নামকরা মুসলমান লেখকদের মধ্যে মীর মোশাররফ হোসেন, মোজাম্মেল হক, লুৎফর রহমান, ইমদাদুল হক, কায়কোবাদ ও নজরুল বাংলা সাহিত্যে মুসলিম জীবন ও তমদ্দুনের উদগাতা। এঁদের সৃষ্টি শুধু মাত্র মুসলমানদের জন্য হয়নি; মুসলিম কৃষ্টি ও জীবন থেকে রস সংগ্রহ ক’রে বাংলার মাটী ও সাহিত্যকে উর্ব্বর করেছে। তা হয়েছে বাংলার ও বাঙালীর।

বৃটিশ শাসনের মধ্যকালই বাংলা সাহিত্যের পরিণত কাল। সে সময়েও মুসলমান আমলের জের একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি; তার শেষ রশ্মিটুকু ক্ষীণ দীপালোকের মতো নিবু নিবু করছে। একথা সত্য যে পলাসীর যুদ্ধে বাংলাদেশে মুসলিম রাজশক্তির ভাগ্য বিপর্যয় না ঘটলে পুঁথি সাহিত্যের ভাষা বা অনুরূপ আরবী ফারসী প্রভাবান্বিত বাংলা ভাষাই হিন্দু ও মুসলমান বাঙালীর বাংলা সাহিত্যের ভাষা হতো এবং নবযুগের বাংলা সাহিত্যের এ হেন সমুন্নতরূপও অনুরূপ ভাষার উপর ভিত্তি করেই দাঁড়াতে পারত। কিন্তু সে কথা থাক। অতীত ফিরে আসেনা; অতীতকে আঁকড়ে ধরা কিংবা তাকেই যথাযথ ভাবে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টাও ফলবর্তী হয়না। তার জন্য দুঃখ ক’রে লাভ নেই; কেবল দুঃখ হয় তাঁদের জন্য যারা ইতিহাসের পাঠ গ্রহণ না ক’রে বর্ত্তমানকে সেই কঙ্কালসার অতীতেরই সেকেলে বোরকা পরাতে চাইছেন।

রাজনৈতিক কারণেই ইংরেজ শাসনে মুসলমান দেশের সকল বিধি ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে গেল। আর্থিক অস্বচ্ছলতার মধ্যে পড়ে শিক্ষাদীক্ষা থেকেও বঞ্চিত হল। সুতরাং এ মহা নৈরাশ্যের মধ্যে সে আর উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি করবে কি করে? ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত এ যুগ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ও সুবর্ণ যুগ। এ যুগের বাংলা সাহিত্য মূলত বাঙালী হিন্দুর সৃষ্টি। তার পাশে মুসলমান রচিত সাহিত্য একটা ক্ষীণ দ্বীপালোকের মতোই মিট মিট করছে। সুতরাং হিন্দুর রচিত শ্রেষ্ঠ সাহিত্য হিন্দু কৃষ্টিরই যে ছাপ বহন করবে তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। হিন্দু কৃষ্টি বাদ দিয়ে যে পরিমাণে তা মানুষের অন্তর্জীবনের গাথা রচনা করেছে সে পরিমাণে তা বাঙালীর সুতরাং মুসলমানেরও— এ কথা অবশ্য স্বীকার্য। সে দিক থেকে উরাধিকার সূত্রে বাঙালী মুসলমানও সে সাহিত্যের একটা বিরাট অংশের দাবীদার— একথা অস্বীকার করলে চলবে কেমন করে?

তাই ব’লে তার নিজের সাহিত্য তাকে সৃষ্টি করতে হবে না এবং বাংলা সাহিত্যের বিশ্ববিমোহনরূপে মোহ (সম্ভবত শব্দটি ‘মজে’ হবে— আখড়া টিম) গিয়ে মুসলমান সান্ত্বনা পাবে এও তার পক্ষে এক মস্ত বড়ো বিড়ম্বনা। যেমন ক’রে সে হিন্দুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মধ্য যুগের সাহিত্য সৃষ্টি ক’রেছে, হিন্দুর তুলনায় নগন্য হলেও বাংলা সাহিত্যের গৌরবোজ্জলযুগে তার কৃষ্টির ছাপ যেমন ক’রে সে তার নিজের রচিত সাহিত্যে স্থল বিশেষে ফুটিয়ে তুলেছে, আজকের রাষ্ট্র ব্যবস্থার এ মহাপরিবর্তনের যুগেও সে তেমনি তার সাহিত্য রচনা করবে। সে সাহিত্য হবে বাংলা, তার ভাষাও বাংলা এবং লিপিও বাংলা।

পশ্চিম বাঙলা ও পূর্ববাঙলা এদুটো কথা নূতন নয়; নূতন শুধু হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এ পরিবর্তন আসার বহুপূর্ব থেকেই অর্থাৎ দেশ ও সাহিত্যের শৈশবাবস্থা থেকেই বাঙলা দেশের এই দুই অঞ্চলের আবহাওয়াতে তফাৎ ছিল। উক্ত ভৌগলিক পার্থক্য এমনি যে তা আপনাপন অঞ্চলের মানুষের জীবনের সকল দিকেই বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্যের অজস্র চাপ রেখে গেছে। আবহমান কালের ‘বাঙ্গাল’ ও ঘটীর লড়াই ও ব্যঙ্গ বিদ্রূপের কথা না হয় বাদই দিলাম— দুই বাঙলার সাহিত্যে যদিও বা এর প্রকাশ কম হয়নি।

কিন্তু নদীমাতৃক পূর্ববাঙলার অপেক্ষাকৃত সিক্ত মাটীতে এ অঞ্চলের মানুষ ভাটিয়ালী, মারফতী, জারি মার্সিয়া, লোক সঙ্গীত ও পল্লীগীতিকা ইত্যাদির যেভাবে জন্ম দিয়েছে তা নিছক পূর্ব বাঙলারই। আশ্চর্যের কথা এই যে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুসলিম জীবনের অন্তর্গাথা এবং দরিদ্র ও নিরক্ষর মুসলিম জীবনকে কেন্দ্র করেই প্রাণ পেয়েছে। আবার শুকনো মাটীর দেশ পশ্চিম বাঙলায় যে সাহিত্য ফলেছে, উক্ত অঞ্চলের প্রাকৃতিক শুষ্কতার জন্যই বোধ হয় (অবশ্য বৈষ্ণব কবিতা বাদ দিয়ে) তার মধ্যে জলীয় ভাবের অংশ অপেক্ষাকৃত অল্প। এর সূক্ষ্ম উদাহরণ পশ্চিমের বাউল সঙ্গীত আর পূর্ব বাঙলার ভাটিয়ালী। প্রাণের আবেগ দুটোতেই সমান তবু বাউলে চড়াই, ভাটিয়ালতে উৎরাই। শুষ্ক ও রুক্ষতার জন্য বাউলে উর্দ্ধশ্বাস আর প্রচুর জলীয় বাষ্পের জন্য ভাটিয়ালীতে শ্বাস নিম্নগামী; একটা পশ্চিম বাঙলার আর একটা পূর্বের। একটা হিন্দুর, একটা মুসলমানের। একি আজকের তফাৎ? এতো চিরকালের!

পাকিস্তানের নবতন আলোকে আমাদের সাহিত্যকে শুধু এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিচার করলেই যথেষ্ট হবে না। কথা উঠেছে সাহিত্যকেও দীন ইসলামের কালেমা পড়াতে হবে। কথাটা বিচার ক’রে দেখা যাক। পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হোক বা না হোক পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীই যখন মুসলমান তখন তার জীবনে এবং সাহিত্যেও ইসলামের সুস্পষ্ট চাপ থাকতে বাধ্য। ইসলাম শুধু ধর্ম নয়; দুনিয়াতে মানুষের সুস্থ, সবল, স্বাভাবিক ও সহজভাবে বেঁচে থাকবার ব্যবহার বিধি। উক্ত নীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িত থেকে যে জাত বাঁচতে চায় তার উপযোগী সাহিত্য তাকে তৈরী করতে হবে। কেননা সাহিত্যই জাতির সংস্কৃতি গ’ড়ে তোলে এবং সেই সংস্কৃতির দুগ্ধধারে সুস্পষ্ট ক’রে সে জাতিকেও বাঁচায়। পৃথিবীতে শারীরিক শক্তির আস্ফালনের দ্বারা কোন জাতি বাঁচেনি; কুওতে ইসলাম জাহির ক’রে আমরাও তেমন বাঁচতে পারবো না। জাতীয় জীবনের উত্থান ও পতন আছে স্বীকার করি কিন্তু এও মানতে হবে যে, পতন থেকে অভ্যুদয়ের পথে এগুতে তার সাহিত্যই তাকে প্রেরণা দেয়; সাহিত্য জাতীয় জীবনের আরসি; সুতরাং যে জাতির সাহিত্য নাই তার আর রয়েছে কি?

প্রশ্ন হ’তে পারে মুসলমানের রচিত হ’লেই কি তা মুসলিম সাহিত্য হবে? তা যখন হয়নি এবং হবেও না তখন পূর্ববঙ্গের সাড়ে তিন কোটি মুসলমানের সাহিত্য আমাদেরই রচনা করতে হবে। কোরান হাদীস ফেকা উসুল, শরাহ শরীয়ত মাফিক মুসলিম জীবন যে ভাবে নিয়ন্ত্রিত তার সাহিত্যকেও তদনুবিদ্ধ প্রাণধর্মে উজ্জীবিত হ’তে হবে। হিন্দুর রামায়ণ মহাভারতাদি পূরাণ ও গীতা উপনিষদ যেমন তার সাহিত্যের অফুরন্ত উৎসব হ’য়ে রয়েছে এবং হিন্দু যেমন অকাতরে সেখান থেকে ভাব সম্পদ আহরণ ক’রে তার নব যুগের সাহিত্যকে একটা বিরাট মহনীয়তা দান করেছে, আমাদের সাহিত্য সৌধও তেমনি কোরাণ ও মুসলমানী উপকথার বিরাট চত্বরের উপরেই প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রসঙ্গত বলা যায় মুসলমান সমাজের কোন নায়িকাকে যদি ফজর থেকে এশা পর্যন্ত শুধু নামাজই পড়তে দেখি তাতে বিস্মিত হবো না, কিন্তু সে যদি এবাদৎ বন্দেগী করতে করতে তার নারীত্ব বর্জন ক’রে ফেরেস্তা হ’য়ে দাঁড়ায় তখন শুধু বিস্মিত নই, ব্যথিত হবো। অতএব আমাদের সাহিত্যের দেহ ও মন হবে মুসলমানের কিন্তু আত্মা হবে সকল কালের সকল দেশের মানুষের; এক কথায় সার্বজনীন, সুতরাং বিশ্বের।

এখানে একটা কথা আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে স্মরণ রাখতে হবে। আমাদের দেশ সেই পূর্ববঙ্গ আজকের পূর্ব পাকিস্তান; মুক্ত মুসলমানের স্বাধীন আবাস ভূমি; কিন্তু দেশের মাটী সেই পূর্বেরই, প্রকৃতি তাও সেই পুরাতন; এখানকার মুসলমানের চেহারায় এদেশের প্রকৃতিগত ছাপ আমৃত্যু সংরক্ষিত। সুতরাং আমাদের অন্তর ও বহির্জীবনের উপর রাষ্ট্রগত প্রভাব আনতে হ’লে এদেশের মানুষগুলোর দিকে চেয়েই তা আনতে হবে, নইলে শেষটায় আমরা মুসলমান তথা মানুষ গড়তে গিয়ে বানর না গড়ে ফেলি সে আশঙ্কাও আছে। বিপদ আমাদের কম নয়।

এ বিপদ থেকে একমাত্র আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যই আমাদেরকে রক্ষা করতে পারে। আমরা পাকিস্তানবাসী অথচ পূর্ব পাকিস্তানের; এই বৈশিষ্ট্যের উপরে যদি আমাদের সাহিত্য গড়ে ওঠে তবে আশা হয় আমরা মরবো না; এবং কারুর দাসেও পরিণত হব না, বরং নিখিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ণ সমৃদ্ধিতে আমাদের যথোপযুক্ত দাবী নিয়েই বিশ্বের দরবারে হাজির হ’তে পারবো। এপথে এগুতে হ’লে আমাদের সাহিত্যের ভাষা বাংলাই রাখতে হবে; সেখানে প্রয়োজনাতিরিক্ত আমূল পরিবর্তনের জন্য বাহির কি ভেতর থেকে কোন জবরদস্তি চলবেনা। একথা অবশ্য ঐতিহাসিক সত্য যে প্রত্যেক জাতির ভাষা ও সাহিত্যে নানা কারণে যুগে যুগে নানা পরিবর্তন দেখা গেছে, কিন্তু সে পরিবর্তন দশ পাঁচ বছরে সম্ভব হয়নি; ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই যে পরিবর্তন উদ্ভব হয়েছে খুব কম করে হলেও শতাব্দী কালের কম সময়ে জাতীয় জীবন ও সাহিত্যে সে পরিবর্তন হাড়ে মাংসে সঞ্চারিত হয়নি।

পূর্ব পাকিস্তানের নব্য মুসলিম বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করতে গিয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালী হিন্দুদের কথা। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও মানবতার আদর্শে দীক্ষিত হ’য়ে অফুরন্ত সৃষ্টি প্রেরণা নিয়ে বাঙালী হিন্দু সেদিন যে বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টি করেছে, হিন্দু পটভূমিকায় রচিত হলেও তা হয়েছে বাংলার ও বাঙালী সাহিত্য। পাকিস্তান মুসলমানের আশা ও ভরসার ঠাঁই, তার জীবনের বিচরণ ভূমি, মরনের বিশ্রামস্থল। যে মুক্ত জীবন কল্পনা মুসলমানকে পাকিস্তান রচনায় দুরন্ত উন্মত্ত ক’রে তুলেছিল, প্রতিচীর নবতন আলোকে সৃষ্টি পাগল উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালী হিন্দুর মতোই মুক্তি পাগল আজকের এই বাঙালী মুসলমান জাতিও তেমনি তার বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করবে। পাকিস্তান আন্দোলনের সমসাময়িক কাল থেকেই তার শুভ সূচনা হয়েছে।

এ প্রয়োগ পরীক্ষার পথ ধরে আশা আছে আমাদের সাহিত্যেও ইসলামি ভাবধারার সঙ্গে যথারীতি ও গভীর পরিচয়সম্পন্ন বাঙালী ইকবাল কি মুসলমান রবীন্দ্রনাথ, শরৎ ও তারাশঙ্করের শুভাগমন হবে। এ দিক দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কোন সমস্যা নেই। সমস্যা যা, তা আমাদেরই। ভাষায় ও বর্ণমালায় বাংলা বর্জন করে উর্দু গ্রহণ করলে সে সমস্যার সমাধান হবেনা। রাজভাষা ইংরেজি বরণ ও চর্চ্চা করে উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালী হিন্দু যেমন বাংলা সাহিত্যে তার সৃষ্টির আনন্দ ধ’রে রেখেছে, ইসলামী ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত [ও আমাদের নব সাহিত্য সৃষ্টির জন্য আজকের রাষ্ট্রভাষা] উর্দুকেও আমাদের সেই ভাবে গ্রহণ করতে হবে; তার এক চুল বেশী হ’লেই প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে অনুকরণ করেও আমরা দাঁড়াতে পারবোনা, স্বীয় স্বাতন্ত্র্যের মহিমায় তো নয়ই। ইতিহাস তার প্রমাণ। এ বাস্তব সত্যকে যে অবহেলা বা অস্বীকার করে, অপঘাতে সে জাতির মৃত্যু হয়। অতি আগ্রহ ও উগ্রতাও তখন তাকে বাঁচায় না।

যেমন ক’রেই হোক জীবনের আঘাতে জীবন জেগে ওঠে। হীরা মালিনীর ভাঙা মালঞ্চে একদিন যেমন সুন্দরের অতর্কিত আগমনে তা ফুলে ফলে ও সমৃদ্ধি-সৌরভে ভরে উঠেছিল, তেমনি পাকিস্তানের সোনার কাঠির স্পর্শে বাঙালী মুসলমানের ঘুমন্ত অন্তরপুরীতে দোলা লেগেছে; সৃষ্টি প্রেরণায় সে আজ মশগুল। আজ তার ভুল করলে চলবে না। সে যে বাঙলার মানুষ। সুতরাং তার মুসলমানত্ব ও বাঙালীত্ব, তার পাকিস্তান ও পূর্ব বাঙলা— এই বৈশিষ্ট্যের উপরেই তার সাহিত্য তাকে রচনা করতে হবে। 


[নোট: ২৬ নভেম্বর  ছিল বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান ধ্বনিবিজ্ঞানী, ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের জন্মবার্ষিকী। আবদুল হাইয়ের এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘দিলরুবা’ নামক একটি পত্রিকায়। পরে ১৯৫৪ সালে তাঁর ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি’ নামক প্রবন্ধগ্রন্থে এটি সংকলিত হয়। আবদুল হাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে সামান্য সম্পাদনাসহ ‘আখড়া’র পাঠকদের জন্য লেখাটি প্রস্তুত করেছে আখড়া টিম।]

Administrator 29 নভেম্বর, 2025
Share this post
Tags
Sign in to leave a comment