এই নিরক্ষর কবিগণ সরল বাঙ্গালা কথায় উদ্দীপনার ছন্দে তাঁহাদের গাতি গাহিয়া গিয়াছেন। এই সকল গানে কতকগুলি উর্দ্দু শব্দ আছে, তাহাতে আমাদের আপত্তি করিবার কোন কারণ নাই। গত পাঁচ-ছয় শত বৎসরের মধ্যে বাঙ্গালা ভাষাটা হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই হইয়া গিয়াছে। মুসলমানদের ধর্ম্মশাস্ত্র ও সামাজিক আদর্শ অনেকটা আর্বি ও পার্সি সাহিত্যে লিপিবদ্ধ, সেই সাহিত্যের জ্ঞান তাঁহাদের নিত্যকর্ম্মের জন্য অপরিহার্য্য। আমাদের যেরূপ সংস্কৃতের সহিত সম্বন্ধ, আর্বি ও পার্সির সঙ্গে তাঁহাদেরও কতকটা তাই। তাহা ছাড়া মুসলমান এ পর্য্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, সুতরাং নানা কারণে, বাঙ্গালা প্রাকৃতের সঙ্গে কতকটা উর্দ্দুর সংস্রব ঘটিয়াছে।
মুসলমান আমাদের প্রতিবাসী, আমাদিগের কিছুতেই তাহাদিগকে এড়াইয়া যাওয়া সম্ভবপর নহে। এইজন্য ভারতের অব্যবহিত পশ্চিমদেশের ভাষা বাঙ্গালা ভাষার সঙ্গে কতক পরিমাণে মিশিয়া গিয়াছে এবং তাহা আমাদের নিত্যকথিত ভাষার অঙ্গীয় হইয়া উঠিয়াছে। এই মিশ্রভাষা আমাদের চাষার কুটীরে, এমন কি হিন্দুর অন্তঃপুরে পর্য্যন্ত ঢুকিয়াছে। বাঙ্গালার অভিধান হইতে এখন আর তাহা বাদ দেওয়া চলে না।
কিন্তু হিন্দু লেখকগণ মুখে যে সকল কথা কহিয়া থাকেন, সংস্কৃতের ঘোর প্রভাবের বশবর্তী হইয়া লিখিবার সময় সেগুলি অন্যরূপ করিয়া ফেলেন। শতবার কথিত ও শ্রুত ‘খাজনা’ তাঁহাদের লেখনীতে ‘রাজস্ব’রূপে পরিণত হয়— চিরপরিচিত ‘ইজ্জৎ’ ‘সম্মান’ হইয়া দাঁড়ায়। এইভাবে ‘জবরদস্তি’ ‘বলপ্রয়োগে’, ‘দুস্তি’ ‘বান্ধবতায়’, ‘জমি’ ‘মৃত্তিকায়’, ‘আসমান ‘আকাশে’ এবং আরও শত শত নিত্যকথিত বিদেশী শব্দ, যাহাদের অস্থিমজ্জা বাঙ্গালার জলবায়ুতে দেশীয় রূপ ধারণ করিয়াছে, তাহারা লিখিত সাহিত্যে সংস্কৃত আগন্তুকের নিকট নিজেদের স্থান ছাড়িয়া দিতে বাধ্য হইয়া থাকে। এক সময়ে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতগণ অতিকায় সংস্কৃত শব্দ বাঙ্গালা সাহিত্যে আমদানী করিয়া এই ভাষার পর্ণ কুটীরটিকে ঐরাবতশালায় পরিণত করিয়া হাস্যাস্পদ হইয়া পড়িয়াছিলেন। সেই ভাবে আর্বি-পার্সির পণ্ডিতগণ উক্ত দুই ভাষার অপর্য্যাপ্ত ও অবৈধ শব্দ প্রয়োগ দ্বারা এখনও মুসলমানী বাঙ্গালা নামক একটা উদ্ভট সামগ্রীর সৃষ্টি করিতেছেন।
বস্তুতঃ মুসলমানী বাঙ্গালা ও পণ্ডিতী বাঙ্গালা, ইহাদের কোনটাই বাঙ্গালার স্বরূপ নহে, উহারা আমাদের ভাষার বিদ্রূপ ও একান্ত পরিহার্য্য। ভাষা জিনিষটা পণ্ডিত বা মোল্লার হাতের মোরব্বা নহে। দেশের জলবায়ু ও আলোকে ইহা পুষ্ট হইয়া থাকে। ইহা স্বীয় জীবন্ত গতির পথে, ইচ্ছাক্রমে বর্জন ও গ্রহণ করিয়া চলিয়া যায়, স্বীয় ললাটলিপিতে কোন শিক্ষকের ছাপ মারিয়া পরিচিত হইতে চায় না।
মৈমনসিংহ-গীতিকায় আমরা বাঙ্গালা ভাষার স্বরূপটি পাইতেছি। বহুশতাব্দীকাল পাশাপাশি বাস করার ফলে হিন্দু ও মুসলমানের ভাষা এক সাধারণ সম্পত্তি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহা সমস্ত বঙ্গবাসীর ভাষা। এক্ষেত্রে জাতিভেদ নাই। এই মৈমনসিংহ-গীতিকায় উর্দ্দু উপাদান ততটা ঢুকিয়াছে, যতটা প্রকৃত পক্ষে এদেশে আসিয়া বাঙ্গালা হইয়া গিয়াছে। এই গীতিসাহিত্য হিন্দু-মুসলমান উভয়ের, এখানে পণ্ডিতগণের রক্তচক্ষে শাসাইবার কিছু নাই। লেখকদের মধ্যে হিন্দুও যতটি মুসলমানও ততটি। এই সাহিত্যে আবার হিন্দু নায়ক, মুসলমান নায়িকা এবং মুসলমান নায়ক ও হিন্দু নায়িকা পাইতেছি। প্রকৃত ঘটনা কবিরা যাহা শুনিয়াছেন, তাহাই অনেক সময়ে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। হিন্দুর ঘরে স্বাধীন প্রেম-চর্চ্চার সুযোগের অভাব অনুভব করিয়া বঙ্কিমচন্দ্র মুসলমানী আয়েষার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাহা মুসলমান-বিদ্বেষের ফল নহে। ইংরাজী উপাখ্যানের পূর্ব্বরাগ বাঙ্গালা সাহিত্যে আমদানী করিতেই হইবে, সুতরাং এক দিকে সমস্ত সমাজবন্ধন-বিচ্যুতা কপালকুণ্ডলারূপ অভূতপূর্ব্ব চরিত্র পরিকল্পিত হইয়াছে, অন্য দিকে মুসলমান সমাজ হইতে আয়েষাকে সংগ্রহ করিয়া লেখকের প্রাণের কামনা মিটাইতে হইয়াছে। বঙ্কিমবাবু নিজের সুবিধার জন্য সাহিত্যে এই চরিত্রগুলি সৃষ্টি করিয়াছিলেন।
মুসলমানেরা কিন্তু জাতিগত বিদ্বেষের চিহ্ন বলিয়া এই ব্যাপারটা ধরিয়া লইয়াছেন। এটি মোটেই তাহাদের ভাল লাগে নাই। আজকাল অনেক মুসলমান লেখক বঙ্কিমবাবুর এই কার্য্যের প্রতিশোধ লইতে গিয়া হিন্দু রমণীকে মুসলমান নায়কের অনুরাগিণী করিয়া দেখাইতেছেন। কিন্তু মৈমনসিংহের গীতিকায়, সেইরূপ আড়াআড়ির ভাব, বা জাতীয় বিদ্বেষের চিহ্নমাত্র দেখিতে পাই না। মুসলমান কবি কালিদাস গজদানী এবং মমিনা খাতুনের প্রেম অকুণ্ঠিতভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, পার্শ্বেই আবার ঈশাখাঁর প্রতি অনুরক্তা কেদার রায়ের ভগিনীর চিত্রটি আছে। আর-একটি গাথায় ব্রাহ্মণ জয়চন্দ্র এক মুসলমানীর প্রেমে পড়িয়াছেন ও অপর-একটিতে সুরৎজমাল ও ব্রাহ্মণ রাজকন্যা অধুয়ার প্রেমপ্রসঙ্গ আছে। এই সকল পালাগানের শ্রোতা হিন্দু-মুসলমান উভয়েই। হৃদয়ের কোমল বৃত্তিগুলির উপর যে দেবতা হাসিয়া খেলিয়া ফুলশর সন্ধান করিয়া থাকেন, তিনি হিন্দুর পরিকল্পিত হইলেও আদবেই জাতিভেদ স্বীকার করেন না। এই গাথাগুলিতে জাতীয় বিদ্বেষের কণিকামাত্র নাই, সত্য ঘটনা স্বকীয় গৌরবের বেদীর উপর দাঁড়াইয়া শ্রোতার অনুরাগ আকর্ষণ করিতেছে।
হিন্দু ও মুসলমান যে বহুশতাব্দীকাল পরস্পরের সহিত প্রীতির সম্পর্কে আবদ্ধ হইয়া বাস করিতেছিলেন, এই গীতিগুলিতে তাহার অকাট্য প্রমাণ আছে। দেওয়ান সাহেবদের অত্যাচারের কথা অনেক স্থলেই পাওয়া যাইবে, কিন্তু তাহা ‘মুসলমানী অত্যাচার’ বলিয়া অভিহিত করা অন্যায় হইবে। এই অত্যাচার দুর্ব্বলের উপর প্রবলের অত্যাচার, ব্যভিচারীর ব্যভিচার,— ইহার জন্য কোন রাষ্ট্রীয় নাম দেওয়া যায় না, ইহা হিন্দু-মুসলমানের ধর্ম্ম বা জাতিঘটিত কোন ঘটনা নহে। এক দিকে দেওয়ান জাহাঙ্গীর যেরূপ মলুয়ার উপর অত্যাচার করিতেছেন, তেমনি বিচার না করিয়াই মুসলমান কাজীকে শূলে চড়াইয়া দিতেছেন। এক দিকে দেওয়ান ভাবনা সোনাইকে জোর করিয়া লইয়া যাইতেছেন, অপর দিকে সোনাইয়ের মাতুল ব্রাহ্মণকুলগৌরব ভাটুক ঠাকুর তাঁহাকে সাহায্য করিতেছেন। এক দিকে যেরূপ অত্যাচারী কাজী, দেওয়ান জাহাঙ্গীর, দেওয়ান ভাবনা,— অপর দিকে তেমনি বিশ্বাসঘাতক অত্যাচারী পরস্ত্রীলিপ্সু হিন্দুকুলতিলক হীরণসাধু ও মগাধিপতি রাংচাপুরের আবু রাজার নির্ম্মম মূর্ত্তি আমরা দেখিতে পাই।
বস্তুতঃ সে যুগে প্রবলের অত্যাচার সর্ব্বত্রই ছিল। যদি রাজা ভাল হইতেন, তবে প্রজার সুখের সীমা থাকিত না। সোণার ভাটা লইয়া রাইয়তের ছেলেরা খেলিতে থাকিত, কলার পাতা বেচিয়া লোকে পাকা বাড়ী তুলিত, ঘাস-বেচা লোকে হাতী কিনিতে সাধ করিত, লোকে ধনকড়ি যেখানে সেখানে শুকাইতে দিত, ধনরত্ন পথে ফেলিয়া রাখিলেও চোরদস্যুর উপদ্রব থাকিত না। আবার রাজা কি মন্ত্রী অত্যাচারী হইলে রাইয়তেরা তাহাদের বলীবর্দ্দ, লাঙ্গল-জোয়াল এবং ফাল বিক্রয় করিয়াও ত্রাণ পাইত না, অতিরিক্ত খাজনার দায়ে দুধের ছেলেকে বিক্রয় করিত। বানিয়াচঙ্গের অত্যাচারী দেওয়ান দুলালের কারাগৃহ হইতে সিংহলরাজ্যের কারাগার অল্প ক্রূর বলিয়া বর্ণিত হয় নাই।
সুতরাং এই দুর্ব্বলের উৎপীড়ন ইতিহাসবিশ্রুত সনাতন ঘটনা, হিন্দু বা মুসলমানের নামাঙ্কিত করিয়া ইহা জাতিবিদ্বেষ উস্কাইয়া দেওয়ার উপলক্ষ করা উচিত নহে। মুসলমান রাজত্বে মুসলমানের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বেশী ছিল, এইজন্য হয়ত অত্যাচারীর সংখ্যা তাহাদের মধ্যে বেশী ছিল,— কিন্তু সে দোষ ক্ষমতার কোন শ্রেণীবিশেষের নহে। বিজয় গুপ্তের পদ্মা-পুরাণে দেখিতে পাওয়া যায়, এক দিকে অত্যাচারী মুসলমান ব্রাহ্মণের কণ্ঠ হইতে পৈতা কাড়িয়া লইয়া তাহার মুখে থু থু দিতেছে, অপর দিকে হিন্দু গোপের মুসলমান কাজীর দাড়ি উপড়াইয়া তাহার মুখে ছাগের রক্ত মাখিয়া দিতেছে, সুতরাং কেহই কম নহে।
বাঙ্গালা ভাষাটা প্রাকৃতের রূপভেদ। কিন্তু টোলের পণ্ডিতেরা এই ভাষায় অপর্য্যাপ্ত সংস্কৃত শব্দ আনয়ন করিয়া ইহার শ্রী বদ্লাইয়া দিয়াছেন; এইজন্য কাহারও কাহারও মনে হইতে পারে, বাঙ্গালা ভাষা সংস্কৃত হইতে উদ্ভূত হইয়াছে। সংস্কৃত যুগের পূর্ব্ব সাহিত্য, বিশেষ এই গীতিকাগুলি, পাঠ করিলে যে ভুল ঘুচিয়া যাইবে। খাঁটি বাঙ্গালা যে প্রাকৃতের কত নিকট ও সংস্কৃত হইতে কত দূরবর্ত্তী তাহা স্পষ্টভাবে হৃদয়ঙ্গম হইবে। এই সকল গাথায় ‘হস্তী’ (হাতী) শব্দ ‘আত্তি’, ‘বর্ষা’ শব্দ ‘বাস্যা’, ‘শ্রাবণ’ শব্দ ‘শাওন’, ‘মিষ্ট’ শব্দ ‘মিডা’, ‘শিকার’ শব্দ ‘শিগার’ প্রভৃতি প্রাকৃত ভাবেই সর্বদা ব্যবহৃত হইয়াছে। এখনও চাষারা এই ভাষায় পাড়াগাঁয়ে কথা কহিয়া থাকে। পণ্ডিত মহাশয়ের টোলে ঘুরিয়া আমাদের মাথা ঘোলাইয়া গিয়াছে; আমরা অভিধানের সাহায্যে প্রাকৃতশব্দ সংশোধনপূর্বক সেই সংশোধিত ভাষাটাকেই বাঙ্গালা ভাষা বলিয়া পরিচয় দিতেছি। এই সংশোধন-কার্য ভারতচন্দ্র এমন কৌশলের সঙ্গে চালাইয়াছিলেন যে, তাঁহার রচিত কয়েকটি বাঙ্গালা স্তোত্র নাগরী অক্ষরে লিখিলে তাহা নিছক সংস্কৃত বলিয়া গৃহীত হইতে পারে।
নোট: ২০ নভেম্বর বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, ‘বৃহৎ বঙ্গ’র আবিষ্কারক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মী শ্রী দীনেশচন্দ্র সেনের মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তার এই গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি ‘আখড়া’র পাঠকদের জন্য প্রচার করা হলো। লেখাটি দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র ভূমিকা অংশ থেকে সংগৃহীত।
গাথাসাহিত্যে উর্দ্দু প্রভাব—হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে প্রীতির ভাব