Skip to Content

পপুলিজম নিয়ে সাতটি থিসিস

জন-ওয়ার্নার মুলার
24 নভেম্বর, 2025 by
Akhra Desk
| No comments yet

১. ‘পপুলিজম’ (জনতুষ্টিবাদ) আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো খাঁটি উপাদান নয়, আবার এটি বিচারবোধহীন নাগরিকদের কারণে সৃষ্ট কোনো বিকারও নয়। বরং এটি প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির এক স্থায়ী ছায়া। যে কোনো সময় যে কেউ ‘সাচ্চা জনতা’র তরফে কথা বলে ক্ষমতাসীন এলিটদের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে— এই সম্ভাবনাই পপুলিজমকে টিকিয়ে রাখে। প্রাচীন এথেন্সে পপুলিজম ছিল না; সেখানে ডেমাগগি (জননেতাগিরি) ছিল হয়তো, কিন্তু পপুলিজম না; কারণ পপুলিজম কেবল প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেই জন্ম নিতে পারে। পপুলিস্টরা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিরোধী না; তারা শুধু দাবি করে যে, তারাই (জনগণের) একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি— অন্য কেউ নয়।

২. যারা এলিটদের সমালোচনা করে, তারা সবাই পপুলিস্ট না। এলিটবিরোধী হওয়ার পাশাপাশি পপুলিস্টরা বহুত্ববাদেরও বিরোধী— তারা দাবি করে যে জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার একমাত্র তাদেরই। অন্য সব রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মূলত অবৈধ; এবং যারা তাদের (পপুলিস্টদের) সমর্থন করে না, তারা আদতে পুরোপুরি জনগণের অংশও না। বিরোধী অবস্থানে থাকলে পপুলিস্টরা অবধারিতভাবে জোর দিয়ে বলে যে: এলিটরা অনৈতিক, আর জনগণ হলো একটি নৈতিক, অভিন্ন সত্তা— যাদের ইচ্ছা কখনও ভুল হতে পারে না।

৩. প্রায়শই মনে হতে পারে যে, পপুলিস্টরা জনতার ইচ্ছায় নির্ধারিত ‘সামগ্রিক কল্যাণ’র প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলছে। কিন্তু নজর চোখা করলে বোঝা যায়— গণ-অভিপ্রায় গঠনের কোনো আন্তরিক প্রক্রিয়া কিংবা সাধারণ জ্ঞান দিয়ে বোঝা যায় এমন কোনো সামগ্রিক কল্যাণ নিয়ে পপুলিস্টরা খুব একটা ভাবে না। তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘সাচ্চা জনতা’র একটি প্রতীকী রূপ নির্মাণ; তারপর সেই নির্মিত রূপের ভিত্তিতে, ‘সঠিক’ নীতিগুলো ব্যাখ্যা করে বের করে আনা। এর ফলে পপুলিস্টদের রাজনৈতিক অবস্থানকে বাস্তব প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। তারা সবসময় ‘সাচ্চা জনতা’ বা ‘সাইলেন্ট মেজরিটি’ নামক ধারণাগুলোকে নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং ভোটের আনুষ্ঠানিক ফলাফলের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

৪. পপুলিস্টরা প্রায়ই গণভোটের দাবি তুললেও, এটা আসলে নাগরিকদের মধ্যে গণতান্ত্রিক অভিপ্রায়-গঠনের কোনো উন্মুক্ত প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নয়। পপুলিস্টরা কেবলমাত্র এটুকু নিশ্চিত হতে চায় যে, যা তারা আগেই ‘সাধারণ জনতা’র ইচ্ছা বলে নির্ধারণ করে রেখেছে, গণভোট যেন সেটাকেই পুনরায় বৈধতা দেয়। পপুলিজম রাজনীতিকে আরো বেশি অংশগ্রহণমূলক করে তোলার কোনো পথ নয়।

৫. পপুলিস্টরা শাসন করতে পারে। “জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার বৈধ অধিকার একমাত্র আমাদেরই”— তারা সাধারণত নিজেদের এই মৌলিক বিশ্বাসের সাথে মিল রেখেই শাসন করে। বাস্তবে এর অর্থ হলো— তারা রাষ্ট্রযন্ত্র দখলে নেওয়ার চেষ্টা করবে, ব্যাপক ক্লায়েন্টেলিজম (রাজনৈতিক সমর্থন/ভোটের বিনিময়ে সেবা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া) ও দুর্নীতিতে লিপ্ত হবে, এবং সমালোচনামুখর নাগরিক সমাজের মতো যেকোনো কিছুকেই দমন করবে। পপুলিস্টদের রাজনৈতিক কল্পনায় এসব কার্যকলাপের স্পষ্ট নৈতিক যৌক্তিকতা থাকে— তাই তারা এগুলো প্রকাশ্যে স্বীকারও করতে পারে। পপুলিস্টরা সংবিধানও লিখতে পারে; তবে সেই সংবিধান হবে দলীয় বা ‘একচেটিয়া’— যা কথিত আদি ও আসল গণের আকাঙ্ক্ষা ও অভিপ্রায়কে চিরস্থায়ী করার নামে পপুলিস্টদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য তৈরি। এরা কোনো না কোনো পর্যায়ে গুরুতর সাংবিধানিক সংকট ডেকে আনতে পারে।

৬. পপুলিস্টরা গণতন্ত্রের জন্য বাস্তবিক অর্থেই বিপজ্জনক (শুধু ‘লিবারালিজম’র জন্য নয়); আর এই মৌলিক বৈশিষ্ট্যগত কারণেই তাদের সমালোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্কে যুক্ত হওয়া যাবে না। পপুলিস্টদের সঙ্গে কথা বলা আর পপুলিস্টদের মতো কথা বলা এক না। তারা যে সমস্যাগুলো তুলে ধরে, সেগুলোকে তাদের ফ্রেমিং মোতাবেক গ্রহণ না করেও, অন্যভাবে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

৭. পপুলিজম লিবারেল ডেমোক্রেসির কোনো প্রগতিশীল সংশোধনী না। পপুলিজম রাজনীতিকে ‘জনতার কাছাকাছি আনা’ বা জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করা— এ ধরনের কিছু করে না, যেমনটা মাঝেমধ্যে দাবি করা হয়। তবে পপুলিজম একটি জিনিস স্পষ্ট করতে সাহায্য করে: সমাজের কিছু অংশ সত্যিই প্রতিনিধিত্বহীন থাকে (প্রতিনিধিত্বের এই অভাব যেকোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট, পরিচয়-সংশ্লিষ্ট, অথবা দুটোই হতে পারে)। কিন্তু তাতে পপুলিস্টদের এই দাবি ন্যায়সঙ্গত হয় না যে, তাদের সমর্থকরাই ‘সাচ্চা জনতা’ এবং তারাই একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি।

সুতরাং, পপুলিজমের কারণে লিবারেল ডেমোক্রেসির রক্ষকদের আরও গভীরভাবে ভাবতে পারা উচিত— বর্তমান প্রতিনিধিত্বের ব্যর্থতাগুলো আসলে কী। একই সঙ্গে তাদের আরও বৃহত্তর নৈতিক প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানো উচিত: রাষ্ট্র-সমাজে অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড কী? বহুত্ববাদকে সংরক্ষণ করা ঠিক কেন জরুরি? আর পপুলিস্ট ভোটারদেরকে হতাশা, ক্ষোভ বা অপমানবোধে তাড়িত ‘বিকারগ্রস্ত কেস’ না ভেবে, মুক্ত ও সম-অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে, তাদের উদ্বেগগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়?

নোট: Jan-Werner Müller-এর What is Populism? বইয়ের (২০১৭, University of Pennsylvania Press) উপসংহার থেকে ‘পপুলিজম বিষয়ক সাতটি থিসিস’ শিরোনামের এই লেখাটি নেওয়া হয়েছে। এআইয়ের সহায়তায় লেখাটি অনুবাদ করেছে আখড়া টিম।

Akhra Desk 24 নভেম্বর, 2025
Share this post
Tags
Sign in to leave a comment