[লেখকের কৈফিয়ত: ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণার ঐতিহাসিক বিভ্রান্তিগুলো নিয়ে অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আলাপ করেছেন ওনার “The Concept of Bharatavarsa and Its Historiographical Implications”, এবং “Interrogating ‘Unity in Diversity’: Voices from India’s Ancient Texts” শীর্ষক দুটো প্রবন্ধে। অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘদিন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। কয়েকটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রসঙ্গে ওনার গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী তত্ত্বায়ন আর পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ রয়েছে। আগ্রহী পাঠকগণ অন্তর্জালে খুঁজলে উনার লেখালিখি ও বইপত্র সহজেই খুঁজে পাবেন। আমাদের আলোচ্য প্রবন্ধদুটো The Concept of Bharatavarsha and Other Essays বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি বিভিন্ন লিখিত উৎস পর্যালোচনা করে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত ও দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ভারতেবর্ষ’-এর ধারণার কালিক-স্থানিক রূপান্তরগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের পর্যালোচনার পদ্ধতি বিবেচনা করা এখানে জরুরি। তিনি ধারণার ইতিহাস ও তার বিবিধ পরিপ্রেক্ষিতের প্রতি মনোযোগ দেন। বিভিন্ন উপাত্তের ও তথ্যের প্রকৃতিকে ও উৎসকে তিনি প্রশ্ন করেন। একই সঙ্গে কেন ও কীভাবে বিভিন্ন উপাত্ত অধিপতিশীল ও প্রবল ইতিহাসের বয়ান তৈরিতে কাজ করে তার প্রতিও তিনি মনোযোগ দেন। কেবল আদি পর্বের ইতিহাসবিদ্যার একজন অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবেই নন, সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসশাস্ত্রটির বহুবিধ নতুন ধারায় এবং জনপরিসরে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের চিন্তাপদ্ধতি আর লেখালেখিকে পুনর্পাঠ করা জরুরি। আমাদের দেশে বিদ্যায়তনগুলোতে ইতিহাসশাস্ত্রটির বেহাল দশা বহুদিন থেকেই। তারমধ্যেও বিভিন্ন পরিসরে আমরা নতুন নতুন ইতিহাস চিন্তা, পদ্ধতি ও ধারার সঙ্গে পরিচয়ের আগ্রহও লক্ষ্য করতে পারি। হয়ত সেটার লক্ষণাগুলো এখনো ততটা দৃশ্যমান না। কট্টর পরিচয়বাদী ও হিন্দুত্ববাদের মতন আগ্রাসী, সম্প্রসারণবাদী এবং বিগত দশকে পুনর্নবায়িত বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতাগুলো আমলে নিলে সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে মোকাবেলার উদাহরণগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা, বোঝাপড়া থাকা আর সংবেদনশীল ও নিবিড় পঠন সম্ভবত অনেক দরকার। তবে জনতুষ্টিবাদ, উগ্র পরিচয়বাদ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেক্সাসের এই কালে ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়দের মতন পণ্ডিতগণের চিন্তা ও কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া আর নিজের বারংবার পরিচিত হওয়া—দুই-ই অস্তিত্ত্বের অর্থপূর্ণ যাপনের জন্য জরুরি বলে আমি মনে করি। কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য পাঠকদের কাছে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।]
এই ছোট লেখাটিতে আমি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাববিস্তারী ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের উপর্যুক্ত দুটো প্রবন্ধ নিয়ে আলাপ করে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস চিন্তা আর রাজনৈতিক বয়ানে বহুল প্রচলিত ‘অখণ্ড ভারত’-এর ইতিহাসতাত্ত্বিক সমস্যা ও সঙ্কটের দিকে নজর দেয়ার চেষ্টা করবো। দুটো প্রবন্ধই অত্যন্ত নিবিড় ও
- দ্বিতীয় প্রবন্ধটির বাংলা তর্জমা আমি করেছিলাম আর সেটি পড়া যাবে এই লিঙ্কে :https://swadhinsen.wordpress.com/2021/10/28/191/।
- Braja Dulal Chattopadhyaya, The Concept of Bharatavarsha and Other Essays, State University of New York Press (1 September 2018)
ঘন-উপাত্তনির্ভর। বিভিন্ন ধরনের লিখিত উৎসকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করে তিনি আলাপ করেছেন। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা জরুরি যে, আদর্শায়িত, বর্ণনামূলক, আরোহী বা অবরোহী সিদ্ধান্ত গ্রহণসর্বস্ব আর হালের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াজাত ও ভিউ-শেয়ার-লাইক-ট্যাগানোকেন্দ্রীক যে ইতিহাস চর্চা ও ভাষ্যকে আমরা ইতিহাস বলে মনে করি, সেই ধরনের ইতিহাসের ও ইতিহাসবোধের পর্যালোচনা করার পথও ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় আমাদের দেখান। বুনিয়াদী কতগুলো ধারণা ও পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ ছাড়া ইতিহাসবীক্ষা আপনা-আপনি জন্ম নেয় না। কাউকে হেয় করার জন্য, বাছাই করা জনতুষ্টিবাদী আলাপের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কোনো প্রতিপক্ষতা তৈরি করার জন্য, বচন ও ভাষ্যের মাধ্যমে কাউকে নিগৃহীত করার, নিপীড়ন করার আর বহুবিধ পরিসরে নিপীড়ন ও হত্যাযোগ্য করে তোলার ভুড়ি ভুড়ি উদাহরণ হিন্দুত্ববাদী ‘হোয়াটস-অ্যাপ ইউনিভার্সিটি’ নির্ভর ইতিহাসচর্চা তৈরি করেছে। ইতিহাস নিয়ে তন্বিষ্ট পর্যালোচকগণ ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান দুনিয়ায় ডিজিটাল পরিসর ও বিদ্যায়তনিক পরিসরের সমন্বিত তৎপরতাকে যেমন বোঝাপড়ার কথা বলেন, একইসঙ্গে বাস্তব দমন-পীড়ন ও প্রান্তিকীকরণের রাজনীতি বা এমনকি নির্বাচনী রাজনীতিতেও ইতিহাসের বিভিন্ন ভাসা-ভাসা, উপরতলীয়, আর কখনো কখনো খ্যাতিমান পণ্ডিতদের ইচ্ছাকৃত বিকৃত উদ্ধৃতি ব্যবহার করে ভাষ্য, বয়ান আর প্রোপাগাণ্ডায় ইতিহাসের ব্যবহারকেও তারা বিশ্লেষণ করেন।
অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের আলোচ্য প্রবন্ধ দুটো ‘আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদের অতীতমুখী ঝোঁক’ এবং ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক জনতুষ্টিবাদের বিপজ্জনক জ্ঞানতত্ত্ব’—উভয়ের বিরুদ্ধেই একটি অত্যন্ত জরুরি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষেধক’ হিসেবে কাজ করতে পার। হিন্দুত্ববাদের মতো উগ্র-ডানপন্থী আন্দোলনগুলো সমসাময়িক রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য গৌরবোজ্জ্বল অতীতের যে সরলীকৃত অথচ শক্তিশালী আখ্যান তৈরি করে, তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে সেই ‘সারসত্তাবাদী’ (essentialist) আখ্যানগুলোকে ভেঙে চূর্ণ করে দিয়েছেন।
ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা ও প্রকাশনা বাংলাদেশের বিদ্যায়তনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে খুব একটা আলোচিত না। কেবল তিনিই নন, রোমিলা থাপার, সতীশচন্দ্র থেকে শুরু করে মুজাফফর আলাম, সঞ্জয় সুব্রামন্ন্যম, কেশবন ভেলুহতসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদদের ইতিহাস চিন্তা আর ইতিহাস রচনার পদ্ধতি নিয়ে আমাদের বিদ্যায়তনে এক আশ্চর্য নিরবতা রয়েছে। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের যেকোনো লেখা নিয়ে ছোট পরিসরে আলাপ করা কেবল কঠিনই না; তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত প্রসঙ্গটি আমলে নিলে ক্ষুদ্র পরিসরের আলাপ উনার কাজের নিবিড় গভীরতার প্রতি অসম্মান দেখানোও হতে পারে। তবে একজন নিষ্ঠাবান পাঠক ও মুরিদ হিসেবে আমার ভীষন প্রিয় এই চিন্তকের কাজ নিয়ে এই আলাপ করার ধৃষ্টতা দেখালাম। নিচে আমার পর্যবেক্ষণে উনার উপর্যুক্ত প্রবন্ধদুটোর কয়েকটি কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।
প্রথম প্রবন্ধ: ‘ভারতবর্ষ’ ধারণার ইতিহাসতাত্ত্বিক প্রভাব
‘ভারতবর্ষ’ নিয়ে চট্টোপাধ্যায়ের এই প্রবন্ধটি কালবিভ্রান্তিমূলক (anachronistic) ঐতিহাসিক প্রক্ষেপনকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে একটি ‘মাস্টারক্লাস’ বা ধ্রুপদী পাঠ। এই কালবিভ্রান্তিকে পরিভাষাগতভাবে ‘ভূখণ্ডগত কালবিভ্রান্তি’ বলা হয়। বর্তমানের বা কোনো ভূখণ্ডগত পরিচয়কে যখন চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় ও আদর্শ হিসেবে নির্মাণ করা হয় আর সেই পরিচয়কে যখন হাজার হাজার বছর আগের ভূখণ্ডের উপরে আরোপ করা হয়, তখনই এই অনৈতিহাসিক কালবিভ্রান্তি ঘটে। তিনি বিভিন্ন স্থান ও কালের বিভিন্ন উৎস ঘেঁটে ‘ভারতবর্ষ’ ধারণাটির, এই ভৌগোলিকতা আর পরিচয়গত বৈশিষ্ট্যাবলির রূপান্তরকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিহ্নিত করেছেন। পাশাপাশি, যখন আমরা ইতিহাসের জাতীয়তাবাদী জবরদখলের প্রবল চর্চার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, কেন ও কীভাবে এই রূপান্তরের বোঝাপড়া জরুরি সেই আলাপেই নজর দিয়েছেন। সুনির্দিষ্ট থিম হিসেবে এই প্রবন্ধের প্রধান আলাপগুলো হলো:
১. ভারতবর্ষের গতিশীল রূপান্তর: ভূখণ্ডগত পরিচয় কোনো ‘স্বতঃসিদ্ধ সত্তা’ নয়
চট্টোপাধ্যায় শুরুতেই প্রবল বা প্রচলিত ধারণাটির মুখোমুখি পাঠকদের দাঁড় করিয়ে দেন চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় হিসেবে ধরে-নেয়া একটি ধারণাকে প্রশ্ন করে। বর্তমান জাতি-রাষ্ট্রর ভূখণ্ডগত সীমানা ও সেই সীমার মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীগুলোর স্বীকৃত পরিচয়ের নিরিখে ধরে নেওয়া হয়: “আমরা যে দেশে বাস করছি তার অর্থ বা দ্যোতনা চিরকাল একই ছিল, এবং আজ আমরা দেশ সম্পর্কে যা ভাবি, অতীতেও ঠিক তাই ভাবা হতো”। তিনি স্পষ্টভাবে দেখান, ভারতবর্ষের ধারণাটি কোনো আগে থেকে তৈরি ধারণা ছিল না এবং এই ভূখণ্ডের আধুনিক বিভিন্ন পরিচয়ের (যেমন: ভারতীয় সংস্কৃতি, ভারতীয় ঐতিহ্য, ভারতীয় জ্ঞান ইত্যাদি) ‘স্বতঃসিদ্ধ সত্তা’ ছিল না। বরং এগুলো “ঐতিহাসিকভাবে রূপান্তরিত হয়েছে” । একরৈখিক ও একশিলা ঐতিহাসিক আখ্যান থেকে সরে আসার ক্ষেত্রে এই প্রস্তাবই একটি নিবিড় বিশ্লেষণের রাস্তায় হাঁটা শুরুর যাত্রাবিন্দু হতে পারে।
পাশাপাশি, আরেকটি বুনিয়াদী ধারণাকেও তিনি চ্যালেঞ্জ করেন। ভূখণ্ডের সঙ্গে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, ভাষা, ঐতিহ্যাবলি, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মাচরণ, গোষ্ঠীগত বা সামষ্টিক নানান পরিচয়সমেত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও জৈবিক পরিচয়কে সমাপতন ঘটানো অথবা মিলিয়েমিশিয়ে দেয়া কেবল অনৈতিহাসিকই নয়; বরং ভূখণ্ডগত কালবিভ্রান্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। আধুনিক ঔপনিবেশিক জ্ঞানে যেভাবে ভূগোল, জৈবিক বৈশিষ্ট্যাবলি আর সাংস্কৃতিক বহুত্বগুলোকে একত্রিত করা হয়েছে, অবিচ্ছেদ্য হিসেবে পেশ করা হয়েছে, সেটা প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলের বৃহত্তর কালিক ও স্থানিক পরিপ্রেক্ষিতে সতত রূপান্তরশীল ছিল।
এই তারল্য ও পরিবর্তনশীলতা দেখানোর জন্য তিনি ভারতবর্ষের ধারণাগত পরিবর্তনের পথরেখাটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন:
ক. নির্দিষ্ট ‘জনপদ’ থেকে বৃহত্তর ভূখণ্ড: তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রাথমিকভাবে ভারতবর্ষ ছিল “পরবর্তীতে যা হয়েছে তার একটি অংশমাত্র। সম্ভবত সেটা ভরতদের ‘জনপদ’-এর সাথে সম্পর্কিত ছিল” । প্রাচীন ভারতে ‘জনপদ’ বলতে কোনো কুল/জ্ঞাতিত্বসূচক/ভাষাগোষ্ঠীসূচক স্থান বা রাজ্যকে বোঝাত। জনপদের সংজ্ঞা ও বিবরণীও বিভিন্ন লিখিত সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিবেশিত হয়েছিল। এই আদি ও ক্ষুদ্র এলাকাভিত্তিক বোঝাপড়াটি পরবর্তীকালের বিশাল আঞ্চলিক দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি আরো দেখান: “বিভিন্ন স্বতন্ত্র জনপদ ধীরে ধীরে পরবর্তী বৃহত্তর ধারণা বা কল্পনার স্থানিক-সামাজিক (spatio-social) উপাদানে পরিণত হয়”। একথার অর্থ হলো, কোনো নির্দিষ্ট বা পূর্বনির্ধারিত সীমানা নয়, বরং অর্থ ও ভূখণ্ডের একটি ক্রমিক সংযোজন বা বিবর্ধন ঘটেছিল। অধুনা হিন্দুত্ববাদীরা ‘বেদ’ বা ‘বৈদিক’ বলতে যে একটি সমসত্ত্ব ও বিশ্বজনীন ধারণা উৎপাদন করেছে, সেই বেদ ও বৈদিকতারও বিচিত্র ও বহুবিধ অর্থ আর রূপান্তর ছিল। চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি আরো অনেক ইতিহাসবিদ ও ভাষাতত্ত্ব বিশ্লেষকও বেদের বিভিন্ন বর্গ, শ্রেণিকরণ, কালানুক্রমিক রূপান্তর আর স্থানিক চিহ্নায়নের বহুবিধতার কথা উল্লেখ করেছেন। ঋগ্বেদের বর্তমান চেহারা বহু পরে অর্জিত হয়েছে। অনেক অংশ প্রক্ষিপ্ত বা পরবর্তীতে সংযোজিত। অন্যদিকে চারটি বেদ ছাড়াও ব্রাহ্মণ ও সংহিতা বর্গের, উপনিষদীয় বহু টেক্সটই একত্রে বৈদিক সূত্রসমষ্টি বা কর্পাস হিসেবে গণ্য হয়। বর্তমান ভারতবর্ষকে পেছনে ঠেলে বেদের সময়কালকে পিছনে ঠেলে ‘অখণ্ড ও বৃহত্তর একটি ভূখণ্ড’-এর চেহারা ও বাসনাকে বৈধতা দেয়া হয়ে থাকে। অথচ বিভিন্ন সূত্রে আর্যাবর্ত, মধ্যদেশ, জম্বুদ্বীপ অথবা ভরতদের (ভরতের কুল) বাসভূমি হিসেবে বর্তমান ভারতবর্ষের ধারণাকে প্রাচীন ও অপরিবর্তনীয় একটি স্বতঃসিদ্ধ ভূখণ্ড ও সংস্কৃতি হিসেবে পেশ করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন সূত্রে আর্যাবর্ত/মধ্যদেশ/জম্বুদ্বীপের মতন স্থানগুলোর যেসকল বিবরণী প্রদত্ত হয়েছে তার মধ্যে যেমন ভিন্নতা আছে, তেমনই সেই পরিচয়ের অর্থ ওই টেক্সটের আখ্যানভঙ্গি আর প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
খ. মহাকাব্য ও পৌরাণিক কল্পচিত্র: চট্টোপাধ্যায় একটি বৃহত্তর ও তখনো বিবর্তনশীল বোঝাপড়া তৈরির ক্ষেত্রে পুরাণের মতো টেক্সটগুলোর ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেন। অন্যান্য লিখিত উৎসের মতনই মহাপুরাণ, উপপুরাণ এবং অন্যান্য নানা শ্রেণির স্থানিক পুরাণ রয়েছে। পুরাণের আখ্যানভঙ্গি আর বিবরণীও বিভিন্ন সময়ে রূপান্তর ও পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। কথ্যরূপে আদিতে প্রচলিত থাকলেও স্তরে স্তরে সেই চেহারা ও গঠন পাল্টেছে। এই ধরনের লিখন ঐতিহ্যের পাণ্ডুলিপিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে। তারপরেও বেশিরভাগ গবেষক একটি বড় কালানুক্রমিক সীমা প্রস্তাব করেন। যেমন: বিষ্ণুপুরাণ বা বায়ুপুরাণের যে লিখিত রূপ পাওয়া যায় তা আনুমানিক. সাধারণ ৬ষ্ঠ-৯ম শতকের মধ্যকার। একই রকম লিখিত রূপায়ন আর স্থানিক ভিন্নতা মহাভারত বা রামায়নের মতন মহাকাব্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো টেক্সটের কাঠামো, প্রকৃতি, পরিপ্রেক্ষিত এবং ভাষিক বিশ্লেষণ জানা খুব জরুরি। আর কোনো ভৌগোলিক বা জনগোষ্ঠীগত বা আচার-আচরণগত বিবরণীকে আক্ষরিকভাবে আধুনিক রৈখিক সময় ও স্থানের ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা পদ্ধতিগত ভুল বলেই মনে করা হয়। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় তার বিশ্লেষণে উপর্যুক্ত পুরাণের উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি লিখছেন, “একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে, মহাকাব্য ও পুরাণের হাত ধরে ভারতবর্ষ একটি বিশাল ও বিস্তৃত পরিসরের কল্পচিত্র লাভ করে”। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, এই কল্পচিত্র বা ইমেজারি [ভারতবর্ষকে] এমনকি “ক্ষুদ্রতর অঞ্চলগুলোর” কাছেও একটি “অপরিহার্য রেফারেন্স পয়েন্ট” বা প্রাসঙ্গিক বিন্দুতে পরিণত করেছিল। তবে, তিনি পরোক্ষভাবে সতর্ক করে দেন যে, এই সাহিত্যিক নির্মাণকে যেন আমরা প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ঐক্য (political unity) ভেবে ভুল না করি—যে পার্থক্যটি আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদ প্রায়শই গুলিয়ে ফেলে।
গ. অন্যান্য সাহিত্যিক উৎস: তিনি কালিদাস রচিত রঘুবংশ কাব্যের (আনু. সাধারণ ৫ম শতক) এবং গুর্জর-প্রতিহার শাসকদের সভাকবি রাজশেখরের কাব্যমীমাংসা (আনু. সাধারণ ১০ম শতক) বিশ্লেষণ করে এই দুই ধরনের লিখিত সূত্রে স্থান-ভূগোল আর ভারতবর্ষের ধারণার ক্রমরূপান্তর ও বৈচিত্র্য নিয়ে আলাপ করেছেন। লিখিত সূত্রের বা টেক্সটের প্রকৃতি ও আখ্যানভঙ্গীর বিচারবিশ্লেষণ আর রচয়িতা ও রচনার পরিপ্রেক্ষিতায়ন জরুরি। আক্ষরিকভাবে কোনো ভৌগোলিক বিবরণীকে যেমন গ্রহণ করা যাবে না, তেমনই সেই ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত করে জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও সংস্কৃতিকেও প্রশ্নাতীতভাবে ‘সত্য’ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। রঘুবংশ একটি আদর্শায়িত কাব্য এবং কালিদাস রঘুর দিগ্বিজয়ের যে কাব্যিক বিবরণী হাজির করেছেন তা বিচার করার ক্ষেত্রে রচনার এই প্রকৃতি বিবেচনায় রাখতে হবে। অন্যদিকে, দিগ্বিজয়ের বিভিন্ন দিশা বা দিক পর্যালোচনা করে ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, এক্ষেত্রে উল্লিখিত বিভিন্ন স্থান ও জনপদের উল্লেখের সঙ্গে সেখানকার বিভিন্ন উদ্ভিদ, পণ্য আর ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যাবলিকে যুক্ত করা হয়েছে। সেটা সেই সময়ের ভূগোলের বিবরণীর একটা ছাঁচ পেশ করে। তবে তিনি বলেন:
কালিদাসের উদ্দেশ্য কঠোর ভৌগোলিক নির্ভুলতা প্রদান করা ছিল না। বরং তার উদ্দেশ্য ছিল একজন সার্বভৌম-পদপ্রার্থী শাসককে যে স্থানটি অতিক্রম করতে হতো তার রূপরেখা দেওয়ার জন্য এই স্কিমা বা নকশাটি ব্যবহার করা। কিছু কিছু অবস্থানের স্বেচ্ছাচারিতা সহজেই নির্দেশ করা যায়: যেমন কলিঙ্গের পরেই কেবল দক্ষিণ অঞ্চলের ইঙ্গিত দেওয়া; মলয়ের সঙ্গে নয়, বরং সহ্য বা পশ্চিমঘাটের পরেই কেবল কেরালার উল্লেখ; প্রাগজ্যোতিষ থেকে কামরূপকে আলাদা করা এবং রঘুর ‘উদীচ্য’ বা উত্তরের বিস্তৃত অভিযানের প্রেক্ষাপটে তাদের অবস্থান নির্দেশ করা। পুনরায় বলা যেতে পারে যে, কালিদাস ভৌগোলিক নির্ভুলতার চেয়ে রঘুর ভ্রমণসূচিকে চার দিকের মূল ধারণার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিলেন। (লেখকের তর্জমা)
অন্যদিকে কাব্যমীমাংসা তৎকালীন সংস্কৃত কাব্যরীতি সম্পর্কিত একটি কিতাব হলেও, তাতে উল্লিখিত দিক বা দিশার ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্র বা বিন্দুকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। বর্তমান ভারতের উত্তরপ্রদেশের কনৌজ বরাবর একটি উত্তর থেকে দক্ষিণাভিমুখী রেখা কল্পনা করলে সেই কেন্দ্রকে চিহ্নিত করা যেতে পারে বলে ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় মনে করেন। এক্ষেত্রেও ভারতবর্ষকে একটি পৌরাণিক বৈশ্বিক রূপরেখার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে উল্লিখিত বিভিন্ন স্থান ও অঞ্চলের ধারণা ও বৈশিষ্ট্যাবলির সঙ্গে বর্তমানে ঐতিহাসিক সত্য-হিসেবে পরিবেশিত ‘অখণ্ড ভারত’-এর ভূখণ্ডগত ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকেন্দ্রীক ( ‘হিন্দু ভারত’ বা ভারতের হিন্দু জাতি) নির্মাণের কোনো সম্পর্ক নাই। একইসঙ্গে, রাজশেখরের ভৌগলিক ধারণার কেন্দ্রও ছিল আর্যাবর্ত আর পরবর্তীতে ধারণাকৃত মধ্যদেশ। ঐতিহাসিক লিখিত উপাত্তের বিবেচনায় বর্তমান ভারত ও পাকিস্তান জুড়ে বিস্তৃত পাঞ্জাব-হরিয়ানা অঞ্চলকেই ‘আর্যাবর্ত’ হিসেবে ধরে নেয়া যায়; আর গঙ্গা-যমুনা দোয়াবের উত্তরদিকে প্রসারিত অংশকে ‘মধ্যদেশ’ হিসেবে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু বর্তমান ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রের ধারণায় যে আধুনিক সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে একীভূত করা হয়, তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট সীমানা, ও জনগোষ্টীগত (অর্থাৎ জাতীয়তবাদী) পরিচয় সেকালে অনুপস্থিত ছিল। বিভিন্ন দিক বা দিশার বিবরনীতে আদর্শায়িত যে চেহারা ও ছাঁচ পরিবেশিত হয়েছিল সেগুলোর সঙ্গে বর্তমানে হিন্দুত্ববাদী ‘অখণ্ড ভারত’-এর ধারণা, অর্থ ও ব্যঞ্জনার কোনো ধরনের মিল নাই। তিনি বলেন:
পৌরাণিক উপাদানের পুনরাবৃত্তি এবং তার সঙ্গে নতুন সংযোজনের মাধ্যমে রাজশেখর যা করতে চেয়েছেন, তা হলো—মূলত পৌরাণিক কাঠামোর মধ্যেই ভারতবর্ষের একটি নকশাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা; তবে তার উপস্থাপনায় এটি বংশলতিকার সংযোগ থেকে মুক্ত। ভবিষ্যৎ রচয়িতাদের কাছে হয়তো তাদের নিজস্ব প্রসঙ্গগুলোকে খাপ খাওয়ানোর জন্য এই ধরণের নকশা বেশ উপযোগী বলে মনে হয়েছিল। (লেখকের তর্জমা)
২. ‘পশ্চাৎমুখী প্রক্ষেপন’-এর বিপদ: বিচিত্র ইতিহাসকে অবমূল্যায়ন
চট্টোপাধ্যায়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সমালোচনাগুলোর কেন্দ্রীয় মনোযোগের মধ্যে একটি হলো “আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদের সেই পশ্চাৎমুখী ঝোঁক” (retrospective thrust)। একটি মতাদর্শ হিসেবে এমন ঝোঁক স্থান ও কালের সম্পর্কের বিচিত্র বুনন বা টেক্সচারকে আড়াল করে দেয়। এই মনোযোগ “সমসাময়িক রাজনৈতিক এজেন্ডার স্বার্থে ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যার এজেন্ডা”র বিপদ ও ভ্রান্তি সম্পর্কে তার আপত্তি ও উদ্বেগ প্রকাশ করে। কীভাবে এই ‘ঝোঁক’ ঐতিহাসিক অনুসন্ধানকে বিকৃত করে তা তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন নিম্নলিখিতভাবে :
ক. ‘মৌলিক ঐক্য’ (Fundamental Unity)-এর ধারণাকে চ্যালেঞ্জ: তার মতে, ইতিহাসের পাঠ যদি শুরুই হয় “ভারতের ‘মৌলিক ঐক্য’ই হলো ভিত্তি”—এই পূর্বানুমান নিয়ে, তবে তা একটি ‘কেন্দ্র-সর্বস্ব’ (centre-centric) দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। এই পদ্ধতি ঐতিহাসিক উপাদানগুলোকে ছাঁকনির মধ্য দিয়ে এমনভাবে বিচার করে, যেখানে দেখা হয় তারা ঠিক কতটা ‘সর্ব-ভারতীয়’ (pan-Indian) আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে, অথবা সেই আদর্শ থেকে কতটা বিচ্যুত। এই প্রক্রিয়াটি একটি পূর্বনির্ধারিত, ঐক্যবদ্ধ আখ্যান উৎপাদন করতে গিয়ে সত্যিকারের স্থানিক ও কালিক বৈচিত্র্যকে সরাসরি দমন করে।
খ. একটি ‘কেন্দ্র-অপসারিত’ (De-centered) ঐতিহাসিক পদ্ধতির প্রস্তাবনা: কোনো পূর্বানুমানভিত্তিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতি খোঁজার বদলে, ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় একটি আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন যে এমন দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরাপুরি উল্টে দেওয়া প্রয়োজন। কোনো একটি ঐতিহ্য থেকে সমস্ত বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে—এটা না ভেবে, আমাদের দেখা উচিত কোন কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি বৃহৎ সত্তা তৈরি হলো। ইতিহাসের উপাদান হিসেবে নানা স্থান ও উৎসের বহুত্বর (multiplicity) সংমিশ্রণ ও সংশ্লেষের (আর বাদ দেয়ার) মধ্য দিয়ে গঠিত একটি ক্যালিডোস্কোপিক বা বিচিত্ররঙা স্থানিক-কালিক সত্তার খোঁজ করার যে আহ্বান তিনি করেছেন, তা একটি গভীর ‘বি-ঔপনিবেশিক’ পদ্ধতি। এই আহ্বান একটি একরৈখিক, গন্তব্যমুখী বা পরমকারণবাদী (teleological) অগ্রগতির বদলে জটিল ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলো উন্মোচনের চেষ্টা করার আবেদন। এই প্রস্তাবনা ও বিশ্লেষণ হিন্দুত্ববাদী আখ্যানের সরাসরি বিরোধিতা করে। এই হিন্দুত্ববাদী বুনিয়াদী আখ্যান ঐতিহ্য ও পরিচয়ের ধারণাগুলোর সাথে এমনভাবে সুবিধাজনক সম্পর্ক স্থাপন করে, যেন সেই ধারণাগুলোকে জটিল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক গৌরবোজ্জ্বল অতীতের সরলীকৃত অথচ শক্তিশালী আখ্যান তৈরির কাজে ব্যবহার করা যায়।
গ. ঔপনিবেশিকতা এবং একটি সমসত্ত্ব (Homogeneous) অতীতের নির্মাণ: যদিও চট্টোপাধ্যায় প্রাচীন টেক্সট নিয়ে কাজ করেন, তার কাজ পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে একটি ঐক্যবদ্ধ ভারত সম্পর্কে ঔপনিবেশিক চিন্তাধারার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশীয় ভাষায় ইতিহাস লেখার চর্চা মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাস লিখনকেই মডেল হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এই প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কারণ একটি একক, ভৌগোলিকভাবে সীমানাবদ্ধ সত্তা হিসেবে ‘ইন্ডিয়া’র ধারণাটি... ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের অধীনেই উল্লেখযোগ্যভাবে জমাট বেঁধেছিল। চট্টোপাধ্যায় বলেন :
ইতিহাস লিখন হোক বা সাধারণ চিন্তাভাবনা—তাদের পরিচয় আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; এমন একটি পরিচয় যা ঔপনিবেশিক প্রশাসনের কাছ থেকে আরও উৎসাহ পেয়েছিল। তারা তাদের ভূমি জরিপ (cadastral surveys), প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্র এবং অন্যান্য দাপ্তরিক কাজের মাধ্যমে এই ধারণাগুলো ব্যবহার করে একটি ম্যাপ-যোগ্য, কংক্রিট আঞ্চলিক পরিচয়ের দানা বাঁধতে সাহায্য করে এবং সেটিকে অতীতের ওপর ছুঁড়ে দেয়; যা ছিল উন্মুক্ত, তা এখন হয়ে গেল প্রশাসনিকভাবে সংজ্ঞায়িত একটি বদ্ধ দেশ—‘ভারতবর্ষ’ হয়ে উঠল এক সমসত্ত্ব ঐতিহাসিক আখ্যানের নবনির্মিত কেন্দ্রভূমি। (লেখকের তর্জমা)
এই উদ্ধৃতিটি একটি সরাসরি অভিযোগনামা। এই অভিযোগে ভূখণ্ডগত কালবিভ্রান্তি আর সেই কালবিভ্রান্তি উৎপাদনের কৌশলগুলো প্রধান হয়ে ওঠে। তিনি দেখান কীভাবে ঔপনিবেশিক চর্চাগুলো পরবর্তীকালের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য একটি ‘সমসত্ত্ব ঐতিহাসিক আখ্যান’ এবং একটি ‘ মানচিত্রায়ন-যোগ্য, অনড় ও বুনিয়াদী আঞ্চলিক পরিচয়’ নির্মাণের ব্লু-প্রিন্ট বা নকশা তৈরি করে দিয়েছিল, আর কীভাবে পরবর্তীতে সেই পরিচয় কালবিভ্রান্তিমূলকভাবে (anachronistically) অতীতের ওপর প্রক্ষেপ করা হয়েছে। নিখুঁতভাবে এই অভিযোগনামা দেখিয়ে দেয় যে, কীভাবে ‘ঔপনিবেশিক প্রত্নবস্তু এবং আখ্যানগুলো’ পুনঃপ্রতীকায়িত (re-symbolized) হয় এবং “নেটিভ বা দেশীয় অভিজাতদের দ্বারা নতুন ধরনের আধিপত্য ও নিপীড়ন কায়েম করা”র হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়।
দ্বিতীয় প্রবন্ধ: ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’র ধারণাকে জিজ্ঞাসাবাদ: ভারতের প্রাচীন টেক্সট থেকে উঠে আসা স্বর
এই প্রবন্ধটি আমাদের অতি-পরিচিত বা আইকনিক বুলি ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’র ধারণাকে সরাসরি প্রশ্ন করে। এই ধারণার সমস্যাযুক্ত উৎস ও পরবর্তীকালের মতাদর্শগত জবরদখলকে ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় পরতে পরতে উন্মোচন করেন। চট্টোপাধ্যায় দেখান, কীভাবে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ এই ধারণাটিকে সমসত্ত্বকরণ এবং বর্জনের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করার জন্য বাঁকানো যেতে পারে।
ছবি: ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের সাথে লেখক স্বাধীন সেন
১. রাজনৈতিক একক হিসেবে ‘ইন্ডিয়া’র ঔপনিবেশিক উদ্ভব
চট্টোপাধ্যায় এমন একটি শক্তিশালী দাবি করেন যা ভারতীয় ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ বোঝাপড়াকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে: “ঐতিহাসিক গবেষণার একক (unit) হিসেবে ‘ইন্ডিয়া’র ধারণাটি আদতে ঔপনিবেশিক উৎসের সৃষ্টি” । এর মানে এই নয় যে প্রাচীন সাংস্কৃতিক সংযোগগুলোকে অস্বীকার করা হচ্ছে; বরং তিনি ভারতের রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ধারণাটিকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করছেন। তিনি বিশদভাবে বলেন:
ক. তারল্য থেকে স্থির রাজনৈতিক সত্তা: তিনি বলেন যে, এই ইউনিট বা এককটিকে মূলত একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে, আর একটি ভারতীয় রাষ্ট্র (Indian State) এবং সেই রাষ্ট্রের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিসর (space) হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশের ধারণাটিকে নির্মাণ করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক জ্ঞান ও প্রশাসনিক কাঠামো একটি একক ও ভৌগোলিকভাবে সীমানাবদ্ধ সত্তার ধারণা জমাট বাঁধিয়েছিল এবং পরবর্তীতে সেই ভৌগোলিকভাবে নবায়িত সত্তার পাটাতনে ‘অখণ্ড ভারত’-এর আখ্যানগুলো নির্মিত হয়েছে।
খ. ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার খণ্ডীকরণ: ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় এই বড় আকারর প্রবন্ধে বিভিন্ন সূত্র, টেক্সট যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনই সেসব টেক্সট পাঠের একটি অসাধারণ বিশদ ও উন্মুক্ত পদ্ধতি সামনে নিয়ে এসেছেন। ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চা একটি একক ‘ইন্ডিয়া’র ধারণা প্রতিষ্ঠা করার পরেও, [ভারতীয় ইতিহাসকে] টুকরো টুকরো করে কেটেছে—হিন্দু, মুসলিম এবং ব্রিটিশ পিরিয়ড বা যুগ হিসেবে। পরিহাসের বিষয় হলো যুগবিভাজনের নামে এই খণ্ডীকরণই পরবর্তীকালের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল; এমনকি জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদগণ প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক নামে সেই যুগগুলোর নামকরণ কেবল বদলালেও যুগবিভাজনের বুনিয়াদী ভিত্তি একই রেখেছিলেন। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক কালপর্ব বা যুগগুলোর বৈশিষ্ট্যাবলি ধর্মীয় বাইনারি বা দ্বিমেরুকরণের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। এই কৌশলটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হিন্দুত্ববাদীরা আজ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। ‘১২০০ বছরের ঔপনিবেশিকতা (যার মধ্যে মুঘল আমলও অন্তর্ভুক্ত)’র বয়ানের বিপরীতে একটি সমসত্ত্ব, অপরিবর্তনীয় ও চিরন্তর হিন্দু ‘স্বর্ণযুগ’কে সংজ্ঞায়িত করায় এই যুগবিভাজনের ভিত্তি ব্যবহার করা হয়। এখানে স্পষ্টতই ব্রিটিশদের পাশাপাশি মুসলমানদেরও বহিরাগত, ‘ভারতীয় সংস্কৃতি’র (পড়ুন ‘হিন্দু সংস্কৃতি)’ জবরদখলকারী, দূষণকারী আর বিনাশকারী কুশীলব হিসেবে পেশ করা হয়।
২. ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’র পবিত্র প্রথার (Hallowed Convention) সমালোচনা
চট্টোপাধ্যায় ভারতে বৈচিত্র্যের ধারণাটি উড়িয়ে দেন না, কিন্তু তিনি ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ নামক বুলিটির (trope) নির্মাণ ও উপযোগিতাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করেন। তার লক্ষ্য হলো—প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক গবেষণাগুলো এই ভাবমূর্তিকে ঠিক কতটা প্রতিফলিত করে সেটা বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রস্তাবিত বিচ্যুতিগুলোর (departures) দিকগুলোর মূল্যায়ন।
ক. তত্ত্ব ও বাস্তবতার অমিল: তিনি একটি ‘বাস্তব অমিল’ (real mismatch) তুলে ধরেন, যা “ইতিহাস এবং তৃণমূল স্তরের বিভিন্ন জরিপ—নৃতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রের—মধ্যে বিদ্যমান”। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ঐক্যের যে গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ বা মহাবয়ান আমরা দেখি, তা প্রায়শই জটিল, আঞ্চলিক এবং উপ-আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের অভিজ্ঞলব্ধ প্রমাণগুলোকে (empirical evidence) অগ্রাহ্য করে। এই বিচ্ছিন্নতা বা ডিসকানেক্ট আসলে “রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য অসুবিধাজনক সামাজিক জটিলতা এবং ঐতিহাসিক সূক্ষ্মতাগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া”র অন্যতম সহায়ক।
৩. মৌলিক ঐক্যের ধারণার অসঙ্গতি আর ভিন্নতার নানান ধরন
স্পষ্টতই হিন্দুত্ববাদ এবং বৃহত্তর অর্থে আধুনিক জাতীয়তাবাদ যে অতীতের বয়ানগুলো জনপ্রিয় করে তোলে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম বুনিয়াদী হলো বর্তমানের পরিচয়ের সাপেক্ষে অতীতে সেই পরিচয়ের উদ্ভব, ধারবাহিকতা আর রূপান্তর খোঁজার বিভিন্ন রকম কুশীলবকে চিহ্নিতকরণ। কোনো একটা সময় সুদুর অতীত থেকে বা হাজার হাজার বছর ধরে কথিত জাতির বা পরিচয়ের একটি আদিরূপ ছিল, একটি মৌলিক ঐক্যবদ্ধ রূপ বা চেহারা ছিল—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত করা। সেই বিশুদ্ধ ও পবিত্র রূপের নির্মাণ যেমন নানাভাবে করা হয়, তেমনই দূষণকারী বা বিচ্যূতিসৃষ্টিকারী হিসেবেও কোনো কোনো পন্থা, মতবাদ, সম্প্রদায় অথবা জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। জাতীয়তাবাদী আত্মসত্তা একটি বা একাধিক ‘অপর’ নির্মাণ করা ছাড়া কখনো টিকে থাকতে আর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। ‘নিজ’ পরিচয় এই অর্থে ‘অপর’-এর সঙ্গে সম্পর্কের আখ্যানের মধ্য দিয়ে নির্মিত, পুনর্নবায়িত ও রূপান্তরিত হতে থাকে। হিন্দুত্ববাদী আর নয়া-হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসের আখ্যানও কিছু মৌলিক ও ভিত্তিদায়ী অপরায়নের বয়ানের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সারসত্তাগতভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী আর বর্তমান ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অঞ্চল (আর্যাবর্ত ও মধ্যদেশ) কেন্দ্রীক এই আখ্যানে পরবর্তীতে অন্যান্য অঞ্চলকে আর্যীকরণ/অ্যারিয়ানাইজেশন ও সংস্কৃতায়ন/স্যানসক্রিতাইজেশনের প্রক্রিয়ার কথা বলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা হয়। পাশাপাশি, বর্তমানবাদী এজেন্ডাগুলোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কোনো পরিচয়কে ‘সিদ্ধ’ হিসেবে স্বীকার করা হয়, আবার কোনো পরিচয়কে ‘অসিদ্ধ’ হিসেবে তকমা দেয়া হয়। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে, হিন্দুত্ববাদী বা জাতীয়তবাদী এই আদি ও চিরন্তন মৌলিক সারসত্তাকৃত ঐক্য বিভিন্ন লিখিত সূত্রের বাছাইকৃত, বিকৃত আর পদ্ধতিগতভাবে ভ্রান্ত বিশ্লেষণ করে বর্তমানের প্রতিষ্ঠান, বিদ্যায়তন, প্রকাশনা আর হালের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এমনভাবে যে, যেকোনো ভিন্ন ও বিশ্লেষণাত্মক আখ্যানই জাতি-বিরুদ্ধ, ভারত-বিরোধী অথবা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে তকমায়িত হয়। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় আলোচ্য প্রবন্ধে বিভিন্ন সময়ের ও বিভিন্ন ধরনের টেক্সট বিশ্লেষণ করে অতীতে ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ভিন্নতা, অপরায়ন, বিবাদ আর বহুত্বকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। যেমন, ঋগ্বেদের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন:
আদিকালের টেক্সটগুলোর লেখকদের চিন্তাকে বৈশিষ্ট্যায়িত করেছিল এমন একটা অনুভব যে, সামাজিক পরিস্থিতি কতগুলো বিপরীত জোড়ের মিলে, অথবা বহু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। সরাসরি বলা হয়েছিল যে, বিপরীত জোড়গুলোর মধ্যকার সম্পর্ক স্পষ্টতই পুনর্মিলিত হওয়ার অযোগ্য। অন্যদিকে, সামাজিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচিত ভিন্নতার মধ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যক্ত হতো নানাবিধভাবে। আর্য ও দস্যুর মতো পদাবলির মাধ্যমে ঋগ্বেদে যেভাবে দুটো বর্গের বৈপরীত্যকে প্রকাশ করা হয়েছে, সেই বৈপরীত্য কেবল দুটো দলের সমসাময়িকতার প্রকাশক ছিল না। দুটো দলের মধ্যে বিরাট সাংস্কৃতিক ফারাকের কারণে বলা হয়েছে যে, আর্যদের প্রয়োজন দস্যুদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। আর্য ও ম্লেচ্ছ বর্গের ফারাক ভাষাগত ভিন্নতা থেকে উদ্ভূত হয়ে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে জেনেরিক বর্গ হিসেবে ম্লেচ্ছ পদটি যবন, শক, তুষার, চিন, হুনের মতো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে নির্দেশ করত। দুটি জাতিবর্গের পরস্পরের মধ্যে লীন হয়ে যাওয়ার অসম্ভাব্যতার ধারণা সর্বকালেই অটুট ছিল। আর্যদের সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছুর প্রতি লেখকদের (যেহেতু এই প্রারম্ভিক পর্বের লেখকগণ এই বর্গেরই প্রতিনিধিত্ব করতেন) অনুরাগ থাকার কারণে অন্যদের তুলনায় আর্যদের ছবি আঁকা হয়েছে মহত্তর হিসেবে। (লেখকের তর্জমা)
তিনি নাট্যশাস্ত্র, কামসূত্র বা বিভিন্ন নাট্যসাহিত্য পর্যালোচনা করেন বিশদভাবে। কীভাবে ভাষা, বৃত্তি, প্রবৃত্তি অথবা ধর্মপরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠী বা জনপদ বা অঞ্চলকে ব্রাহ্মণ্য মানদণ্ড অনুসারে হীন, নিকৃষ্ট এবং দূষিত হিসেবে চিহ্নিত করা হতো, আর কোনোটি উৎকৃষ্টভাষা, বিশুদ্ধ বৃত্তি ও প্রবৃত্তি, উত্তম আচার, আর্যত্ব নিশ্চিতকারী দৈনন্দিন আচরণ হিসেবে নির্ধারিত হতো—সেটা তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে বড়কথা, এসব বাদ-বিবাদ আর মানদণ্ড বিভিন্ন স্থান ও কাল অনুসারে রূপান্তরিত, পুনর্নবায়িত, পুনরানয়িত হওয়ার উদাহরণও তিনি পেশ করেন। বনবাসী, দলিত, ভিন্ন মতাবলম্বী আর বেদের প্রামাণ্যতা অস্বীকারকারী মানুষজন, জনগোষ্ঠী অথবা জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত জনপদ বা এলাকাগুলোকে কোনো কোনো সময় পাষণ্ড, বর্বর, চন্ডাল, ম্লেচ্ছ, ইত্যাদি নানা হীন অভিধায় ভূষিত করা হলেও, আবার পরে সেই গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে বা ভাষাগোষ্ঠীকেই আত্মসাৎ করা এবং দখল করার পরে কীভাবে সেই অভিধাগুলো ইতিবাচক হয়ে উঠতো—তেমন উদাহরণও তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পেশ করেছেন। তিনি বলছেন:
মার্গ যেমন স্বর্গীয় হিসেবে আর দেশী যেমন পার্থিব বা অন্তঃসারশূন্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত হতো, সেভাবেই অপবিত্র বা অশুদ্ধ হিসেবে যা চিহ্নিত হতো, তার বিপরীতে পবিত্র বা শুদ্ধ হিসেবে অন্যগুলোকে অনুধাবন করা হতো। এই ভিন্নতা বা পার্থক্যের ধারণার উদ্ভব ঘটে থাকতে পারে একেবারেই কঠোর ব্রাক্ষণ্য চিন্তার তরিকা থেকে। তবে যে-কোনো সামাজিক বাস্তবতার অনুধাবনই হতে হবে তার প্রত্যক্ষণনির্ভরতার ভিত্তিতে; তার পরিবর্তনশীলতার, অসঙ্গতির সাপেক্ষে; সংঘাতপ্রবণ, রূপান্তরশীল হিসেবে; ব্যক্তি কুশীলবের সক্রিয়তার সাপেক্ষে। (লেখকের তর্জমা)
‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’র ধারণার প্রধান সমস্যা হলো—কোন কোন বৈচিত্র্যকে বৃহত্তর ও প্রভাবশালী বিশ্ববীক্ষা আর মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হিসেবে কখন ও কীভাবে স্বীকার করা হলো, আর কোনগুলোকে বাদ দিতে থাকা হলো—সেই প্রসঙ্গ। কতটা বৈচিত্র্য থাকলে ঐক্য বলবৎ থাকবে? কোন কোন বৈচিত্র্যকে ঐক্যের কল্পিত ছাঁচে আঁটানো যাবে আর কোন কোন বৈচিত্র্যকে ঐক্যের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে বা ঐক্য বিনষ্টকারী হিসেবে দাগিয়ে দেয়া হবে?—এই প্রশ্নগুলোকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন।
ক. অঞ্চল যখন ‘খণ্ডিত পরিসর’ (Fractured Space): চট্টোপাধ্যায় পর্যবেক্ষণ করেন যে, “ঐতিহাসিক চিন্তাভাবনায় ‘অঞ্চল’ (region) ছিল একটি খণ্ডিত পরিসর বা স্থান, যা কেবল একটি বৃহত্তর অংশের টুকরো মাত্র; এবং এটিকে মূলত দেখা হতো বৃহত্তর সাংস্কৃতিক এলাকা বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি সাধারণীকৃত ইতিহাসের নিরিখে”। অঞ্চলগুলোকে কেবল একটি বৃহত্তর সত্তার উপাদান হিসেবে দেখার এই ‘খণ্ডীকরণ’ বা ফ্র্যাকচারিং তাদের নিজস্ব ইতিহাস ও অবদানকে সামগ্রিকভাবে বোঝার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যা প্রথম প্রবন্ধে তার সমালোচিত ‘কেন্দ্র-সর্বস্ব’ দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিধ্বনি।
খ. জাতীয় সংবেদনশীলতাকে (National Sensitivity) ঐতিহাসিকভাবে স্বয়ংসিদ্ধকরণ: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চট্টোপাধ্যায়ের ভূখণ্ড ও সংবেদশীলতাকে একীভূত করে ফেলার ভ্রান্তির দিকে নজর প্রদান। তিনি স্পষ্টই বলেন যে:
কোনো স্থানের সাথে নির্দিষ্ট একটি জাতীয়তাবাদের মতন কোনো যৌথ সংবেদনশীলতা স্বয়ংক্রিয় বা স্বতঃসিদ্ধভাবে বিরাজ করে এমন যুক্তি ভ্রান্ত। কোনো সংবেদনশীলতা বা স্পর্শকাতরতা সেই স্থানের বা সেখানে বসবাসকারী যৌথ মানবসত্তার কোনো ‘প্রদত্ত গুণ’ (given quality) নয়। এটি এমন একটি সংবেদনশীলতা যা ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত হয় এবং যার রূপান্তর বা মিউটেশন ঘটতে পারে। (লেখকের তর্জমা)
এই যুক্তি হিন্দুত্ববাদের সেই দাবিকে সরাসরি দুর্বল করে দেয়, যেখানে একটি প্রাচীন, সহজাত এবং অপরিবর্তনীয় হিন্দু জাতীয় বৈশিষ্ট্য বা হিন্দুদের কিছু অর্জিত মনোবৃত্তি, বুদ্ধিবৃত্তি আর অনুভূতির অস্তিত্ত্বের দাবি করা হয়। ভৌগোলিক বা ভূখণ্ডকেন্দ্রীক নির্দিষ্টতাবাদী এই আরোপন বিশেষ ভূখণ্ড বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানুষের আচার-আচরণ, আবেগ-অনুভূতি, সংবেদন, বুদ্ধিমত্তা, বীরত্ব, বা হীন প্রবৃত্তিকে সারসত্তাগতভাবে সম্পর্কিত করে। প্রাসঙ্গিকভাবে, নাৎসি মতবাদে পবিত্র ভূমি ও রক্তের সম্পর্ককে স্বয়ংসিদ্ধ ও প্রদত্ত গুণ বলে ধরে নেয়া হয়েছিল। বণবাদী, জাতিবর্ণবাদী ও পরিচয়বাদী বিভিন্ন অঞ্চলের বা দেশের প্রবল বয়ানেও নতুন নতুন রূপে ভৌগোলিক নির্দিষ্টতাবাদ বা নির্ধারণবাদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে, ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে আর বিশ শতকের শুরুর দিকে হিন্দুত্ববাদী চৈতন্যের দানা বাঁধার পর্বে হিন্দুদের নারীসুলভ, কোমল, দৈহিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়াকে উজ্জ্বল, বীরত্বসুলভ, শক্তিশালী, পুরুষালী অতীত পরিচয় থেকে বিচ্যূতি হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়। নানাধরনের ব্যায়ামাগার, শরীরচর্চা, স্থানীয় হিসেবে চিহ্নিত অস্ত্রশিক্ষার বিভিন্ন তৎপরতা চোখে পড়ে। হিন্দুত্বের এই পুরুষালী পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে উপনিবেশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কয়েকটি ধারা সম্পর্কিত হয়। বিশেষকরে, বৃটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেয়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর কোনো কোনোটা এই পুরুষালী শক্তিমত্তা ও বীরত্ব অর্জনের সাধনাকে উপনিবেশ বিরোধী লড়াইয়ে যেমন যুক্ত করে, ঠিক তেমনই ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে মুসলমানদের চিহ্নিত করে মুসলমান শাসনামলকে হিন্দুদের এই পুরুষালী শক্তিমত্তার পতনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ‘অখণ্ড ভারত’-এর ধারণা কেবল তাই ভূখণ্ডগতই না। বরং সংবেদন, লিঙ্গীয় পরিচয়, জৈবিক বৈশিষ্ট্যাবলি আর সাংস্কৃতিক মানদণ্ডগুলোর সুনির্দিষ্ট কতগুলো কল্পচিত্র বাস্তবায়নের প্রকল্পও বটে।
গ. ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ: ‘অখণ্ড ভারত’ আখ্যানটি “বিচিত্র ঐতিহাসিক ভূখণ্ড ও সংস্কৃতির ওপর একটি আধুনিক রাজনৈতিক পরিচয় প্রক্ষেপ (project) কর”। চট্টোপাধ্যায়ের যুক্তি প্রমাণ করে যে, এই ধরনের প্রক্ষেপণ মৌলিকভাবেই কালভ্রমাত্মক বা অ্যানাক্রোনিস্টিক। সমসাময়িক ঐতিহাসিক আখ্যানগুলোতে “রাজনৈতিক একীকরণ এবং বিকেন্দ্রীকরণ ও অনৈক্যের ব্যাপারে ভীতির ওপর যে জোর” দেয়া হয়, তা একটি আধুনিক উদ্বেগ ও আতঙ্ক। অন্যমত, ভিন্নতা, বহুত্ব আর সহনশীলতার বিপরীতে ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করা দানবীয়, অশুদ্ধ, অপবিত্র, হীন প্রবৃত্তিসম্পন্ন, নিকৃষ্টভাষাভাষী, অশুদ্ধ বা অ-ভারতীয় আচারআচরণ বিশিষ্ট এক শত্রুর নির্মাণ আর পুনর্নিমাণের পাটাতনে দাঁড়িয়ে আছে এই আতঙ্ক। এই ভাষ্য ও বয়ান কোনো ঐতিহাসিকভাবে নিরিখকৃত ও পর্যালোচিত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার প্রতিফলন নয়। ভেদাভেদ বা বাদ-বিবাদ-সমেত যে প্রাক-আধুনিক ভারত উপমহাদেশ, সেখানকার ভেদাভেদ বা সংঘাত বা মতানৈক্যকে টেনে এনে বর্তমানের সংঘাত, বাদানুবাদ, ভেদাভেদ আর বিদ্বেষকে ন্যায্যতা দেয়ার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই বলেই ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় বারংবার প্রমাণ হাজির করেন।
নিবিড় পর্যালোচনা: উত্তর-ঔপনিবেশিক/বি-ঔপনিবেশিক বিতর্ক ও ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণের অনন্যতা
প্রবন্ধদুটোতে উপস্থাপিত ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষুরধার পাণ্ডিত্য আমাদের এমন একটি শক্তিশালী কাঠামো প্রদান করে, যা হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের কেন্দ্রে থাকা ঐতিহাসিক রিভিশনিজম বা পুনর্লিখনকে বুঝতে এবং ভেঙে দিতে সাহায্য করে। তার কাজ সরাসরি সমালোচনামূলক অনুসন্ধানকে খাটো করে কেবল বেছে বেছে দেশীয় জ্ঞানকে আলিঙ্গন করার পবিত্র আহ্বানকারী সেই ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক জনতুষ্টিবাদের/পপুলিজমের বিপজ্জনক জ্ঞানতত্ত্ব’র অনুপুঙ্খ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধিতা করে। জনপ্রিয়, শ্লোগানসর্বস্ব আর পাল্টা-পরিচয়বাদী প্রতিবাদ ও বয়ানের তুলনায় ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের পর্যালোচনামূলক ও প্রশ্নমূলক বয়ান হিন্দুত্ববাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বুনিয়াদকে ভেঙ্গেচুরে দেয়ার জন্য অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। নতুবা সরল ও জনতুষ্টিবাদী বয়ান হিন্দুত্ববাদী ‘অখণ্ড ভারত’-এর বয়ানের পরিপূরক হয়ে ওঠার, সেই বয়ানগুলোকে বৈধতা প্রদানের যুক্তি তৈরি করার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
১. হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসের কারচুপির বিরুদ্ধে একটি ঢাল
হিন্দুত্ববাদের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘অখণ্ড ভারত’ আখ্যানটি ভারতের অতীত সম্পর্কে এক অনৈতিহাসিক ও সারবত্তাবাদী বোঝাপড়ার ওপর নির্ভরশীল; আর এই বয়ান কেবল ভৌগোলিকভাবে সম্প্রসারণবাদীই না, পাশাপাশি এই বয়ান নানা রূপে ও ছলে বিচিত্র ঐতিহাসিক ভূখণ্ড ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের বহু দিকাভিমুখী ও জটিল মিথষ্ক্রিয়ার উপরে একটি আধুনিক রাজনৈতিক পরিচয় আরোপ করে। এই আরোপন স্পষ্টতই জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সহিংসতা বাস্তবের বিদ্বেষ, নৃশংসতা, সহিংসতা, হত্যা আর নিপীড়নকে ন্যায্যতা প্রদান করে। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের কাজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ‘অখণ্ড ভারত’সহ হিন্দুত্ববাদী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী দাবিগুলোর ঐতিহাসিক মিথ্যাচার প্রমাণ করে। ভারতবর্ষ যে একটি স্থির আঞ্চলিক সত্তা নয় বরং একটি বিবর্তিত ধারণা ছিল, এবং রাজনৈতিক একক হিসেবে ভারতের ধারণা যে ঔপনিবেশিক উৎসের সৃষ্টি—তা দেখানোর মাধ্যমে তিনি পদ্ধতিগতভাবে একটি কালাতীত, ঐক্যবদ্ধ এবং অখণ্ড হিন্দু জাতির ধারণাকে ভেঙ্গেচুরে তছনছ করে দেন। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় হিন্দুত্ববাদীদের ব্যবহৃত পশ্চিমা ও ঔপনিবেশিক জ্ঞান বিরোধীতার কৌশলটিকে প্রশ্ন করেন। হিন্দুত্ববাদের মতন বিভিন্ন পরিচয়বাদই বি-ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুমিত বৈধতাকে কাজে লাগিয়ে একটা জাতীয়তাবাদী ও বিভিন্ন পরিচয়বাদী আখ্যানকে বৈধতা দিতে চেষ্টা করে, আর জনতুষ্টিবাদী বয়ান উৎপাদনের বিভিন্ন কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। এই পশ্চিম-বিরোধিতা বা উপনিবেশ-বিরোধিতা প্রায়শই সমসাময়িক রাজনৈতিক এজেন্ডার স্বার্থে ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যা করে। পরিনতিতে প্রকৃত বি-ঔপনিবেশিক সমালোচনা এবং প্রতিশোধপরায়ণ ও আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদের সীমানাটি ঝাপসা হয়ে যায়।
২. সত্যিকার অর্থেই একটি ‘বি-ঔপনিবেশিক’ (Decolonial) পদ্ধতি
ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতিগতভাবেই বি-ঔপনিবেশিক। তিনি একটি মনোলিথিক আখ্যানের (ঔপনিবেশিক) বদলে আরেকটি আখ্যান (সারবত্তাবাদী দেশীয়) বসাতে চান না। এর পরিবর্তে, তিনি প্রাথমিক উৎসগুলোর (primary sources) একটি সূক্ষ্ম ও প্রেক্ষাপট-সংবেদনশীল পাঠের পক্ষে কথা বলেন। এই পাঠ ও পর্যালোচনা ঐতিহাসিক গতিশীলতা ও বৈচিত্র্যের ওপর জোর দেয়। কেন্দ্র-সর্বস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘পুরাপুরি উল্টে দেওয়া’র আহ্বানটি যেকোনো প্রকৃত বি-ঔপনিবেশিক প্রকল্পের জন্য একটি পদ্ধতিগত আবশ্যকতা। এই পদ্ধতি ইতিহাসের উপাদান গঠনকারী ‘স্থান ও উৎসের বহুত্ব বা মাল্টিপ্লিসিটি’র সাথে বোঝাপড়ার দাবি ও আহ্বানকে সামনে নিয়ে আসে। এই পদ্ধতি হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প “প্রায়শই ঐতিহ্য ও পরিচয়ের ধারণাগুলোর সাথে একটি সিলেক্টিভ বা বাছাই করা সম্পর্কে লিপ্ত হয়, এবং সেগুলোকে তাদের জটিল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক গৌরবোজ্জ্বল অতীতের সরলীকৃত অথচ শক্তিশালী আখ্যান তৈরি করে আর সেই অতীত পুনরুদ্ধার করার ও পুনরুজ্জীবিত করার তৎপরতা জারি রাখে।”
৩. ‘বি-ঔপনিবেশিক জাতীয়তাবাদ’ (Decolonial Nationalism)-কে একটি ‘বিপরীতার্থক শব্দ’ (Contronym) হিসেবে উন্মোচন
হিন্দুত্ববাদীরা ‘ডিকলোনাইজেশন’ বা বি-ঔপনিবেশিকরণ শব্দটিকে একটি ‘বিপরীতার্থক শব্দ’ বা ‘কন্ট্রোনিম’ (Contronym)-এ পরিণত করে। এখানে ঔপনিবেশিক চিন্তা, মনন, জ্ঞান ও চর্চাগুলোকে বিশ্লেষণ করার আর সেগুলোকে প্রতিরোধ করার মূল উদ্দেশ্যকে উল্টে দিয়ে উল্টো নতুন ধরনের আধিপত্যবাদকে ও নিপীড়নকে যৌক্তিকতা দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদের উপনিবেশ বা পশ্চিম-বিরোধিতাকে পরিশেষে ভাসা-ভাসা, শ্লোগানসর্বস্ব, ঐতিহাসিকভাবে ভ্রান্ত ও সুবিধামতন বাছাইকৃত জনতুষ্টিবাদী বয়ান ও তৎপরতা হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। রাজনৈতিক একক হিসেবে ভারতের ঔপনিবেশিক উৎস এবং এর ফলে সৃষ্ট ‘সমসত্ত্ব ঐতিহাসিক আখ্যান’ সম্পর্কে চট্টোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ উন্মোচন করে যে, কীভাবে আপাতদৃষ্টিতে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জনপ্রিয় আখ্যানগুলো (যেমন অখণ্ড ভারতের ‘বিদেশি আক্রমণকারী’দের প্রত্যাখ্যান) কূটাভাসমূলকভাবে বা প্যারাডক্সিকালি “ঔপনিবেশিক ক্ষমতার যুক্তিকেই প্রতিলিপিকরণ (replicate) করতে পারে”—আঞ্চলিক সম্প্রসারণবাদ, সাংস্কৃতিক সমসত্ত্বকরণ এবং একটি আধিপত্যবাদী আখ্যান চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এবং কখনো কখনো আক্রমণকারীদের বা ধ্বংসকারী মুসলমানদের সময়কে ভারতীয় সভ্যতা সৃষ্টির ও নবায়নের যুগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—এমন হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা ঠিক সেই ধরনের ‘ইতিহাস পুনর্লিখন’, যা চট্টোপাধ্যায় ব্যবচ্ছেদ করে দেখান। ভিন্নতা, সম্মিলন, বিনিয়ম, সংঘাত, সংমিশ্রণ আর বাদানুবাদ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ছিল। ‘হিন্দু’ নামক পরিচয়সূচক বর্গটি যেভাবে হিন্দুত্ববাদীরা ব্যবহার করেন, তেমন বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়গত পরিচয় ঐতিহাসিকভাবেই উপনিবেশের বহুবিধ জ্ঞানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। তাই হিন্দুত্ববাদীদের অখণ্ড ভারতের কল্পচিত্র আর হিন্দু জাতির কল্পনার গঠন হয়েছে উপনিবেশের ছাতার নিচে, উপনিবেশের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। তিনি প্রমাণ করেন যে, যে ধরনের যুগবিভাজন অনুসরণ করে হিন্দুত্ববাদীরা অখণ্ড ভারতের কথা বলেন, সেই যুগবিভাগ নিজেই একটি ঔপনিবেশিক লিগ্যাসি বা উত্তরাধিকার।
৪. সারবত্তাবাদের (Essentialism) বিপদ এবং বহুত্ববাদের বিনাশ
ভারতবর্ষের সতত রূপান্তরশীল প্রকৃতি প্রদর্শন করে এবং সরলীকৃত ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ বুলিটির সমালোচনা করে, ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় ভারতের অতীতের একটি বহুত্ববাদী (pluralistic) বোঝাপড়ার পক্ষে অবস্থান নেন। এটি সরাসরি হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার “মনোলিথিক বা একশিলা ‘ভারতীয়ত্ব’ বা ‘হিন্দু পরিচয়’-এর ওপর জোর” দেয়ার বিরোধিতা করে। এই জোর দেয়া প্রকৃতপক্ষে “বিচিত্র ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাগুলোকে সমসত্ত্ব বা একরঙা করার একটি কৌশলগত চাল”। রোমিলা থাপার এবং মানান আহমেদ আসিফের পাশাপাশি তার কাজও এই বিষয়ের ওপর জোর দেয় যে, ‘প্রাচীন’ বা ‘মধ্যযুগীয়’ ভারতের ইতিহাস বোঝা এবং লিপিবদ্ধ করার বিচিত্র সব উপায় ছিল, যা একটি মনোলিথিক বা একরঙা অতীতের সরলীকৃত আখ্যানগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে। যেমনটি আসিফ উল্লেখ করেছেন যে, হিন্দুস্তান নামে পরিচিত বহুসাংস্কৃতিক অঞ্চলটি...ইউরোপীয় প্রভাবের কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল, যার ফলে ‘ভারত মূলত হিন্দু’—এই ধারণার জন্ম হয়।
ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের পাণ্ডিত্যপূর্ণ কঠোরতা (scholarly rigor) আমাদের সেই ধরনের অন্তর্নিহিত পক্ষপাত বা ঐতিহাসিক ভুলত্রুটি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় আখ্যানগুলোকে নির্বিচারে গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখে। এর পরিবর্তে, তিনি একটি সমালোচনামূলক ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের মডেল তৈরি করেন, যা মতাদর্শগত নির্মাণের (ideological constructs) চেয়ে অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ (empirical evidence) এবং প্রাসঙ্গিক বোঝাপড়াকে অগ্রাধিকার দেয়।
ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধগুলো কেবল ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নয়; এগুলো সমালোচনামূলক পাণ্ডিত্যের এক গভীর অনুশীলন, যা আমাদের সেই বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে—যার মাধ্যমে আমরা ‘আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদী’ শক্তিগুলোর দ্বারা ইতিহাস ও পরিচয়ের ‘কৌশলগত জবরদখল বা কো-অপশন’ (strategic co-option) চিনতে এবং প্রতিরোধ করতে পারি। ঐতিহাসিক গতিশীলতা এবং প্রাসঙ্গিক নির্দিষ্টতার (contextual specificity) ওপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী অতীতের আখ্যানগত জনতুষ্টিবাদ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ট্যাগ দেয়া, অপর করে দেয়া এবং বিদ্বেষ ছড়ানোর তৎপরতাগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের ইতিহাসবোধ ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠতে পারে।
…
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫। অরুণাপল্লী, সাভার।
লেখক পরিচিতি: স্বাধীন সেন একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষকতা করেন। আন্তঃশাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সংলাপ রচনায় একজন সঞ্চালক হিসেবে তার আগ্রহ বেশি। প্রতিবেশ প্রসঙ্গে জল ও স্থলের বিভাজনের বা মানুষ ও না-মানুষী দুনিয়ার বিচ্ছেদের বিপদ প্রসঙ্গে মনোযোগী থেকে তিনি বর্তমানে বাংলাদেশেল উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে গবেষণা পরিচালনা করছেন। অতীত ও প্রত্নতত্ত্বের রাজনীতি, পরিচয়বাদী বাহাস আর সমসাময়িক বিভিন্ন ধারণা নিয়ে তিনি আগ্রহী। জল ও নদীর সঙ্গে তার বিশেষ সংবেদী নৈকট্য ও মোহাব্বত রয়েছে। তিনি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ইমেইল: swadhin.sen@gmail.com
‘অখণ্ড ভারত’ ধারণার অনৈতিহাসিক অসারতা: ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের শাণিত ব্যবচ্ছেদ