ইসলামি চিন্তাধারা অনুসারে, ইতিহাসদর্শন এক ধরণের ঐতিহাসিক নিয়তিবাদ (Historical Determinism)-এর উপর ভিত্তি করে গঠিত। ইতিহাস এক নিরবিচ্ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহ যা, মানুষের মতোই, এক দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্য (Dialectical Contradiction) দিয়ে প্রভাবিত— সৃষ্টির শুরু থেকে বিদ্যমান দুটি বৈরী ও পরস্পরবিরোধী উপাদানের মধ্যে এ এক নিরন্তর যুদ্ধ, যা সর্বকালে সব জায়গায় সংঘটিত হয়েছে এবং যার সমষ্টিই হলো ইতিহাস।
সময়ের নির্ধারিত পথে মানবজাতির যে গতিপ্রবাহ, তাই ইতিহাস; এবং মানবজাতি নিজেই এক ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড (Microcosm), অস্তিত্বের সবচেয়ে নিখুঁত অভিব্যক্তি, সৃষ্টির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ। মানবজাতির বিকাশের প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি নিজেই আত্মচৈতন্য লাভ করে; এবং মানুষ যেমন অগ্রসর হয়, প্রকৃতিও তেমনি জীবন্ত, সচেতন ও সজাগ হয়ে পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়।
অন্যভাবে বলতে গেলে, মানুষ হলো খোদার অভিব্যক্তির প্রকাশ, যা সকল সত্তার পরম অভিব্যক্তি ও চৈতন্য; এবং নৃতত্ত্ব (Anthropology) অনুসারে, মানুষ পৃথিবীতে খোদার প্রতিনিধি, ভূ-পৃষ্ঠে তার খলিফা। মানুষের ইতিহাস, যা মানুষের ‘মানুষ’ হয়ে ওঠা এবং তার সারসত্তা গঠনের দলিল, তা তাই আকস্মিক এমন কোনো ব্যাপার হতে পারে না, যা সামান্য কিছু ঘটনা দিয়ে নির্মিত, হঠকারীদের খেলার বস্তু, জঘন্য, বৃথা, লক্ষ্যহীন এবং অর্থহীন।
বিশ্বের অন্যান্য বাস্তবতার মতো ইতিহাসও নিঃসন্দেহে একটি বাস্তবতা। এটি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে শুরু হয়েছিল এবং অনিবার্যভাবে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে শেষ হবে। এর অবশ্যই একটি লক্ষ্য এবং একটি গতিপথ থাকবে।
এর শুরুটা কোথায় হয়েছিল? মানুষের মতোই, বৈপরীত্যের সূচনালগ্নে!
নৃতত্ত্ব সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, মানুষ মাটি ও ঐশ্বরিক আত্মার এক যৌগ; যা আদমের গল্প থেকে স্পষ্ট।(১) আদমের গল্পই হলো, আক্ষরিক ও দার্শনিক অর্থে মানুষ বলতে যা বোঝায়, সেই মানুষের গল্প। আদমের মধ্যে আত্মা ও মাটি, খোদা ও শয়তানের যে সংগ্রাম, সেখান থেকেই মানুষের শুরু। কিন্তু ইতিহাস কোথায় শুরু হয়? এর সূচনাবিন্দু কী?— কাবিল ও হাবিলের দ্বন্দ্ব।
আদমের দুই পুত্রই ছিল মানুষ, মানবিক ও স্বাভাবিক, কিন্তু তারা একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিল। একজন অন্যজনকে হত্যা করেছিল এবং মানবজাতির ইতিহাস শুরু হয়েছিল। আদমের যুদ্ধ ছিল একটি আত্মগত (Subjective), অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ— যা তার নিজের সারসত্তার মধ্যে (বা সামগ্রিকভাবে মানবজাতির মধ্যে) সংঘটিত হয়েছিল; কিন্তু তার দুই পুত্রের যুদ্ধ ছিল একটি নৈর্ব্যক্তিক (Objective) যুদ্ধ যা বাইরের জীবনে ঘটেছিল। অতএব, কাবিল ও হাবিলের গল্প হলো আমাদের ইতিহাসদর্শনের উৎস, ঠিক যেমন আদমের গল্প আমাদের মানবদর্শনের উৎস। কাবিল ও হাবিলের যুদ্ধ হলো দুটি বিরোধী পক্ষের যুদ্ধ, যা ইতিহাসের পুরোটা জুড়ে এক ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব (Historical Dialectic) আকারে বিদ্যমান। তাই, ইতিহাসও, মানুষের মতোই, এক দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় গঠিত। বৈপরীত্যের শুরুটা হয় কাবিলকর্তৃক হাবিলকে হত্যার মধ্য দিয়ে।
এখন হাবিল, আমার মতে, পশুপালন-ভিত্তিক অর্থনীতির যুগ, তথা ব্যক্তিগত মালিকানা-পূর্ব আদিম সমাজতান্ত্রিক যুগের প্রতিনিধিত্ব করে; অন্যদিকে কাবিল প্রতিনিধিত্ব করে কৃষিব্যবস্থার, এবং ব্যক্তিগত বা একচেটিয়া মালিকানার। এরপর এক স্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে সমগ্র ইতিহাসের হত্যাকারী কাবিল ও তার শিকার হাবিলের, অর্থাৎ শাসক ও শাসিতের মধ্যে সংগ্রামের মঞ্চ হয়ে ওঠে। পশুপালক হাবিলকে ভূমি-মালিক কাবিল হত্যা করল; উৎপাদনের উৎসের যৌথ মালিকানার সময়কাল— পশুপালন, শিকার এবং মাছ ধরার যুগ—, ভ্রাতৃত্ব ও প্রকৃত বিশ্বাসের চেতনার সমাপ্তি ঘটল; এবং এসবের স্থান দখল করল কৃষি ও ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা, সাথে ধর্মীয় প্রতারণা আর অন্যের অধিকার লঙ্ঘন। হাবিল অদৃশ্য হয়ে গেল এবং কাবিল ইতিহাসের সম্মুখভাগে এসে দাঁড়ালো; এবং সেখানে সে এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
যে সূত্র ধরে আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা হল, যখন আদম তার পুত্রদের বিরোধ (কাবিল তার ভাইয়ের সুন্দরী বাগদত্তার প্রেমে পড়েছিল) নিষ্পত্তি করার জন্য খোদার দরবারে প্রত্যেককে একটি করে বলি উৎসর্গ করার প্রস্তাব দেন, তখন কাবিল বেদীতে এক মুঠো শুকনো হলুদ ভুট্টা রাখে, আর হাবিল নিয়ে আসে একটি অল্পবয়সী ও মূল্যবান লালচুলের উট। অতএব, আমি পরেরটাকে পশুপালনের এবং আগেরটাকে কৃষির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করেছি। ইতিহাস আমাদের বলে যে পশুপালনের যুগে— যা মাছ ধরা এবং শিকারেরও যুগ ছিল—, প্রকৃতি ছিল সমস্ত উৎপাদনের উৎস (এবং গল্পে উট এই উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে)। বন, সমুদ্র, মরুভূমি ও নদী— এই সম্পদগুলি পুরো গোত্রের ব্যবহারের জন্ম উন্মুক্ত ছিল এবং উৎপাদনের সরঞ্জাম ছিল প্রধানত মানুষের হাত ও বাহু। এর পাশাপাশি তাদের অন্য কিছু সাধারণ সরঞ্জাম থাকলেও, সেগুলি ছিল এমন জিনিশ— যে কেউ এগুলোর কারিগর ও মালিক হতে পারত।
উৎপাদনের উৎস (জল এবং জমি) বা উৎপাদনের সরঞ্জাম (গরু, লাঙ্গল ইত্যাদি)— এসবের একচেটিয়া বা ব্যক্তিগত মালিকানা বলতে কিছু ছিল না। সবকিছু সমানভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। সমাজের নীতি ও আদর্শ, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, নৈতিক বাধ্যবাধকতা পূরণে অবিচলতা, সম্মিলিত জীবনের সীমাবদ্ধতার প্রতি পরিপূর্ণ অলঙ্ঘনীয় আনুগত্য, সহজাত পবিত্রতা ও ধর্মীয় চৈতন্যের অকৃত্রিমতা, প্রেম ও সহনশীলতার একটি শান্ত মানসিকতা— এগুলি ছিল সেই উৎপাদন ব্যবস্থায় মানুষের কিছু নৈতিক বৈশিষ্ট্য এবং আমরা হাবিলকে তাদের প্রতিনিধি ভাবতে পারি।
কৃষির সংস্পর্শে আসার পর মানুষের জীবন, সমাজ এবং সম্পূর্ণ গাঠনিক সত্তা এক গভীর বিপ্লবের মুখোমুখি হলো, যা আমার মতে, ইতিহাসের সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব। এটি এমন একটি বিপ্লব, যা এক নতুন মানুষ, এক শক্তিশালী ও শয়তান মানুষের জন্ম দিয়েছিল; জন্ম দিয়েছিল সভ্যতা ও বৈষম্যভিত্তিক যুগব্যবস্থার।
কৃষিব্যবস্থার ফলে প্রকৃতিতে বিদ্যমান উৎপাদনের উৎসগুলির সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। কৃষিব্যবস্থার ফলে উন্নত উৎপাদন সরঞ্জাম ও জটিল উৎপাদন সম্পর্কগুলির উদ্ভব ঘটে; এবং যেহেতু বন ও সমুদ্রের মতো আবাদি জমিন সকলে অবাধে ও উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারত না, তাই মানুষের জীবনে প্রথমবারের মতো প্রকৃতির একটি অংশ নিজেরা দখল করার এবং অন্যদের তা থেকে বঞ্চিত করার— এক কথায়, ব্যক্তিগত মালিকানার— প্রয়োজন দেখা দিল।
এর আগে মানবসমাজে ‘ব্যক্তি’র কোনো অস্তিত্ব ছিল না; গোত্র নিজেই ছিল ‘ব্যক্তি’। কিন্তু এখন কৃষির উদ্ভবের সাথে সাথে সেই একক সমাজ, যেখানে সমস্ত মানুষ একই পরিবারের ভাইদের মতো মিলেমিশে থাকত, তা বিভক্ত হয়ে গেল। যেদিন প্রথম কোনো ভূমি— যা সবাই মিলে ব্যবহার করত—, প্রকৃতি থেকে কেড়ে নিয়ে, অন্য সবার অধিকার অস্বীকার করে, এক ব্যক্তির একক অধিকারে পরিণত করা হলো— সেদিন আইন, ধর্ম বা উত্তরাধিকার নামের কোনো প্রতিষ্ঠানই ছিল না; পুরোটাই ছিল স্রেফ শক্তিপ্রদর্শনের ব্যাপার। যাযাবর বা পশুপালনভিত্তিক মালিকানাব্যবস্থায় গোষ্ঠীর শক্তিশালী সদস্যদের শক্তি গোষ্ঠীকে রক্ষা করত এবং তার সামাজিক মর্যাদা বাড়াত, কিংবা শিকার-মৎস্য আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নিশ্চিত করতে সাহায্য করত— অর্থাৎ এ শক্তি গোষ্ঠীর স্বার্থেই উভয় ভূমিকা পালন করত। কিন্তু পরে সেই শক্তিই অধিকার নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তিতে পরিণত হলো— ব্যক্তিগত ভোগের মাপকাঠি এবং ব্যক্তিমালিকানা অর্জনের প্রধান শর্তে পরিণত হলো। ইতিহাসের এই সংকটময় মুহূর্তে মার্কসের তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত সত্যটি দেখা গেল: মালিকানা ক্ষমতা অর্জনের প্রধান উপাদান নয়, বরং তার উল্টো— ক্ষমতা ও জবরদস্তিই প্রথমে ব্যক্তিকে মালিকানা প্রদান করেছিল। ক্ষমতা ব্যক্তিগত মালিকানা সৃষ্টি করল, আর সেই ব্যক্তিমালিকানাই পরে ক্ষমতার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করল এবং একে ‘আইনসিদ্ধ’ ও ‘স্বাভাবিক’ ব্যাপার হিসেবে শক্তিশালী করে তুলল।
ব্যক্তিমালিকানা একসময়ের ঐক্যবদ্ধ সমাজকে দ্বিখণ্ডিত করে দিল। যখন স্বোপার্জন ও ব্যক্তিগত দখল স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হলো, তখন কেউ আর নিজের প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সংযমী হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাইলো না। যেকোনো ক্ষেত্রে, নিজের প্রয়োজনের পরিমাণ নির্ধারণও তখন সম্পূর্ণ ব্যক্তির নিজস্ব বিষয় হয়ে গেল। ফলে মানুষ আর বাধ্য হয়ে সম্পদ অর্জন করত না— ইচ্ছা হলেই করত। অথচ এর বিপরীতে, আগের ব্যবস্থায়— হাবিলের ব্যবস্থা বা সমবায় মালিকানাপ্রথায়— মানুষ শিকার করত এবং মাছ ধরত কেবল নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য।
প্রকৃতি— স্বাধীন, উদার, অকৃপণ— সবসময়ই ছিল তাদের হাতের কাছে। শ্রম ছিল কেবল প্রয়োজন মেটানোর একটি উপায়; আর যে উৎপাদনে যত বেশি দক্ষ ছিল, সে তত বেশি অর্জন করত। কিন্তু এখন প্রকৃতির সেই উন্মুক্ত ও প্রাচুর্যপূর্ণ বিস্তার— তার অরণ্য ও সাগর— পিছনে পড়ে রইল; আর মানুষ ভিড় জমালো কৃষিজমি থেকে পাওয়া দারিদ্র্যপীড়িত ও করুণ আহারের চারপাশে। লোভ ও অধিগ্রহণের বাসনায় তারা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলো। এই নতুন সামাজিক ব্যবস্থায় ঈগল ও শকুন— কাবিলের গল্পের কাকদের মতো— দুর্বল পাখিদের ডানা ভেঙে তাদের তাড়িয়ে দিল। আগে সমাজ ছিল অভিবাসী পাখির ঝাঁকের মতো— মরুভূমি, নদীর তীর, মহাসাগরের উপকূল ধরে একই সুরে ও সমন্বয়ে চলাফেরা করত সবাই। কিন্তু এখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির পচাগলা মৃতদেহের জন্য, একচেটিয়া দখলের আকাঙ্ক্ষায়, পাখিরা— পারস্পরিক হিংস্র ঘৃণায় পূর্ণ— এক অপরকে ঠোকর মারছে, নখ বসাচ্ছে।(২)
শেষ পর্যন্ত, যে মানবসমাজ একসময় ভরে ছিল স্বাধীনতা, শান্তি, প্রশান্তি ও জীবনীশক্তিতে, তা রূপ নিল দুই পরস্পর-বিরোধী ও সংঘর্ষরত শিবিরে। একদিকে ছিল এক সংখ্যালঘু শ্রেণি, যাদের প্রয়োজনের চেয়ে, এমনকি নিজেদের চাষের সামর্থ্যের চেয়েও, বেশি জমি ছিল; আর তাই তাদের দরকার পড়ল অন্যদের শ্রমের। অপরদিকে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ, যাদের ছিল শুধু ক্ষুধা আর কাজ করার শক্তি, কিন্তু ছিল না জমি বা কোনো উৎপাদনের উপকরণ। নতুন সামাজিক ব্যবস্থায় এই সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিণতি ছিল স্পষ্ট— দাসত্ব। যে শ্রেণি দাসত্বে পতিত হলো তাদের কিছুই ছিল না— না জমি, না পানি, না সম্মান, না বংশপরিচয়, না নৈতিকতা, না মর্যাদা, না চিন্তাশক্তি, না শিল্প, না জ্ঞান, না মূল্যবোধ, না অধিকার, না সত্য, না আত্মা, না অর্থবোধ, না শিক্ষা— সংক্ষেপে বললে, ইহকাল বা পরকাল— কিছুই তাদের ছিল না।
যেসব জিনিশ থেকে তারা বঞ্চিত হলো, সেগুলো সবই নির্ভরশীল ছিল জমি ও মাটির ওপর— বাগান ও ক্ষেতের ফলনের ওপর। তাই এগুলো হয়ে গেল উৎপাদনের উৎস (শুধু বস্তুগত নয়, অবস্তুগত ক্ষেত্রেও) যে শ্রেণির হাতে ছিল, তাদের একচেটিয়া সম্পদ। যে শ্রেণি নিছক কায়িক পরিশ্রমে বাধ্য ছিল না, তারাই পেল শিক্ষা, বিমূর্ত সংস্কৃতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও শিল্পচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ ও পুঁজি।
এ দুই বিরোধী শ্রেণি একসময় একই সমাজে বাস করত— একই আত্মা, একই অনুভূতি, একই সম্মানবোধ ও আত্মর্যাদাবোধে উজ্জীবিত সেই সম্মিলিত গোত্রীয় চেতনায়। তারা একসাথে খালি হাতে প্রবেশ করত বনে-জঙ্গলে, একসঙ্গে যেত মহাসাগরের দিকে। প্রকৃতির সম্পদ— যেমন, তাদের চারদিকে থাকা বাতাস, যা তারা একসঙ্গে বুকভরে টেনে নিত, কিংবা তাদের ঘিরে থাকা দৃশ্যপট, যা তারা একসঙ্গে উপভোগ করত— সবই ছিল উভয় গোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত, গোটা গোত্রের জন্য উন্মুক্ত। তারা ছিল সমান, আর তাই তারা ছিল ভাই-ভাই। তারা ছিল আদমের দুই সন্তান, আর আদম ছিলেন মাটির তৈরী। কিন্তু এখন— ব্যক্তিগত সম্পত্তির পচাগলা লাশের কারণে— তারা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ও শত্রুভাবাপন্ন হয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, আর তাদের মধ্যে প্রধান হয়ে উঠেছে শত্রুতা।
রক্তসম্পর্কের বন্ধন বদলে গেল দাসত্বের শৃঙ্খলে; সমতা বলি হয়ে গেল বৈষম্যের কাছে, আর ভ্রাতৃত্ব বলি হয়ে গেল ভ্রাতৃঘাতের কাছে। ধর্ম হয়ে গেল প্রতারণার উপায় এবং বস্তুগত ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার— আর কিছু নয়। মানবিকতা, সমন্বয়, করুণা— এসবের জায়গা নিল ঘৃণা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সম্পদের পূজা, অধিগ্রহণের লালসা, একচেটিয়া দখলের বাসনা, প্রতারণা, জবরদস্তি, নিপীড়ন, আত্মপূজা, নিষ্ঠুরতা, হত্যাপ্রবণতা, সীমালঙ্ঘন, আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা, শ্রেষ্ঠত্বের দাবি, বিশেষ সুবিধা তৈরী, মানুষের প্রতি অবজ্ঞা, দুর্বলকে হত্যা, সম্পত্তির জন্য সবকিছুকে ও সবাইকে পিষ্ট করে এগিয়ে যাওয়া, ভাইকে হত্যা করা, পিতাকে যন্ত্রণা দেওয়া— এমনকি খোদার সাথেও প্রতারণা করা।
ফলে আমরা গভীরভাবে বুঝতে পারি দুই ধরণের মানবিক রূপের মধ্যে বিরোধকে— হাবিল, যে ছিল ঈমানদার, শান্তিপ্রিয় ও আত্মোৎসর্গী; এবং কাবিল, যে ছিল কামনার উপাসক, সীমালঙ্ঘনকারী ও ভ্রাতৃহন্তা। তাদের পরিবেশ, পেশা ও শ্রেণিকে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক ও সমাজতাত্ত্বিক পরীক্ষার ভিত্তিতে বিচার করলে এই বিরোধের ব্যাখ্যা আরও স্পষ্ট হয়।
আমরা জানি, তাদের দুজনের অনেক কিছুতেই মিল ছিল— জাত, পিতা-মাতা, লালন-পালন, পরিবার, পরিবেশ ও ধর্ম। সেই প্রাথমিক পরিবেশে, আমরা ধরে নিতে পারি যে মানবসমাজ তখনও পরিপূর্ণরূপে গঠিত হয়নি, এবং ভিন্ন ভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ, বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক আবহ বা পৃথক সামাজিক গোষ্ঠীগুলো তখনও সৃষ্টি হয়নি। তাই আমরা বলতে পারি না যে, দুই ভাই ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় বা শিক্ষাগত প্রভাবের অধীনে বেড়ে উঠেছিল— (তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ) অন্তত এত বিপরীত ছিল না যে, তারা একে অপরের পুরোপুরি বিপরীত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে, এবং প্রত্যেকে একেকটি বিশেষ মানবিক রূপের প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে।
বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক উভয় পদ্ধতিই দাবি করে যে দুটি ঘটনা— সবদিক থেকে একরকম হয়েও— যদি ভিন্ন বা পরস্পরবিরোধী গতিপথে বিকশিত হয়, তবে আমাদের উচিত দুটি ঘটনার প্রত্যেকটিকে প্রভাবিত করে এমন সমস্ত কারণ, উপাদান ও শর্তের তালিকা তৈরি করা। এরপর আমরা এদের মধ্যে যা যা মিল আছে তা বাদ দিয়ে, যে উপাদান বা উপাদানসমূহ এদের মধ্যে বৈপরীত্য সৃষ্টি করে, তা নির্ণয় করতে পারব। কাবিল ও হাবিলের গল্পে যে একমাত্র উপাদানটি দুই ভাইকে আলাদা করে, সেটি হলো তাদের ভিন্ন ভিন্ন পেশা। এই ভিন্ন পেশাই তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানে দাঁড় করায়; তাদের কাজের ধরন, উৎপাদনের গঠন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও ছিল পরস্পরবিরোধী।
আমাদের তত্ত্ব স্পষ্টভাবে সমর্থিত হয় এই সত্যের মাধ্যমে যে, একদিকে হাবিলের চরিত্রের ধরন এবং আদিম সমাজতন্ত্রের যুগে— মুক্ত পশুপালন, শিকার ও মৎস্য আহরণের অর্থনীতিতে— মানুষের শ্রেণিচেতনা ও সামাজিক আচরণের মধ্যে সঠিক সামঞ্জস্য আছে; অন্যদিকে কাবিলের চরিত্রের ধরন ও শ্রেণিভিত্তিক সমাজ, দাসব্যবস্থা ও প্রভুমনোবৃত্তির যুগে মানুষের সামাজিক ও শ্রেণিগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।
কিন্তু কুরআনের মুফাসসির ও অন্যান্য ধর্মীয় পণ্ডিতরা কাবিল-হাবিলের এই ঘটনার ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, (খোদার তরফ থেকে ওহি হিসেবে) এই ঘটনা নাজিলের কারণ হলো ‘হত্যার প্রতি নিন্দাজ্ঞাপন’। এটা খুবই ভাসাভাসা ব্যাখ্যা— এই ব্যাখ্যা বিষয়টিকে অতিরিক্ত সরলীকৃত করে। আমার তত্ত্ব যদি সঠিক না-ও হয়, তবুও দুই ভাইয়ের এই গল্পের অর্থ ও উদ্দেশ্য এত সামান্য হতে পারে না। আব্রাহামীয় ধর্মসমূহ, বিশেষত ইসলাম, এই ঘটনাকে মানবজীবনের সূচনালগ্নে সংঘটিত এক গুরুতর ঘটনারূপে উপস্থাপন করেছে। ‘হত্যা খারাপ কাজ’— (কাবিল-হাবিলের ঘটনার মাধ্যমে) কেবল এই সহজ নৈতিক উপসংহার টানাই ধর্মগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য— এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। গল্পের অন্তর্নিহিত অর্থ যাই হোক, তা নিশ্চয়ই এত সাদাসিধে নৈতিক শিক্ষা নয়, যে— ‘এখন স্পষ্ট হলো: হত্যা একটি মন্দ কাজ, তাই আমাদের এটি পরিহার করতে হবে, বিশেষত ভাইদের ক্ষেত্রে।’
আমার মতে, কাবিলের হাতে হাবিলের হত্যা মানব ইতিহাসে এক বিশাল পরিবর্তন, ইতিহাসের গতিপথে এক আকস্মিক বাঁক— সমগ্র মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। এই ঘটনা বৈজ্ঞানিক, সমাজতাত্ত্বিক ও শ্রেণিভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরতম ব্যাখ্যা বহন করে।
গল্পটির বিষয় হলো আদিম সাম্যবাদ বা প্রাথমিক সমবায় সমাজের অবসান— মানবের সেই প্রাকৃতিক সমতা ও ভ্রাতৃত্বমূলক ব্যবস্থার বিলুপ্তি, যা শিকার ও মৎস্য আহরণের উৎপাদনব্যবস্থায় (হাবিল যার প্রতীক) বিকশিত হয়েছিল; এবং এর বদলে কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, ব্যক্তিমালিকানার সৃষ্টি, প্রথম শ্রেণিভিত্তিক সমাজের উদ্ভব, বৈষম্য ও শোষণমূলক ব্যবস্থা, সম্পদের উপাসনা ও প্রকৃত ঈমানের অনুপস্থিতি, শত্রুতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, লোভ, লুণ্ঠন, দাসত্ব ও ভ্রাতৃহত্যার সূচনা (কাবিল যার প্রতীক)। হাবিলের মৃত্যু এবং কাবিলের টিকে থাকা একটি বাস্তব, বস্তুনিষ্ঠ, ঐতিহাসিক সত্য। ধর্ম, জীবন, অর্থনীতি, সরকার ও মানব-নিয়তি এরপর থেকে কাবিলের হাতেই ন্যস্ত হলো— এটি ইতিহাসে যা ঘটেছে তার বাস্তবসম্মত, পর্যালোচনামূলক ও প্রগতিশীল বিশ্লেষণ। একইভাবে, হাবিল বংশবিস্তার না করেই মারা গেছে এবং আজ সমগ্র মানবজাতি কাবিলের বংশধর— এ কথার অর্থ হলো কাবিলের সমাজব্যবস্থা, সরকার, ধর্ম, নৈতিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণই মানবসমাজে সর্বজনীন হয়ে গেছে। ফলে প্রতিটি যুগ ও সমাজে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বৈষম্য দেখা যায়, তা এই ঐতিহাসিক সত্য থেকেই উৎসারিত।
কাবিল ও হাবিলের গল্পটি দেখায় যে, এই পৃথিবীতে আদমসন্তানদের জীবনের প্রথম দিনটি (তাদের নিজ নিজ বোনকে বিয়ে করার দিন) ছিল একইসাথে বিরোধ, সংঘর্ষ, এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ ও ভ্রাতৃহত্যার সূচনারও দিন। ঘটনাটি এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে নিশ্চিত করে যে, জীবন, সমাজ ও ইতিহাসের ভিত্তি হলো বিরোধ ও সংগ্রাম; এবং ভাববাদীদের ধারণার বিপরীতে এই তিনটি জিনিশের মূল নির্ণায়ক হলো অর্থনীতি ও যৌনতা— যেগুলো ধর্মীয় বিশ্বাস, ভ্রাতৃত্ব, সত্য ও নৈতিকতার ওপর প্রাধান্য পায়।
কাবিল ও হাবিলের মধ্যে বিরোধের উৎস ছিল নিম্নরূপ: কাবিল হাবিলের জন্য নির্ধারিত বোনটিকে নিজের বাগদত্তার চেয়ে বেশি পছন্দ করত। সে জোরাজুরি করে সেই বোনকে পেতে চাইলো এবং আদমের (আ.) সম্মতিতে সম্পাদিত বাগদান বাতিল করার দাবি জানালো। দুই ভাই আদমের (আ.) সামনে এলে আদম (আ.) প্রস্তাব দিলেন যে তারা দু’জনে একটি করে কোরবানি পেশ করবে। যার কোরবানি গ্রহণ করা হবে, সে বোনটিকে পাবে এবং অপরজন ফলাফল মেনে নেবে।
কাবিল ধোঁকাবাজি করল; তার ধূর্ততা কাজে লাগিয়ে শুকিয়ে যাওয়া কিছু ভুট্টা কোরবানি হিসেবে নিয়ে এলো; স্বাভাবিকভাবেই তা গ্রহণ করা হলো না। (দেখুন, কাবিল যখনই প্রয়োজন বোধ করে তখনই প্রতারণা করে— এমনকি খোদার সঙ্গেও! ‘কাবিলিয় ব্যবস্থা’র প্রত্যেকটা প্রতিনিধি ঠিক এই আচরণই করে।) আবারও কাবিল প্রতারণার আশ্রয় নিল, এবং খোদার বাণীর তুলনায় নিজের কামনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঘৃণ্যভাবে হত্যা করল হাবিলকে— যে কিনা মূল অভিযোগকারীও ছিল না, কাবিলের কোনো কিছুই চাইত না, এবং খোদার নামে নিজের সেরা উট, তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, কোরবানি হিসেবে উৎসর্গ করেছিল— যা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করা হয়েছিল।
হাবিলের মৃত্যুমুহূর্তে দুই ভাইয়ের মধ্যে যে সংলাপ ঘটে তাও শিক্ষণীয়। কাবিল তাকে হত্যার হুমকি দেয়, কিন্তু হাবিল শান্ত, কোমল ও বিনয়ীভাবে উত্তর দেয়: “কিন্তু আমি তোমার বিরুদ্ধে হাত তুলব না।” এইভাবে হাবিলের প্রতিনিধিত্বশীল সমাজ ও ব্যবস্থা আক্রমণাত্মক ও অধিগ্রহণলিপ্সু কাবিলের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি; কাবিলের ব্যবস্থা তাকে নিঃশঙ্কভাবে বশীভূত করে ফেলেছে।
কাবিল-হাবিলের গল্প বিবেচনা করতে গিয়ে প্রথমে আমার মনে হলো, এখানে কি যৌনতার প্রশ্নটিকে অর্থনীতির চেয়ে শক্তিশালী ও প্রাথমিক কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে? এই ক্ষেত্রে কি ফ্রয়েড ঠিক ছিলেন? কারণ বিরোধের প্রথম শব্দ তো ছিল ‘নারী’— যেমন তাদের পিতা আদমের ক্ষেত্রে সবকিছুর সূচনাবিন্দু ছিল হাওয়া।
কিন্তু আরও গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, বিষয়টি এত সরল নয়। এটা সত্য যে বিরোধের প্রথম উৎস ছিল হাবিলের জন্য নির্ধারিত বোনটির প্রতি কাবিলের আকর্ষণ— এ পর্যায়ে ফ্রয়েডকে ঠিকই মনে হয়। কিন্তু যদি ফ্রয়েড যৌনতার (যাকে তিনি প্রাথমিক ও মৌলিক কারণ ভাবেন) আগে আরও এক বা একাধিক কারণ ও উপাদানের অস্তিত্ব মেনে নিতেন, তাহলে তাকেও স্বীকার করতে হতো যে— এই গল্প যৌন উপাদানের প্রাধান্যের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ যৌনতার প্রশ্ন ওঠার আগেই আরেকটি প্রশ্ন বিবেচনা করতে হবে: এটুকু সত্যি যে, কাবিল এই বিবাদ শুরু করেছিল তার বাগদত্তার প্রতি আকর্ষণের কারণেই, কিন্তু দুই ভাইয়ের মধ্যে কেবল কাবিলই কেন এমন আচরণ করল? যেহেতু তারা দু’জন একই বংশগত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, একই পরিবেশে বড় হওয়া, তাই স্বাভাবিকভাবে তাদের আচরণও একইরকম হওয়ার কথা ছিল— একই দৃঢ়তা ও সংযম প্রদর্শন করার কথা ছিল দুজনেরই।
তথাপি যদি বৈজ্ঞানিকভাবে এটা সম্ভবপর হয়েও থাকে যে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেবল এক ভাই-ই এমন আচরণ করবে— তাহলেও প্রশ্ন জাগে: সেই ভাইটি কেন কাবিলকেই হতে হল? আর তৃতীয় আরেকটি বিষয় হলো, গল্পের টেক্সট, দুই ভাইয়ের সংলাপ ও আচরণের ধরণ, এবং গল্পের বর্ণনাকারীর (অর্থাৎ কুরআন, খ্রিস্টীয় ও বিশেষত জ্যুইশ ধর্মীয় গ্রন্থ, ব্যাখ্যাগ্রন্থ, ইতিহাস ও ইসলামি লোককথার) দৃষ্টিভঙ্গি— এ সব বিশ্লেষণ করলে যে সাধারণ উপসংহার পাওয়া যায় তা হলো: হাবিলকে ভালো চরিত্রের নমুনা হিসেবে, আর কাবিলকে দুষ্ট চরিত্রের নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি ‘চরিত্র’ (Character) নয়, ‘নমুনা’ (Type) শব্দটি ব্যবহার করছি; কারণ ‘চরিত্র’ বললে বোঝাবে, ব্যক্তি কাবিলের মধ্যে কেবল দুষ্ট বৈশিষ্ট্য, যেমন: কামনা ও বস্তুবাদ আছে; আর ব্যক্তি হাবিলের মধ্যে আছে কেবল শুভ বৈশিষ্ট্য, যেমন: ধর্মনিষ্ঠা ও সংবেদনশীলতা। কিন্তু না, (মূল ব্যাপারটি এমন যে) এক ভাই হলো দুষ্ট মানুষের পূর্ণ প্রকাশ, আর অন্য ভাই হলো শুভ মানুষের পূর্ণ প্রকাশ।
অতএব আমি এই উপসংহারে পৌঁছেছি যে, হাবিল একজন সুস্থ মনের মানুষ; একটি অমানবিক ও ভারসাম্যহীন সামাজিক ব্যবস্থা, কাজের ধরন এবং অর্থনৈতিক জীবন তাকে বিচ্ছিন্ন, বিকৃত, বিকারগ্রস্ত বা পঙ্কিল করতে পারে নাই; এগুলো তাকে খর্ব, ত্রুটিপূর্ণ, মার্কুজের ভাষায় ‘চিড় ধরা’ (fractured), দূষিত এবং বিবিধ জটিলতায় ভারাক্রান্ত কোনো মানুষে পরিণত করে নাই। তিনি একই সঙ্গে পিতার প্রতি ভালোবাসা, ভাইয়ের প্রতি স্নেহ, খোদায় বিশ্বাস এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়তায় পরিপূর্ণ ছিলেন; এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য তার ভাই কাবিলের মতো কামাসক্ত জিদ ধরে থাকেন নি। আবার সৌন্দর্যের প্রতি তিনি একেবারেই উদাসীন বা নিরপেক্ষ ছিলেন, তা কিন্তু না। কারণ কাবিলের দেওয়া নানা কষ্ট— এমনকি মৃত্যুর হুমকি— সত্ত্বেও হাবিল একবারও সাধুর বৈরাগ্য নিয়ে বলেন নি, “ভাই, আমি তাকে (মেয়েটিকে) ছেড়ে দিচ্ছি। সে তর্কাতর্কির যোগ্য না; নাও, সে তোমার।”
হাবিল একজন মানুষ, একজন ‘আদমসন্তান’, এর বেশি বা কম কিছু না। এই গল্পের সব টেক্সট তাকে এভাবেই উপস্থাপন করেছে। আমার মতে এর কারণ হলো, সে এমন সমাজে বাস করত যেখানে বিরোধ বা বৈষম্য ছিল না; তার কাজ ছিল স্বাধীন এবং বাধাহীন— “সে উটের ওপর চড়ে বসা কেউ ছিল না, গাধার মতো বোঝা টানা কেউ ছিল না; দাসদের প্রভু ছিল না, রাজা বা রাজসেবকের দাসও ছিল না।”(৩) তিনি শুধু একজন মানুষ ছিলেন— এমন একটি সমাজে, যেখানে সবাই সমানভাবে ভোগ করে এবং জীবনের সমস্ত প্রাচুর্য— সামাজিক সব বস্তুগত ও আত্মিক সম্পদ— সবার যৌথ মালিকানায় থাকে, যেখানে প্রত্যেকে স্বাভাবিকভাবেই সমান ও ভ্রাতৃপ্রতিম হয়, এবং সুস্থতা, সৌন্দর্য, দয়া, পবিত্রতা, সততা, প্রেম ও মানবিকতার চেতনা বিকশিত হয়।
কাবিল সত্তাগতভাবে দুষ্ট নয়। তার ধাত বা সত্তা হাবিলের মতোই, এবং কোনো মানুষই ধাতগতভাবে খারাপ হয় না, কারণ প্রত্যেকের সত্তাই আদমের সত্তার মতো। কাবিলকে খারাপ বানায় এক মানবতাবিরোধী সামাজিক ব্যবস্থা, শ্রেণিভিত্তিক সমাজ, ব্যক্তিমালিকানার শাসনব্যবস্থা, যা দাস ও মনিবের জন্ম দেয় এবং মানুষকে নেকড়ে, শেয়াল বা ভেড়ায় রূপান্তরিত করে। এটি এমন পরিবেশ যেখানে শত্রুতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নিষ্ঠুরতা ও লোভ বিকশিত হয়; উপহাস ও প্রভুত্ব— কিছু মানুষের ক্ষুধা আর অন্যদের অতিভোজ, লোভ, প্রাচুর্য ও প্রতারণা; এমন পরিবেশ যেখানে জীবনদর্শনের ভিত্তি হল লুণ্ঠন, শোষণ, দাসত্ব, ভোগ, অত্যাচার, মিথ্যা ও চাটুকারিতা; যেখানে জীবনের মানে হল দমন করা বা দমনের শিকার হওয়া, স্বার্থপরতা, অভিজাত অহংকার, ধন-সঞ্চয়, চুরি ও জাঁকজমক; যেখানে মানব সম্পর্কের ভিত্তি হল আঘাত দেওয়া বা নেওয়া, শোষণ করা বা শোষিত হওয়া; যেখানে মানবদর্শনের মূলমন্ত্র হল সর্বোচ্চ আনন্দ, সর্বোচ্চ ধন, সর্বোচ্চ কামনা ও সর্বোচ্চ জবরদস্তি; যেখানে সবকিছু ব্যক্তিস্বার্থকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় এবং সবকিছুকে ব্যক্তিস্বার্থের— একটা ঘৃণ্য, স্থূল ও লোভী ব্যক্তিস্বার্থের— বেদীতে উৎসর্গ করা হয়।
এগুলোই কাবিলের— ভালো, দয়ালু, পবিত্র হাবিলের ভাই, আদমের সরাসরি সন্তানের— প্রকৃতি গঠন করে; তাকে এমন এক প্রাণীতে রূপান্তরিত করে, যে মিথ্যা বলার, প্রতারণা করার, সচেতনভাবে তার ধর্মকে কলুষিত করার এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভাইকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত; সবই তার এমন এক যৌন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য, যা কোনো অস্থির বা শক্তিশালী প্রণয়াকাঙ্ক্ষা নয়, বরং সরল ও ক্ষণস্থায়ী কামনা। না, মি. ফ্রয়েড, সে এই সবকিছু শুধুমাত্র তার যৌন প্রবৃত্তি অন্যদের চেয়ে বেশি হওয়ার কারণে করে না; বরং এর কারণ হল (আর এটা খুব সহজেই বোঝা যায়) মানবিক গুণাবলী তার মধ্যে অত্যন্ত দুর্বল, এমনকি যৌন আকাঙ্ক্ষার ক্ষীণতম প্রকাশের চেয়েও কমজোর। যদি ফ্রয়েডের কথা সঠিক হতো, কাবিলের মধ্যে যৌন উপাদান এত শক্তিশালী হতো যে সে নিজের কামনা চরিতার্থ করার জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত থাকত, তাহলে সে-ই ওই মূল্যবান লাল চুলের উটটা কোরবানি হিসেবে উৎসর্গ করত, হাবিল নয়! যদি ফ্রয়েড সঠিক হতেন, আমরা দেখতাম কাবিল তার পিতার কথা শোনামাত্রই মাঠের মধ্যে দৌড়ে দৌড়ে তার সমস্ত ফসল পুড়িয়ে দিচ্ছে।
অথচ আমরা দেখি যে, কাবিল খোদার সন্তুষ্টি অর্জন এবং তার হারানো প্রেম জিততে যা করতে প্রস্তুত, তা হলো এক মুঠো শস্য কোরবানি দেওয়া— যে শস্য আবার হলদেটে ও শুষ্ক।
এত বিস্তারিতভাবে এই গল্পটি বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্য হলো: প্রথমত, এই ধারণাকে খণ্ডন করা যে— গল্পটির উদ্দেশ্য কেবল নৈতিক; কারণ, এর বিষয়বস্তু সামান্য একটা প্রবন্ধের বিষয়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর; এবং দ্বিতীয়ত, এই ব্যাপারটা স্পষ্ট করা যে, এটি কেবল দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধের গল্প নয়। বরং এটি মানব সমাজের দুটি দিক, দুটি উৎপাদনব্যবস্থার গল্প; এটি ইতিহাসের গল্প, সমস্ত যুগে দ্বিখণ্ডিত মানবতার বর্ণনা, এমন একটি যুদ্ধের সূচনা যা আজও শেষ হয়নি।
হাবিল যে পক্ষটির প্রতিনিধি সেটি হলো প্রজা ও নিপীড়িতদের পক্ষ; অর্থাৎ, সেই জনগণের, যারা ইতিহাসজুড়ে কাবিলিয় ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট হত্যাযজ্ঞ ও দাসত্বের শিকার হয়েছে, আর সে ব্যবস্থা হল ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক ব্যবস্থা, যা মানবসমাজে প্রাধান্য লাভ করেছে। কাবিল ও হাবিলের যুদ্ধ হলো ইতিহাসের স্থায়ী যুদ্ধ, যা প্রত্যেক প্রজন্মেই সংঘটিত হয়েছে। শাসক শ্রেণী সবসময় কাবিলের পতাকা উঁচু করে ধরে রেখেছে; অন্যদিকে হাবিলের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা পরবর্তী প্রজন্মগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে তার বংশধরদের কাছ থেকে— এরা সেইসব নিপীড়িত প্রজা, যারা ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও প্রকৃত বিশ্বাসের জন্য লড়েছে এমন এক লড়াই, যা প্রতিটি যুগেই কোনো না কোনোভাব চালু ছিল, আছে। (এ লড়াইয়ে) কাবিলের অস্ত্র ছিল ধর্ম, আর হাবিলের অস্ত্রও ছিল ধর্ম।
ফলে ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্মের যুদ্ধও মানব ইতিহাসের একটি স্থায়ী সত্য। একদিকে আছে শির্কের ধর্ম— খোদার সঙ্গে অন্যকে অংশীদার বানানোর ধর্ম— যা সামাজিক শির্ক ও শ্রেণিবৈষম্যকে ন্যায়সংগত হিসেবে উপস্থাপনের যুক্তি সরবরাহ করে। অন্যদিকে আছে তৌহিদের ধর্ম— খোদার একত্ব— যা সকল শ্রেণি ও জাতির ঐক্যের ন্যায়সংগত যুক্তি সরবরাহ করে। হাবিল ও কাবিলের মধ্যে সংঘটিত ইতিহাসোর্ধ্ব (Trans-Historical) লড়াইটি আসলে তৌহিদ ও শির্কেরও লড়াই; একদিকে ইনসাফ ও মানবিক ঐক্যের আর অন্যদিকে সামাজিক ও জাতিগত বৈষম্যেরও লড়াই। মানব ইতিহাসের পুরোটা সময়জুড়ে একটি লড়াই সর্বদাই জারি ছিল, এবং ইতিহাসের শেষ দিন পর্যন্ত থাকবে— প্রতারণা, অচৈতন্য ও বিদ্যমান অবস্থার ( Status Quo) পক্ষে যুক্তি উৎপাদনের ধর্মের সাথে চৈতন্য, সক্রিয়তা ও বিপ্লবের ধর্মের লড়াই। শেষ সময় তখন আসবে যখন কাবিল মারা যাবে এবং ‘হাবিলের ব্যবস্থা’ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই অনিবার্য বিপ্লবের অর্থ হবে কাবিলের ইতিহাসের সমাপ্তি; সমগ্র বিশ্বে সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং ন্যায় ও সুবিচারের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি ইতিহাসের অনিবার্য গতিপথ। একটি সার্বজনীন বিপ্লব মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে ঘটবে; ইতিহাসের মজলুম শ্রেণিগুলি তাদের প্রতিশোধ নেবে। আল্লাহর এই সুসংবাদ বাস্তবায়িত হবে:
“আর জমিনে যাদেরকে দুর্বল ও মজলুম করে রাখা হয়েছিল, আমার ইচ্ছা হল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করার, তাদেরকে (মানুষের) নেতা ও (জমিনের) উত্তরাধিকারী বানানোর।” (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৫)।
ভবিষ্যতের এই অনিবার্য বিপ্লবটি হবে সেই দ্বান্দ্বিক বিরোধের চূড়ান্ত পরিণতি, যা কাবিল ও হাবিলের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যে সমগ্র মানবসমাজে এখনও বিদ্যমান রয়েছে। ইতিহাসের অনিবার্য ফল হবে ন্যায়বিচার, সমতা ও সত্যের বিজয়।
আমরা যে দুটি পক্ষের (শাসক ও শাসিত) কথা বললাম, তাদের মধ্যে চলমান এই নিত্য সংগ্রামে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করা প্রতিটি যুগের প্রতিটি ব্যক্তির দায়িত্ব, এবং দর্শক হয়ে থাকা উচিত নয়। একরকম ঐতিহাসিক নিয়তিবাদে (Historical Determinism) বিশ্বাসী হয়েও, আমরা ব্যক্তির স্বাধীনতায় এবং তার মানবিক দায়িত্বে বিশ্বাস করি, যা ঐতিহাসিক নিয়তিবাদী প্রক্রিয়ার একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করে। আমরা এই দু’য়ের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখি না, কারণ ইতিহাস একটি সার্বজনীন এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রদর্শনযোগ্য নিয়তিবাদের প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই অগ্রসর হয়; কিন্তু একজন একক মানুষ হিসেবে ‘আমি’কে অবশ্যই বেছে নিতে হবে যে, আমি জ্ঞান ও বিজ্ঞানের শক্তি দিয়ে ইতিহাসের সঙ্গে এগিয়ে যাব এবং এর নির্ধারিত গতিকে ত্বরান্বিত করব, নাকি ইতিহাসের সামনে অজ্ঞতা, অহমিকা, ও সুবিধাবাদের সঙ্গে দাঁড়াব এবং পিষ্ট হব।
টীকা:
(১) এই লেকচারেরই আরেকটি অংশ, Anthropology: The Creation of Man and the Contradiction of God and Iblis, or Spirit and Clay-র বিষয়বস্তুর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
(২) হাবিলকে হত্যার পর কাবিল তার লাশ কী করবে— এ নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেল। তখন সে দেখতে পেল, একটি কাক ঠোঁট দিয়ে মাটি খুঁড়ে অন্য একটি কাককে দাফন করছে। এটা দেখে কাবিলও তার ভাই হাবিলের লাশ মাটির নিচে দাফন করল। এই লাইনগুলোতে ওই কাকেদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
(৩) শেখ সাদির ‘গুলিস্তাঁ’র একটি লাইন (এই টীকাটি হামিদ আলগারের অনূদিত ইংরেজি টেক্সট থেকে নেওয়া হয়েছে)।
[নোট: তেহরানের হুসাইনিয়্যাহ-ই-ইরশাদ সেন্টারে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ২৭ টি লেকচার দেন আলি শরিয়তি, যা পরে ‘ইসলামশিনাসি’ (Islamology) শিরোনামে তার রচনাসমগ্রে তিন খণ্ডে (১৬, ১৭, ১৮) সংকলিত হয়। এই লেকচারগুলোতে ড. শরিয়তি ইসলামের জ্ঞানগত ঐতিহ্য ও বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ধারণাকে মার্ক্সবাদী ইতিহাসদর্শন, সমাজদর্শন, নৃবিদ্যা, অর্থনীতিবিদ্যা ইত্যাদির আলোকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন, এবং ইসলাম ধর্মের এক ধরনের ঐতিহাসিক নিয়তিবাদ-প্রভাবিত দ্বান্দ্বিক বিপ্লবী বিশ্ববীক্ষা (লিবারেশন থিওলজি) হাজির করেন।
এই লেখাটি মূলত ‘Islamology’ সিরিজেরই একটি লেকচারের অংশবিশেষ, যা আলি শরিয়তি ১৯৭২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হুসাইনিয়্যা সেন্টারে দিয়েছিলেন। পরে এটি তার রচনাসমগ্রের ১৬তম খণ্ডে (Islamology-1) সংকলিত হয়। ১৯৭৯ সালে শরিয়তির কয়েকটি লেকচার ইংরেজিতে অনুবাদ করেন হামিদ আলগার, নাম দেন: On the Sociology of Islam. বইটি বার্কলের মিজান প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। ‘ইতিহাসদর্শন: কাবিল ও হাবিল’ নামক রচনাটির টেক্সট হামিদ আলগারের ইংরেজি অনুবাদ থেকে নেওয়া হয়েছে।]
ইতিহাসদর্শন: কাবিল ও হাবিল