[সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও সম্পাদনা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুলতানা আক্তার লুবনা (জিওগ্রাফি এন্ড এনভায়রনমেন্ট, ২০১৮-১৯ সেশন), ইসমাইল কারজাবি ও শান্ত তালুকদার (গণিত, ২০২৩-২৪ সেশন)]
মোঃ আলামিন। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসের কারো কাছে তিনি আলামিন ভাই, কারো কাছে তিনি ‘সিঙ্গাড়া মামা’, আবার কারো কাছে ‘চাষাভুষার টঙের মামা’। সেই ২৩/২৫ বছর পূর্বে সুনামগঞ্জ থেকে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছিলেন এই এলাকায়। কত শত ঘটনা, কত পটপরিবর্তন, ক্যাম্পাসের কত বিবর্তন তিনি দেখেছেন দূর থেকে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসকদের মতো এই ক্যাম্পাস যেন হয়ে উঠেছে তারও। শিক্ষার্থীরা আসেন, যান, তিনি ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন বহুবছর। ‘সিঙ্গাড়া মামা’র সাথে যেন সবার গড়ে উঠেছে এক ভালোবাসার সম্পর্ক। আলাপে আলাপে উঠে আসে সম্পর্কের এক গহিন দিক। শিক্ষার্থীদের বহু বিপদ-আপদে আলামিন ভাই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রশাসকদের সাথে বহুবার মনকষাকষিও হয়েছে তার। বারবার উচ্ছেদ হয়েছেন। আবার ফিরে এসেছেন। শত প্রতিকূলতা ঠেলে আলামিন ভাইয়ের জীবন যেন এক টিকে থাকার লড়াই। তার টিকে থাকার এই গল্পের ভেতরে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবর্তনও নজরে পড়ে।
আলামিন ভাইকে জিজ্ঞেস করি তার শুরুর দিককার জীবনের কথা—‘কীভাবে জড়িয়ে গেলেন এই ক্যাম্পাসের সাথে?’ আলামিন ভাই শুরু করেন: ‘আমার ২৩ বছর রানিং চলে এই ক্যাম্পাসে। আমি ফার্স্ট ২০০২ সালে, তখন আমার বয়স ৮/সাড়ে ৮ বছর। সুনামগঞ্জ থেকে আরকি, আমার খালারা থাকতেন, খালাতো ভাই টঙের দোকান চালাইতো, সাধ দিতাম, ঐ আরকি। তারপর ২০০৪-এর দিকে ক্যাম্পাসে রিক্সা চালাই, দুই বৎসর। পরে ৬-এর দিকে নিজে দোকান দিলাম, দুই বৎসর নিজে করলাম। পরে দোকানের মালিক বাতিল কইরা দিলো দোকান অন্যজনরে, তারপর ব্যবসা ছাড়া মন টেকেনা। ক্যাম্পাস এমন এক জায়গা, বাড়িতে গিয়াও মন টেকেনা। আমার এমনও দিন গেছে বাড়িত গেছি, আগের দিন সন্ধায় গেছি, পরের দিন ভোর বেলা উঠে চলে আসছি, ভাল্লাগেনা। এমন একটা অবস্থা। এখনও তো, শনিবার সন্ধ্যায় গেসি, কলে কলে রবিবার দিন থাকসি, সোমবার দিন চলে আসছি।’
তাকে জিজ্ঞেস করি, সে সময়ে তার দোকান, টং কেমন ছিল? তিনি বলে যান, ‘এইখানে বি-বিল্ডিং আর লাইব্রেরির মাঝে টং ছিলো। …এরপরে ২০০৬-এ আমি টং দিলাম বর্তমানে রেজাউল মামা যেখানে আছেন, এইখানে ২০০৬-এর থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ছিলাম। এরপর আবার এইখানে থেকে উঠায়া দিলো, এরপর আবার দিলাম ২০১৩ থেকে ইউসি’র সামনে। তখন এরকম টং (টিনের) ছিলো না। উপরে তিরপাল দিয়া ছিলো আরকি। সেই সাইডে ছিলাম ৭ জন। তারপর ঐখান থেকে টঙের মালিক আমাকে বাতিল কইরা দিলো, অন্য কেউরে নিয়া বসাইলো, তারপর কিছুদিন রিক্সা চালাইসি, বিল্ডিং-এ কাজ করসি। এরপর মনে করেন যে, ২০১৩-তে দোকান পাইলাম একটা। ঐটাও ঐ মালিকানায়ই, ইউসি’র পাশে দিলাম। ২০১৩-২০১৮ পর্যন্ত করলাম। …রাষ্ট্রপতি আসছিলো না একবার ক্যাম্পাসে (২০১৯ এর সমাবর্তনের সময়), তখন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার জন্য আমারে তুইলা দেয়া হইছিলো।’
আলামিন ভাইয়ের কথা থেকেই তাকে তুলে দেয়ার প্রসঙ্গ এলো। ভাই বলেন, ‘সমাবর্তনের টাইমে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার জন্য আমারে তুইলা দেয়া হইছিলো। আমরা বলছিলাম রাষ্ট্রপতি আসবেন সেন্ট্রাল ফিল্ডে আর দোকান ইউসি’র সামনে, তখন আমাদেরকে বলসে এগুলা বুঝবানা, রাজনৈতিক ব্যাপার। প্রক্টর স্যার তখন বলসে যে, চাইরদিনের জন্য আমি দোকানটা ভাইঙ্গা নিয়া যাই। তারপর চাইর দিন পরে দোকানটা বসামু—এইরকম একটা বলসে, তারপর বললাম যে আচ্ছা, চাইরদিনোর জন্য তো আর এমন কিছু নষ্ট হবেনা, চাইরদিন পরে তো আবার বসাইতে পারমু, তারা যেহেতু বলছে। এরপরে চাইরদিনোর জাগাত দেড় মাসের মতো চইলা গেছে, তারা আমারে কোনো সংবাদ দেয়নাই, আমি বসবো কি বসবো না, তারার কাছে অনেকবার আমি গেছিও, যাওয়ার পরেও তারার কোনো পদক্ষেপ নেয় নাই।’
টং দোকানিদের তুলে দেয়ার সাথে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একটা সম্পর্ক আছে। এই টং দোকানগুলো আড্ডার আখড়া। ক্যাম্পাসে আন্দোলন শুরু হতো এইসব আড্ডা থেকে। প্রশাসনও জানতো, টং থাকলে আড্ডা থাকে, আড্ডা থাকলে আন্দোলন থাকে। শাবিপ্রবির ছাত্র আন্দোলনের সাথে সেখানকার টং দোকানগুলোর ওতপ্রোত সম্পর্কই দোকানিদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন ইস্যুর আন্দোলন শেষে প্রশাসন যেন ঝালটা মেটাত টং দোকানিদের ওপর। একে একে নানাবিধ বিধিনিষেধ আরোপ করা হতো। আন্দোলন চলাকালেও সবার আগে কড়াকড়ি বিধি আসত দোকানিদের কাছে। তারা দোকান খুলতে পারবেন না মর্মে নামে-বেনামে হুঁশিয়ারি আসতো।
২০২২ সালে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলার প্রতিক্রিয়ায় গড়ে উঠেছিল ভিসিবিরোধী আন্দোলন। শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশনে বসেছিলেন। হামলা-মামলা-কলা-কৌশল সকল উপায়ে সেই আন্দোলন দমন করা হয়েছিল। আন্দোলনের এক পর্যায়ে শিক্ষকদের একাংশ সরাসরি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। একজন শিক্ষক তো বলেই ফেলেছিলেন, ‘আমরা ইন্টেলেকচুয়াল শ্রেণিতে বিলং করি, আমরা চাষাভুষা নই যে, আমাদের যা খুশি তাই বলবে…’। এই বক্তৃতার প্রতিক্রিয়ায়, ‘চাষাভুষার সন্তান, আমরা সবাই সাস্টিয়ান’ শ্লোগান জনপ্রিয় হয়ে উঠে। আন্দোলন চলাকালে একসময় প্রশাসন নির্দেশ দিয়ে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে শিক্ষার্থীদের সকল খাবারের ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলে সেখানে রেজিস্ট্যান্স গড়ে তোলেন শিক্ষার্থীরা। নিজেদের মালসামানা নিয়ে নিজেরাই নিজেদের জন্য রঙ চা-এর ব্যবস্থা করেন। নাম দেয়া হয়, ‘চাষাভুষার টং’। আন্দোলন পরবর্তী-সময়ে আরও কিছু টঙের সাথে সাথে ‘চাষাভুষার টং’ নামে একটি পরিপূর্ণ টং স্থান করে নেয় ক্যাম্পাসের ভেতরে। যখন আর কেউ সাহস করে টঙের দাবিদার হচ্ছিলেন না, তখন আলামিন ভাই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে এই টঙের হাল ধরেছিলেন।
ছবি: আন্দোলন চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্যান্সে গড়ে উঠা ‘চাষাভুষার টং’
আলাপে আলাপে ‘চাষাভুষার টং’ চলে এলো। আলামিন ভাই বলে যান, ‘এরপর তো ছাত্র আন্দোলন হইলো। ছাত্র আন্দোলনের সময় তো কোনো টং ছিলো না, কিচ্ছু ছিলো না। শুধু গিফারি খোলা ছিলো, গিফারি মানে সবুজ ভাইয়ের টং-টা। আর সব বন্ধ ছিলো। তারপরে চাষাভুষার টং খুললো। আমার খুব ক্লোজ ভাই একজন, অমিয়, তো হে আমারে কইতাসে যে ভাই তুমি এইটা করো, তোমার দ্বারাই সম্ভব, আর আমরা তো আছিই। শুরু করলাম, করার পরে ৭ মাস না ৮ মাসের মতো করসি আরকি। তারপরে রাত্রের বেলা মনে হয় ৮/সাড়ে ৮ টার দিকে, আমি অইখানে মাছ মারতেসি, হঠাত ছাত্র ভাইয়েরা বুঝি কিসের ব্যানার লাগাইসে, আমি জানিনা, ভালো মন্দ কিসের ব্যানার লাগাইসে আমি জানিনা, প্রক্টর অফিস থেকে আমাকে ডাকাইসে, মানে আমার ২০-২২ বছরের ক্যাম্পাস লাইফো আমি এত ফাপর খাইসিনা, যতো ফাপর খাইসি হেদিন অফিসে গিয়া, আমার ক্যাম্পাস তাইক্কা আমার চোর’র মতোন বাইর হইতে হইসে। …যিনি ফাপর দিলো, উনার সাথে আমি তিনবার জামাত করসি, তাবলিগ করসি, অথচ, যে ফাপরগুলা দিসে।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী বলে থ্রেট দিছে?’
‘থ্রেট দিসে বলতে আমি ক্যাম্পাসো সন্ত্রাসী করতেসি। এতো বড় কলিজা আমার, যা পারসে বলতেসে, এরপর আমাকে কোনো রাস্তা দিয়া যাইতে নিষেধ করসে। কোনো রাস্তা দিয়া যাইতে পারবো না, কোনো রাস্তা দিয়া গেলে যদি আমি স্টুডেন্টের কাছে বইলা দেই! আমারে বন-পাথারে ফাটাইসে, মানে একবারে জমিনের উপর দি যাইবার লাগি। আমি আর আমার ছোটো ভাই ইয়াছিন আছিলো, দুই ভাই কী করমু, উনার সাথে তো আমরা আম-পাব্লিক, আমরা পাইরা উঠবো না, উনার কথামতোই আমরা…টোটালি ক্যাম্পাস ঢুকা নিষেধ করসে।’
আলামিন ভাই বলে যান, ‘প্রক্টোরিয়াল বডি বলে দিসে এবং সাইন রাখসে, তারা কাগজো লেখসে আর সাইনও রাখসে, আমি ক্যাম্পাসে কোনোদিন ঢুকতে পারবো না, আমি সন্ত্রাস, আমি গাঁজার ব্যবসা করি, এই সেই অনেক কিছু আরকি, আমার সাইন রাখসে, আমার ছোটো ভাইর সাইন রাখসে। এরপরে বলসে যে, তোমরা কি নিজ ইচ্ছায় যাইতে চাও না পুলিশে ধরাই দিই চাও, যদি সাইন করো তাইলে তোমরা যাইতে পারবা, আর যদি সাইন না করো তাইলে আমরা তোমাদেরকে পুলিশে দিয়ে দিবো। তো সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে ভাই, আমার তো ফ্যামিলি আছে। আমার ফ্যামিলির মাঝে আমি ছাড়া আর কেউ নাই। আজকে আমি যদি পুলিশে যাই, আমার মনের মধ্যে এইটা, প্রশাসনে চাইলে অনেক কিছু করতে পারে, যদি পুলিশে দিয়া দেয়, আমার ফ্যামিলি ধ্বংস। এই চিন্তা কইরা কইলাম যে, যা, আমার ক্যাম্পাসের দরকার নাই, আমার ফ্যামিলির দরকার, আমরা সাইন দিয়া তারপরে বি বিল্ডিং এর মাঝ দিয়া যে জমিন, এখন যে কাজ হইতাসে, ঐ জমিনের উপর দিয়া গেলাম। পকেট গেইটে দিয়া বাইর হইসি। প্রায় রাইত ১১ টা বাজে।’
‘আপনার কি মনে হয়, প্রশাসনের আপনার সাথে ক্ষোভটা কিসের?’—আলামিন ভাইকে জিজ্ঞেস করি। উত্তর দেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, ঐযে চাষাভুষার টং, ঐ আন্দোলনকারীদের টং-টা আমি চালাইসি, এই ওদের উপরের ক্ষোভটা আমার উপর মিটাইসে। আমারে ট্যাগ দিয়া ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিসে। হয়তবা, ঐ ক্ষোভটাই এখনো মিটাইতাছে। ক্যাম্পাস লাইফে আমার জানামতে আমার এই একটাই দোষ, আন্দোলনকারীদের টং আমি উদ্বোধন করসিলাম। প্রশাসনের কাছেও আমার নামে আর কোনো দোষ নাই, আপনি খোঁজ নিয়ে দেখেন। প্রত্যেক মাসে টঙের বেতন আমি দিয়ে আসতাম সবার আগে। আগে ছিলো ৪০০ টাকা, ভিসিবিরোধী আন্দোলনের পরে ইট দিয়ে যখন টং বানায়ে দিলো, তখন ঐ খরচা তোলার জন্য ভাড়া বাড়াইলো ১০০০ টাকা।’
‘তো, এই যে ৭-৮ মাস চালাইলেন, তাতে প্রশাসন থেকে কোনো থ্রেট আসে নাই?’—এ প্রশ্নের জবাবে আলামিন ভাই বললেন, ‘নাহ, এই রানিং অবস্থায় কোনো সমস্যা করেনাই প্রশাসন। ভালো চালাইসি, বেশ খাওয়াই কম খাওয়াই, ভালো চালাইসি, আমার ফ্যামিলির প্রত্যেকটা মানুষ দোকানের জিনিস খায়, সকালের নাস্তায় তারা দোকানের জিনিস খায়। তো আমি এক জিনিস খাইমু, বা খেউরে খাওয়াইমু, তো এই জিনিস অবশ্যই পরিষ্কার রাখতে অইবো, তারা অনেক যাছাই বাছাই করসে, আমার মাঝে কোনো জাবরা ফাইসেনা আরকি, কোনো নোংরা পরিবেশ ফাইসেনা আরকি, তো এইজন্য তারা অন্য কোনোকিছু বলেনাই, কিন্তু হঠাত কইরা ঐযে, ছাত্রভাইয়েরা ব্যানার লাগানোর কারণে আমারে ডাকাইয়া নিসে, নেয়ার পরে তো এই কাহিনিটা। টোটালি বন্ধ।’
ভিসিবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গ আসাতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ক্যাম্পাসে এসব আন্দোলন তিনি কেমন পেয়েছেন। উত্তর দেন, ‘আন্দোলন তো পাইছি অনেক। এইটা তো ছাত্র আন্দোলন, আগে হইতো রাজনৈতিক আন্দোলন বেশি। ২০০২-এর পর থেকে যা যা আন্দোলন হইসে সব পাইসি। মারামারিই বেশিরভাগ। পার্টিগুলা, রাজনৈতিক দলগুলা। এক পার্টি থাকতো মুক্তমঞ্চের এখানে, এক পার্টি থাকতো বি-বিল্ডিং-এর এখানে। তখন তো আমি ছোটোই, যদি মনে করেন রাত্রের দিকে মাইর হইতো, তাইলে মনে করেন আমরার জয় হইসে। রাতে তো দা, রড, এগুলা টোকাইয়া নিয়া বিক্রি করা যাইতো, সেই নেয়া গেছে। তখনো তো একটা সময় আছিলো, খুব মাইর হইতো। ২০১৪ সালে, অনেক মারামারি হইতো, বহিরাগত একজন গুলি খায়া মারা গেলো, তখন দোকানেই ছিলাম।’
আন্দোলন প্রসঙ্গের পর আলাপ চলে এলো টঙের খাবার নিয়ে। এখন তো ক্যাম্পাসে টং উঠিয়ে দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে নামিদামি কোম্পানিকে। ক্যাম্পাসের ভেতরের এই পরিবর্তনটাকে তিনি কীভাবে দেখছেন জিজ্ঞেস করা মাত্রই আলামিন ভাই উত্তর দেন, ‘এখন কথা হচ্ছে যে, উন্নত হইসে যে, উন্নত হোক ক্যাম্পাস এটা তো আমরাও চাই, কিন্তু ক্যাম্পাসো এটা পারতো, যারা পুরানা টং দোকানদার আছে, ওরাও তো খাইতো না? এইযে ধরেন চাইরটা ফুডকোর্ট হইসে, আগে তিনটা ফুডকোর্টের দোকানদার ছিলো, তাইলে ফুডকোর্টের হকদার কে? যারা আগে ছিলো, তারা না? টেন্ডারে দেন, তারারেই দেন। এখন আপনি ক্যাম্পাসের নিয়ম অনুযায়ী যেভাবে করেন, কিন্তু তারারে দিয়াই করেন? তারার তো পাওয়ার অধিকার আছে। আপনি অন্যজনকে কেনো দেবেন? আমি বর্তমানে ক্যাম্পাসে যতো ব্যবসায়ী আছে সবার থেকে ছোটো ব্যবসায়ী, আমার বয়স যদি বাইশ বছর ক্যাম্পাসে থাকে, তাইলে তাদের বয়স কতোটুকু হইসে, আরো বেশি। আমার বাইশ বছর ক্যাম্পাসে কী করলাম আমি? আমার ফ্যামিলির জন্য কী করলাম, আমরা ফ্যামিলির জন্য কিছু যে দরকার, প্রশাসন এইটা বুঝলো না। আমরার কিন্তু তেমন কোনো কিছু নাই এখান থেকে, আমরা যদি তিন বেলা ভাত, তিন বেলা ডাল পাইলেই আমরার শুকরিয়া, এই সিস্টেমটাও নষ্ট কইরা দিতেসে। তো আমরা কার আশায় থাকবো ক্যাম্পাসে?’
কথা প্রসঙ্গে চলে এলো খাবার দামের বিষয়টা। আলামিন ভাই বলে যান, ‘পরিবারের সবাই-ই মিলেই ব্যবসাটা চালাইতাম, দুই হাজার তিন হাজার সিঙ্গারাই বেচতাম তখন। এক কড়াইয়ে ২০০-৩০০ সিঙ্গারা বানাইতাম। এখন বানাইয়াও আনে কম, খায়ও কম। তেলের জিনিস তো। আগে খেলাধুলাও করতো বেশি, একটা না একটা খেলা চলতোই, ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল, এখন কই বলেন? ডিপার্টমেন্টের সবাই একসাথে খেলতো, জিম করতে যাইতো পোলাপান একসাথে, এসে খাইতো। ১০ জন একসাথে বইলেই ৫০০ টাকার বিল হইতো। এখন ৫০০ টাকার বিল হইতে হইলে ৫০ জন বসার লাগবো।’
জিজ্ঞেস করলাম আবার, ‘খাবারের দাম বেড়ে গেলে ছাত্ররা কিছু বলতো না?’
‘না, খাবারের দাম আমরা খুবই সীমিত বাড়াইতাম’, বলেন আলামিন ভাই, ‘এখন তো মনে করেন ছোলা খিচুড়ি বেচতেসে ২৫ টাকা, আমরা তখন প্যাকেজ দিতাম, এক প্লেট খিচুড়ি, ছোলা, আলুর চপ, স্মল ডিম—৪০ টাকা। ওইটা শুরু হইসিলো ২০১৫-১৬’র দিকে। প্যাকেজটা করায় ক্যাম্পাসটাও অন্যরকম হয়ে গেছিলো। এর আগে এখন যেরকম ঠাণ্ডা দেখতেছেন, এরকমই ছিলো মোটামুটি, প্যাকেজ চালু হওয়ায় ক্যাম্পাস আবার গরম হইসে।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আগে ক্যাম্পাসে সিগারেট পাওয়া যাইতো?’ আলামিন ভাই জানালেন, ‘হ্যা, যখন বিএনপি আমল, তখন একদিন সিগারেট সব দোকান থেকে হামলা দিয়া দলা করসে, সিগারেট একদম ন্যাতায়লাইসে। এইযে সিগারেট একবার নিষিদ্ধ করসে, এই নিষিদ্ধে নিষিদ্ধে যাইতাসে, এরপর থেকে অপেনলি কেউ বেচতে পারেনা।’
জিজ্ঞেস করি, ‘পুরান ব্যবসায় বাকি কেমন আছে? যারা বাকি নিয়েছিল, তারা কি ফেরত দেয়?’ আশাবাদী আলামিন ভাই বলেন, ‘আমার বাকি আছে। প্রায় ৫ লাখের উপরে বাকি আছে। …অনেকেই বাইরে চলে গেছে। বাইরে গেলে তো বুঝেন মনে করেন টেকাটা দেয়া প্যারা, তারা গিয়া সেটিং হইতে হইতে ২-৩ বছর যায়। যারা আমার পরিচিত আছে, তারা আমার সাথে যোগাযোগে আছে, তারা মনে করেন সুযোগ হইলে দেবে। হ্যা, ইনশাল্লাহ দেবে। বেশিরভাগ বাকি আছে ভার্সিটি স্টাফের কাছে।’
‘বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?’, আলামিন ভাইকে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, ‘যেটা হয়নাই এখানে সেটা অযথা বলতে পারবোনা। আমার সাথে সত্যি বলতে ভাই কারো খারাপ সম্পর্ক নাই। ছাত্রলীগের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিলো, জামাতের লগেও সম্পর্ক ভালো, বিএনপির লগেও সম্পর্ক ভালো। কারণ, আমি তো একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীর কাছে নটি, দামি, বেশ্যাধারী সবাই যায়। হের ক্ষমতা আছে আর হের ক্ষমতা নাই এইটা ভাইবা তো আমি ব্যবসা করতে পারবো না।’
আন্দোলন পরবর্তী সময়ে টং স্থাপনার কাজ শুরু হয়। ছবিসূত্র: ‘শিক্ষার্থীবান্ধব শাবিপ্রবি চাই’-এর ফেসবুক পেইজ
টং দোকান, খাবারের দাম, নতুন নতুন ফুডকোর্টের আমদানি—এসবের ভেতরের রাজনীতির কথাও ফুটে ওঠে তার আলাপে, ‘আমার কাছে মনে হয়, যারা ক্যাম্পাসে আছে, তারা গর্ব করে বলতে পারেনা এই জিনিসটা আমার, যে এই জিনিসটা আমি করবো। ওই যে নিজের ব্যক্তিগতভাবে করতে চায় দোকানটা, তাইলেই প্রশাসন থেকে ঝামেলাটা আসে, প্রশাসন নিজে থেকে করে এমন না, স্টাফ থাকে ভার্সিটির, মনে করেন আপনি ভালো করতেসেন, আপনার পিছে আঙুল দেয়ার জন্য আর ৫০ জন স্টাফ লাইগা যাবে, ভালো কিছু করতে দেবেনা। আপনি দুই টাকা কামাবেন তাদের শইলে দেবেনা। ধরেন, আমি একজন দোকানদার, আপনিও একজন দোকানদার, আপনি ভালো কিছু কামাইতেছেন, আমি আপনার পিছে লাইগা গেছি, কারণ আমি তো করতে পারতেছিনা। আমরাও তো ভালো না। একজন যে ব্যবসা করতেসে, সে মোটামুটি ক্যাম্পাসের সামনে এখন সেরা ব্যবসা করতাছে, বাকি সবার জ্বলতেসে, একেবারে ক্যাফেটেরিয়া লাগায়া সবার জ্বালাপোরা হইতেসে, যে পরিমাণ লেবার রাখসে, কারিগর রাখসে, সবাইরে দিয়া হের বেতনটা হে পায়না। সব বিলও পায়না, কতো বাটপার চিটার আছে, খাইতাসে, খায়া যাইতাসেগা। কারে ক্যাডা ফলো করবে?’
‘কেউ এসব নিয়ে কথা বলে না?’ জিজ্ঞেস করি।
তিনি বলে যান, ‘যেকোনো সময় উঠায় দেবে। কথা বলতে যাবেন আপনি, আপনারে বহিষ্কার করে দেবে। এখন প্রশাসনের হাতে পাওয়ার। আপনার নাই। আগে মনে করেন যে, আপনার সাথে আমি আমার দুক্ষের কথা বললাম। আমার সাথে প্রশাসনিকভাবে ঝামেলা হইসে, আমি আপনার সাথে শেয়ার করলাম। আপনার ব্যাচমেট আছে ৫০ জন, আপনি দুয়েকবার বলছেন খালি, আলামিন ভাইয়ের অমুক সমস্যা, থাকিস তোরা। দেখবো আমরা। দেখা যাইতো এরা আরো দুই ঘন্টা আগে আইয়া উপস্থিত। এখন যদি এটা বলেন, হয়তো দশজনের মধ্যে দুইজন আসব, আর আসতো না। অন্যের ঘরে ধুমা দিয়া লাভ আছে?—এখন এভাবে ভাবে সবাই। আগে ভাবতোই অন্যভাবে। ক্যাম্পাসে টং না থাকলে ক্যাম্পাসে আর কিছুই নাই । কোনোকিছুই আর ভালো লাগবেনা। আপনি ফুডকোর্টে গিয়া বসেন, সেই মজাটা পাইবেন না। টঙের মজাটাই আলাদা।’
আফসোস করে আলামিন ভাই বলেন, ‘সবকিছু চেঞ্জ হয়ে যাইতেসে। কিছুদিন পরে মনে হয় ক্যাম্পাসের পুরান দোকানদার যারা আছে, তারা কেউই থাকবো না। যে অবস্থা হইতেসে ক্যাম্পাসের।’
‘চেঞ্জ হয়ে যাইতেছে’ শুনে আলামিন ভাইকে আবার নিয়ে যাই অতীতে। ক্যাম্পাসের কালচার সম্পর্কে জানতে চাই। কীভাবে সব বদলে যাচ্ছে, বদলে গেলো, কতটুকু বদলে গেলো—জানতে চাই। তার কথা থেকে বারেবারে ক্যাম্পাসের আড্ডার অতীতের কালচার এবং এখনকার পরিবেশের তুলনামূলক বিবরণ ফুটে ওঠে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আগেরকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতির ফারাক কেমন দেখেন?’
আলামিন ভাই বলেন, ‘অনেক ফারাক। রাইত আর দিন ফারাক। এখন যে ভাইয়েরা আছে, তারা তো ঠিকমতোন কথাই বলেনা, জাস্ট টঙের মধ্যে আসে, ধরেন, আসে, খায়, বন্ধুবান্ধবের সাথে এক দেড় ঘন্টা আড্ডা দেয়, আগে ভাই বোনেরা দেখা যাইতো ঘন্টার পর ঘন্টা, এমনো সময় গেছে রাত ১১ টা, সাড়ে ১০ টা/১১ টা পর্যন্ত আছে। …যখন মনে করেন কনসার্ট হইসে, কোনো প্রোগ্রাম হইসে, রাত্রে ১ টা পর্যন্ত খোলা রাখসি। প্রশাসনেও তেমন কিচ্ছু বলতো না। এমনও হইসে, রাত ১২ টা/সাড়ে ১২ টা হইসে, দোকান বন্ধ কইরালছি, ফুল প্রক্টরিয়াল বডি আসছে, আইসা বলতেসে, চা করো, আমরা বসতেছি। তো আবার দোকান খুলছি, চা দিসি, তারারে বিদায় করসি। এই সময়ের দিনটা খুবই ভালা ছিলো, এই সময় তেমন সমস্যা করতো না। এখন, কিরকম জানি হই গেছে ক্যাম্পাস।’
তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘পুজা, শীতকালীন ছুটি, এসবে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলে এখন মানুষ দেখা যায় না পুরো ক্যাম্পাসে, আগেও কি এরকম ছুটির দিনে দোকানপাট আপনারা বন্ধ রাখতেন?’ আলামিন ভাই বলেন, ‘নাহ, দেখা যাইতো নিজে বাড়িতে গেলে একমাত্র আমি দোকান বন্ধ রাখতেসি, কারণ তখন ক্যাম্পাসে অনেক রিক্সাড্রাইভার ছিলো। এখন সারা ক্যাম্পাস টুকাইলে বিশটা রিক্সা পাইতানায়। তখন মনে করেন শ’/দেড়’শ রিক্সাড্রাইভার ছিলো। তারা ক্যাম্পাসেরই ভক্ত ছিলো, ক্যাম্পাসের বাইরে যাইতে মজা পাইতো না। ক্যাম্পাসের মজাটা যার মনে গাইথা গেছে, সে ক্যাম্পাস ছাড়া আর বুঝেনা আসলে। তো তারা ২-৪ টা টিপ দিয়াই টঙে যাইত। চা-বিড়ি বা এক গ্লাস পানি খাইতো। তখন ভাড়াও ছিলো কম, তারার রুজি ছিলো বেশি। এখন গেটে থেকে ক্যাম্পাসে আসলেই বিশ টাকা, হলে গেলে তিরিশ টাকা। তো সারাদিনে একটা রিক্সাড্রাইভারে রুজি করতে পারেনা, আগে ভাড়া ছিলো ৫ টাকা, তখন রুজি করতে পারতো। তো ক্যাম্পাস অফ থাকলেও একটা দুইটা দোকান মোটামুটি চলতোই। যেমন এখন লাল টঙের মামারা। উনি সবসময় খুলে, ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলেও, খোলা থাকলেও। সেইমভাবে ছিলো আমারও। খোলা থাকতো। তখন অনেকেই ছিলো শুধু রাত্রে মেসে খাইতো। দিনে আমাদের টঙেই।………। অনেকে টিচার হইসে, বিভিন্ন ডিপাটমেন্টের, এখনো ‘তুমি’ কইরা বলি, কারণ এদের সাথে ভাই-ব্রাদার সম্পর্ক, একসাথে বইসা বিড়ি খাইসি। একজন রেজিস্ট্রার হইসে, এখন ফোন দিলে ভাই ভাই কইয়া ডাক দিবো, আমি হেরে নাম ধরি ডাক দিমু, হে মাইন্ডই করতো না, এইটা এখনকারদের সাথে সম্ভব? চাইলেও পারা যাইতো না।’
তিনি মনে করেন এখনকার পরিবেশও ভালো। তবু পরিবর্তনটা ধরতে পারেন। বলে যান, ‘আগের থেকে মানুষ পরিবর্তন হয়ে গেছে। আপনি দেখেন, প্রত্যেকটা টঙে যান, দেখেন কয়টা স্টুডেন্ট আছে টং মামাদের সাথে কথা বলে? একটা কথাই বলবে, মামা এক কাপ চা দেন। মামা, দুইটা সিঙ্গারা দেন, এইটুকুই, আর কিছু না। আগের ভাইয়েরা আগে আইয়া বুক মেলাইছি, দুই দিন কিংবা এক দিন ক্যাম্পাসে আসেনাই, তাইলে তো হইসেই, আর ছেলে থাকলে তো ভিতরে ডুকাই নিছে (আদরে) । বৈদেশ থেকে আইসা এখন যারা হাত মিলাইছে, তাদের হাত কি পছে গেছে? না, ভালো তারা করছে দেইখা তারার সুনাম করতেসি। তারা খারাপ করলে, তাদের বদনাম করতাম। এখন এরকম নাই-ই আসলে।’
বর্তমানের শিক্ষার্থীদের সাথে যেন একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন এই দূরত্ব?’ আলামিন ভাই সহজসরল ভাষায় বলে ফেলেন, ‘ওদের কাছে মনে হয় আমরা কোনো ধরণের বোঝা। আমি এইযে গত একমাস ব্যবসা করলাম, আপনার সাথে আমার দুই দিন কথা হইলে তিনদিনের দিন আপনি আমারে খুজাইবেন, কিন্তু গত এক মাসে একটা ভাইয়ের সাথে আমার ফ্রি-ভাবে কথা হয়নাই। আর কী বুঝাইবো বলেন? আগে একজনকে একদিন কথা বলাইলে, পরের দিন আইয়া তারাই ডাকসে, ভাই বসো, খাও, নাইলে খাওয়াও। একটা টঙে আপনারে আমি খাওয়াইলেও ৫০ টাকারই খাওয়াইমু, আপনি আমারে খাওয়াইলেও ৫০ টাকারই খাওয়াইবেন, তাইনা? যেই দিন যায় ভাই, সেই দিন আর আসে না। মানুষ তো চেঞ্জ হয়ে যায় ভাই। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের দিকে আমার টঙের নাম হয়া গেছিলো ‘সিঙ্গারা মামার টং’।’
জিজ্ঞেস করি, শিক্ষকদের সাথে ওনাদের সম্পর্ক কেমন ছিল? উত্তর আসে, ‘আগে ভালো ছিলো, অনেক সময় বসে গল্প করসি, তারাও বুদ্ধি দিতো, কী করবো না করবো। তাদের অনেকেই চলে গেছে। তাদের মধ্যে এখনো যারা আছে, ভালো সম্পর্ক । এখনকার যারা টিচার আছে, তারা টং দোকানদারের খুত থুকায়। এখন ধরেন একটা দোকানে ত্রিশজন কাস্টমার আসলো। ত্রিশজন খিচুড়ি অর্ডার করল। তো ত্রিশটা প্লেট ধুয়ে খিচুরির ডেগে না ঢুকাইলে তো নষ্ট হবেই খিচুড়ি, তারা এমন সময় আসে, কাস্টমারের মাঝখানে, প্লেট ধুয়ার আগেই ক্যামেরা অন করে নিউজ করে ফেলে। কোনো দোকানদার চায়না হেতে খারাপ খাওয়াক। কেউ যদি খারাপ খাওয়ায় অটোমেটিক্যালি হের ব্যবসা ভাইসা যাবে, ছবি তোলা লাগতো নায়। কেউ যদি ভুল করেও খাবারের মান কমায়ে ফেলে, তারে তো একবার সুযোগ করে দিবে না, যে মামা, খারাপ হইসে, পরেরদিন খেয়াল রাইখেন। এখন সেই সুযোগ দেয়না, একজন কমপ্লেইন করলেই ডিরেক্ট অফিসে ডাকায়।’
যতক্ষণ আলাপ করি, আলামিন ভাইয়ের সুরে ও স্বরে একধরনের ভালোবাসা ও টান মিশে থাকে। ক্যাম্পাসের ধুলোবালিতে গড়ে উঠা সম্পর্কগুলোর এক নিখাদ পরিচয় ফুটে ওঠে তার জবানে। আলামিন ভাই বলেন, ‘অনেকে আছে বাহিরে গেছে, বাহির থেকে আসতাছে, প্লেনে থাকতেও মেসেঞ্জারে ফোন দিতাসে, মামা আসতাছি…এইটা একটা ভালোবাসার টানে। ৫-৭ বছর একসাথে থাকলাম, খাইলাম, বইলাম, গল্প টল্প করলাম এই এক টান ভুলা যায়না…।’
ক্যাম্পাসের মামাদের সাথে আলাপ কি আর ফুরায়? ফুরায় না। তবু জীবনের তাড়া তো থাকে সবারই। তাই আলাপেরও ইতি টানতে হয়। আলাপের শেষ দিকে এসে জিজ্ঞেস করি, ‘ধরেন, যারা নতুন এসেছে, তাদের কী করা উচিত?’ ভাই বলেন, ‘আমি সবাইকে বলবো না, আপনারা যেহেতু বসছেন আমার সাথে, আমি আপনাদের বলবো, যতোটুকু পারেন টং মামাদের সাথে বসেন, গল্প করেন। হাজার বিপদ আসুক ক্যাম্পাসে, আর কেউ আপনাদের পাশে থাকুক না থাকুক, দোকানদারেরা আপনাদের পাশে থাকবে। এটা একশো থেকে একশো গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, টং দোকানদারদের আপনাদের পাশে পাবেন। হয়তো লাঠি হিসাবে না পাইতে পারেন, আমি আলামিন ক্যাম্পাসে না থাকলেও, এই কথাটা থাকবে। আপনারা আরো ৫ বছর থাকবেন, যদি সম্পর্ক রাখেন মামাদের সাথে, এই কথাটা মিলাইতে পারবেন। দেখবেন ওরাই আপনারে মায়া করবে। …আমার সাথে যদি আপনার সম্পর্ক হয় তাইলে তো আপনার টাকা পয়সা আমি নিয়া যাবো না, কিংবা আমার টাকাপয়সাও আপনি নিয়া যাবেন না। আপনার সাথে বসে কথা বললে আমার সমস্যা কোথায়? আপনার খাবারও আমি কাইড়া খাইতাসিনা, আমার খাবারও আপনি কাইড়া খাবেন না। যতোটুকু ব্যবধান, আপনি শিক্ষিত, আমি মূর্খ। অতোটুকুই। আমিও তো মানুষ। আমার সাথে কথা বললে আপনাদের দোষটা কী হবে?’
ওঠার আগে জিজ্ঞেস করি, ‘ইউনূস কেমন চালাচ্ছে দেশ?’ হাসি দিয়ে আলামিন ভাই বলেন, ‘চালাইতেসে তো ভালো, মাঝেমধ্যে, ভুল কইরা ফালায়।’
শাবিপ্রবির টঙের আলামিন ভাইয়ের সাকারক্ষাৎ- ‘বাহির থেকে আসতাছে, প্লেনে থাকতেও মেসেঞ্জারে ফোন দিতাসে, মামা আসতাছি…এইটা একটা ভালোবাসার টানে’