আজ আমরা বুলডোজারকে একটি উপকারী নির্মাণযন্ত্র হিসেবে দেখি, কিন্তু এই নামটি এসেছে সহিংস ভোটারদমন-নীতির একটি প্রাথমিক রূপ থেকে।
Bulldozer শব্দটি দেখলে আপনার মনে হয়তো ভেসে ওঠে বড় হলুদ রঙের একটা মেশিন —ক্যাটারপিলার-চাকা, সামনে স্টিলের দাঁতালো ব্লেড, সামনে যা পায় সব সমান করে চলে যায়। অথবা হয়তো মনে পড়ে এই বিশাল যান্ত্রিক দানবের টঙ্কা কোম্পানির ছোট্ট খেলনা সংস্করণটি। আবার সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে ভাবলে হয়তো কোনো শান্ত গবাদিপশুর দৃশ্যও মনে আসতে পারে— ফার্দিনান্দ দ্য বুল যেন ডেইজি ফুলের মাঝে বসে তন্দ্রায় ডুবছে।(১)
তাহলে bulldozer শব্দটির ভয়াবহ ও সহিংস উৎসের কথা জানলে ঠিক কতটা ধাক্কা লাগবে, ভাবুন তো!
Bulldozer (প্রথমে বানান ছিল bulldoser) শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৮৭৬ সালের নির্বাচনের আগমুহূর্তে। সেটিই ছিল প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস. গ্রান্টের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ বছর, এবং তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে তৃতীয়বার প্রার্থী হতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর জায়গায় রিপাবলিকান পার্টি সমর্থন দেয় ওহাইওর গভর্নর ও সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি রাদারফোর্ড বি. হেইসকে; ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী ছিলেন নিউইয়র্কের গভর্নর স্যামুয়েল টিলডেন।
এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। ততদিনে সব কনফেডারেট অঙ্গরাজ্যই আবার ইউনিয়নে ফিরে এসেছে, গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন চলছিল, এবং এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আফ্রিকান-আমেরিকান পুরুষরা ইউলিসিস এস. গ্রান্ট ছাড়া অন্য কাউকে ভোট দিতে পারছিলেন। ১৮৭৬ সালের নির্বাচনের ফল দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বহু বছরের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
দক্ষিণের সাবেক দাসমালিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিষয়টি জানত; এবং তারা বসে বসে দেখতে রাজি ছিল না যে, উত্তর ও তাদের সাবেক ক্রীতদাসেরা এসে তাদের ক্ষমতা-প্রভাব দখল করে নেবে। ১৮৭০ এবং ’৭১ সালে পাস হওয়া তিনটি ফেডারেল আইন আফ্রিকান-আমেরিকানদের ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা ও জবরদস্তি থেকে রক্ষার কথা বললেও, অনেককে bulldosed করে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। Bulldose ছিল এক ধরনের স্ল্যাং, যা এসেছে “a dose fit for a bull” বা “a dose of the bull” (অর্থাৎ চাবুকের আঘাত)–থেকে। Bulldosers–রা কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ওপর শারীরিক সহিংসতা চালাত— তাদের ভোট দিতে না যেতে বাধ্য করতে অথবা ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য ভয় দেখাতে।
নির্বাচনের আগে পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে— আলাবামা, ফ্লোরিডা, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি ও সাউথ ক্যারোলাইনা— নিবন্ধিত ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিলেন আফ্রিকান-আমেরিকান। সুষ্ঠু ভোট হলে, রিপাবলিকান প্রার্থী সহজেই এসব রাজ্যে জিতবেন—এই প্রত্যাশাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ভোটগণনার শেষে দেখা গেল, আলাবামা ও মিসিসিপিতে পপুলার ভোটে জিতেছেন টিলডেন।
অন্য তিন রাজ্যের ফল ছিল আরও নাটকীয়। গণনা শেষে দুই দলই দাবি করে তারা জিতেছে। নির্বাচনের রাতে টিলডেনকে বিজয়ী ধরে নেওয়া হয়— তার ইলেকটোরাল ভোট ১৮৪, হেইসের চেয়ে ১৯ বেশি, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে মাত্র ১ ভোট দূরে। এই রাজ্যগুলোর (ওরেগন-সহ) ২০টি ইলেকটোরাল ভোট কয়েক মাস ধরে ঝুলে থাকে— প্রথমে দুই দল, পরে কংগ্রেসের দুই কক্ষ আলাদা তদন্ত শুরু করে। ডেমোক্র্যাটরা ও তাদের নিয়ন্ত্রিত হাউস কমিটি রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ব্যালট ভরাট ও জবরদস্তির অভিযোগ তোলে। রিপাবলিকানরাও ঠিক একই অভিযোগ আনে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটির নিষ্পত্তি হয় রুদ্ধদ্বার বৈঠকের মাধ্যমে; যা পরে “১৮৭৭ সালের সমঝোতা” (Compromise of 1877) নামে পরিচিতি পায়। ডেমোক্র্যাটরা বাকি ইলেকটোরাল ভোটগুলো রিপাবলিকানদের দিতে রাজি হয়, ফলে রাদারফোর্ড হেইস হন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯তম রাষ্ট্রপতি; কিন্তু এর বিনিময়ে দক্ষিণ থেকে ফেডারেল সেনা প্রত্যাহার করা হয়— ফলে পুনর্গঠন-পর্বের কার্যত সমাপ্তি ঘটে এবং ক্ষমতা আবার ফিরে যায় সেইসব লোকদের হাতে, যারা গৃহযুদ্ধের সময় দক্ষিণ শাসন করত।
ভোটকেন্দ্রে সহিংস ভয়-ভীতি প্রদর্শন চালু থাকে; পাশাপাশি দক্ষিণের কর্মকর্তারা কৃষ্ণাঙ্গ ভোট দমনের নতুন নতুন ব্যবস্থা নেয়— যেমন: জিম ক্রো আইন এবং গ্রান্ডফাদার ক্লজ।(২) সময়ের সাথে bulldosing শব্দটি “বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তি করে বাধ্য করা”— এই বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে; এবং যখন বিশাল, প্রায় অপ্রতিরোধ্য মেশিনটি আবির্ভূত হয়, তখন শব্দটি আক্ষরিক অর্থেও ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
আমরা যেটিকে আজ bulldozer নামে চিনি, সেই যন্ত্রটি উদ্ভাবিত হয় ১৯২০–এর দশকের শুরুর দিকে। আর মহামন্দার (Great Depression) প্রথম মাসগুলোর মধ্যেই বিভিন্ন লেখাপত্রে bulldozer শব্দটি দেখা যেতে শুরু করে— Z অক্ষরটি শব্দটির উৎপত্তিকে আরও আড়াল করে দেয়। Bulldozer শব্দটির সহিংস ও বর্ণবাদী উৎসের কারণেই এখন অনেকে এই বিশালাকায় যন্ত্রগুলোকে earth mover (মাটি সরানোর যন্ত্র) বলতে পছন্দ করেন।
টীকা:
(১) ফার্দিনান্দ দ্য বুল শিশুদের জন্য লেখা বিখ্যাত একটি গল্প, The Story of Ferdinand-এর একটি চরিত্র। ফার্দিনান্দ একটি কোমল, শান্ত স্বভাবের ষাঁড়, যে লড়াই করতে চায় না, বরং ফুলের গন্ধ নিতে ভালোবাসে।
(২) কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকারসহ অন্যান্য অধিকার হরণের জন্য দুটি দমনমূলক রাষ্ট্রীয় নীতি।
নোটস: লেখাটি ৮ অক্টোবর ২০২০ তারিখে ‘দ্য স্যাটারডে ইভিনিং পোস্ট’-এ প্রকাশিত হয়। এআই’র সহায়তায় লেখাটি অনুবাদ করেছে আখড়া টিম।
‘বুলডোজার’ শব্দটির বর্ণবাদী উৎস