Skip to Content

জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ : একটি ‘রাজনৈতিক’ পাঠ

তুহিন খান ও সহুল আহমদ
24 সেপ্টেম্বর, 2026 by
তুহিন খান ও সহুল আহমদ
| No comments yet

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ভারতে পলায়ন এবং পরদিন রাষ্ট্রপতিকর্তৃক তৎকালীন সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর সরকার গঠনের প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়। অবশেষে ৮ আগস্ট সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা মেনে, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্তত ২ জন শীর্ষ নেতা (পরবর্তীতে ৩ জন) এই সরকারের অংশ হন। ফলে দল-মত-নির্বিশেষে সকলেই এই সরকারটিকে মেনে নেন।

তবে জুলাই-আগস্টের গণ-বিদ্রোহ কি একটি গণ-বিপ্লব, না গণ-অভ্যুত্থান—এই তর্ক চলমান থাকে। যারা এটিকে একটি গণ-বিপ্লব হিসেবে দেখতে চাচ্ছিলেন, তারা হাসিনার পলায়নের পরপরই একটি বিপ্লবী ঘোষণাপত্র ও বিপ্লবী সরকারের দাবি তুলতে থাকেন। তবে শেষপর্যন্ত সেটি কার্যকর না হওয়ায়, এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখেই একটি সরকার গঠিত হওয়ায় তাদের অনেকেই মনোক্ষুন্ন হন। এই ঘরানার শীর্ষস্থানীয় চিন্তক ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার ৮ আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের এই ঘটনাটিকে ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার বিশ্লেষণ মোতাবেক, জুলাইয়ে বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিপরীতে একটি গণ-বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল; পরবর্তীতে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে সেটিকে পুরাতন বিধি-ব্যবস্থার ভেতরে আত্মসাৎ করে ফেলা হয়। এই প্রক্রিয়াটিকেই তিনি ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’ নামে আখ্যায়িত করেন।

তবে ৮ আগস্ট সরকার গঠনের পরেও জুলাই-আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একটি ‘বিপ্লবী বাস্তবতা’ ও নবগঠিত সরকারটিকে একটি ‘বিপ্লবী সরকার’ হিসেবে দেখতে চাওয়ার বাসনা রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে নানাভাবে জারি ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গঠনের আড়াই মাস পরে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’-এর দাবি তোলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী প্লাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর শহিদ মিনার থেকে ৫ দফা দাবি ঘোষণা করে তারা। দাবিগুলো ছিল: 

১. বিদ্যমান সংবিধান অনতিবিলম্বে বাতিল করে ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নতুন সংবিধান লিখতে হবে 

২. ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করতে হবে 

৩. রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে এ সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে হবে 

৪. জুলাই বিপ্লবের আলোকে ‘প্রোকলেমেশন অব রিপাবলিক’ ঘোষণা করতে হবে


  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধরন নিয়ে তর্কের হদিস পেতে দেখুন: আর রাজী, ‘বিপ্লব-গণ-অভ্যুত্থান-জন-অভ্যুত্থান’; যোবায়ের আল মাহমুদ, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কি বেহাত বিপ্লব, নাকি পোস্ট-মডার্ন গণতান্ত্রিক বিপ্লবেরই নতুন রূপ’; মোশাহিদা সুলতানা, ‘জুলাই আন্দোলন: কালার রেভল্যুশন, নাকি গণ-অভ্যুত্থান’; সেলিম রেজা নিউটন, ‘গণবিপ্লব-প্রবাহ: চলমান ইশতেহারের খসড়া’; (সম্পা.) সহুল আহমদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রবন্ধ, বাংলা একাডেমি, ২০২৫ 
  • ফরহাদ মজহার চব্বিশের আগস্ট মাস থেকেই বিভিন্ন ইন্টারভিউ, বক্তৃতা ও লেখায় এই ধারণা প্রচার করে গিয়েছেন। তার এই অবস্থানের সবচেয়ে সুসংহত প্রকাশ পাওয়া যায় এখানে: ফরহাদ মজহার, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’, চিন্তা, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

৫. ২০১৪ সাল, ২০১৮ সাল এবং ২০২৪ সালের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করতে হবে। এ তিন নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হয়েছে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তারা যেন কখনো বাংলাদেশে নির্বাচন করতে না পারে, সেজন্য আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

জুলাইয়ের সম্মুখ সারির নেতৃবৃন্দ ও অ্যাক্টিভিস্টদের নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তৈরি হওয়া প্লাটফর্ম জাতীয় নাগরিক কমিটি (পরবর্তীতে এখান থেকেই গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি) দাবিগুলোর সাথে তাৎক্ষণিক সংহতি জ্ঞাপন করে। এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা এই দাবিগুলোর ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সাথে বৈঠক করেন। বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো হাসিনার পতনের আড়াই মাস পর এ ধরনের দাবি কেন মাঠে আসলো, সে ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির অপসারণের ফলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করে তারা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এসব দাবির সাথে নীতিগতভাবে একমত হলেও, রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই করণীয় নির্ধারণের ব্যাপারে মত দেয়। ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্য কয়েকটি দল ছাত্রদের দাবির সাথে একমত হয়; তবে দাবিগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতির ব্যাপারে তারা বিভিন্ন ধরনের মতামত ব্যক্ত করে।


ছবি: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দের ৫ দফা দাবি উত্থাপন


  • বণিক বার্তা, ‘সংবিধান বাতিলসহ ৫ দফা দাবি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’, ২২ অক্টোবর ২০২৪

মোদ্দাকথা, ‘অসমাপ্ত বিপ্লবকে প্রকৃত বিপ্লবে রূপান্তরিত করা’র যে উদ্যোগটি ছাত্রনেতারা তখন নিয়েছিলেন, সেটির ব্যাপারে কোনো রাজনৈতিক ঐকমত্য সেসময় হয় নাই। সরকারও এ ব্যাপারে আর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে নাই।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর শহিদ মিনারে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ জারি করার মাধ্যমে ‘৭২-এর মুজিববাদী সংবিধানকে কবর দেওয়া’র ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ও সরকারের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়।  সরকারের তরফ থেকে এ ব্যাপারে বেশ কড়া প্রতিক্রিয়া


  •  ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪, শনিবার সন্ধ্যার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পরপর একই ধরনের দুটি পোস্ট দেওয়া হয়। প্রথম পোস্টে লেখা হয়, ‘৩১ ডিসেম্বর ২০২৪, বিপ্লবীরা প্রস্তুত তো?’ পরের পোস্টে ইংরেজিতে লেখা হয়, ‘প্রক্লেমেশন অব জুলাই রেভল্যুশন’। কাছাকাছি সময়ে ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে পরপর ইংরেজিতে দুটি পোস্ট দেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। প্রথমটিতে লেখা হয়, ‘কমরেডস, নাউ অর নেভার’; দ্বিতীয়টিতে লেখা হয়, ‘প্রক্লেমেশন অব জুলাই রেভল্যুশন’। পরে জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও ফেসবুকে ইংরেজিতে দুটি পোস্ট দেন। প্রথমটিতে তিনি লিখেন, ‘অল আইজ অন শহীদ মিনার, ৩১ ডিসেম্বর, সময়: বিকেল তিনটা’; দ্বিতীয়টিতে বলা হয়, ‘প্রক্লেমেশন অব জুলাই রেভল্যুশন, নাউ অর নেভার’। সংগঠনটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ফেসবুকে লেখেন, ‘এ বছরেই হবে, ৩১ ডিসেম্বর, ইনশাআল্লাহ!’ মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম লেখেন, ‘৩১ ডিসেম্বর! শহীদ মিনার, বিকেল তিনটা; এখনই সময়, বাংলাদেশের জন্য।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহও তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এ প্রসঙ্গে দুটি পোস্ট দিয়েছেন। প্রথমটিতে তিনি লেখেন, ‘কমরেডস, ৩১ ডিসেম্বর! নাউ অর নেভার।’ দ্বিতীয় পোস্টে লেখা হয়, ‘প্রক্লেমেশন অব জুলাই রেভল্যুশন, ৩১ ডিসেম্বর, শহীদ মিনার, বিকেল তিনটা।’ সংগঠনটির সদস্যসচিব আরিফ সোহেল লেখেন, ‘জুলাই হাজির হবে ইতিহাসে অমলিন হতে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪।’ (প্রথম আলো, ‘৩১ ডিসেম্বর দেওয়া হবে ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’’, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪)

  • ২৯ ডিসেম্বর যুগান্তর দাবি করে, ঘোষণাপত্রের খসড়ার একটি কপি তাদের হাতে পৌঁছেছে। সেখানে দেখা যায়, ঘোষণাপত্রের ভাষ্যটি এরকম: যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির জন্য ১৯৪৭ সালে যুদ্ধ করেছে, যেহেতু পাকিস্তান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে, যেহেতু ১৯৭২-এর সংবিধান আমাদের জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারেনি, যেহেতু মার্শাল ল’ এবং সাংবিধানিক সংশোধনীসমূহ ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রকে দুর্বলতম করেছে। এই উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়েছে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম করার ক্ষেত্রে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে; পিলখানা, শাপলা চত্বর গণহত্যা, বিচার বিভাগীয় হত্যা, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে; ছাত্র-জনতা এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে; ‘রাজাকারের নাতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে; আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফ্যাসিস্ট শাসন দীর্ঘস্থায়ী কারার ক্ষেত্রে বেপরোয়া ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে; ছাত্ররা ৯ দফা দাবি উপস্থাপন করেছিল, ইন্টারনেট বন্ধ করে কারফিউ জারি করে ছাত্র-জনতার উচ্চকিত কণ্ঠ স্তিমিত করার চেষ্টা হয়েছিল; ছাত্র-জনতা অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল; সব শ্রেণি-পেশার, ধর্ম, বর্ণ, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, ডান-বাম নির্বিশেষ ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে অকল্পনীয় ঐক্য গড়ে তুলেছে, সেহেতু ছাত্র-জনতা ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করেছে এবং সহস্রাধিক জীবন বিসর্জন দিয়েছে। সেই সঙ্গে আজও শত শত ছাত্র-জনতা মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর, সেজন্য আমরা নিজেদের স্বাধীন সার্বভৌম জনগণ হিসেবে ঘোষণা করলাম। এর প্রেক্ষিতে…আমরা পার্লামেন্ট বিলুপ্তি চাই। হাসিনা সরকারের সময় নিযুক্ত কর্মকর্তা কর্মচারীদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে চাই। আমরা ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটা অন্তর্বর্তী সরকার চাই। মিলিটারি শাসন ও ১/১১ এর পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সেজন্য বেগম খালেদা জিয়ার তড়িৎ মুক্তি কামনা করছি। আমরা ’৭২-এর সংবিধান সংস্কার বা বাতিল চাই। আমরা সব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার চাই। আমরা গুম, খুন ও গণহত্যার সুবিচার চাই। অর্থপাচার, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার এবং পাচারকারী ব্যক্তিদের শাস্তি চাই। আমরা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই। ’৭২-এর বন্দোবস্ত বাতিল চাই। ১/১১ এর বন্দোবস্ত বাতিল চাই। আমরা একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (Democratic Republic) চাই, আমরা বৈষম্য চাই না। এই ঘোষণা ৫ আগস্ট, ২০২৪ থেকে কার্যকর হবে বলেও জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। (যুগান্তর, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪)

আসে। ২৯ ডিসেম্বর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন যে, এই ঘোষণাপত্রের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো সম্পর্ক নাই। সরকার এটাকে ‘প্রাইভেট ইনিশিয়েটিভ’ (ব্যক্তিগত উদ্যোগ) হিসেবেই দেখছে বলে জানানো হয়। প্রেস সচিব আরো জানান যে, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একটি ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রেস সচিবের এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ঘিরে বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়। 

এই প্রেক্ষাপটে ৩০ ডিসেম্বর রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দের একাংশ জুলাই ঘোষণাপত্র জারির কর্মসূচি স্থগিত করতে চাইলে, বাকিরা এ ব্যাপারে আপত্তি তোলেন। মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘ মিটিংয়ের পর বাংলামোটরে প্রেস ব্রিফিং করে তারা জানান যে, ৩১ তারিখ শহিদ মিনারে তারা ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ নামে একটি


  • একদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এই ঘোষণাপত্রে আগামীর বাংলাদেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। ৩১ ডিসেম্বর জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে ‘নাৎসিবাদী আওয়ামী লীগকে’ বাংলাদেশে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করা হবে। আমরা চাই, মুজিববাদী সংবিধানকে কবরস্থ ঘোষণা করা হবে। যেখান থেকে একদফার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, ঠিক সেই জায়গা থেকে মুজিববাদী বাহাত্তরের সংবিধানের কবর রচিত হবে। অন্যদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানায়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে লেখা যে সংবিধান, সেই সংবিধানকে যখন কবর দেওয়ার কথা বলা হয়, তখন কিন্তু আমাদের কষ্ট লাগে। কবর দিয়ে ফেলব, মেরে ফেলব, কেটে ফেলব—এ সমস্ত কথা ভালো কথা নয়। এ ধরনের কথা ফ্যাসিবাদের মুখ থেকে আসে।’ রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সংবিধানে ফ্যাসিবাদের যে বৈশিষ্ট্যগুলো আছে, সেগুলো সংশোধন হতে পারে। সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে শেখ হাসিনা যে অকর্ম করেছে, সেগুলো নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু সংবিধান বাতিল করে নতুন করে লেখা হবে, আমার মনে হয় এতে জাতির যে ধারাবাহিকতা, সেটি ক্ষুণ্ন হবে।’ বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘যেভাবে ৭২-এর সংবিধানকে মুজিববাদী সংবিধান আখ্যায়িত করে কবর দেওয়ার কথা বলছে, প্রথমত এটা ভুল উপস্থাপনা। এর মধ্যে এক ধরনের বিদ্বেষ কাজ করছে। … এই সংবিধানে অনেক ঘাটতি, দুর্বলতা আছে। তা নিয়ে অনেকগুলো বিকল্প প্রস্তাবনা আছে, তা আমরা গণতন্ত্র মঞ্চের পক্ষ থেকে ৩১ দফায় বলেছি। সেখানে সংশোধনের অনেকগুলো প্রস্তাবনা রয়েছে। এটি বাতিল করতে গেলে বর্তমান যে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য তা বাড়িয়ে তুলবে।’ (একাত্তর টিভি, ‘৩১ ডিসেম্বর: আলোচনার তুঙ্গে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪) 

  • অন্যদিকে ৩১ তারিখের কর্মসূচি নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর ভেতরেও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির বলেন, ‘আমরা মনে করি ৫ মাস পর এ ধরনের ঘোষণা অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক। গণমাধ্যম মারফত যতটুকু জেনেছি, তাতে মনে হয়েছে, এটি দলীয় স্বার্থ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি প্রচেষ্টা—যা ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ গঠনের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।…এক কথায় এটি জুলাই আন্দোলনের স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি মেঘমল্লার বসু বলেন, ‘...এভাবে তো একটা অভ্যুত্থানের ৫ মাস পরে বিপ্লবের প্রক্লেমেশন ঘোষণা দেওয়া যায়না। এজন্য ন্যূনতম আলোচনা ও বোঝাপড়া দরকার ছিল অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সাথে। …আমরা মনে করি, এটিও আসলে ৭১-এর চেতনার মতোই একটি একদলীয় বয়ানে পরিণত হবে। যেমনটি স্বাধীনতার ঘোষণার পর মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু ৭২-এর সংবিধান তো মুক্তিযুদ্ধের প্রক্লেমেশন না। …সেটির মাধ্যমে একটি দলের চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছিল। বর্তমানেও ২০২৪-এর এই ঘোষণা শেষমেশ দলীয় বয়ানেই পরিণত হবে।’ ছাত্রসংগঠনগুলো কোনো দাওয়াত পায়নি বলেই মন্তব্য করে। ইসলামি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দাওয়াত পাইনি। এমনকি, আমাদেরকে ক্লিয়ারলি কোনো কিছু জানানো হয়নি। তাছাড়া, সেদিন আমাদের বার্ষিক কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এই অনুষ্ঠানটি সন্ধ্যা পরবর্তী সময় পর্যন্ত গড়াতে পারে।’ (দি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র: ঐক্য না-কি বিভেদ?’, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪) 

প্রথম আলো, ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব’, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪


কর্মসূচি করবেন। এছাড়া রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ জারির যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে তারা স্বাগতও জানান। বিএনপি-ছাত্রদল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের এই উদ্যোগ নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তোলেন; বিভিন্ন আশঙ্কার কথা জানান। এছাড়া জামায়াত-শিবিরের নেতারা জানান যে, ৩১ তারিখ সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন থাকায়, শহিদ মিনারের অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খুবই কম। এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘এই কর্মসূচিতে আমাদের যাওয়ার সুযোগ নেই।’ পরবর্তীতে ৩১ ডিসেম্বর ছাত্রনেতারা নিজেদের উদ্যোগে শহিদ মিনারে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ নামে একটি কর্মসূচি পালন করেন, এবং সেখানে কোনো ঘোষণাপত্র জারি করা থেকে বিরত থাকেন। 

এবং এ পর্যায়ে ঘোষণাপত্র জারির বিষয়টি সরকার ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।



ছবি: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ প্রোগ্রাম

২.

প্রশ্ন উঠতে পারে—কেন তখন ঘোষণাপত্র জারি করা গেল না? এই প্রশ্ন অনেকেই তুলেছেন। কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারের মতে, ছাত্রনেতাদেরই এককভাবে ঘোষণাপত্র জারি করা উচিত ছিল। এখানে সরকার বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের কিছু নাই। কারণ তার দৃষ্টিতে, অন্তর্বর্তী সরকার ও পুরাতন রাজনৈতিক দলগুলো ছিল


  • প্রথম আলো, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি আজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে’, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪


‘প্রতিবিপ্লবী শক্তি’। এবং গণ-অভ্যুত্থানের নেতারাই জুলাইকে ‘গণ-বিপ্লব’-এ রূপান্তরিত করার প্রকৃত হকদার। তার দাবি শুনতে ‘বৈপ্লবিক’ বলে মনে হলেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিসরের টানাপোড়েনে (ট্রানজিশনাল বা রূপান্তরকালীন পর্বে যেমন থাকে) এই দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষণিক উত্তেজনা তৈরি করা ব্যতীত ফলপ্রসূ কোনো সমাধান হাজির করতে পারেনি। বিদ্যমান রাজনৈতিক মহলগুলোর রাজনীতি ও রাষ্ট্র-কল্পনার ভিন্নতা এবং গণ-অভ্যুত্থানের চরিত্র থেকেই এই টানাপোড়েন তৈরি হয়। বিশেষভাবে কয়েকটি দিকে আলোকপাত করা দরকার:  

১. সাধারণত আইনি ভিত্তিসম্পন্ন বিপ্লবী ইশতেহার বিপ্লবের পরপরই, গণ-অভিপ্রায় অটুট থাকতে থাকতেই, দিয়ে দিতে হয়। কিন্তু ছাত্রনেতারা এই উদ্যোগটি গ্রহণ করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় আড়াই মাস পর, যখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে, এবং জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সমাজে বিবিধ হতাশা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে, এবং জনগণ নির্বাচনকে একটি ‘অপশন’ ভাবতে শুরু করেছে। ফলে স্বভাবতই তাদের এই উদ্যোগ আশানুরূপ সাড়া পায় নাই।

২. জুলাই-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা মেনেই, ১০৬ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে, রাষ্ট্রপতির হাতে শপথ নিয়ে। এবং সেই সরকারকে জুলাইয়ের ছাত্রনেতৃত্বসহ সকলেই তখন মেনে নিয়েছিল। এই সরকারে এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ২ জন নেতাও ছিলেন। ফলে আইনি ক্ষমতাসম্পন্ন বিপ্লবী ঘোষণাপত্রের পরিকল্পনা এই সরকারকেও নানাভাবে বিব্রত করে তুলেছিল। বিপ্লবী ঘোষণাপত্র জারি হলে এই সরকারের স্ট্যাটাস সম্পূর্ণ বদলে যেত। সরকারের ক্ষমতাবলয়ের ভেতরে থাকা অনেকের পক্ষেই সেটা মানতে না পারাই স্বাভাবিক বাস্তবতা ছিল।

৩. জুলাই-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই ঘোষণাপত্রের তীব্র বিরোধিতা করে। বিএনপি আগাগোড়া বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল। এবং এ ধরনের বিপ্লবী কর্মসূচিকে তারা কখনোই সমর্থন করেনি। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনকে কেন্দ্র করেও যখন এ ধরনের ‘বিপ্লবী’ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখনও বিএনপি সেখানে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। বিএনপি বরাবরই নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী দল। জুলাইয়ের পরও তারা সেটাই চাচ্ছিল—দ্রুত নির্বাচন। তাই স্বভাবতই তারা এ ধরনের বিপ্লবী তৎপরতাকে সমর্থন জানাতে পারে নাই। বরং তারা দ্রুত এক ধরনের স্থিতিশীলতার দিকে যেতে চাচ্ছিল।

৪. বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আরো কিছু ‘ইসলামপন্থী’ বা ‘মধ্য-ডান’ দল ছাত্রনেতাদের এই বিপ্লবী আহ্বানের সাথে নীতিগতভাবে একমত হলেও, কার্যত মাঠের কর্মসূচিতে তারা পুরোপুরি সাড়া দেয় নাই। এর কারণ ছিল নানাবিধ। প্রথমত, এই দলগুলো সরকারসহ পুরাতন স্টাব্লিশমেন্টের সম্পূর্ণ বিপক্ষে গিয়ে একটি বিপ্লবের দায়ভার নিজেদের কাঁধে নেওয়ার মতো সাহস করে উঠতে পারে নাই। দ্বিতীয়ত, জামায়াত ছাড়া এই ঘরানার অন্য দলগুলোর মাঠের শক্তি খুবই নগন্য। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভাবাদর্শের জনভিত্তি ও ‘সফট পাওয়ার’ বেশ দুর্বল। একদিকে মওদুদি মডেলের ‘বিপ্লবী রাজনৈতিক ইসলামপন্থা’, অন্যদিকে একাত্তরপ্রশ্ন—দুটি কারণেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই দলটি কোনঠাসা হয়ে আছে দীর্ঘদিন যাবত। জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশিমাত্রায় ও ভালোভাবে ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে ঢুকে যেতে পেরেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষিতে জাতীয় নির্বাচনেও তাদের বেশ ভালো ফলাফলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব প্রাপ্তি, সাফল্য ও সম্ভাবনাগুলোকে হুমকির মুখে ফেলে একটি সর্বাত্মক বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়া তাদের কাছে ইতিবাচক বলে মনে হয় নাই। চতুর্থত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের কিংবা ফরহাদ মজহারের মতো বুদ্ধিজীবীদের ‘সেক্যুলার’ রাষ্ট্রবাসনার সাথে জামায়াত কিংবা অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের রাষ্ট্রকল্পের বেশ দূরত্ব আছে। ফরহাদ মজহার কিংবা বৈষম্যবিরোধী নেতারা ‘সংবিধান ছুঁড়ে ফেলা’ কিংবা ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’-এর কথা বলছিলেন ‘পপুলার সভ্রেইনটি’ বা ‘গণ-সার্বভৌমত্ব’-এর জায়গা থেকে। অন্যদিকে জামায়াত বিশ্বাস করে ‘হাকিমিয়্যাহ’ বা ‘আল্লাহর সার্বভৌমত্ব’-এর ধারণায়, যেটি মওদুদি মডেলের ইসলামপন্থার একটা কেন্দ্রীয় ধারণা। ফলে জামায়াতের দিক থেকে এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নীতিগত সম্মতি জানানোর কারণ ছিল স্রেফ একাত্তরের দায় মোচনের চেষ্টা এবং একাত্তর-পরবর্তী রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত ‘সেক্যুলার’ ভাবাদর্শিক হেজিমনিকে উলটে দেওয়া। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী নেতাদের পেছনে নিজেদের সর্বস্ব ছেড়ে এসে একটি বিপ্লবের জন্য দাঁড়াতে স্বভাবতই তারা রাজি ছিল না। 

ফলে, পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, তাদের কৌশল ছিল, বৈষম্যবিরোধী নেতারা যদি এই বিপ্লব করে ফেলতে চায়, তাহলে জামায়াত তাদের লজিস্টিক্স সহায়তা দেবে; বিপ্লবটা করে ফেলতে পারলে নিজেদের ‘স্টেক’ ও নেতৃত্ব দাবি করবে। কিন্তু নিজেরা গতানুগতিক ভোটের রাজনীতি থেকে সরে আসবে না। এসব কারণেই জামায়াত সরকারের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের বাইরে যায়নি; কিন্তু বৈষম্যবিরোধী নেতাদের প্রায় সকল দাবিতে নীতিগত সমর্থন দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। এতে একদিকে তারা নিজেদের ‘সংস্কারপন্থী’ ও বিএনপিকে ‘সংস্কারবিরোধী’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে; অন্যদিকে সরকার বা স্টাব্লিশমেন্টকেও খুব বেশি বিরক্ত না করে ভোটের মাঠ গোছানোর কাজ করে গেছে। পরবর্তীতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় তাদের কোনো কোনো নেতা ১০৬-এর ভিত্তিতে সরকারের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, সেটা ছিল জামায়াতের কৌশলগত আচরণ। কারণ শুরুতে তারা এই সরকারকে অন্য সবার মতো বৈধ হিসেবে মেনে নিয়েছিল; ১০৬ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে নাই। 

৫. রাজনৈতিক ঐকমত্যের বাইরে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী নেতারা কি এককভাবে একটা ‘ঘোষণাপত্র’ দিতে পারতেন? এই প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই ওঠে। নিশ্চয়ই গণ-অভ্যুত্থানের আড়াই মাস পরে এককভাবে এটা জারি করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শুরুতে? আগস্টের ৫-৮ তারিখের মধ্যে কি তারা এটা পারতেন? উত্তর হল: না। এর কিছু কারণ আছে। প্রথমত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব ছিল বিকেন্দ্রিত, আনুভূমিক ও স্বতঃস্ফূর্ত: সমাজের নানা গোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে একটি সাধারণ অভিমুখে রওয়ানা দিয়েছিল বলেই গণ-অভ্যুত্থান সম্ভব হয়ে উঠেছিল। ৫ আগস্টের পর অভ্যুত্থানের ‘স্টেক’ বা ‘ভূমিকা’ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির নেতাদের বাহাস এবং খোদ নেতাদেরই ভেতরকার বাহাস থেকে এই অভ্যুত্থানের ধরন সম্পর্কে বেশকিছু গুরুতর ইশারা পাওয়া যায়।  

‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ কোনো আদর্শিক প্লাটফর্ম ছিল না। এখানে বিচিত্র মতাদর্শের, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরুণেরা ছিলেন। এরমধ্যে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ থেকে আসা অংশটি আন্দোলনের একদম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেও, তাদের কোনো জমাট বিপ্লবী মতাদর্শ কিংবা রাষ্ট্রকল্প ছিল না। এই তরুণেরা আওয়ামী আমলের ভয়াবহভাবে বিভাজিত সাংস্কৃতিক রাজনীতির—তথা, ‘ডান-বাম’ কিংবা ‘ইসলামপন্থী-সেক্যুলার’ বিভাজনের—বাইরে বেরুতে চাইছিলেন; এবং এই দ্বন্দ্বগুলো সমাধানের মাধ্যমে আওয়ামী দুঃশাসনের অবসান চাইছিলেন। তারা ‘বাম-ডান’-এ বিভাজিত তরুণদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজটি করছিলেন। কিন্তু এদের কোনো ‘বিপ্লবী মতাদর্শ’ বা ‘রাষ্ট্রকল্প’ ছিল না; সংঘবদ্ধ মাঠের শক্তিও ছিল না। বরং পেছন থেকে রাজনৈতিক দলগুলো এই মাঠের শক্তির যোগান দিয়েছে। এছাড়া নাগরিক সমাজের প্রায় সর্বস্তরের জনগণই যার যার জায়গা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছেন। বিগত প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যে গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রাম চলছিল, তা জুলাইয়ের ঐ মুহূর্তটিতে এসে একীভূত হয়ে বিস্ফারিত হয়েছে। ফলে সারাদেশ মূলত একটা ‘না’-তে একমত হয়েছিল; কিন্তু এই ‘না’ অর্জনের পর কী হবে, সে ব্যাপারে অভ্যুত্থানের সম্মিলিত শক্তির কোনো ঐক্যবদ্ধ ভিশন ছিল না। বিপ্লবের যে সকল ধারণা দুনিয়াবি চিন্তারবাজারে প্রভাবশালী আছে, তাতে যে ধরনের সাংগঠনিক কাঠামো ও অভিকল্প প্রয়োজন, হালজমানার অন্যান্য ‘অভ্যুত্থান’-এর মতো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও তার অনুপস্থিতি ছিল। যে স্বতঃস্ফূর্ততা ও আনুভূমিকতার কারণে জনগণের অভাবনীয় সমাবেশ ঘটেছিল, অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল, তার সেই চরিত্রের ভেতরেই নিহিত আছে বৈষম্যবিরোধী নেতাদের এককভাবে একটা ‘ঘোষণাপত্র’ দিতে না পারার কারণ। এমনকি যদি দিতেনও, সেটার গ্রহণযোগ্যতা ‘দলে’র ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকতো। অর্থাৎ, অন্যভাবে বলা যেতে পারে, সারাদেশ যে ‘না’-তে একমত হয়েছিল, সেই ‘না’-কে ‘হ্যা’-তে রূপান্তর সামগ্রিক ঐক্যমত ও সমঝোতা ব্যতীত সম্ভব ছিল না।   

ছবি: ৩ আগস্ট শহিদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা ঘোষণা 


বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘ছাত্রশক্তি’ অংশের নেতারা কি পারতেন অভ্যুত্থানের পরপরই পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক হতে? নিজেদের মতো রাষ্ট্রকল্প প্রস্তাব ও বাস্তবায়ন করতে? হয়ত পারতেন, হয়ত পারতেন না। তবে তারা সেই চেষ্টাটা করেন নাই। এবং হয়ত যৌক্তিক কারণেই করেন নাই। কারণ, আসলে তাদের সেরকম কোনো ‘রাষ্ট্রকল্প’ তখনও জমাট বেঁধে ওঠে নাই। ৩ আগস্ট শহিদ মিনারে ‘এক দফা’র ঘোষণায় তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক (পরবর্তীতে প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও পরে এনসিপির আহ্বায়ক) নাহিদ ইসলাম ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’—এ দুটি শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন বটে; কিন্তু আওয়ামী সরকারের পতনের বাইরে এগুলোর কোনো স্পষ্ট অর্থ, মর্ম বা তাৎপর্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় হাজির ছিল না। অভ্যুত্থানের পরেও এই নেতারা সেগুলো স্পষ্টভাবে হাজির করতে পারেন নাই। এই ব্যর্থতার বেশ সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক (পরবর্তীতে প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, ও পরে এনসিপির মুখপাত্র) আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ২০২৫ সালে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগের মাসখানেক আগে তিনি বলেন: “খুব জনপ্রিয় একটা শব্দ ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এখনও জানি না যে আসলে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তটা কী জিনিস। কেউ যদি পপুলিস্ট (লোকপ্রিয়) কর্মকাণ্ড করে, সেটাই কি নতুন বন্দোবস্ত? এর রূপরেখা কী? কোনো লিখিত রূপ কি আছে? যারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের রাজনীতি করছেন, তারা কি এটা দিতে পেরেছেন?”

তাছাড়া মাঠের বাস্তবতা তারা জানতেন। নিজেদের শক্তি ও প্রস্তুতির ব্যাপারেও তাদের ধারণা ছিল। অন্যদিকে, অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পিছনে সমাজের নানান শ্রেণি, এমনকি অভিজাত শ্রেণি—যাদের এস্টাবলিশমেন্ট বলে চিহ্নিত করা হয় জনপরিসরে—তাদের গুরুতর ভূমিকা রয়েছে। ফলে, অপ্রস্তুত অবস্থায় ও একটি কল্পনাবিহীন হালতে এই বৃহৎ পরিসরের বাইরে তাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভবও ছিল না।

তাহলে পরবর্তীতে প্রায় আড়াই মাস পরে তারা কেন এরকম একটা ঘোষণাপত্রের দাবি তুলেছিলেন? এটা সত্য যে, এই তরুণদের অনেকেরই প্রকৃত বিপ্লবী খায়েশ ছিল। অনেকেই অপরাপর বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিপ্লবী খায়েশের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরও বিভিন্ন গোষ্ঠী জুলাইকে একটি গণ-বিপ্লবে রূপ দিতে চাইছিলেন। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী নেতারা সেসময় মাঠের এই মোমেন্টামকে কাজে লাগিয়ে মূলত নিজেদের রাজনৈতিক লাইন বা এজেন্ডাগুলো হাজির করেছেন; এবং বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে নিজেদের নতুন উত্থানের জানান দিতে চেয়েছেন। রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের আবির্ভাবের ঘোষণা দেওয়াই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, তারা বিপ্লবের এই রেটরিককে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা উৎপাদনের কাজটিই কেবল করেছেন; কোনো বাস্তবিক ‘বিপ্লব’-এর দিকে যাওয়ার সাহস বা পরিকল্পনা তাদের আদতে ছিল না।

৩.




 সমকাল, ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আসলে কী এখনও আমরা জানি না: আসিফ মাহমুদ’, ৭ নভেম্বর ২০২৫

অবশেষে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার যে ঘোষণাপত্রটি প্রকাশ করে, সেটির চরিত্র তাই আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। ২৮ টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত দীর্ঘ এই ঘোষণাপত্রটি লেখা হয় মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রের স্টাইলে। এই ঘোষণাপত্র অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতার নতুন আইনি ভিত্তি দিতে পারেনি; বরং এটা সরকারের আইনি, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বৈধতা পুনঃর্ব্যক্ত করেছে কেবল। এটা একটা রাজনৈতিক দলিল বা স্মারক হতে পেরেছে; কোনো আইনি ভিত্তিসম্পন্ন ‘বিপ্লবী ইশতেহার’ হতে পারে নাই। বিদ্যমান বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সেটি করা সম্ভবও ছিল না অবশ্য।


ছবি: জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস


ঘোষণাপত্রের ২০ নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক, ‘জনগণের দাবি অনুযায়ী’ এবং ‘সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের মতামতের আলোকে সাংবিধানিকভাবে’ অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার কথা বলা হয়। এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক বৈধতার ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য পুনঃর্ব্যক্ত হয়েছে। এবং ঘোষণাপত্রটি কবে থেকে কার্যকর হয়েছে/হবে তা নির্দিষ্ট না হওয়ার ফলে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারটি এই ঘোষণাপত্রের ‘আইনি ফলাফল’ হতে পারে নাই।

ঘোষণাপত্রের ২২ নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিদ্যমান সংবিধান ও সকল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধনের অভিপ্রায়’ ব্যক্ত করা হয়েছে। এবং ২৫ নং অনুচ্ছেদে এই সকল ‘প্রতিশ্রুত প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার’ একটি নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে, এই ঘোষণাপত্র অনুযায়ী যাবতীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের একমাত্র পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি নির্বাচিত সংসদ।

ঘোষণাপত্রটিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদদের একটা আনুমানিক সংখ্যা বলা হয়েছে—প্রায় এক হাজার (১৭ নং অনুচ্ছেদ)। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় গেজেটে প্রকাশিত শহিদদের সংখ্যার (৮৩৬ জন) দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে সম্ভবত, কারণ জাতিসংঘের রিপোর্টে শহিদদের সংখ্যা বলা হয়েছে ১৪০০। অন্যদিকে আহতদের কোনো আনুমানিক সংখ্যাও ঘোষণাপত্রে বলা হয় নাই। অর্থাৎ, সরকার তখনও পর্যন্ত শহিদ ও আহতদের একটা সুষ্ঠু তালিকা প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছে; এবং এই ব্যর্থতার ছাপ ঘোষণাপত্রটিতে মুদ্রিত হয়ে থাকল। 

নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে ঘোষণাপত্রটিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি (ভিত্তি না) দেওয়া হবে মর্মে বলা হয়েছে ২৭ নং অনুচ্ছেদে। বলা হয়েছে, সংবিধানের তফসিলে এটিকে যুক্ত করার মাধ্যমে এই স্বীকৃতি দেওয়া হবে। তবে সেটি হবে কিনা, তা একান্তই নির্বাচিত সংসদের উপর নির্ভরশীল থেকে গেছে। আইনি ভিত্তিহীন এ ধরনের রাজনৈতিক দলিল সংবিধানে যুক্ত করার কোনো দৃষ্টান্ত অবশ্য বাংলাদেশের সংবিধানে নাই।

আসলে এই ঘোষণাপত্র অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদ্যমান বাস্তবতাকে পাল্টায় নাই, বরং আনুষ্ঠানিক করেছে কেবল। ফলে এই ঘোষণাপত্রটি ‘আইনি ক্ষমতাসম্পন্ন সাংবিধানিক দলিল’ হয় নাই; বরং ‘সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত একটি রাজনৈতিক দলিল’-এ পরিণত হয়েছে। এটা জুলাইকে পুরাতন আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় এনে, একে একটি আনুষ্ঠানিক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দিয়েছে।  জুলাই ঘোষণাপত্র কেন ৩১ ডিসেম্বর দেয়া সম্ভব ছিল না/হলো না, তার যে ব্যাখ্যা আমরা পূর্বে করেছি, সেটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে সরকারি জুলাই ঘোষণাপত্রের চরিত্র। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলের ভেতরকার নেগোশিয়েটেড বা সমঝোতামূলক দলিল যেমন হওয়ার কথা, তেমনই হয়ে উঠেছে এই ঘোষণাপত্র। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, অভ্যুত্থানের এক বছর পর, ছাত্র-জনতার নয়া বিপ্লবী ঐক্য ও আকাঙ্ক্ষা ভেঙেচুরে পুরাতন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে ঢুকে পড়ার পর, দেশে মিলিটারি ও সিভিল ব্যুরোক্রেসির একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম হওয়ার পর, পুরাতন সংবিধানের আওতায় শপথ নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া এই ঘোষণাপত্র এমনই হওয়ার কথা ছিল। এরচাইতে বেশিকিছু, এই সরকারের, দেওয়া সম্ভবই ছিল না, বা বাস্তবভিত্তিকও ছিল না। 

৪.

বিএনপি এই ঘোষণাপত্রটিকে স্বাগত জানায়। জামায়াত, এনসিপিসহ অন্য কিছু দল ঘোষণাপত্রটি নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা করলেও, এটিকে শেষমেশ স্বাগত জানায় এবং মেনে নেয়। বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত দলগুলো ঘোষণাপত্র পাঠের অনুষ্ঠানটি বয়কট করে। দলগুলোর নেতাদের ভাষ্যমতে, তাদেরকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ঘোষণাপত্র প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা হয়নি বলে তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। 

তবে এই ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে কড়া সমালোচনা আসে সম্ভবত দুজন ব্যক্তির তরফ থেকে: কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার এবং সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী ডেভিড বার্গম্যান।

ফরহাদ মজহার অন্তর্বর্তী সরকারের গঠনকে দেখেছেন ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’ হিসেবে। ফলে এই সরকারের জারি করা ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’টিকেও তিনি এই প্রতিবিপ্লবের ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখেছেন। তার মতে, এটি ‘লুটেরা মাফিয়াদের পক্ষে’ জারি করা ঘোষণাপত্র। ঘোষণাপত্রটির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন যে, “ড. ইউনূসের জুলাই ঘোষণাপত্র দেওয়ার কোনো বৈধ অধিকার নেই আইনগতভাবে। কারণ, তিনি শেখ হাসিনার সংবিধানের অধীনে একজন উপদেষ্টামাত্র। তার কোনো অধিকার নেই। তিনি গণ-অভ্যুত্থানের নেতা নন, তিনি গণ-অভ্যুত্থানের ফলমাত্র।” এই বক্তব্য থেকে মজহারের সমালোচনার উৎসবিন্দুটি শনাক্ত করা যায়। তিনি জুলাইকে একটি গণ-বিপ্লব হিসেবে দেখেন এবং মনে করেন যে, জুলাই ঘোষণাপত্র হওয়া উচিত একটি ‘বিপ্লবী ঘোষণাপত্র’—যা বিদ্যমান সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আইনি অর্থে বাতিল করে দেবে। ফলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা আইনি ভিত্তিহীন ঘোষণাপত্রকে স্বভাবতই তিনি দেখেছেন একটি ‘প্রতিবিপ্লবী’ ঘটনা হিসেবে। তার মতে, বৈষম্যবিরোধী নেতারাই এই ঘোষণাপত্র জারির একমাত্র বৈধ হকদার; অন্য কেউ নয়। তার এই অবস্থানটিকে একটি ধ্রুপদী বিপ্লবী অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। 

অন্যদিকে ১০ টি পয়েন্টে জুলাই ঘোষণাপত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে সবচেয়ে দীর্ঘ, বিস্তারিত এবং তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনা হাজির করেছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী ডেভিড বার্গম্যান। প্রথমত, ডেভিড বার্গম্যানের দৃষ্টিতে, এই ঘোষণাপত্রটি বাংলাদেশের আওয়ামী বিরোধী অংশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ন্যারেটিভে পরিণত হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে আওয়ামী লীগকে ঐতিহাসিকভাবে যে-রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা কেবল তাদের সাম্প্রতিক কার্যকলাপের কারণে না, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক ঐতিহাসিক বিকাশের ধারাবাহিকতায় দলটির মতাদর্শ, রাজনৈতিক ভূমিকা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে এর বিরোধীদের যে তীব্র ঘৃনা ও রাজনৈতিক বিরোধিতা, সে কারণেও বটে। ফলে ঘোষণাপত্রটি একটি প্রতিশোধমূলক মতাদর্শিক ইশতেহারে পরিণত হয়েছে।

বার্গম্যানের মতে, এই ঘোষণাপত্রে ইতিহাসেরও ভয়াবহ বিকৃতি ঘটেছে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের যে বিকৃত ও খণ্ডিত ইতিহাস দিয়ে নিজেদের দুঃশাসন জায়েজ করার চেষ্টা করেছিল, সেটিকে সরিয়ে “তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আরেকটি বর্ণনাকে প্রতিষ্ঠা করছে” এই ঘোষণাপত্র। ১৯৭১ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস


  • New Age, ‘Left parties avoid July Declaration ceremony’, 5 August 2025
  • দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ‘‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ দেওয়া হয়েছে লুটেরা, মাফিয়াদের পক্ষে: ফরহাদ মজহার’, ১৩ আগস্ট ২০২৫
  • ইত্তেফাক, ‘ড. ইউনূসের জুলাই ঘোষণাপত্র দেওয়ার বৈধ অধিকার নেই: ফরহাদ মজহার’, ১২ আগস্ট ২০২৫


পর্যন্ত বাংলাদেশের যে ইতিহাস ঘোষণাপত্রে বর্ণিত হয়েছে, তা কেন ভুল, একপেশে ও বিকৃত—বার্গম্যান এর বিস্তারিত বিবরণ হাজির করেছেন। এই বিবরণে বার্গম্যান ৭২-এর সংবিধান রচনার প্রসঙ্গটিও এনেছেন। তার মতে, “১৯৭১–পরবর্তী ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার’ দায় ‘সংবিধানের খসড়া তৈরির প্রক্রিয়া ও কাঠামোর দুর্বলতার’ ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে”, যা অন্যায্য ও বিভ্রান্তিকর। বার্গম্যানের সন্দেহ, ৭২-এর সংবিধানকেন্দ্রিক এই বিতর্ক এসেছে “বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছ থেকে”, যারা বাংলাদেশে এখন শক্তিশালী এবং নতুন একটি সংবিধানের ন্যায্যতা তৈরি করতে সচেষ্ট। অর্থাৎ, তার মতে, বর্তমানের সংবিধান পরিবর্তনের ‘বৈপ্লবিক’ খায়েশকে জায়েজ করার জন্য ৭২-এর সংবিধান রচনার প্রক্রিয়া ও কাঠামোর সমালোচনা হাজির করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত ‘১০৬ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে সু্প্রিম কোর্টের মতামতের আলোকে’ অন্তর্বর্তী সরকারের যে বৈধতার কথা বলা হয়েছে, সে ব্যাপারে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন যে, তার জানামতে সুপ্রিম কোর্টের ঐ আদেশ কেউ দেখে নি। 

তৃতীয়ত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শহিদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা ও আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে ‘প্রয়োজনীয় সকল আইনি সুরক্ষা’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ঘোষণাপত্রে (অনুচ্ছেদ ২৪)। বার্গম্যানের মতে, ভবিষ্যতে উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক মামলা থেকে আন্দোলনকারীদের এক ধরনের আইনি সুরক্ষা দেওয়া উচিত, তবে “শব্দের ব্যবহার দেখে মনে হয়েছে আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে (যে পরিস্থিতিতেই সেই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটুক না কেন)”। বার্গম্যান মনে করেন, ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত ‘আইনের শাসন’ এখানে লঙ্ঘিত হচ্ছে। 

উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টেও এ প্রসঙ্গটি এসেছে। ঐ রিপোর্টের ২৬১-৬২ নং অনুচ্ছেদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সূচনালগ্ন থেকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সমর্থক, পুলিশ সদস্য, ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর সংঘটিত সহিংসতাগুলোর দ্রুত, স্বাধীন ও যথাযথ তদন্ত ও বিচারের কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি দায়মুক্তি অধ্যাদেশ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। এই রচনা যখন লেখা হচ্ছে, তখনও অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশিত হয়নি; তাই ঠিক কাদের, কেন এবং কোন সময় থেকে কোন সময় পর্যন্ত কী থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে—এ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলা যায় যে, কেবল আইন-আদালত দিয়ে এ ধরনের একটা জাতীয় ক্ষত সারিয়ে তোলা যায় না। জুলাই-পরবর্তী সময়ে একটা ‘ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন প্রসেস’ এবং ট্রানজিশনাল জাস্টিসের হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করে, অভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ের সহিংসতাগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা এবং এর মধ্য দিয়ে একটা কার্যকর ও সুবিচারপূর্ণ ‘দায়মুক্তি ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করতে না পারার ফলে, আমাদের সমাজে


  • Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights (OHCHR), Fact-Finding Report: Human Rights Violations and Abuses related to the Protests of July and August 2024 in Bangladesh, 12 February 2025, p. 61

নানারকম ক্ষত ও জখম রয়ে গেছে। রয়ে গেছে অনেক আইনি প্রশ্ন। এগুলা অ্যাড্রেস করতে না পারা এই সরকারের চরম ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা পপুলিজম দিয়ে ঢাকা যাবে না; এগুলো বাস্তব সমস্যা। এ ব্যাপারে আশু উদ্যোগ না নিতে পারলে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার নিরাপত্তার প্রশ্ন কিংবা আওয়ামী লীগ প্রশ্ন—সার্বিকভাবে জাতীয় রিকনসিলিয়েশনের প্রশ্নগুলো মোকাবেলা করা দিন দিন আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

চতুর্থত, বার্গম্যান এই ঘোষণাপত্রকে সংবিধানে যুক্ত করার বিরোধিতা করেন; পাশাপাশি এই ঘোষণাপত্রের সাথে যুক্ত থাকায় ড. ইউনূসেরও তীব্র সমালোচনা করেন। এছাড়া তিনি ঘোষণাপত্রটির কয়েকটা দিকের প্রশংসাও করেন। একদম শেষ পয়েন্টে (১০ নং) বার্গম্যান তার সমালোচনার মূলকথাটি বলেছেন। তার মতে, “এই ঘোষণাপত্র আরও সংক্ষিপ্ত হতে পারত। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে ১ ও ২ নম্বর অনুচ্ছেদ ছাড়া এই ঘোষণাপত্রে আর কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা উচিত হয়নি।”

ঘোষণাপত্রের রচনাপদ্ধতি, ফেনানো কলেবর ও মতাদর্শিক দিক নিয়ে প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন লেখক ও চিন্তক পারভেজ আলম। তার মতে, জুলাই মাসে আন্দোলন চলাকালেই অনেকগুলো ছোট ছোট বিপ্লবী ঘোষণাপত্র রচিত হয়েছিল। সেগুলোকে একটু সম্পাদনা করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ‘অ্যাডেন্ডাম’ হিসেবে যুক্ত করে দিলেই জুলাই একটি প্রকৃত ঘোষণাপত্র পেতে পারত, যা বিপ্লবকালে (সংবিধান অকার্যকর থাকাবস্থায়) ‘জনগণের সংবিধান’


  • ট্রানজিশনাল জাস্টিসের গুরুত্ব নিয়ে আলাপের জন্য দেখতে পারেন: সহুল আহমদ, ‘সহিংসতা, পরিচয় এবং ক্রান্তিকালীন পরিচয়ের সন্ধানে’, সিল্করুট ঈদসংখ্যা, ২০২৫
  • প্রথম আলো, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে ডেভিড বার্গম্যানের অভিমত’, ৬ আগস্ট ২০২৫
  • পারভেজ আলম এরকম একটি ঘোষণাপত্রের হদিশ দিয়েছেন তার একটি ফেসবুক পোস্টে (৩ আগস্ট ২০২৫)। তার মতে, এই ঘোষণাপত্রটি ৩৪ জুলাই তথা ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়। যদিও, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণাপত্র প্রচারিত হয় নাই। ঘোষণাপত্রটি এই: 

​এক দফা ঘোষণাপত্র

​যেহেতু, বর্তমান সরকারের নির্দেশে নির্বিচারে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। নারী-শিশু-ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক কেউ ​এই গণহত্যা থেকে রেহাই পাননি।

​যেহেতু, সরকার এই হত্যাযজ্ঞের বিচার করার পরিবর্তে নির্বিচারে ছাত্র-জনতাকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করছে।

​যেহেতু, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মরণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাযজ্ঞ সংঘটন ​ ​করেছে।

​যেহেতু, ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক-মজুরসহ আপামর জনগণ মনে করছে এই সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ বিচার এবং ​তদন্ত সম্ভব নয়।

​সেহেতু, আমরা বর্তমান স্বৈরাচারী সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করছি।

​একই সাথে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার ​গঠনের দাবি জানাচ্ছি।

​বার্তা প্রেরক,
​মোঃ মহিউদ্দিন
​সহ-সমন্বয়ক
​বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

হিসেবে, এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ‘সংবিধান ব্যাখ্যার একটি মানদন্ড হিসেবে’ কাজ করতে পারত।  পারভেজ আলমের মতে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও জুলাই মাসে প্রচারিত ঘোষণাপত্রগুলো বেশ সরাসরি ও সুসংহত; দীর্ঘ ‘ঐতিহাসিক বয়ানের বোঝা’ মুক্ত। কারণ এগুলো বিপ্লবের মুহূর্তকেই কেবল ধারণ করে। এবং ঘোষণাপত্রের তেমনই হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমান সরকারের জারি করা ঘোষণাপত্রটি তেমন না। পারভেজের মতে, এটি ‘অনেক বেশি কিউরেটেড’ ও ‘মতাদর্শিকভাবে প্রভাবিত’।

এটা ঠিক যে, ঘোষণাপত্রটি আরো ছোট হতে পারত; এবং সেটা হওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু যেহেতু এটা জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কে ধারণ করা কোনো ‘বিপ্লবী’ ঘোষণাপত্র ছিল না, বরং ছিল অভ্যুত্থানের প্রায় এক বছর পর রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে রচিত একটি সমঝোতা স্মারক, তাই এটা এমনই হওয়ার কথা ছিল আসলে। তবে সেক্ষেত্রেও, এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক জাতীয় ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে যে সতর্কতা ও সংযমের পরিচয় দেওয়া উচিত ছিল সকল পক্ষের, তা যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি। এই অংশে বরঞ্চ ইতিহাসের এক বয়ান দিয়ে আরেক বয়ানকে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। ইতিহাস নিয়ে রাজনীতি করা এবং ইতিহাসকে এস্তেমাল করে রাজনৈতিক বৈধতা হাসিলের যে প্রাণপণ কোশেশ আমাদের রাজনীতিতে চলে আসছে বিগত পঞ্চাশ বছর যাবত, এটা যেন তারই স্মারক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, আমাদের জনপ্রিয় ও বিদ্যায়তনিক পরিসরের ইতিহাসপাঠ, পদ্ধতি ও চেতনার সমূহ দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও আমরা এই মতাদর্শিক বয়ানের ‘প্রতিস্থাপন’কে পাঠ করতে পারি। এইদিক থেকে ইতিহাস-অংশে ঘোষণাপত্রের যে দুর্বলতা, এটা আমাদের সামূহিক দুর্বলতারই অংশ। আমাদের আফসোস হচ্ছে এই, যে সঙ্কীর্ণ দলীয় ইতিহাসচর্চা ও পদ্ধতির ক্রিটিক করতে করতে চব্বিশে এসে আমরা উপনীত হয়েছিলাম, চব্বিশের পর সেটাকেই আবার যেন আঁকড়ে ধরা হলো। 

৫.

ডেভিড বার্গম্যানের সমালোচনার দুই-একটি দিক নিয়ে সংক্ষেপে কথা বলা দরকার। ৭২-এর সংবিধান নিয়ে বিতর্ক এবং জুলাই-পরবর্তী সংবিধান বিতর্কে এর প্রভাব ও পরবর্তী গতিপথ নিয়ে বিস্তারিত আলাপের সুযোগ এখানে নাই। অন্যদিনের জন্য সে আলাপ আমরা তুলে রাখলাম। এখানে কেবল এতটুকু বলে রাখা দরকার যে, ৭২-এর সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন ও কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে সেই ১৯৭২ সালেই বেশ তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এবং এই সংবিধান প্রণয়নের জন্য গঠিত গণপরিষদের ভিত্তি নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব প্রশ্ন ও সমালোচনা এসেছিল প্রধানত বামপন্থীদের তরফ থেকে। এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্য থেকেও বেশ কিছু তর্ক ও সমালোচনা উঠে এসেছিল। বিগত এক দশকজুড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সঙ্কটের উৎসের খোঁজে বিদ্যমান সংবিধানের অলিগলিতে ঘোরাঘুরি ছিল জনপ্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ। বিদ্যায়তনিক জগতের লোকজন থেকে শুরু করে


  • সূত্র: ২০২৫ সালের ৩ ও ৫ আগস্ট পারভেজ আলমের লিখিত দুটি ফেসবুক পোস্ট
  • এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: ফিরোজ আহমেদ, ‘বাংলাদেশের সংবিধান: উপনিবেশের উত্তরাধিকার’, ৮ অক্টোবর ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ দর্শন সংঘ’ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়ন তত্ত্ব’ শীর্ষক বক্তৃতা, পরবর্তীতে ‘রাষ্ট্রচিন্তা’ ব্লগে প্রকাশিত।

বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক মহল ধারাবাহিকভাবেই বাহাত্তরের সংবিধানের কাঠামোগত দুর্বলতা, বা এর একব্যক্তিকেন্দ্রীক শাসনকাঠামোর বিস্তর সমালোচনা করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পরপর যে ‘সংবিধান’ বড় ইস্যু হয়ে উঠেছিল, তার প্রধান কারণ তৎপরতার এই ইতিহাস। জুলাই-পরবর্তী সময়ে বামপন্থীদের প্রণীত সেসব যুক্তি ও তর্কের উপর দাঁড়িয়েই ৭২-এর সংবিধান বাতিল করে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা সংবিধান পুনর্লিখনের ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী নেতারাসহ ডানপন্থী ও ইসলামপন্থী দলগুলোও বেশ জোরালোভাবে একটি নতুন সংবিধানের কথা বলতে থাকে।

তবে জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় ডানপন্থী ও ইসলামপন্থী দলগুলোর এ ধরনের প্রচারণাগুলো সঙ্গত কারণেই সফল হতে পারেনি। ৭২-এর সংবিধানকে পালটে ফেলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উলটে দেওয়াই তাদের আসল উদ্দেশ্য কিনা—এই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বামপন্থীদের ৭২-এর সংবিধান-বিরোধী যুক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিলো ৭২-এর সংবিধানকে ‘অধিকতর গণতান্ত্রিক’, ‘সমাজতান্ত্রিক’, ‘মৌলিক অধিকারভিত্তিক’ ও ‘বিউপনিবেশিত’ করে তোলা; সংবিধানকে ‘স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ার’ হওয়া থেকে রক্ষা করা। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় ডানপন্থী ও ইসলামপন্থী দলগুলোর ৭২-এর সংবিধানের বিরোধিতার উৎস কী—তা নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংবিধানটি প্রণয়নকালে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা বেশ কোনঠাসা ছিল রাজনৈতিকভাবে। তবু তাদের বিশেষ কোনো লিখিত ও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ, এই সংবিধানের ব্যাপারে, পাওয়া যায় না। বামপন্থী সমালোচনার উপর ভর করে গড়ে ওঠা ৭২-এর সংবিধান বিরোধিতাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যমান সংবিধানকে বাতিল করে, তারা মূলত একটি ‘অধিকতর ধর্মবাদী’ সংবিধানই তৈরি করতে চান কিনা—সে প্রশ্ন উঠেছে; কারণ ৭২-এর সংবিধান তারা কেন বাতিল করতে চান, এর কোনো গ্রহণযোগ্য, সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেননি। ‘৭২-এর সংবিধান খারাপ ও স্বৈরতন্ত্রের প্রধান উৎস’—বামপন্থীদের তৈরি করা যুক্তিকাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে এরকম একটি সাধারণীকৃত বক্তব্যের ভিত্তিতেই তারা ৭২-এর সংবিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু কেন এটি খারাপ, এর পরিবর্তে তারা কেমন সংবিধান চান এবং সেটি কেন ভালো, বা সেই সংবিধান স্বৈরতন্ত্রের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে পারবে কিনা—এ ব্যাপারে কোনো সিরিয়াস আলোচনা ডানপন্থী বা ইসলামপন্থী দলগুলো করেনি। এমনকি বৈষম্যবিরোধী নেতারাও সে জায়গাগুলো পরিষ্কার করতে পারেন নাই। ফলে তারা ঠিক কেন সংবিধান বাতিল চান, এবং বাতিল করে ঠিক কোন ধরনের সংবিধানের দিকে যেতে চান—তা স্পষ্ট ছিল না। 

মোটকথা, ৭২-এর সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন প্রক্রিয়া ও কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে যেসব জনপ্রিয় সমালোচনা অ্যাকাডেমিয়া বা জনপরিসরে বিদ্যমান, সেসবের প্রায় সবটাই বিভিন্ন বামপন্থী দল ও ব্যক্তির, এবং খোদ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ধারার চিন্তা থেকে উৎপাদিত। এসব সমালোচনার ব্যাপারে ইসলামপন্থী বা ডানপন্থীদের চিন্তা কী—তার বিস্তারিত কোনো বিবরণী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে হাজির নাই। বরং তাদের সংবিধান বিষয়ক সমালোচনা


  • ফরহাদ মজহার, সংবিধান ও গণতন্ত্র, আগামী প্রকাশনী, ২০১৪ (তৃতীয় মুদ্রণ); আকবর আলি খান, অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি, প্রথমা প্রকাশন, ২০১৭; আলী রীয়াজ, নিখোঁজ গণতন্ত্র, প্রথমা প্রকাশন, ২০২১; Ali Riaz, Pathways of Autocratization: The Tumultuous Journey of Bangladeshi Politics, Routledge, 2024; ফিরোজ আহমদ, প্রাগুক্ত
  • বাংলাদেশের সংবিধান পর্যালোচনা, গণতান্ত্রিক আইন ও সংবিধান আন্দোলন, ২০১৩

প্রায়শই ‘রাষ্ট্রধর্ম’ থাকা/না থাকা, সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ থাকা/না থাকা, রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ‘সেক্যুলারিজম’ থাকা/না থাকা, সংবিধানে তাদের মতে ‘ধর্মবিরোধী’ কিছু থাকা/না থাকা, ‘ব্লাসফেমি আইন’ থাকা/না থাকা, কাউকে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করা/না করা—এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই আবির্ভূত হয়েছে, সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। তাই দেখা যায় যে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের রাজনীতিতেই, ইসলামপন্থীরা সামরিক শাসকদের মাধ্যমে সংবিধানের ‘পপুলিস্ট ধর্মীয়করণ’কে স্বাগত জানিয়েছেন; বিপরীতে সামরিক শাসনের স্বৈরতান্ত্রিক দিকগুলো নিয়ে এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোগত সমস্যাগুলো—ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকারের উপর রাষ্ট্রীয় খবরদারি, বিভিন্ন কালা কানুন ইত্যাদি—নিয়ে তারা কোনো পর্যালোচনা বা আন্দোলন গড়ে তোলেন নাই। এমনকি পতিত আওয়ামী সরকারের দুঃশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে, ৭২-এর গণপরিষদের ন্যায্যতা কিংবা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোগত ত্রুটিগুলোর বিরোধিতা ইসলামপন্থী বা ডানপন্থীদের রাজনৈতিক এজেন্ডাভুক্ত ছিলই না কখনো। যা ছিল সেটা, কিছু কিছু ইসলামপন্থী দলের ক্ষেত্রে, নির্বাচনে ‘পিআর’ ব্যবস্থা কায়েম করায় সীমিত ছিল। 

এখানে উল্লেখ করা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ৭২-এর সংবিধান সংক্রান্ত আলাপে, বামপন্থী সমালোচকদের বাইরে ভিন্ন মতাবলম্বীদের যুক্তি ও তর্কগুলো আমাদের জনপরিসরে এখন আর বিশেষ চর্চিত হয় না। ৭২-এর সংবিধান নিয়ে আজ যে ধরনের আলাপ-আলোচনা চলছে তা যে সেসময় নিরঙ্কুশ মতামত ছিল না, এবং বামপন্থীদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও অনেক প্রকৃত গণতান্ত্রিক চিন্তক (যাদের কেউ কেউ জুলাই-পরবর্তী সময়ে ডানপন্থী মহলেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন) যে এই সংবিধানটির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, সংবিধানের দোষ-ত্রুটির চেয়ে এর প্রয়োগ-পদ্ধতিকেই গণতন্ত্রের জন্য বেশি প্রয়োজনীয় ভেবেছিলেন—তারও বহু নজির রাজনৈতিক সাহিত্যে পাওয়া যায়।


  • জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত মরহুম গোলাম আযমের পর্যালোচনা থেকে, ৭২-এর সংবিধানের ব্যাপারে ইসলামপন্থীদের মৌলিক আপত্তির এই ধরনটি বোঝা যেতে পারে। তিনি লেখেন: 

১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রণীত শাসনতন্ত্রের যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল তা নিম্নে উল্লেখ করেছি:

  1. ঐ শাসনতন্ত্রে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' লেখা ছিল না। এমনকি আল্লাহ শব্দটিও ছিল না।
  2. রাষ্ট্র-পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে নিম্নরূপ ৪টি আদর্শ লেখা ছিল:

​(ক) ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ, (খ) জাতীয়তাবাদ, (গ) গণতন্ত্র ও (ঘ) সমাজতন্ত্র।

3. ধর্মের ভিত্তিতে কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করা নিষিদ্ধ ছিল।

  • যেমন: লেখক, চিন্তক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ। এ ব্যাপারে তার চিন্তা জানতে দেখুন: আবুল মনসুর আহমদ, বেশী দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা, ‘আমাদের কাজ শেষ হয় নাই, শুরু হইয়াছে মাত্র’ (১ সেপ্টেম্বর ১৯৭২) এবং ‘বাংলাদেশ সরকার কি বিপ্লবী সরকার, না নির্বাচিত সরকার?’ (৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭২), আহমদ পাবলিশিং হাউজ, প্রথম সংস্করণ ১৯৮২, পৃ. ১৭-২৮; আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, ২০১৩, পৃ. ৬১৫-২২; আবুল মনসুর আহমদ, সংবিধান: রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র ভাবনা, (সম্পা.) ইমরান মাহফুজ, আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পরিষদ, ২০২৪।


৬.

বার্গম্যান ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকে সরকারের বৈধতার ব্যাপারে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, সেটি নিয়ে জুলাই-পরবর্তী সময়ে বেশ উত্তপ্ত আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। নানা কারণে এই সরকারকে যারা একটি ‘বিপ্লবী’ সরকার হিসেবে দেখতে আগ্রহী ছিলেন তারা, এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও, ১০৬-এর আলোকে এই সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। 

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঠিক পরপরই এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন চিন্তক ফরহাদ মজহার। তার মতে, গণ-অভ্যুত্থানের ফলে বিদ্যমান সংবিধান বাতিল হয়ে গেছে। এখন সংবিধান সভা বা গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। তার আগ পর্যন্ত ড. ইউনূসের ‘বিপ্লবী’ সরকারের অধ্যাদেশই হবে আইন। ড. ইউনূস প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে এই অধ্যাদেশ জারি করবেন। তাই ৮ আগস্ট সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা মেনে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের (চুপ্পু) কাছে শপথ নিয়ে গঠিত সরকারটিকে তিনি ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’ হিসেবে দেখেন। 

১০৬ অনুচ্ছেদ নিয়েও তিনি স্বভাবতই প্রশ্ন তোলেন। তিনি লেখেন: 

​শেখ হাসিনা পালিয়ে যাবার পর রাষ্ট্রপতি ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত চান, যাতে নতুন ​সরকারকে আইনী বৈধতা দেওয়া যায়। কিন্তু একটি  প্রশ্ন অমীমাংসিত বা রহস্যাবৃত রয়ে গিয়েছে। সেটা হোল ​সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট থেকে রেফারেন্স নিয়ে যে সরকার বানানো হোল সেই ​ ​রেফারেন্সের সিদ্ধান্ত কিভাবে, কোথায়, কোন্‌ সাংবিধানিক যুক্তি বা বিধান অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে? এই সিদ্ধান্ত ​গ্রহণের ক্ষেত্রে কারা কারা ছিলেন? সুপ্রিম কোর্ট কার কার সঙ্গে পরামর্শ করেছে? তাদের সাংবিধানিক বা আইনী ​যুক্তি কি ছিল? যেহেতু সংবিধান পুনর্বহাল করা হয়েছে, অতএব আজ হোক কিম্বা কাল—এর জন্য অবশ্যই ​আদালতে কিম্বা রাজনীতির মাঠে সংশ্লিষ্ট সকলকেই জবাবদিহি করতে হবে।

এছাড়া সুনামগঞ্জ-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আইনজীবী শিশির মনির জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায়ও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “এখানে ১০৬-এর শেল্টারটা যে নেওয়া হল, কে নিল? কারা নিল? কীভাবে নিল? এটা একটা মিস্টিরিয়াস (রহস্যজনক) ব্যাপার।…অ্যাডভাইজরি অপিনিয়নের (উপদেষ্টামূলক মতামত) কপিটা আমার কাছে আছে। এই অ্যাডভাইজরি অপিনিয়নের কপির মধ্যে কোনো আইনজীবীর নাম তো দেখি না। শুধু আছে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল। আর কেউ নাই। ইট ওয়াজ নট ইভেন হিয়ার্ড; উই ওয়্যার ইন দ্য কোর্ট; ইট ওয়াজ নট ইভেন হিয়ার্ড বাই দ্য কোর্ট (কোর্টে এর শুনানিও হয় নাই; আমরা কোর্টে ছিলাম)। এই জিনিসটা কিন্তু চ্যালেঞ্জে পড়বে একদিন, উই অল শুড বি অ্যাওয়ার অব দ্যাট (আমাদের সবার এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া দরকার)।” 


  •  ফরহাদ মজহার, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’, চিন্তা ওয়েবজিন, ৩০ নভেম্বর ২০২৫


এছাড়া আওয়ামী লীগের অফিশিয়াল পেজ থেকে ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, ‘RP Station by Rokeya Prachy’ নামক একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত ড. মাসুম বিল্লাহ নামক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের একজন অধ্যাপকের একটি আলোচনা শেয়ার দেওয়া হয়। আলোচনাটির শিরোনাম ছিল: ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আইনগত ভিত্তি: অনুচ্ছেদ ১০৬ এর ভেদ’। এই আলোচনায় জনাব মাসুম বিল্লাহ ১০৬-এর ভিত্তিতে সরকার গঠনের ব্যাপারটিকে ‘ফ্রড অন কন্সটিটিউশন’ (সংবিধানের সাথে জোচ্চুরি) হিসেবে অভিহিত করেন। পাশাপাশি ১০৬ অনুচ্ছেদ বা ‘স্টেট নেসেসিটি ডকট্রিন’—কোনো সাংবিধানিক আইন দিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘বৈধ’ আখ্যা দেওয়া যায় না বলে মত প্রকাশ করেন। 

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন রশিদ হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। তার আবেদনে দু’টি বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। প্রথমত, তিনি দাবি করেন, মতামতটি অবৈধভাবে আদায় করা হয়েছে; যথাযথ নোটিশ দেয়া হয়নি। এ ছাড়া বিচারকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে; তাই অন্তর্বর্তী সরকারকে অবিলম্বে একটি ‘প্রভিশনাল ইন্টেরিম কনস্টিটিউশন’ প্রণয়ন করতে হবে। হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি এই রিট খারিজ করে দেন। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ আদেশ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কোনো আইনি দলিল দিয়ে সমর্থিত নয় বলে রিট আবেদনকারীর (আইনজীবী মোহাম্মদ মহসিন রশিদ) বক্তব্যে এসেছে। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উপদেশমূলক মতামত গ্রহণ করেন। মতামত অনুযায়ী কাজ করেছেন। তাই এটি আইনি দলিল দিয়ে সমর্থিত, বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার দ্বারা সমর্থিত। পূর্ণাঙ্গ আদেশে আরও বলা হয়, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, তা আমাদের ইতিহাসের অংশ। এবং আশা করি, আগামী বহু বছর ধরে জনগণ যত্নে থাকবে।’ রিটটি ভ্রান্ত ধারণা, বিদ্বেষপ্রসূত ও হয়রানিমূলক বলে উল্লেখ করে তা সরাসরি খারিজ করার কথা বলেন হাইকোর্ট।

পরবর্তীতে মোহাম্মদ মহসিন রশিদ সুপ্রিম কোর্টে ‘লিভ টু আপিল’ করেন। এই শুনানিতে পক্ষভুক্ত হন লেখক ও চিন্তক ফিরোজ আজমেদ, তার পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট শরিফ ভূঁইয়া। আরো পক্ষভুক্ত হন ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও অ্যাডভোকেট শিশির মনির; পক্ষভুক্ত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন, তার পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। পরে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই আপিল খারিজ করে দেন। ফলে ১০৬ অনুচ্ছেদ বা সরকারের বৈধতা নিয়ে বিতর্কের আর কোনো সুযোগ নাই। 


  •  https://www.facebook.com/share/p/1HZuFUQ5Yb/
  • প্রথম আলো, ‘রেফারেন্স–মতামতপ্রক্রিয়া নিয়ে রিট খারিজের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলের শুনানি শেষ’, আদেশ কাল, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫

এ প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহারের অবস্থান ধ্রুপদী বিপ্লবী অবস্থান। আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বাভাবিকভাবেই মানে না, তাই তার ‘বৈধতা’ নিয়েও সে স্বভাবতই প্রশ্ন তুলবে। কিন্তু শিশির মনির কেন এই প্রশ্নটি তুলেছিলেন? সম্ভবত, নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সে লক্ষ্যে পিসিও (প্রভিশনাল কন্সটিট্যুশনাল অর্ডার) জারি করার জন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। কারণ, শিশির মনির ১০৬ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের বহাল থাকা বা তার হাতে উপদেষ্টা পরিষদের শপথ নেওয়া প্রসঙ্গে কিছু বলেন নাই। যদি এই সরকার ‘বিপ্লবী’ সরকার হয়, তাহলে তার এখতিয়ার ও ম্যান্ডেট কতটুকু, কেন সে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন দিতে বাধ্য, বা কেন সে নিজেই সংবিধান বাতিল করে ফেলতে পারবে না বা করবে না—সে বিষয়েও শিশির মনির নীরব। ফলে শিশির মনিরের ১০৬ নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্ন ঠিক ধ্রুপদী বিপ্লবী অবস্থান না; বরং এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থান। 

৭.

জুলাইয়ের বিকেন্দ্রিত বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা, গণ-অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট নিয়ে সাংবিধানিকভাবে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জটিল ধরন ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান—এই তিনের টানাপোড়েন শেষমেশ যে জাতীয় আকাঙ্ক্ষায় থিতু হয়েছে, তার আলঙ্কারিক নাম: সংস্কার। রাষ্ট্র সংস্কারের ডাক এদেশে নতুন নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগ থেকেই বেশ কিছু রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্লাটফর্মের কারণে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’র এই ধারাণাটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। ‘রাষ্ট্রচিন্তা’ ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’-এর মতো প্লাটফর্ম, কিংবা ‘গণসংহতি আন্দোলন’-এর মতো রাজনৈতিক দলগুলো জুলাইয়ের বেশ আগ থেকেই রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলে আসছিল। এসব দলসহ আরো কিছু রাজনৈতিক দলের জোট ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’-এর সাথে যুগপৎ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বিএনপির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলও সংস্কারকে নিজেদের দলীয় এজেন্ডাভুক্ত করেছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে এই সংস্কারের প্রায়োগিক ক্ষেত্র তৈরি হয়। তবে কীভাবে ও কতটুকু হবে এই সংস্কার—সেটাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রথম ধাপে ৬ টি, এবং পরে আরো ৫ টি—মোট ১১ টি কমিশন তৈরি করে। এগুলো হল: ১. জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন; ২. দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন; ৩. বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন; ৪. পুলিশ সংস্কার কমিশন; ৫. নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন; ৬. সংবিধান সংস্কার কমিশন; ৭. শ্রমখাত সংস্কার কমিশন; ৮. নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন; ৯. স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন; ১০. গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন; ১১. স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন।

এই কমিশনগুলোর সুপারিশমালা পর্যালোচনা করে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ড. ইউনূসকে সভাপতি ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রিয়াজকে সহ-সভাপতি করে গঠিত হয় ৭ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’। এই কমিশন তিন দফায় মোট ৭২ দিন ৩৩ টি রাজনৈতিক দল ও জোট এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ পক্ষের সাথে আলোচনা চালিয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে কমিশনের মেয়াদ ছিল কার্যক্রম শুরুর তারিখ থেকে ছয় মাস। পরবর্তীতে সরকার কর্তৃক জারীকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ‌্যমে ১১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে একবার এবং ১৫ সেপ্টেস্বর ২০২৫ তারিখে আরেকবার ১ মাস করে দুই দফায় কমিশনের মেয়াদ মোট ২ মাস (১৫ অক্টোবর, ২০২৫ পর্যন্ত) বৃদ্ধি করা হয়। প্রাথমিকভাবে ১৬৬ টি সিদ্ধান্তের একটি স্প্রেডশিট ধরে আলোচনা শুরু হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মোট ৮৪ টি সিদ্ধান্তে (বিভিন্ন পক্ষের কিছু ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ) একমত হয় রাজনৈতিক পক্ষগুলো। 


ছবি: জাতীয় ঐকমত্য কমিশন


এরপর গত ১৬ আগস্ট এই সনদের খসড়া কপি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়, এবং ২২ আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণ করা হয়। এরপর তৃতীয় দফায় দলগুলোর সাথে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই প্রক্রিয়ায় গত ১৪ অক্টোবর সনদের চূড়ান্ত কপি সকল রাজনৈতিক দলের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ১৭ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ সই করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ও সদস্যবৃন্দ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দুজন করে প্রতিনিধি এই সনদে সই করেন। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মোট ৩০ টি রাজনৈতিক দল ও জোটকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরমধ্যে ২৫ টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এই সনদে স্বাক্ষর করেন। 

​

সনদ স্বাক্ষরের দিন আমন্ত্রিত দলগুলোর মধ্যে মোট ৬ টি দল সনদে স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকে। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী ছাত্রদের দল এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। ‘এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে (জুলাই সনদের) কোনো আইনি ভিত্তি অর্জিত হবে না’—এই দাবি করেন তারা। অন্যদিকে, চারটি বাম দল—বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ—এই সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে।



  •  তারা এর ৭ টি কারণ উপস্থাপন করেন:

১. জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনাকালেই তারা বারবার বলেছে, যেসব বিষয়ে সবার ঐকমত্য রয়েছে কেবলমাত্র সেসব বিষয়েই সবার স্বাক্ষর নেওয়া যেতে পারে। ভিন্নমতগুলো অতিরিক্ত (এনেক্স) প্রতিবেদন হিসেবে সনদে সংযুক্ত থাকতে পারে। ২. সনদের প্রথম অংশে পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। তারা বারবার সংশোধনী দিলেও সেগুলো সন্নিবেশিত করা হয়নি। ৩. শেষ অংশে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করতে বলা হয়েছে। সেখানে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভিন্নমত থাকলে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার কীভাবে সম্ভব তা চার দলের কাছে বোধগম্য নয়। ৪. অঙ্গীকারনামার ২ নম্বরে জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে বা যথোপযুক্ত স্থানে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তারাও সর্বসম্মত জুলাই সনদ সংবিধানে যুক্ত করার পক্ষে। কিন্তু ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ কীভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা চার দলের বোধগম্য নয়। ৫. অঙ্গীকারনামার ৩ নম্বরে ‘জুলাই সনদ নিয়ে কেউ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে না’ বলে যে অঙ্গীকার রয়েছে, এটি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। ৬. এছাড়াও সংবিধানের ১৫০ (২) অনুচ্ছেদে ক্রান্তিকালীন বিধানে ষষ্ঠ তফসিলে থাকা স্বাধীনতার ঘোষণা ‘ডিক্লারেশন অব ইনডিপেন্ডেন্স’ এবং সপ্তম তফসিলে থাকা ‘প্রোক্লেমেশন অব ইনডিপেন্ডেন্স’ বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি, সেটা বাদ দিলে তো বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকে না। অথচ জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। ৭. জুলাই সনদের পটভূমিতে অভ্যুত্থান পরবর্তী সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের ‘রেফারেন্স’ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার কথা আগে পাঠানো খসড়া সনদে উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত সনদে ১০৬ অনুচ্ছেদের কথা বাদ দেওয়া হয়েছে। (সূত্র: বিডিনিউজ২৪.কম, ‘যে সাত কারণে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না বামপন্থি ৪ দল’, ১৬ অক্টোবর ২০২৫)


ছবি: জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান

অন্যদিকে গণফোরাম স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে তারা জানায় যে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত টেলিগ্রাম এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত থাকবে—এটি নিশ্চিত করা না হলে তারা স্বাক্ষর করবে না। পরে ১৯ অক্টোবর তারা সনদে স্বাক্ষর করে।  

৮.

কেমন হল প্রস্তাবিত জুলাই সনদটি? এ ব্যাপারে খুব বিস্তারিত আলাপের সুযোগ এই লেখায় নাই। তবু কয়েকটা বিষয়ে আলোকপাত করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বোধকরি। 

সংস্কার কমিশনগুলো যখন তৈরি হয়, তখনই এই আলাপ উঠেছিল যে, গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো বিষয় সংস্কার এজেন্ডার বাইরেই থেকে যাচ্ছে বোধহয়। যেমন, ‘শিক্ষানীতি সংস্কার কমিশন’ কিংবা ‘ভূমি সংস্কার কমিশন’। তবু যে সংস্কার কমিশনগুলো শেষমেশ হল, সেগুলোর যথার্থ প্রতিফলন কি ঘটল জুলাই সনদে? দুঃখের সাথে বলা উচিত, না। 

১১ টি-র মধ্যে ৫ টি (৭-১১) কমিশনের সুপারিশ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এজেন্ডাভুক্তই হয়নি। এমনকি এই কমিশনগুলোর কথা সনদের মূলপাঠে উল্লেখও করা হয়নি। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি কমিশন হল শ্রমখাত


দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ‘জুলাই জাতীয় সনদে সই করবে না বামপন্থী ৪ দল’, ১৫ অক্টোবর ২০২৫

সংস্কার কমিশন এবং  নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন। এই দুটি কমিশন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সফলতার পেছনে অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল নারী ও শ্রমিক শ্রেণি। জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্রের পটভূমিতেও এর স্বীকৃতি আছে। তাই জনগণ আশা করেছিল যে, নতুন বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচিতে এই দুই শ্রেণির অধিকারের কথা গুরুত্বের সাথে উচ্চারিত হবে। কিন্তু বাস্তবে সেসবের কিছুই হয় নাই। বরং উলটো ডানপন্থী ও ইসলামপন্থী দলগুলোর তরফে নারী কমিশনের কিছু সুপারিশকে কেন্দ্র করে পুরো কমিশন বাতিলের দাবি ওঠে, এবং সরকারও একপর্যায়ে এ ব্যাপারে নতজানু অবস্থান গ্রহণ করে। 

এছাড়া স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাত ও অর্থনীতি বিষয়ক প্রায় কোনো পলিসিই এই সনদের অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। আইনজীবী জাহেদ ইকবালের মতে, “এই জুলাই সনদে সংবিধান আর রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলেও সাধারণ-প্রান্তিক কিংবা নারীদের আকাঙ্ক্ষার কিছুই প্রতিফলিত হয়নি। সেই সাথে তৃণমূলের মানুষের কথাও এই সনদে তেমনিভাবে আসেনি”। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলো প্রত্যক্ষভাবে আনার সুযোগ থাকলেও সেগুলো এই সনদে নেই।

জুলাই সনদের আরেকটি খুব গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ দিক হল, এটি রাজনীতিবিদ ও অভিজাত শ্রেণির মধ্যে ক্ষমতার ভাগ-বণ্টন, বা ক্ষমতা হস্তান্তরকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, সাধারণ মানুষের মানুষ হিসেবে, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সসম্মানে বেঁচে থাকার অধিকারকে ততটা গুরুত্ব দেয় নাই। উল্লেখ্য, আমরা মনে করি যে, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সমস্যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু সনদ এটাকেই একমাত্র ‘কারণ’ হিসেবে হাজির করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়, কেননা এটা কেবল এই একটি সমস্যার সমাধান খোঁজার কোশেশ করেছে। এজন্যই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ নিজার এটিকে বলেছেন ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যারনদের সমঝোতার দলিল’। তার মতে, জুলাই সনদের সাথে ১২১৫ সালের ‘ম্যাগনা কার্টা’র মিল আছে। ‘ম্যাগনা কার্টা’ যেমন সাধারণ জনগণের (কৃষক বা প্রজা) অধিকারের দলিল ছিল না, বরং রাজা জন এবং ব্যারনদের (অভিজাত শ্রেণীর) মধ্যকার একটি রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল; ঠিক তেমনি জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কার ও ঘোষণাপত্রও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক দলসমূহ ও অভিজাত শ্রেণির (যাদের তিনি ‘ব্যারন’ বলেছেন) স্বার্থরক্ষার দলিলে পরিণত হয়েছে। নিজারের বিশ্লেষণ মোতাবেক, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের  দুটো প্রধান সমস্যা আছে, যা তীব্র আকার ধারণ করেছিল আওয়ামীলীগের শাসনামলে—জনগণকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা (বিরাজনীতিকরণ) এবং জনগণকে ‘মানুষ’ হিসেবে গণ্য না করা (বিমানবায়ন)। সাধারণ মানুষ ও ছাত্ররা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল মূলত ‘প্রাণের অধিকার’ বা জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাষ্ট্রের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে; এককথায়: নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ‘মানবিক মর্যাদা’ পুনরুদ্ধার করতে। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার আলোচনা ও কমিশনগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া (যেমন, পার্লামেন্টে উচ্চকক্ষ থাকবে কি না, ভোটের পদ্ধতি কী


  • বিবিসি বাংলা, ‘জুলাই সনদ সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে?’, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
  • যা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও জুলাই ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত একটি মূলনীতি। এছাড়া ২০২৬ সালে নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান’ শীর্ষক নতুন যুক্ত করা একটি অংশে বলা হয়েছে: “(জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের) এই চেতনার সারমর্ম হলো গণতন্ত্র, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা।”

হবে ইত্যাদি) এবং বিরাজনীতিকরণ রোধের ওপর। সাধারণ মানুষের মূল দাবি ‘বেঁচে থাকার অধিকার’ সেখানে গৌণ হয়ে গেছে। বর্তমান সংস্কার প্রস্তাবগুলো রাজনীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও, বিমানবায়ন রোধে বা নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে যথেষ্ট কঠোর বা স্পষ্ট নয়।

ফলে আমরা দেখি যে, ৭২-এর সংবিধান নিয়ে অভ্যুত্থানের পর অনেক কথাবার্তা হলেও, এই সংবিধানের অন্যতম ত্রুটিপূর্ণ দিক, নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত অধ্যায়, সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট প্রস্তাবনা জুলাই সনদে নাই। সনদে মৌলিক অধিকার সম্পর্কে কেবল এতটুকু বলা হয়েছে যে, “নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, সেগুলোর সুরক্ষা এবং বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।” কিন্তু এগুলো ঠিক কীভাবে হবে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাবনা সনদে নেই। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্টে এ ব্যাপারে সংবিধান সংস্কার কমিশনের বিস্তারিত সুপারিশ ও সেখান থেকে ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার জন্য বাছাইকৃত ৫ টি সুপারিশ থাকলেও, সনদে তা উল্লেখ নেই। ফলে কার্যত এসব সুপারিশ মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। 

এমনকি বাংলাদেশের কালা কানুন হিসেবে পরিচিত ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪’, যে আইন অনুযায়ী সরকার গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই যেকোনো নাগরিককে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখার লাইসেন্স পায়, স্বাধীনতার পর থেকে যে আইনটির সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করা হয়েছে, সেটির ব্যাপারেও জুলাই সনদে কিছু বলা হয় নাই। যদিও ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্ট মোতাবেক, কমিশন এটি বাতিলের সুপারিশ করেছে, কিন্তু জুলাই সনদে সেটি আসে নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথম ৮ মাসে এই আইনেই ৩৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারও জুলাই সনদকে ‘লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেনীর রাজনৈতিক সমঝোতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ফরহাদ মজহারের মতে, ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’-এর প্রক্রিয়ায় গঠিত এই সরকার মূলত গণ-অভ্যুত্থানের গণ-আকাঙ্ক্ষাকে বাদ দিয়ে বিদ্যমান লুটেরা-মাফিয়াদের সাথে সমঝোতার অংশ হিসেবেই এই সনদ প্রণয়ন করেছে; তাই এটি ‘গণবিরোধী’। তিনি লেখেন: “এটা পরিষ্কার যে, তথাকথিত জুলাই সনদটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণীর বিভিন্ন প্রতিযোগী গোষ্ঠীর সঙ্গে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা মাত্র।” তিনি আরো মনে করেন যে, জুলাই সনদে “জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কমিশন ও খাতসমূহকে সজ্ঞানে বাদ দেওয়া হয়েছে।” জুলাই সনদের ব্যাপারে মজহারের সমালোচনা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাপারে তার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উৎসারিত; এবং জুলাই ঘোষণাপত্র সম্পর্কে তার মতামতও অনুরূপ। ফরহাদ মজহারের মতে, পূর্বতন সংবিধান


  • সৈয়দ নিজার, ‘রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হাবিবুর রহমান স্মারক বক্তৃতা ২: জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যারনদের সমঝোতার দলিল’, সিরাজুল ইসলাম লেকচার হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ৩১ শে অক্টোবর ২০২৫।
  • ৭২-এর সংবিধানের ‘মৌলিক অধিকার’ সংক্রান্ত ধারাগুলোর সমালোচনা সম্পর্কে জানতে দেখুন: আবুল মনসুর আহমদ, বেশী দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা, ‘সংবিধানে আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য রক্ষিত হউক’, পৃ. ৫১-৫৭ 
  • জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫, ১৭ অক্টোবর ২০২৫, পৃ. ৬ 
  • বিবিসি বাংলা, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিতর্কিত বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা-আটক নিয়ে উদ্বেগ’, ১৮ এপ্রিল ২০২৫

মোতাবেক এই সরকার অবৈধ, ফলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে সংবিধান সংস্কার করার এখতিয়ার তার নাই। বরং এই সরকারের উচিত ছিল সার্বভৌম ক্ষমতা গ্রহণ করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা। অর্থাৎ, ফরহাদ মজহার জুলাইকে যে-অর্থে গণ-বিপ্লব হিসেবে দেখেছেন, জুলাই সনদে তার প্রতিফলন ঘটে নাই।


৯.

জুলাই সনদের বিষয়বস্তুর আরো কিছু দিক নিয়ে আলাপ করা যাক।

ডেভিড বার্গম্যানের বরাতে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’-এ বর্ণিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে যেসব সমালোচনার কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছিল, ‘জুলাই সনদ’-এ তার কিছু কিছু দিক আমলে নেওয়া হয়। যেমন, সনদের পটভূমি অংশে ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত ৭২-এর সংবিধানের ‘প্রণয়ন পদ্ধতি’ ও ‘কাঠামোগত দুর্বলতা’র ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। এছাড়া ঘোষণাপত্রে ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ না থাকলেও, জুলাই সনদে সেটি উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি, জুলাই ঘোষণাপত্রে ৭৫-এর ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলীকে ‘সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, জুলাই সনদে সেটি এড়িয়ে যাওয়া হয়। সনদে ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের কথাও উল্লেখ করা হয় নাই। এই দিক থেকে বলা যেতে পারে, ঘোষণাপত্র যেভাবে ‘ইতিহাস দখলের লড়াই’-এর স্মারক হয়ে উঠেছিল, সনদ সেটা হয়ে ওঠেনি। 

ঘোষণাপত্রে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী প্লাটফর্ম হিসেবে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নাম ও অভ্যুত্থানে তাদের ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচির উল্লেখ থাকলেও, জুলাই সনদে সেগুলো অনুল্লেখিত থাকে। এর প্রতিক্রিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দাবি করে যে, জুলাই সনদে ‘ইতিহাস বিকৃতি ও পুনর্লিখন’ ঘটেছে। এছাড়া তারা আরো দাবি করেন যে, সংস্কারপ্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জুলাইয়ের শহীদ পরিবার, আহত ব্যক্তি ও ছাত্রদের উপেক্ষা করা হয়েছে। “জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও নোট অব ডিসেন্টের সমাধান না করেই দ্রুত স্বাক্ষর সম্পন্ন করার টালবাহানা চলছে” মর্মেও অভিযোগ করেন তারা। তাদের এই অভিযোগ এনসিপির অভিযোগের সাথে মিলে যায়।

ঘোষণাপত্রে শহিদদের সংখ্যা ‘প্রায় এক হাজার’ বলা হলেও, জুলাই সনদের খসড়ায় প্রথমে ‘এক হাজার চারশোর বেশি’ এবং পরে চূড়ান্ত কপিতে ‘সহস্রাধিক’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ঘোষণাপত্রে আহতদের নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখিত না হলেও, জুলাই সনদে ‘বিশ হাজারের বেশি’ আহতের কথা বলা হয়। জুলাইয়ের শহিদ-সংখ্যা যে সামনের দিনগুলোতে ‘তর্কে’র উছিলা হয়ে উঠতে পারে, তার ইশারা দুই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দলিলে দুই ধরনের ভাষার ও ভঙ্গির ব্যবহারে পাওয়া যায়। এইকালে এসে রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্টেশনের এমন দ্বিধান্বিত হালত আমাদের জন্য লজ্জাজনক অভিজ্ঞতাও বটে।   


  • ফরহাদ মজহার, ‘জুলাই সনদ: লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণীর রাজনৈতিক সমঝোতা?’, চিন্তা ও তৎপরতার পত্রিকা, ১ম বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ২৩ অক্টোবর ২০২৫
  • প্রথম আলো, ‘জুলাই সনদে ‘ইতিহাস বিকৃতি ও পুনর্লিখনের’ নিন্দা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’, ১৭ অক্টোবর ২০২৫

এছাড়া জুলাই ঘোষণাপত্রে এবং জুলাই সনদের খসড়ায় ‘বিদ্যমান সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে’ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা বলা হলেও, সনদের চূড়ান্ত কপিতে তা বাদ দেওয়া হয়। চারটি বাম দল যে ৭ কারণে সনদে স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকে, তার মধ্যে এটিও একটি কারণ। অনেকেই মনে করেন, জুলাই সনদের চূড়ান্ত কপি থেকে ১০৬ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ বাদ দেওয়াটা সরকারের একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে জুলাই সনদে অন্তর্বর্তী সরকারের ধরন নিয়ে একটি অস্পষ্টতা রেখে দেওয়া হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই, রাষ্ট্রের সংস্কার কার্যক্রমের একেবারে কেন্দ্রে চলে আসে সংবিধানের বিষয়টি। ৭২-এর সংবিধানই রাষ্ট্রের সকল দুর্দশার কেন্দ্রবিন্দু—এ ধরনের একটি প্রচারণা বেশ জোরদার হয়। এর যৌক্তিক কারণও আছে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি ছিল সংবিধান। ৭২-এর সংবিধানে অনেকগুলো গুরুতর পরিবর্তন আনা হয়েছিল পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে। শেখ হাসিনা ৭২-এর সংবিধানে ফেরার কথা বলে, আদালতের রায়ের ভিত্তিতে, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আনেন; এবং এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেন—বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেটিকে শেখ হাসিনার স্বৈরাচার হয়ে ওঠার সূচনাবিন্দু হিসেবে দেখা হয়। পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, সংবিধান যে আমাদের রাজনৈতিক সঙ্কটের অন্যতম কারণ, এ বিষয়ে জোরদার রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনও চলছিল বেশ কয়েকবছর যাবত। তাছাড়া খোদ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও দেশে এক ধরনের সাংবিধানিক সংকট তৈরি করে। ফলে সঙ্গত কারণেই অভ্যুত্থানের পর সংবিধান হয়ে ওঠে আলাপ-আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংকট ও সম্ভাবনা পরিণত হয় স্রেফ একটি ‘সাংবিধানিক সংকট ও সম্ভাবনা’য়। পরবর্তীতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তুতকৃত জুলাই সনদেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। সনদে উল্লেখিত মোট ৮৪ টি সংস্কার প্রস্তাবনার মধ্যে ৪৭ টিই সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়। ফলে গোটা সংস্কার এজেন্ডাটিই মূলত এক ধরনের ‘সংবিধান সংস্কার এজেন্ডা’ বা ‘নতুন সংবিধানের এজেন্ডা’য় পরিণত হয়। এর ফলে গোটা সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়েই তৈরি হয় নানাবিধ জটিলতা। সে আলাপে পরে ফিরব। 

আপাতত বলা যাক: জুলাই সনদে উত্থাপিত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত এজেন্ডাগুলো স্রেফ সুশাসন, নাগরিক অধিকার বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। বরং বিভিন্ন মতাদর্শিক বিতর্কও সনদের এজেন্ডাভুক্ত হয়েছে, যা জুলাই সনদ নিয়ে বিবিধ অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও ধোঁয়াশা তৈরি করেছে; পাশাপাশি সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ও গতিপথকেও ব্যাহত করেছে। দুটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

৭২-এর সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতি ছিল: বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। মূলনীতিগুলো নিয়ে আগে-পরে বেশ তর্ক-বিতর্ক হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের অজনপ্রিয় শাসনের ফলে ৭২-এর সংবিধানের এই মূলনীতিগুলোও বেশ অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘গণতন্ত্র’ বাদে বাকি তিনটি মূলনীতিই পালটে ফেলা হয়; পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে যেগুলো আবার সংবিধানে ফিরে আসে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংক্রান্ত এসব বিষয় বেশ স্পর্শকাতর ও মতাদর্শতাড়িত; তাছাড়া রাষ্ট্র বা শাসকদের শাসনগত 


  • বিস্তারিত দেখুন: আলী রীয়াজ, ২০২১; বদিউল আলম মজুমদার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রাজনীতি, প্রথমা, ২০২৩

ভালো-মন্দের সাথে এসবের যোগ খুবই সামান্য। তবু ঐকমত্য কমিশনের এজেন্ডায় রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলোকে রাখা হয়। প্রথমে কমিশন ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র’—এই পাঁচটি মূলনীতি প্রস্তাব করে। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ মূলনীতি হিসেবে এমনিতেই বেশ অজনপ্রিয়; আর ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর মধ্যে ‘সমাজতন্ত্র’র মূল দ্যোতনা বিদ্যমান। কিন্তু নানা কারণে ‘সেক্যুলারিজম’কে (যা যেকোনো আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য) বাদ দিলেও, প্রায় একই ভাবসম্পন্ন একটি শব্দ সংবিধানে যুক্ত করা ঐকমত্য কমিশনের কাছে স্বভাবতই জরুরি বলে মনে হয়েছিল। ফলে ‘বহুত্ববাদ’-এর আগমন ঘটে। 

কিন্তু, বাংলাদেশের ডান বা ইসলামপন্থী দলগুলো ‘সেক্যুলার’ ভাবসম্পন্ন এই ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটিকেও ভালোভাবে নেয় নাই; কারণ এই দলগুলোর রাষ্ট্রকল্পের প্রধানতম উপাদান ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ। ফলে তারা এই মূলনীতির বিরুদ্ধে ‘ভেটো’ দেয়। আগে থেকেই ঐকমত্য কমিশনের সাথে বৈরী অবস্থানে থাকা বিএনপি এটাকে একটা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে, এবং ‘বহুত্ববাদ’-এর বদলে পঞ্চম সংশোধনীতে যুক্ত হওয়া ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করে। 

ফলে শেষ পর্যন্ত ‘বহুত্ববাদ’ বাতিল হয়ে যায়। এর বদলে যুক্ত হয় ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’। অথচ সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা আগে থেকেই স্বীকৃত। ফলে এটিকে মূলনীতি বানানোর কিছুই নাই। কিন্তু ‘সেক্যুলারিজম’ সরিয়ে ‘বহুত্ববাদ’ আনতে না পারার গ্লানি থেকেই সম্ভবত কমিশন কাজটি করেছে। এখানে আরেকটি জটিলতাও তৈয়ার হয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ তো মৌলিক অধিকার; যেমন মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রে আছে, তেমনি বিদ্যমান সংবিধানেও আছে। ফলে মৌলিক অধিকারকে মূলনীতি বানিয়ে ‘মূলনীতি’ বর্গটাকেই কার্যত অকার্যকর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বা এর মূল সারপদার্থই উবে গিয়েছে।  

তথাপি সনদে মূলনীতি-সংক্রান্ত ধারাটিও বেশ অস্পষ্ট রয়ে গেছে। এ ধারায় বলা হয়েছে যে, “সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ উল্লেখ থাকবে।” প্রশ্ন হলো: তাহলে কি আগের মূলনীতিগুলোর ‘বদলে’ এগুলো যুক্ত হবে? তাহলে ‘গণতন্ত্র’, রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতিটিও, কি বাদ পড়ে গেল? নাকি আগের মূলনীতিগুলোর ‘পাশাপাশি’ এগুলোও যুক্ত হবে? বিএনপি ক্ষমতায় আসলে সম্ভবত দ্বিতীয়টাই হবে। কারণ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জনাব সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, “রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি যাই নির্ধারণ হোক না কেন, সেটা জাতীয় সংসদেই নিতে হবে। একই সঙ্গে ঐকমত্য কমিশন যা সুপারিশ করেছে তার সঙ্গে সঙ্গেও আমরা একমত। …সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় গৃহীত রাষ্ট্র পরিচালনার যে মূলনীতি ছিল তার সঙ্গে আমরা একমত এবং সেটা আমরা ফিরিয়ে আনতে চাই। …এগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশন যে কয়েকটি লাইন, শব্দ যুক্ত করেছে তার সঙ্গেও আমরা একমত। এটা আমরা গ্রহণ করতে রাজী।” এবং এটা হলে, ‘গণতন্ত্র’-ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ফেরত আসবে।


  • জাগোনিউজ২৪, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নির্ধারণ হবে সংসদে: সালাহউদ্দিন আহমদ’, ১ আগস্ট ২০২৫


কিন্তু যদি অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে? তারা যদি বলে যে, জুলাই সনদে যতটুকু আছে, মূলনীতিতে আমরা শুধু ততটুকুই রাখব—তাহলে কী হবে? ‘গণতন্ত্র’ কি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ফিরবে? এ প্রশ্নের উত্তর কমিশন বা আমাদের কাছে নাই। 

​

আরেকটি উদাহরণ দেখা যাক। জুলাই সনদের খসড়ায় বলা হয় যে, সংবিধানের ১৫০ (২) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করা হবে; ফলে ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম তফসিল সংবিধানে থাকবে না। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫ম ও ৬ষ্ঠ তফসিলে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ ও টেলিগ্রামে পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণা, এবং ৭ম তফসিলে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র যুক্ত করা হয়। সনদের খসড়া প্রকাশের পরপরই এই বিষয়ে অনেকে আপত্তি তোলেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কেন বাদ দেওয়া হচ্ছে সংবিধান থেকে—রাজনৈতিক বিভিন্ন দলের তরফে এবং জনপরিসরের বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায়, সভা-সেমিনারে, স্বভাবতই এই প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু কমিশন ব্যাপারটা আমলেই নেয় নাই। পরে বাম দলগুলো এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানালে সনদ স্বাক্ষরের পরে প্রস্তাবনাটি সংশোধন করা হয়; এবং ৭ম তফসিল তথা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রটি সংবিধানে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 


১০.

শুরু থেকেই জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য ছিল। বিএনপি চাচ্ছিল পরবর্তী সংসদ সাংবিধানিকভাবে সনদ বাস্তবায়ন করবে। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি নির্বাচনের আগেই সনদের আইনি ভিত্তি কার্যকর করার দাবি জানায়। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়েই সরকার স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সনদের আইনি ভিত্তি অস্পষ্ট থাকায় এনসিপি এই অনুষ্ঠান বয়কট করে এবং সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে। জামায়াত আইনি ভিত্তি চাইলেও, শেষ পর্যন্ত সনদে স্বাক্ষর করে। 

​

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এনসিপি শুরুতে গণপরিষদের কথা বলে; অন্যদিকে জামায়াত চায় প্রভিশনাল কন্সটিট্যুশনাল অর্ডার বা পিসিও। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই জামায়াতসহ সমমনা ৮ টি ইসলামপন্থী দল জুলাই সনদের ভিত্তিতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন (অর্থাৎ নির্বাচনের আগেই সনদ বাস্তবায়ন), ঐকমত্য কমিশনের এজেন্ডা-বহির্ভূত নিম্নকক্ষে পিআরসহ ৫ দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম পিআরের দাবিতে জামায়াতের আন্দোলনকে ‘সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রতারণা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, জামায়াত সংস্কারের বিষয়টিকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। যদিও পরে তারা ‘সংস্কারপ্রশ্নে ঐকমত্য’-এর ভিত্তিতে জামায়াতের নির্বাচনী জোটে যোগ দিয়েছে। 

পরবর্তীতে সব দল গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি কার্যকরের ব্যাপারে একমত হয়। তবে গণভোট নির্বাচনের আগে হবে না পরে—এ নিয়ে বিএনপির সাথে জামায়াত ও এনসিপির মতবিরোধ তৈরি হয়। এ পর্যায়ে ১৩


  • প্রথম আলো, ‘পিআর নিয়ে জামায়াতের আন্দোলন প্রতারণা: নাহিদ’, ১৯ অক্টোবর ২০২৫

নভেম্বর সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করে। এই আদেশটিও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা ও অস্পষ্টতা তৈরি করে। 


প্রথমত, আদেশটির সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান মোতাবেক, রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করার কোনো বিধান নেই। ফলে খোদ এই আদেশটি পরবর্তীতে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আদেশ জারির দুই দিন আগে ১১ নভেম্বর এক প্রেস কনফারেন্সে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “গেজেট আকারে প্রকাশিত হলেও এ ধরনের অসাংবিধানিক আদেশের আইনি ভিত্তি দুর্বল হবে।” 

​

দ্বিতীয়ত, গণভোটে চারটি প্রশ্নে একটি উত্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা বিভিন্ন জটিলতা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নের ‘ক’ ও ‘খ’ অংশে এমন কিছু বিষয়কে গণভোটে তুলে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোতে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। বিএনপির মতে, এটা জুলাই সনদের সাথে সাংঘর্ষিক; কারণ সনদ তৈরি করা হয়েছিল ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ, এবং সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে—প্রত্যেকটি দল নির্বাচনী ইশতেহারে নিজেদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অনুযায়ী প্রচারণা এবং জয়ী হলে সে অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের সুযোগ পাবে। এভাবে সনদ ও সনদ বাস্তবায়ন আদেশের মধ্যে একটি বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। ফলে বিএনপির দাবি, বিএনপি সরকারে গেলে জুলাই সনদ-বহির্ভূত কোনোকিছু বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। 

তৃতীয়ত, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধন হয়ে যাবে না। বরং, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হবে। এই পরিষদের ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ থাকবে, এবং এই পরিষদ ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কারে বাধ্য থাকবে। প্রশ্ন হল: যদি ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ থাকে, তাহলে কেন এই পরিষদ ১৮০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ মোতাবেক সংবিধান সংস্কারে বাধ্য থাকবে? পূর্বনির্ধারিত কিছু বিষয় সংবিধানে যুক্ত করার এই সীমিত ক্ষমতাকে কি আদৌ ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ বলা যায়? বোঝা যায়, কমিশন এই প্রস্তাবনাটা এনেছে এনসিপির গণপরিষদের দাবি রক্ষার্থে। কিন্তু তারা ব্যাপারটার স্ববিরোধিতা নিয়ে মোটেই ভাবে নাই। উপরন্তু, যদি ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার না করে পরিষদ, তাহলে কী হবে? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর কোথাও নাই। 

তবে এখানেই যাত্রা শেষ হয়ে যায় না। বরঞ্চ অনেককিছুই নির্ভর করছে আগামী নির্বাচন ও সংসদের ওপর। এমনকি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ‘রাজনৈতিক চুক্তি’ ভঙ্গের ঘটনায় ভরপুর। ফলে, আমাদের মনে উঁকি দিচ্ছে আরও কিছু আশঙ্কা: যেহেতু এই গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংস্কার হয়ে যাবে না, ফলে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের পর ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে আবারো গণভোটের সুযোগ থেকে যাবে। আবার, অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেটের যুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’-র পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে গণভোটের ফলাফল আদৌ সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হবে কিনা—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, “নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ ভোট যদি জয়যুক্ত হয় তখন কেউ তো আদালতে যেতেও পারে। গিয়ে বলতে পারে


  • Daily Observer, ‘No obligation to follow decisions beyond July Charter: BNP warns govt’, 11 November 2025

নির্বাচনের এই অংশে সুষ্ঠু ভোট হয় নাই। কারণ সরকার এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। গণভোটে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না। নৈতিকভাবে সরকারের এর থেকে বিরত থাকাই উচিত।” এই বিষয়ে শাহদীন মালিকের সুর অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। এর উত্তরও দেয়া হচ্ছে সরকারের তরফ থেকে। যেমন, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান, জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের সহ-সভাপতি এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, “জুলাই জাতীয় সনদ কেবল কাগজে কালো অক্ষরে ছাপা কোনো দলিল নয়, এটি ১৬ বছরের বেশি সময়ে গুম হয়ে যাওয়া মানুষের পরিবার-পরিজনের হাহাকার এবং চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকার এ সনদের ভিত্তিতে গণভোটের পক্ষে প্রচার করতেই পারে।” এমনকি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয় যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সমর্থন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বৈশ্বিক বিভিন্ন নজির থেকে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, “এসব ঘটনাকে গণতান্ত্রিক রীতির লঙ্ঘন হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবেই দেখা হয়।” তারা বলেন, “এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সমর্থনে নয়, বরং দ্বিধা ও নীরবতায়। যে সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তা সমর্থন না করলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে, ভোটাররা বিভ্রান্ত হবে এবং পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে। …শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণেরই। এটাই গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা। নেতৃত্ব সেই সিদ্ধান্ত কেড়ে নেয় না, বরং তা স্পষ্ট ও অর্থবহ করতে সহায়তা করে।” 

​

তবে এরপরও প্রশ্ন রয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় যদি ‘না’ জয়ী হয়, তাহলে সংস্কারের সম্পূর্ণ এজেন্ডাই হুমকির মুখে পড়ার বিস্তর সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে, সরকার প্রচারণা চালাতে পারে কিনা, এই তর্ককে এক পাশে রেখে আরেকটি প্রবণতা উল্লেখ করা দরকার। যেভাবে বা যে ভাষায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তাতে ‘এক্সক্লুশনারী’ বা ‘খারেজি’ ভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। যারা ‘না’ ভোট দিবে, তারা ফ্যাসিবাদী, বা ‘যারা জুলাই আন্দোলনের পক্ষে তারা সবাই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, আর যারা ফ্যাসিবাদের পক্ষে তারা ‘না’ বলবে’, বা গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে—এহেন প্রচারণার দুই ধরনের ক্ষতিকারক দিক আছে। প্রথমত, ‘না’ ভোট মাত্রই ফ্যাসিবাদী বলে ফেলার মতো তকমাবাজির রেওয়াজ আবার শুরু হতে পারে। এমন বহুলোক থাকতেই পারেন, যিনি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে ছিলেন, যিনি সংস্কারের পক্ষে, কিন্তু যে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে সেটার বিপক্ষে—তাহলে তাকে তো ‘খারিজ’ করে ফেলা হচ্ছে পুরো রাজনৈতিক ডিসকোর্স থেকেই। এমনও বহুলোক থাকতে পারেন, যারা শেখ হাসিনার বিপক্ষে ছিলেন, কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানকে সঙ্কটের উৎস মনে করেন না, বরঞ্চ হাসিনা সংবিধান মানেন নাই বলেই এমন স্বৈরাচারী হয়ে উঠছেন বলে মনে করেন—তাদের অবস্থান কী হতে পারে? সে যদি ‘না’ ভোট দেয়, তাহলে তাকেও কী


  • ঢাকা স্ট্রিম, ‘জুলাই সনদ থেকে আসন্ন গণভোট, সরকারের পক্ষপাত’; ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
  • বণিক বার্তা, ‘জুলাই সনদ রক্তের বিনিময়ে তৈরি, সরকার গণভোটের প্রচার করতেই পারে: আলী রীয়াজ’ ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
  • প্রথম আলো, ‘‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বাধা নেই: আলী রীয়াজ’, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
  • প্রথম আলো, ‘গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার সমর্থনের ব্যাখ্যা দিল সরকার’, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
  • সমকাল, ‘জুলাই সনদের পক্ষে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন: উপদেষ্টা আদিলুর’, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • প্রথম আলো,  ‘বিশেষ সাক্ষাৎকার: মনির হায়দার’, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ 


‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যায়িত করা হবে?  অভ্যুত্থানের যে আনুভূমিক চরিত্র ছিল, তার সাথে প্রচারণার এহেন ধরন এবং তকমাবাজির রাষ্ট্রীয় প্রচারণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরের ভাষিক বহিঃপ্রকাশের জন্য অশনিসংকেত। অন্যদিকে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেই ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে না, বা ‘না’ দিলেই ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে, গুম খুন আবার ফিরে আসবে—এই ধরনের ভয়াবহ সরলীকরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্কটকে ঘনীভূত করে তুলবে। সংবিধান সংস্কার জরুরি; কিন্তু খুব ভালো সংবিধান সংস্কার বা রচনাও যে স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদ রুখতে পারে না, তারও অজস্র নজির আছে দুনিয়াজুড়ে। যে অলিখিত রাজনৈতিক চুক্তি, সমঝোতা ও পরিবেশ সংস্কার-প্রক্রিয়া ও এর ফসলকে জিন্দা রাখতে পারে, সেদিকে বিন্দুমাত্র নজর না দিয়ে স্রেফ রেটরিক ও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার ‘ভয়’ উৎপাদনের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা ইতিমধ্যে খারেজিমূলক হয়ে আছে; প্রচারণার এই কৌশল সেটাকে হ্রাস না করে বরঞ্চ আরও বৃদ্ধি করছে বলেই মনে করছি আমরা। প্রচারণার ধরন দেখে একজন ধারাভাষ্যেকারের এই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক লাগতে পারে: “এই প্রোডাক্ট বা সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পরও যদি ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী শাসন ফিরে আসে, তাহলে এর প্রস্তুতকারক হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা ব্যক্তিরা কি কোনো দায়দায়িত্ব নেবে?”          


ছবি: গণভোটের পক্ষে সরকারি প্রচারণা


কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুরু থেকেই বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকায় এবং বিএনপি নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে সংস্কার চাওয়ায়, বিএনপিকে ‘সংস্কারবিরোধী’ হিসেবে চিত্রায়িত করে জামায়াত ও এনসিপি। সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বিএনপির বেশকিছু ‘নোট অব ডিসেন্ট’কে অগ্রাহ্য করায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে বিএনপির মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। প্রাথমিকভাবে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এই আদেশ মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, এবং সোশাল মিডিয়ায় ‘না’ লেখা ফটোকার্ড শেয়ার করে। এর ফলে বিএনপিকে আরেক দফা ‘সংস্কারবিরোধী’ হিসেবে প্রচারের সুযোগ পায় তার বিরোধীরা। অন্যদিকে, বিএনপি দাবি করে যে জুলাই সনদে যা আছে তারা কেবল সেটুকুই মানবে। ফলে নির্বাচনে যদি বিএনপি জয়ী হয়, সেক্ষেত্রে সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আরেক দফা জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। রাজনৈতিক এই দাবা খেলার মারপ্যাঁচে জুলাই সনদ ও সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এমনকি কোর্টেও উঠতে পারে। 


ইমরান আজাদ, ‘অন্তর্বর্তী সরকার কেন ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় চায়’, প্রথম আলো, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬

​

১১.

এই প্রক্রিয়ায় কার্যত জুলাই সনদ বা সংস্কারের এজেন্ডাটি নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘বার্গেইনিং চিপ’ এবং ভোটের মাঠে প্রচারণার একটি নির্বাচনী ‘টুল’ হয়ে উঠেছে। এনসিপি জুলাই সনদে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালালেও, তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষরই করে নাই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা জুলাই সনদ না, বরং সনদ বাস্তবায়ন আদেশকেই গুরুত্ব দিচ্ছে—যেহেতু সেখানে বিএনপির বেশকিছু ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দেওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও, সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। 

​

জামায়াত শুরু থেকেই সংস্কারের সকল এজেন্ডার সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছে প্রধানত দুটি কারণে: এক. জুলাই সনদের সংস্কার এজেন্ডাগুলো সংবিধানে এমনকিছু পরিবর্তন এনেছে, যা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জামায়াতের জন্য লাভজনক; দুই. সনদের এজেন্ডাগুলো প্রধানত সরকারী দলের ক্ষমতা খর্ব করেছে, যা বিএনপির মতো বড় দলগুলোকেই অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। তবে জামায়াত এক্ষেত্রে কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে: একদিকে তারা ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে, অন্যদিকে এনসিপির স্বাক্ষর না করা নিয়েও তারা বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখায়নি; বরং নীতিগতভাবে এনসিপির এই অবস্থানকে সমর্থন দিয়ে বিএনপির উপর চাপ তৈরি করেছে। স্বাক্ষর না করার জন্য জামায়াতের কোনো কোনো নেতা এনসিপির প্রশংসাও করেছেন। ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার আলোচনার পুরো প্রক্রিয়াতেই জামায়াত এনসিপির মতামতের সাথে নিজেদের অবস্থানের সাযুজ্য ধরে রেখেছে; এনসিপিও সংস্কারপ্রশ্নে নিজেদের আলাদা কোনো অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়নি। তাই স্বভাবতই তারা জামায়াতের সাথে নির্বাচনী সমঝোতায় গিয়েছে। তবে আদতে জামায়াত নিজেদের দলীয় নীতি ও আদর্শের জায়গা থেকে এসব সংস্কারে কতোটা বিশ্বাসী, নানা কারণে সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এর একটা নজির হল, নিজেদের ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে ব্যাপক প্রচারণা চালালেও জামায়াত এবারের নির্বাচনে একজন নারীকেও প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয় নাই; অথচ জুলাই সনদে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তাদের অন্তত ৫% নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা ছিল। এনসিপির ব্যাপারেও একই কথা খাটে। এর বিপরীতে বিএনপির নারী প্রার্থীর শতকরা হার এই দুই দলের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সংস্কার প্রশ্নটি কতোটা অকৃত্রিম, আর কতোটা নির্বাচনী প্রচারণার ‘টুল’—সে প্রশ্নটি উঠতে শুরু করেছে। 

​

১২.

জুলাই ঘোষণাপত্র থেকে শুরু করে জুলাই সনদ পর্যন্ত এই যাত্রাই আসলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের প্রধান রাজনৈতিক ঘটনা। এর বহু ছোটখাটো বিষয় নিয়েও বহু কাটাছেড়া হচ্ছে, সম্ভবত আরও হবে। গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাজনৈতিক পরিসরের এটাই প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু, এতো টানাপোড়েন ও সংশয়ের (যা আমরা উপরে বিস্তারিত আলাপ করলাম) পরও, আমরা স্বীকার করি, এই দুটো ঘটনাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরের জন্য এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত। কেননা, বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার জন্মের পর থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরসহ অজস্র বিষয় নিয়ে এক সহিংস রাজনৈতিক পরিসরের জন্ম দিয়ে আসছে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট আমাদের প্রধান রাজনৈতিক মহলগুলো আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধান করতে পারেনি। আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি, বিদেশি রাষ্ট্রদূতের ‘মধ্যস্থতায়’ একধরনের ‘সংলাপ’ তৈরি হতো, কিন্তু সেই ‘সংলাপ’ কখনো সমঝোতায় পৌঁছাত না। অর্থাৎ, আমাদের রাজনৈতিক পরিসর কখনো তার সংকটগুলো নিজেরা সমাধান করতে সক্ষম হয়নি। এবারই প্রথম দেখা গেলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরের সকল অংশ ‘বিদেশি’ শক্তির মধ্যস্থতা ছাড়াই একসাথে বসে একটি সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করছেন। যার মাঠে প্রবল শক্তি আছে, এবং যার মাঠে কোনো শক্তি নাই—সবাই একসাথে বসে সংলাপ ও সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা দরকার। বাংলাদেশের এই ‘পরিপক্ক’ রাজনৈতিক সমাজই সম্ভবত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় উপহার। কোনো সন্দেহ নেই, এই সমঝোতার মাধ্যমে যে লিখিত ফলাফল আমরা পেয়েছি, সেটারও নানা সীমাবদ্ধতা আছে; কিন্তু এই যে শান্তিপূর্ণ উপায়ে, সমঝোতার ভিত্তিতে আমরা নিজেদের পথ নিজেরা বের করার চেষ্টা করছি, এটা আমাদের অগ্রগতিরই স্মারক। অন্যদিকে, ঘোষণাপত্র ও সনদ—এই দুই সমঝোতা স্মারকে যে সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা, তা আদতে বিগত কয়েক দশকে আমাদের সামূহিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতারও স্মারক। গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক পরিসরের প্রাণ হচ্ছে সংলাপ ও সমঝোতা (নেগোসিয়েশন)। সংলাপ ও সমঝোতা ব্যতীত খুব ‘ভালো’ জিনিসও ‘চাপিয়ে দেওয়া’র অনুভূতি তৈরি করে। জুলাই সনদ নিয়ে জনমনে যে আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছে তা কতটা পূরণ হবে, সেটা আসলে নির্ভর করছে এই ‘সংলাপ’ ও ‘সমঝোতা’র কালচারকে কতটা চর্চিত ও বিকশিত করা যাচ্ছে, তার ওপর। সংস্কারপ্রশ্নে এই জাতীয় ঐক্য শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে কিনা, বা কতটুকু সংস্কার আসলে সম্ভব হবে—তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, আমরা আশা দেখতে চাই। আশা রাখতে চাই।

তুহিন খান ও সহুল আহমদ 24 সেপ্টেম্বর, 2026
Share this post
Sign in to leave a comment