ছবি: হামিদ দাবাশির ‘In the Absence of the Face’ (2000) প্রবন্ধে ব্যবহৃত ইরান বিপ্লবের সময়কার একটি আইকনোগ্রাফি, যেখানে ‘মাহদি’, ‘গায়েব’ বা ‘Unseen’-এর ধারণাটি ফুটে উঠেছে
১.
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
—‘মানুষ’, কাজী নজরুল ইসলাম
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কয়েক বছর আগেই ফ্রেডরিক জেমসন লিখে ফেলেছিলেন—দুনিয়ার সমাপ্তি কল্পনা করাও এখন পুঁজিবাদের সমাপ্তি কল্পনা করার চাইতে সহজ। এরপর চার দশকের বেশি পার হয়ে গেছে। এখন আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করি, যখন দুনিয়ার সমাপ্তি কল্পনা করাটা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় চর্চার বিষয়ে পরিণত হয়ে গেলেও আমরা পুঁজিবাদের সমাপ্তি কল্পনা করতে পারি না। নব্বই দশকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ঠিক পরপরই আগামবেন ও দেরিদা দর্শনের জগতে যে মেসিয়ানিক বাঁকটির সূচনা ঘটিয়েছেন, তার গুরুত্ব একারনেই আমাদের জন্যে অপরিসীম। কেনোনা, আজকের দিনে ইমাম মাহদি ও ঈসা মসিহের আগমনের মতো একটি অতি দূরবর্তী ও প্রায় অকল্পনীয় ঘটনায় পরিণত হয়েছে উত্তর-পুঁজিবাদী দুনিয়া।
দেরিদা তার মেসিয়ানিক দর্শনের কেন্দ্রীয় কিতাব মার্ক্সের ভূতসমূহ (Specters of Marx) প্রকাশ করেছিলেন সোভিয়েত পতনের মাত্র দুই বছর পর। দেরিদা ‘মার্ক্সিয় মাহদিবাদ’ বলতে যা বুঝতেন, তার সমাপ্তির পর মার্ক্সবাদেরই সমাপ্তি ঘটে গেছে—এমন কিছু তিনি ঘোষণা করেন নাই। বরং তিনি নতুন রূপে মার্ক্সিয় ধারার রাজনীতির টিকে থাকার ও বিকশিত হওয়ার আশা ব্যক্ত করেছিলেন। মার্ক্সবাদ (মার্ক্সিজম) তার উনবিংশ শতকী মতাদর্শিক ইতিহাস পেছনে ফেলে এক নতুন, বৈশ্বিক, এবং কেন্দ্র ও কাঠামোহীন মার্ক্সিয় (মার্ক্সিয়ান) রাজনীতির রূপ ধারণ করুক, এমনটাই ছিল তার প্রস্তাব। তবে, তিনি যে নতুন ইন্টারন্যাশনালের ধারণা প্রস্তাব করেছেন, কেবল প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বের ধারণার উপর ইমান ত্যাগ করলেই তার আবির্ভাব ঘটবে না। বরং, মাহদীয়-আখেরিতত্ত্বীয় (messiano-eschatological) ভূমিকা পালনে সক্ষম দুনিয়ার মজদুরের ধারণার উপরও বিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে (অবশ্য, দেরিদা ধরেই নিয়েছেন যে মার্ক্সের অধিকাংশ অনুসারী ইতোমধ্যেই এই ইমান হারিয়ে ফেলেছেন)। একারনেই তার প্রস্তাব হলো ‘মার্ক্সিয় রূহসমূহ’ (‘spirits of Marx or of Marxism’) থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা নতুন ধরণের আন্তর্জাতিক ও র্যাডিকাল ঐক্য গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু করা। এই র্যাডিকাল ও আন্তর্জাতিক ঐক্যই হবে নতুন ইন্টারন্যাশনাল। এই নতুন মার্ক্সিয় রাজনীতিকে তিনি তুলনা করেছেন মাহদির জন্যে অপেক্ষার মতো রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তা ও তৎপরতার সাথে। মানে, সরলরৈখিক সময়ের কোন এক শেষবিন্দুতে মাহদি আসবেন, তথা কমিউনিস্ট কমনওয়েলথ কায়েম হবে, এমন মতাদর্শিক বিশ্বাসের রাজনীতির বদলে তিনি মাহদির রাজত্ব বা সাম্যবাদী সমাজকে সবসময়ই অপেক্ষিত হিসাবে উদযাপন করার ও তার উপর ইমান রাখার উপযুক্ত রাজনীতির ধারণা প্রচার করেছেন। মানে, বেহেশত বা কমিউনিস্ট কমনওয়েলথ কখনো আসবেনা, কিন্তু তার অপেক্ষাটুকু থাকতে হবে এবং এই অপেক্ষা কেন্দ্র করে রাজনীতি গড়তে হবে।
কিন্তু পুঁজিবাদী ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটাতে সক্ষম ঐতিহাসিক কর্তার ধারণা ছাড়া এবং কোনো ‘টেলোস’ (telos) বা পরিণতির ধারণা ছাড়া বিপ্লবী রাজনীতি কীভাবে সম্ভব? দেরিদা এই সংকটের সমাধান করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। বরং তার এই ‘মাহদিবাদহীন মাহদীয়’ (messianic without messianism) রাজনৈতিকতার ধারণা এর সদা ডিকনস্ট্রাকশন তথা বিনির্মানের মধ্যে থাকা হালতের কারনেই পরিণত হয়েছে আরেকটা ‘ডিফারান্স’ (Différance)-এর ধারণায়, অথবা এমন একটা ক্যাটেকনে—যা দাজ্জাল ও মাহদি উভয়ের আগমনই ঠেকিয়ে রাখে অনন্তকালের জন্যে। ভাষার মধ্যে অর্থ, উদ্দেশ্য ও বর্তমানতার অনন্ত ফানা (সুতরাং, অনুপস্থিতিকে) উন্মোচন
- Jacques Derrida, Specters of Marx: The State of the Debt, the Work of Mourning, and the New International, Psychology Press, 1994
- ডিফারান্স (Différance) ধারণাটি দিয়ে ভাষার মধ্যে (অথবা আইন কিংবা অন্য কিছুর মধ্যে) অর্থ ও সত্যের সদা পরিবর্তন এবং সুতরাং অনুপস্থিতিকে তুলে ধরা হয়। শব্দের বহু অর্থ হয়, এবং সময়ের সাথে সাথে অর্থ পালটায়। একটা শব্দকে কোন একটা অর্থে ব্যবহারের মুহূর্তে অন্যান্য অর্থগুলো অনুপস্থিত বা বিলম্বে থেকে যায়। শব্দের মধ্যে অর্থের এহেন নিরন্তর অনুপস্থিতি, বা কেবলই পার্থক্য (Difference) ও বিলম্ব (Deferral) আকারে উপস্থিতিকেই দেরিদা নাম দিয়েছেন ‘ডিফারান্স’।
আর ক্যাটেকন (Katechon) হলো ইঞ্জিল শরিফে (নিউ টেস্টামেন্ট) উল্লেখিত একটি রহস্যময় ধারণা। এই গ্রিক শব্দটির অর্থ হলো—যা বা যিনি ঠেকিয়ে রাখেন। ইঞ্জিল শরিফে সাধু পলের লেখা একটি চিঠিতে যে ক্যাটেকনের
করেন দেরিদা। কিন্তু ভাষিক সত্তা হিসাবে নতুন অর্থ, উদ্দেশ্য, ও বর্তমানতার দিগন্তে মানুষের বাকা লাভের অভিজ্ঞতা, অন্যভাবে বললে, ভাষার মধ্যে নতুন অর্থ ও সত্যের হাজিরাকেও (তথা সাকিনাকে) ঠেকিয়ে রাখে দেরিদা ও তার অনুসারীদের ডিকনস্ট্রাকশনিস্ট তৎপরতা।
মূলত দেরিদার মাহদিবাদ সংক্রান্ত চিন্তাকে মোকাবেলা করতে গিয়েই আগামবেন তার নিজস্ব মাহদিবাদ সংক্রান্ত দর্শন উপস্থাপন করেছেন। আমরা যে একটা মাহদিবাদহীন মাহদীয় সময়ে বসবাস করি, এই বিষয়ে তিনি কখনো দেরিদার সাথে দ্বিমত করেন নাই। তিনি জানেন যে আমাদের সময়ে ভাষা ও আইনের মতোই, মাহদীয় (বা মার্ক্সিয়) রাজনীতির প্রকৃত হালতটা দেরিদার চাইতে ভালভাবে কম লোকই উন্মোচিত করেছেন। কিন্তু তার সাথে দেরিদার পার্থক্য হলো যে, দেরিদা এই উন্মোচনের বেশি কিছু করতে পারেন নাই। বা করার সাহস করেন নাই (বিভিন্ন লেখায় আগামবেন এই সমালোচনাটি করেছেন)। আগামবেন তাই এধরণের বিনির্মানবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে। তিনি ডিকনস্ট্রাকশন অপছন্দ করেন না। কিন্তু আবার ডিকনস্ট্রাকশনের দিগন্তে আটকে থাকতেও চান না। দেরিদা আইনের মধ্যে যেই আইনহীনতাকে উন্মোচিত করেছেন, আগামবেন তাকে তুলনা করেছেন ইঞ্জিল শরিফে বর্ণিত ‘আইনহীনতার পুরুষ’ (Man of Lawlessness/Anomie) তথা দাজ্জালের সাথে। এবং এই দাজ্জালের মোকাবেলা করাই আগামবেনের মাহদিবাদী দর্শনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সতর্ক পাঠক যদি খেয়াল করে থাকেন, তাহলে বুঝবেন যে দেরিদা ও আগামবেনের তর্কটা আসলে নিও-লিবারেলিজমের আবির্ভাব ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পরবর্তী দুনিয়ায় যে নৈরাশ্যের মধ্যে আমরা প্রবেশ করেছি, তারই মোকাবেলা নিয়ে। সুতরাং, মাহদিবাদ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এই দার্শনিক তর্ক উত্তর-পুঁজিবাদী দুনিয়ার কল্পনা বা তার দিকে যাত্রার রাজনীতি গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিশা দিতে পারে।
কথা বলা হয়েছে, তার কাজ হলো ‘আইনহীনতার পুরুষ’ (Man of Lawlessness/Anomie) তথা দাজ্জালকে ঠেকিয়ে রাখা। পলের দাবি, আইনহীনতা বা “অরাজকতার (Anomia) রহস্য ইতোমধ্যেই তার কাজ করে চলেছে, কিন্তু ক্যাটেকন তার সম্পূর্ণ প্রকাশকে বিলম্বিত করছে” (দ্বিতীয় থেসালোনিয়ান, ২:৬-৭)। পল তার আলাপ আর খোলাসা করেন নাই। ফলে ক্যাটেকনের ব্যাখ্যা নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক এবং দার্শনিকদের মধ্যে অনেক তর্ক আছে। অনেকে ক্যাটেকনকে ইতিবাচক শক্তি হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যার কাজ অরাজকতা ঠেকিয়ে রাখা, বা অরাজকতার তৎপরতাকে আড়ালে রাখা। কিন্তু ক্যাটেকনকে নেতিবাচক হিসাবেও দেখা সম্ভব। যেহেতু, অরাজকতা বা দাজ্জালকে ঠেকিয়ে বা গোপন রাখার ফলে মাহদি/মসিহের আগমনও বিলম্বিত হয়।
ছবি: জাক দেরিদা ও জর্জো আগামবেন
বলে রাখা ভাল যে, মাহদিবাদ বিষয়ে আগামবেন ও দেরিদার মতপার্থক্যের একটা বড় কারন হলো সময় সংক্রান্ত তাদের দার্শনিক চিন্তার পার্থক্য। মূলত অনেকের পক্ষেই দেরিদা ও আগামবেনের মাহদিবাদ সংক্রান্ত চিন্তা বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না, যেহেতু তাদের মাহদীয় দার্শনিকতা দাঁড়িয়ে আছে সময় (ও ইতিহাস) বিষয়ক তাদের দার্শনিক চিন্তার পাটাতনে। তাছাড়া পুঁজিবাদ যেহেতু সময়কে কর্মঘন্টাকেন্দ্রীক ব্যবস্থাপনার মধ্যে বন্দি ও বিভক্ত করেছে, এবং যেহেতু আমরা সবাই সময়ের এই বিশেষ ব্যবস্থাপনার মধ্যেই বসবাস করি; তাই সময় সম্পর্কে ভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করা, কিংবা সময়ের ভিন্ন অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত দার্শনিক চিন্তা বুঝে ওঠা আমাদের জন্যে কঠিন হয়ে পড়ে। দেরিদার চাইতে আগামবেনের চিন্তার প্রতি আমার যে পক্ষপাত, তাও মূলত সময় সংক্রান্ত আগামবেনের চিন্তার প্রতি সহমর্মিতার কারনেই। বলা দরকার যে, আগামবেন নিজে কিন্তু তার সময় সংক্রান্ত চিন্তাকে হাজির করেছেন ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের সময় সংক্রান্ত চিন্তার ধারাবাহিকতায়। এবং দেরিদার অনেক আগেই বেনিয়ামিন মার্ক্সবাদকে মাহদিবাদের সাথে তুলনা করেছেন। উল্লেখ্য যে স্পেক্টার্স অফ মার্ক্স কিতাবের তথ্যসূত্রে বেনিয়ামিনের সময় এবং মাহদিবাদ সংক্রান্ত চিন্তার কথা দেরিদা উল্লখে করেছেন, তবে এমনভাবে যে, মনে হয় বেনিয়ামিন ও তার নিজের চিন্তার মধ্যে ফারাক তেমন নাই। আগামবেন অন্যদিকে দীর্ঘ সময় নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন বেনিয়ামিন আর দেরিদার সময় সংক্রান্ত চিন্তার পার্থক্য। এবং নিজেকে তিনি উপস্থিত করেছেন বেনিয়ামিনের সময় সংক্রান্ত চিন্তার একজন অপেক্ষাকৃত সৎ ছাত্র ও অনুসারী হিসাবে।
তবে, বেনিয়ামিন পাঠের ক্ষেত্রে, আমি একান্তই আগামবেনের ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল নই। দিনশেষে, আগামবেন তার মাহদিবাদী চিন্তা গড়ে তুলেছেন ইঞ্জিল শরিফে থাকা সাধু পলের ‘মসিহি সময়’ (messianic time) সংক্রান্ত ধারণার উপর ভর করে। খ্রিষ্টিয় ঐতিহ্যে মাহদি এবং মসিহের বৈশিষ্ট্য একজন ব্যক্তির (ঈসা মসিহ) মধ্যেই কল্পনা করা হয়েছে (যেখানে ইহুদি ও ইসলামি ঐতিহ্যে দুইজন মসিহ চরিত্র কল্পনা করার চল রয়েছে)। সাধু পলের প্রতি ভক্তির কারনে (এবং ক্যাথলিক ঐতিহ্যের কেন্দ্র ইতালির একজন দার্শনিক হওয়ার কারনে) আগামবেনের ব্যাখ্যার মধ্যে ক্যাথলিক থিওলজির ধারাবাহিকতা পরিলক্ষিত হয়। ওয়াল্টার বেনিয়ামিন কথিত ‘নাউ টাইম’ (now-time, বা, Jetztzeit) নামক সময়ের ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়েও তিনি নির্ভর করেছেন ইঞ্জিল শরীফ এবং সাধু পলের লেখার উপর। তার দাবি, বেনিয়ামিনও নাকি সাধু পল দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন (যদিও আগামবেন এই দাবির পক্ষে অকাট্য প্রমাণ দিতে পেরেছেন কিনা, তা তর্কসাপেক্ষ)। অন্যদিকে আমার পাঠ মোতাবেক, বেনিয়ামিনের ‘নাউ টাইম’ সুফিতত্ত্ব, ইসলামিকেট দার্শনিক ঐতিহ্য, ইহুদি কালামতত্ত্ব এবং কাব্বালাশাস্ত্রে উপস্থিত নন-লিনিয়ার (সরলরৈখিক নয়) সময়ের ধারণার ধারাবাহিকতা বহন করে। নন-লিনিয়ার সময়ের ধারণা হিসাবে, মাহদীয় সময় হলো—মুহূর্ত বা ওয়াক্ত বা ঋতুর মতো। সরলরৈখিক সময়ের অন্তর্গত কোন মুহূর্ত নয় এই মাহদীয় সময়। তবে, সরলরৈখিক সময়ের দিগন্ত ফুড়ে অনেক সময় এক ঝলকে তার আবির্ভাব ঘটে (যেমন, মদিনায় নবীর আমলে, বাংলাদেশে একাত্তরে কিংবা চব্বিশের জুলাইয়ে), আবারও বিদায় নেবে বলে।
দেরিদা ও আগামবেন যে মেসিয়ানিজমের কথা বলেন, তার গোড়ায় আছে ঈসা মসিহ সম্বন্ধে খ্রিষ্টিয় ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। খ্রিষ্টিয় ঐতিহ্যে মসিহ একজন। কিন্তু ইহুদি ও ইসলামি ঐতিহ্যে দুইজন (ইসলামে মাহদি ও মসিহ)। একারনেই মেসিয়ানিজমের বাংলা করতে গিয়ে ‘মসিহবাদ’-এর বদলে ‘মাহদিবাদ’ ধারণাটিকে আমি অধিক পছন্দ করি। বাংলা ভাষায় মসিহি চরিত্র হিসাবে মাহদির নামটাই আমাদের কাছে বেশি পরিচিত। সুতরাং মসিহবাদের চাইতে মাহদিবাদ কথাটিই বাঙলাভাষী সমাজের কাছে অপেক্ষাকৃত বেশি অর্থবোধক বলে মনে করি। মাহদি ধারণার একটা আলাদা ইতিহাস ও সিলসিলা থাকার কারনেই এই দুই পাশ্চাত্য ভাবুকের চাইতে আমার মাহদিবাদ সংক্রান্ত চিন্তা খানিকটা ভিন্ন। এই ব্যাপারটা স্বীকার করতে কোন দ্বিধা নাই যে বেনিয়ামিনের মাহদিবাদ যতোটা ইহুদি, আগামবেনেরটা যতোটা খ্রিষ্টিয়, আমার দার্শনিক মাহদিবাদ হয়তো ততোটাই মুসলমানি। অথবা/এবং বাঙালি। এমন না যে শুরু থেকেই খুব সচেতনভাবে এই পার্থক্য বজিয়ে রেখেছি। বরং মাহদিবাদ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে খানিকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই ঘটনাটি ঘটেছে। কিন্তু, মাহদিবাদ সংক্রান্ত এসব লেখাকে ধর্মতত্ত্বীয় রচনা ভাবার অবকাশ নাই। বরং, সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তী দুনিয়ায় মার্ক্সিয়
- বিস্তারিত দেখুন: পারভেজ আলম, জিহাদ ও খেলাফতের সিলসিলা: মুসলিম দুনিয়ার ক্ষমতা সম্পর্কের ইতিহাস, আদর্শ, ২০১৬; পারভেজ আলম, মদিনা, আদর্শ, ২০২০।
বিপ্লবী ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখবার ও গতি দেবার যে তাত্ত্বিক তৎপরতা চলছে, তার তরে এ আমার সামান্য নিবেদন।
কোন একদিন একজন মাহদি আসবেন, যিনি দুনিয়ায় সাম্য ও ন্যায় বিচারের সমাজ কায়েম করবেন, এমন কোন ভবিষ্যতবাণী আমার লেখালেখিতে পাওয়া যাবে না। অনাগত ও একক কোন মাহদির ধারণা প্রচার করাও আমার কাজ নয়। বরং, বিভিন্ন সময়ে যা দেখাতে চেয়েছি, তাহলো, যে কারো পক্ষেই আইন, রাজনীতি ও সময়ের এমন এক অভিজ্ঞতা লাভ করা সম্ভব, যার ফলে তার পক্ষে মাহদীয় তৎপরতা চালানো সম্ভবপর হয়ে ওঠে। ভাষা, আইন ও রাজনীতিতে উন্মোচিত দাজ্জালকে যারা চিনতে পারেন ও মোকাবেলা করার চেষ্টা করেন, তারা সকলেই মাহদীয় তৎপরতায় শামিল হন।
২.
এক ঝলকে আবির্ভূত হয়ে আবার নাই হয়ে যায় বলেই মাহদীয় সময়কে সরলরৈখিক সময়ের ধারাবাহিকতার মধ্যে বন্দী করা যায় না। ফলে, বিপ্লবের ওয়াক্তের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় বিপ্লবের পরপরই, যে ঘটনাকে আমরা অনেক সময় ‘বেহাত বিপ্লব’ বলি (‘ওয়াক্ত’ সরলরৈখিক সময়ের ধারণা নয়, বরং তা চক্রাকার, এবং তা বারবার ফেরত আসে)। একারনেই, সফল বিপ্লব অথবা বিজয় নয় হক ও মাহদীয় তৎপরতার প্রমাণ। বিপ্লবের পর বিপ্লবীরা সরকার গঠন করলেই সেই সরকারকে ‘মাহদির রাজত্ব’ বা ‘কমিউনিস্ট কমনওয়েলথ’ বলা যায় না (তাই একজন ব্যক্তির খেলাফতের মতো কিংবা একনায়ক ও এক পার্টির অধীনে প্রলেতিয়েতের একনায়কত্ব ধরণের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার দরকার পড়ে)।
বাঙালি মুসলমান সমাজে মাহদীয় রাজনৈতিকতার যেই অজ্ঞান ও বাতেনি সিলসিলা জারি আছে, তার গোড়ায় আছে কারবালায় ইমাম হোসেন ও নবী পরিবারের শাহাদাতের স্মৃতি। ইমাম হোসেন কারবালায় পরাজিত হয়েছিলেন। নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু এজিদ জীবিত ছিল। সে আরো অনেক বছর শাসন করেছে। তার মৃত্যুর পর উমাইয়া সাম্রাজ্য আরো সুপ্রতষ্ঠিত ও শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু মজলুমদের কাছে তাদের কোন বৈধতা ছিল না। কারবালায় নিহত ইমাম হোসেনই ছিলেন তাদের নেতা। দৃশ্যমান জগতে উপস্থিত না থাকলেও এজিদের দাজ্জালি ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনমত গঠন, প্রতিরোধ যুদ্ধ আর একের পর বিপ্লবের প্রেরণা হিসাবে ইমাম হোসেন জীবিত ছিলেন। মোক্তারের হাতে ইবনে জিয়াদের পরাজয়, একের পর এক বিদ্রোহের পথ পার হয়ে অবশেষে আব্বাসি বিপ্লবের মাধ্যমে উমাইয়াদের পতন—এইসবই হয়েছে কারবালার স্মরণ নেয়ার মাধ্যমে। কারবালায় ইমাম হোসেন ও নবী পরিবারের হত্যাযজ্ঞ যে একটি বেহাত বিপ্লবের ঘটনা, তা বাঙালি মুসলমান মনের মধ্যে ধারণ করেছে মুখে ‘বেহাত বিপ্লব’ কথাটি উচ্চারণের বহু শত বছর আগেই। এবং এই ঘটনার স্মৃতি যে বাঙালি মুসলমানের মনের তাবৎ মাহদীয় বাসনা ও স্বপ্নকে (বেহাত বিপ্লবকে বিপ্লব হিসাবে পূর্ণতা দেয়া ও সাম্যবাদী সমাজ কায়েম) উদ্বেলিত করে তুলতে পারে, আমাদের সাহিত্য ও রাজনীতির জগতে তার প্রমাণ আছে অনেক।
ক্ষমতা দখল করে শাসক হওয়ার রাজনীতি নয় মাহদীয় তৎপরতা। বরং এই রাজনীতি হলো দাজ্জালি ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, সংগ্রাম, ত্যাগ, বিপ্লব ইত্যাদির রাজনীতি; প্রতি যুগেই মজলুম বিপ্লবীরা যেই রাজনীতিতে শামিল হন। এই রাজনীতির কাজ দাজ্জালি ক্ষমতার প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করা। অনন্ত জরুরি অবস্থা নির্ভর আইনের বাতেনে উপস্থিত অনন্ত অরাজকতাকে জাহের করে দেয়া। এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। এমন না যে মাহদীয় রাজনীতির সাথে শাসন ক্ষমতার কোনই সম্পর্ক নাই। মাহদীয় রাজনীতির ফলে অবধারিতভাবেই কেউ না কেউ ক্ষমতায় আরোহন করেন। আব্বাসিরা মাহদীয় রাজনীতি করেই ক্ষমতায় এসেছিল (শুরুর দিকের সকল আব্বাসি খলিফাই মাহদিসুলভ টাইটেল ব্যবহার করেছেন)। বলশেভিক বিপ্লবের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরি হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ফলে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু ক্ষমতা দখল করে সরকার হওয়ার পর মাহদীয় রাজনীতি কেউ ধরে রাখতে পেরেছে, ইতিহাসে তেমন নজির খুব একটা দেখা যায় না (মদিনার ইউটোপিয় স্মৃতির মতো কিছু বিশেষ ও ক্ষণস্থায়ী উদাহরণ বাদ দিলে)। তার মানে, সরকারে যাওয়া কিংবা স্টেটসম্যান হওয়াটা খারাপ কিছু, তা বলছি না। তবে, জুলুম ছাড়া, এবং অরাজকতাকে আইনের মধ্যে বাতেন রেখে নির্বাহী ক্ষমতার স্বৈরতান্ত্রিক চর্চার উপর নির্ভর করা ছাড়া আজতক খুব কম বিপ্লবী দলই সরকারী দল হতে পেরেছে। আব্বাসিদের হাতে ইসলামের নর্ম্যাটিভ আইন ব্যবস্থা, অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি বেড়ে উঠেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন একটা সময় পর্যন্ত কেবল প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতাই করে নাই, তারও আগে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের হাতেই তৎকালীন ইউরোপিয় ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছিল (মনে রাখা দরকার, ওয়াল্টার বেনিয়ামিন সরাসরিই ফ্যাসিস্টদের জরুরি অবস্থা নির্ভর আইনি-সার্বভৌম ক্ষমতাকে এন্টি-ক্রাইস্ট তথা দাজ্জাল বলে অভিহিত করেছিলেন)। কিন্তু আব্বাসি এবং বলশেভিকরাও স্বৈরতান্ত্রিক হয়েছে। জুলুম তারাও করেছে।
উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা মাহদীয় তৎপরতার উদাহরণ। মুক্তিযুদ্ধকেও হোসেনি সেনাদের যুদ্ধ (সেই হিসাবে মাহদীয় তৎপরতা) হিসাবে স্মরণ করা হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম মহররমেই। মওলানা ভাসানী সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ে লাখো মানুষ নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টাও তিনি ছিলেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগ তিনি নেন নাই। এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলা যে বিপ্লবীদের সচেতন তৎপরতার ফসল, তা বলছি না। কিন্তু এইসমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে তাকালে মাহদীয় তৎপরতা বিষয়টা বোঝা আমাদের জন্যে সহজ হবে।
ছবি: মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী
তার মানে, মাহদীয় তৎপরতা আছে। থাকে। এই তৎপরতা ইতিহাসের ভেতরকার ব্যাপার। কিন্তু মাহদির রাজত্ব আমাদের সরলরৈখিক ইতিহাসের ঘটনা নয়। মাহদি শাসন ক্ষমতায় বসেন না। তিনি কাজ শেষ করে চলে যান। তার তিরোধান ঘটে। তিনি গায়েব হয়ে যান। কেননা মাহদির শাসন ক্ষমতায় বসা, আর আল্লাহর রাজত্ব কিংবা কমিউনিস্ট কমনওয়েলথ কায়েম হওয়া সমান কথা। হাদিসে আছে, মাহদির শাসনমালে দুনিয়ায় ইনসাফ ও সাম্য এমনভাবেই কায়েম হবে, যেমনভাবে এখন জুলুম আর বৈষম্য কায়েম হয়ে আছে। এবং মাহদির শাসন শুরু হওয়া মানে, ঈসা মসিহর ফেরত আসা। এই কারনেই হয়তো কাফকা তার ডাইরিতে লিখেছিলেন: মসিহ কেবল তখন আসবেন, যখন আর তার আসার দরকার থাকবে না।
৩.
যেইদিন সাঁই হিসাব নেবে,
আগুন পানির তুফান হবে।
—লালন ফকির
মাহদি আসবেন ঈসা মসিহ আসার ঠিক পূর্বে। বা মাহদির জীবদ্দশাতেই আবির্ভাব ঘটবে ঈসা মসিহের। কিন্তু ঈসা মসিহ কবে আসবেন? মসিহ তথা নাজাতদাতার ধারণা প্রথম গড়ে উঠেছিল মজলুম বনি ইসরায়েলিদের মধ্যে। এই ধারণা মোতাবেক, মসিহ হবেন ইহুদিদের সেই রাজা, যার মাধ্যমে আল্লার দ্বীন আবার কায়েম হবে এবং ইহুদি জাতি বিদেশীদের শাসন ও জুলুমের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করবে। কিন্তু একের পর এক মসিহ টাইটেলধারীর আগমন ঘটার পরেও যেহেতু তারা মুক্তি লাভ করেন নাই, ফলে বনি ইসরায়েলিদের কাছে মসিহের আগমন পরিণত হয়েছিল এমন এক অনন্ত ভবিষ্যতের ঘটনায়, যা কখনো বর্তমান হয় না। একারনেই হয়তো তাদের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল দুইজন মসিহের ধারণা। প্রথমজন হলেন মসিহ ইবনে ইউসুফ (নবী ইউসুফের বংশের মসিহ), যিনি মসিহের আগমনের রাস্তা পরিষ্কার করেন। এবং দ্বিতীয় জন হলেন আসল মসিহ তথা মসিহ ইবনে দাউদ (নবী ও বাদশাহ দাউদের বংশধর)।
ঈসা মসিহ আবির্ভূত হওয়ার পর যেহেতু কেবল বনি ইসরায়েলিদের মুক্তির কথাই বলেন নাই, বরং বিশ্ব মানবতার মুক্তির কথাও বলেছেন, ফলে তিনি ইহুদিদের চাইতে অ-ইহুদিদের মধ্যেই বেশি জনপ্রিয় হয়েছিলেন। আগামবেন বলেন যে ঈসা মসিহ একই সাথে দুই মসিহর দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে, ইঞ্জিল শরিফ পাঠ করলে আরো জটিলতা আবিষ্কার করা সম্ভব। হয়তো, আদি খ্রিষ্টিয় কালামতত্ত্বে প্রথম মসিহ ছিলেন ঈসার দীক্ষাগুরু নবী ইয়াহিয়া (যিনি খ্রিষ্টানদের কাছে ‘জন দা ব্যাপ্টিস্ট’ হিসাবে পরিচিত ছিলেন)। এই কারনেই হয়তো ইঞ্জিল শরিফে আমরা ইয়াহিয়াকে বলতে শুনি: “তওবা করো, কেননা বেহেশতি রাজ্য সমাগত। …তোমরা প্রভুর আগমনের রাস্তা পরিষ্কার করো, তার পথ সহজ করো। …আমি তোমাদের মন পরিবর্তনের জন্য পানির মাধ্যমে দীক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু আমার পরে যিনি আসছেন, তিনি আমার চেয়ে শক্তিমান; …তিনি তোমাদেরকে পাক-রূহ্ ও আগুনের মাধ্যমে দীক্ষা দেবেন” (মথি, ৩:২-৩, ১১)। বলা দরকার যে, ইয়াহিয়ার এই বাণীটি নবী ঈসাইয়ার কিতাবের একটি ভবিষ্যতবাণীরই পুনরাবৃত্তি। ২০১২ সালে লেখা একটা কবিতায় নবী ঈসাইয়া এবং ইয়াহিয়ার এই ভবিষ্যতবাণী দ্বারা প্রভাবিত হয়েই লিখেছিলাম:
“ইয়াহিয়া যেমন মরুভুমিতে ঈসার আগমনী বার্তা প্রচার করেছিলেন,
আমি তেমনি নদী নালার দেশে সহজ মানুষের আগমনী বার্তা প্রচার করছি।
তোমরা তার আগমনের রাস্তা পরিস্কার করো।”
হেরোদের দরবারে ইয়াহিয়াকে শিরচ্ছেদ করে হত্যা করা হয়। ইয়াহিয়ার শাহাদাতের পরই ঈসা শুরু করেন তার নিজের দাওয়াতের কাজ। কয়েক বছর পর তাকেও ক্রুশে চড়ানো হলো। তিনি বেহেশতে চলে গেলেন। গায়েব হলেন। তার অপেক্ষায় থাকা খ্রিষ্টানরা চার্চের মধ্যেই খোদার বেহেশতি রাজ্য উপস্থিত থাকার ব্যাখ্যা হাজির করলো। আর সেই চার্চকে বৈধতা দিয়ে রোমান সাম্রাজ্য হয়ে গেল খোদার সাম্রাজ্য। ফলে, শেষ বিচার দূরবর্তীই রয়ে গেল। এবং এখন পর্যন্ত ঐ অবস্থাই চলছে। এমনকি আধুনিক যুগে, এই ঘনঘোর আখেরি পুঁজিবাদের দিনেও ঈসা ফিরলেন না। মজলুম আজো হিসাবের দিনটির অপেক্ষায়।
কোরান শরিফে ঈসাকে ‘মসিহ’ বলা হয়েছে। তবে, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের চাইতে মসিহ এবং শেষ বিচার সম্বন্ধে ইসলামি ঐতিহ্যের কিছু ভিন্নতা রয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মসিহের চাইতে, মাহদিকে কেন্দ্র করেই আখেরিতত্ত্বীয় বয়ান ও কল্পনার বিকাশ মুসলমানদের মধ্যে ঘটেছে বেশি। বলা দরকার যে, কোরান শরিফে মাহদি টাইটেলটি নাই। বা মাহদি নামক কোন ব্যক্তির কথাও কোরানে উল্লেখ নাই (এই যুক্তি দিয়ে অনেক সালাফি আজকাল মাহদির আগমনের সম্ভাবনাকেই অস্বীকার করেন)। কিন্তু, কোরান, হাদিস ও ইসলামের প্রথম শতকের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, মাহদি সংক্রান্ত ধারণা ইসলামে প্রথম থেকেই ছিল, এবং এই ধারণাটি মসিহের ধারণার চাইতে কিছুক্ষেত্রে গুণগতভাবেই আলাদা। আরো বিশেষভাবে বললে, কোরানেরই একটি ধারণা ইতিহাসের একটি বিশেষ পর্যায়ে গিয়ে ‘মাহদি’ শব্দের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছে। কোরানে ‘হুদা’ (বা হেদায়েত) ধারণাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘হুদা’ মানে পথপ্রদর্শন। ‘মাহদি’ মানে যিনি পথ প্রদর্শিত (আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেছেন)। ‘মাহদি’ শব্দটির সমার্থক ‘মুহতাদি’ শব্দটি কোরান শরিফে আছে। যেমন, সূরা আল-ইসরা তথা সূরা বনি ইসরায়েলে আছে: “মান ইয়াহদিল্লাহু ফাহুয়াল মুহতাদি” (১৭:৯৭)। মানে: “আল্লাহ যাকে হুদা দেন, তিনিই মুহতাদি”; বা, আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন, তিনিই পথপ্রদর্শিত। কোরান এবং নবীর সাহাবিদের লেখা কবিতা থেকে পরিষ্কার যে, আল্লার নবীর একটা টাইটেলও ছিল ‘মুহতাদি’। ইসলামের আদি পর্বের ইতিহাসে দেখা যায় যে, ‘মুহতাদি’, ‘মাহদি’ এবং ‘রাশেদ’ শব্দগুলি সমার্থক অর্থে (একটা বিশেষ ধারণা তুলে ধরতে) ব্যবহৃত হতো। খোলাফায়ে রাশেদিনদেরও তাই মাহদি বলা যায়। এমনকি, তাদের এমন টাইটেলও পাওয়া যায়, যাতে তাদেরকে একইসাথে রাশেদ এবং মাহদি নামে অভিহিত করা হয়েছে।
নবীর আমল এবং তার মৃত্যুর পরও একটা সময় পর্যন্ত অনাগত ও ভবিষ্যত মাহদির ধারণা কল্পনা করার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে একজন অপেক্ষিত ও অনাগত মাহদির ধারণার জন্ম ঘটে প্রথম ও দ্বিতীয় ফিতনার প্রেক্ষাপটে। এর পেছনে অন্যতম কারন ছিল হুদাপ্রাপ্ত নেতার পরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব। সুন্নিরা শুরুর চার খলিফাকে রাশেদিন বলে মেনে নিয়েছেন। মানে সুন্নিদের কাছে প্রথম চার খলিফা হলেন রাশেদিন, সুতরাং মাহদি। উল্লেখ্য যে খলিফা ওমর যখন জেরুজালেম জয় করেন, তখন সিরিয়ার ইহুদিরা তাকে ‘ফারুক’ টাইটেলে সম্মানিত করেছিলেন। ফারুক ছিল সিরিয়ার ইহুদিদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি মসিহি টাইটেল (হয়তো মসিহ ইবনে ইউসুফ ধরণের একটি টাইটেল)। ওমর নিজ হাতে বায়তুল মোকাদ্দাসের ধ্বংসস্তুপ পরিষ্কার করেছিলেন, আর তার সাথে হাত লাগিয়েছিল ইহুদিরা। সত্তরটি ইহুদি পরিবারকে হজরত ওমর জেরুজালেমে পুনর্বাসন করেছিলেন। ওমর যখন বায়তুল মোকাদ্দাসের স্থানে একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করলেন, তখন ইহুদি থেকে ধর্মান্তরিত রাব্বি কাব আল আহবারের (যিনি খলিফা ওমরের সফরসঙ্গী চিলেন) কাছে একে মনে হয়েছিল তৃতীয় বায়তুল মোকাদ্দাস নির্মানের ভবিষ্যতবাণী পূর্ণতা পাওয়ার ঘটনা। রোম ও পারস্যকে পরাজিত করার সময় খলিফা ওমর জানতেন যে তিনি একটি শেষ জমানার যুদ্ধ লড়ছেন। মৃত্যুর সময় তিনি চেয়েছিলেন যেন আল্লার নবী ও খলিফা আবু বকরের পাশে তার কবর দেয়া হয়। এবং সেইসাথে তাদের কবরগুলার পাশে খুঁড়ে রাখা হয় একটি শূন্য কবর—ঈসা মসিহের জন্যে। আল্লার নবী ও তার সাহাবিরা কোন একটা ধর্মের মানুষের জন্যে সংগ্রাম করেন নাই। তাদের সংগ্রাম ছিল বিশ্বমানবতার জন্যে।
ছবি: ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ২০২৪ সালে নির্মিত ‘ম্যুরাল অফ স্যাভিয়র্স’। ছবিতে হযরত ঈসা ও ইমাম মাহদির দুই পাশে দেখা যাচ্ছে লাতিন আমেরিকা ও আরব বিশ্বের কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বকে। উপরে লাতিন ও ফার্সিতে লেখা: “শহিদদের পথ হল নবী-রাসুলদের পথ।”
হয়তো, মাহদি বা মুহতাদি আদিতে ছিল এমন এক সত্তা, যিনি প্রতি মুহূর্তে ঈসা মসিহের আগমনের অপেক্ষায় থাকেন, কিন্তু তাই বলে বর্তমান জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ত্যাগ করেন না। মানে, মুহতাদি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি মসিহের জন্যে অপেক্ষায় থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান নাই। বরং মসিহের সংগ্রাম জারি রেখেছেন নিজের জীবনেই। কিন্তু ধারণাটি পরবর্তীতে পরিণত হলো মসিহের মতোই একটি ধারণায়। অর্থাৎ, এমন একজন ব্যক্তির ধারণায়, যিনি আসবেন শেষ জমানায়, ঠিক ঈসা মসিহের পুনরাগমনের পূর্বে। এর পেছনে কারন হয়তো প্রথম ও দ্বিতীয় ফিতনার সময় মওলা আলী এবং ইমাম হোসেনের ট্রাজিক পরিণতি। এই কারনেই আমরা একটি হাদিসে দেখি যে মওলা আলীকে তুলনা করা হয়েছে মুসলিম উম্মার ঈসা হিসাবে। এবং মাহদি নামটির অন্যতম প্রথম ব্যবহার আমরা দেখি ইমাম হোসেনের একটি টাইটেল হিসাবে। কারবালার ট্রাজেডির কারনে ইমাম হোসেনের সংগ্রাম উমাইয়া বিরোধী বিপ্লবীদের কাছে পরিণত হয়েছিল মাহদীয় সংগ্রামের প্যারাডাইমে। তবে মাহদির রাজনৈতিক কালামতত্ত্ব পূর্ণতা পেয়েছিল আলীর পুত্র মুহাম্মদ হানাফিয়াকে কেন্দ্র করে (যিনি এককালে বাঙালির পুথি সাহিত্যে একজন সুপারহিরো ছিলেন)।
৪.
আমাদের দেহ যেন এক মরিয়ম,
প্রত্যেকের ভেতরেই আছে এক ঈসা।
যখন আসে একটা ব্যথা, একটা ব্যাকুলতা
মনের ভেতরে, তখন এক ঈসা জন্ম লয়।
যখন থাকে না ব্যথা, ব্যাকুলতা—
মনের ঈসা ফেরত যান।
—ফিহি মা ফিহি, মওলানা রুমি
এই দাবি করছি না যে সরলরৈখিক ইতিহাসের কোন এক বিন্দুতে আসলেই মাহদির রাজত্ব (সাম্য ও ন্যায় বিচার) বা কমিউনিস্ট কমনওয়েলথ ধরণের কিছু কায়েম হবে না। কিন্তু তার মানে তো এই না যে আমাদের নিজেদের জীবনে আমরা ঈসা মসিহের আগমনকে উপলদ্ধি করতে পারবো না, বা মাহদীয় অথবা কমিউনিস্ট রাজনীতি করতে পারবো না। বরং তা করা বিশেষভাবে দরকারি। মসিহের আগমন ও শেষ বিচার সংঘটিত হয় আল্লার দিনটিতে (আইয়ামুল্লাহ)। আল্লার দিক থেকে এই দিনটি আসলে একটাই দিন। ইবনে আরাবী বলেছেন, এই দিনটিতে আল্লাহ সবকিছু ফানা করে আবার নতুন করে সৃষ্টি করেন। এই দিনটি সংঘটিত হয় প্রতিটা মুহূর্তে। এই ফানা ও নতুন সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে সম্ভবপর করে তোলার নামই হলো—মাহদীয় তৎপরতা।
দিনশেষে প্রত্যেকের কেয়ামত (পুনরুত্থান) আলাদা। বিচার ও হিসাব দিবস হতে পারে যৌথ। কিন্তু শেষ বিচার হলো ব্যক্তির বিচারের ধারণা। যার যার হিসাব, তার তারই বুঝিয়ে দিতে হয় (অন্তত ইব্রাহিমি আখেরিতত্ত্ব মোতাবেক)। কিন্তু তারপরও, কেবল একটি বিশেষভাবে নির্বাচিত জাতির (যেমন: ইহুদি বা খ্রিষ্টান জাতি) এবং দলের (বা আকিদাপন্থীর) ধারণাতেও অনেকে বিশ্বাস করেন। ব্যক্তির নাজাত এবং নির্বাচিত জাতি/দলের নাজাতের মধ্যকার এই কন্ট্রাডিকশন কেবল ইব্রাহিমি ধর্মীয় ঐতিহ্যেই জায়গা করে নেয় নাই, বরং প্রবেশ করেছে আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনেও (যার কারনে, কমিউনিস্ট, এনার্কিস্ট এবং তাদের তেহাত্তর ফেরকার সকলেই নিজেদেরকে হক দল মনে করে)। হয়তো, কেবলমাত্র ব্যক্তিগত এবং জাতীয় সময়কে (বা ইতিহাসকে) দুইটা আলাদা সময়ের ধারণা হিসাবে বুঝতে পারলে এই জটিলতা ও কন্ট্রাডিকশনকে খানিকটা অতিক্রম করা সম্ভব। একজন বিপ্লবীর জন্যে, একজন সুফি বা ফকিরের মতোই আপন জীবদ্দশায় ব্যক্তিগত নাজাতের সন্ধান করা সম্ভব। কিন্তু সে যদি নিজের ব্যক্তিগত নাজাতকে পুরোপুরি নিজের জাতি, দল বা সম্প্রদায়ের নাজাতের সাথে গুলিয়ে ফেলে, তাহলে ভয়াবহ জুলুমের পথ খুলে যেতে পারে (ইজরাইল যে গণহত্যায় জড়িয়ে পড়েছে, তার পেছনেও অন্যতম একটি কারণ হলো ব্যক্তি এবং জাতির নাজাতকে পুরোপুরি গুলিয়ে ফেলা, বা জাতীয় মুক্তিকেই ব্যক্তিগত নাজাতের ঊর্ধে স্থান দেয়া)। হাইডেগার যতক্ষণ পর্যন্ত অস্তিত্বের ইতিহাসকে ব্যক্তির ফেনোমেনলজিকাল অভিজ্ঞতার পাটাতনে স্থাপন করে ব্যাখ্যা করেছেন কিংবা ‘দাজাইন’ (dasein) বা ব্যক্তি সত্ত্বার উন্মোচন ও পরিণতি নিয়ে লেখালেখি করেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তার দর্শন ফ্যাসিবাদ দ্বারা দূষিত হয় নাই। কিন্তু যখনই তিনি অস্তিত্বের ইতিহাস ও দাজাইনের পরিণতির সাথে জার্মান জাতির নিয়তির ধারণাকে মিলিয়ে ফেলেছেন, তখনই তা পরিণত হয়েছিল ফ্যাসিবাদী দর্শনে।
ব্যক্তি ও জাতির নাজাতকে আলাদা সময়ের ধারণার পাটাতনে দাঁড় করালে এই ধরণের বিপদ এড়ানো হয়তো সম্ভব। দিনশেষে, জাতি (গোটা মানব জাতি হলেও) বা সম্প্রদায়ের নাজাত কল্পনা করার জন্যে আমাদের সরলরৈখিক সময় ও ইতিহাসের ধারণার উপর নির্ভর করতে হয়। একারনেই একটা জাতির মুক্তিকামীদের পক্ষে সম্ভব অসমাপ্ত বিপ্লব সম্পন্ন করা বা আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পরবর্তী প্রজন্মগুলোর উপর ভরসা রাখা। কিন্তু ব্যক্তিকে তার নিজের জীবনে, তার জন্যে নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই নাজাতের সাধনা বা সংগ্রাম করতে হয়। তবে ব্যক্তি তো সমাজবিচ্ছিন্ন নয়। যে জাতি বা সমাজের মধ্যে তাকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, সেই সমাজের ইতিহাস চেতনা, মুক্তির বাসনা ও সংগ্রামকে ব্যক্তিগত মুক্তির বাসনা ও সংগ্রাম থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করাও তার পক্ষে সম্ভব নয়। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রময় দুনিয়ায় একজন আপাত জীবের জীবন পালনকারী ব্যক্তিকেও ঐতিহাসিক ভাঙাগড়ার মুহূর্তগুলোতে জনগণের অংশ হিসাবে ইতিহাসের কর্তার আসনে বসতে হয়। যৌথ রূপান্তরে অংশ নিতে হয়, অনিচ্ছায় হলেও। আর রাজনৈতিক জীবেদের, তথা রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তকদের পক্ষে ব্যক্তিগত এবং জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে আলাদা রাখাটা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে যায়। এবং তাদের জন্যেই, ব্যক্তি ও জাতির নাজাতকে আলাদা সময়ের ধারণার প্রেক্ষাপটে বোধগম্য করতে পারাটা বিশেষভাবে জরুরি। তবে, যতো বেশী মানুষ মওলানা রুমির মতো নিজের মনে ঈসা মসিহের আশা যাওয়া অনুধাবন করবেন, সরলরৈখিক সময়ের মধ্যেই বিচারের দিনটিও হয়তো ততো বেশী আগাইয়া আসতে থাকবে।
ফ্রাঞ্জ কাফকা হয়তো এ কারনেই লিখেছিলেন: “মসিহ আসবেন কেবল তখন, যখন তার আসার আর দরকার থাকবে না, তিনি আসবেন কেবল তার আগমনের পরের দিন; তিনি আসবেন শেষ দিনটিতে নয়, বরং একেবারে সমাপ্তিতে”। দেরিদার অর্থহীন ও অকার্যকর মাহদীয় রাজনীতির মোকাবেলা করতে গিয়েই আগামবেন স্মরণ নিয়েছেন কাফকার এই নোটটির, এবং মসিহের দ্বৈততার ধর্মতত্ত্বের। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে ‘ক্রোনস’ (Chronos) তথা সরলরৈখিক সময়ই একমাত্র সময় নয়, এবং ‘কায়রস’ (Kairos) তথা ওয়াক্তের অভিজ্ঞতা লাভের জন্যে প্রথমে ক্রোনসকে থামাতে বা সমাপ্ত করতে পারতে হয়। মসিহ শেষ দিনটিতে (ক্রোনলজিকাল) আসবেন না, তিনি আসবেন একেবারে সমাপ্তিতে (কায়রোলজিকাল)।
- Franz Kafka, Blue Octavo Notebooks, (Ed. Max Brod), Exact Change Edition: Cambridge, 1991, p. 28
ছবি: ওয়াল্টার বেনিয়ামিন। সূত্র: ইন্টারনেট
একজন জীববিজ্ঞানীর রূপকধর্মী তুলনা থেকে ধার করে ওয়াল্টার বেনিয়ামিন লিখেছেন, শ্রেফ পৃথিবীতে জীবের আবির্ভাবের ইতিহাসকে যদি চব্বিশ ঘন্টার একটি দিনের সাথে তুলনা করা হয়, তবে তার সাপেক্ষে মানুষের ইতিহাসকে একটা শেষ ঘন্টার শেষ দুই সেকেন্ডের সাথে তুলনা করা যায়। মহাবিশ্বের সাপেক্ষে মানব জাতির এই মৌহুর্তিক অস্তিত্বটাই বেনিয়ামিনের কাছে মাহদীয় অস্তিত্বের মডেল। আর মসিহের আবির্ভাব, ঘটতে পারে—যেকোন মুহূর্তেই—, যেহেতু প্রতিটা সেকেন্ডই তার আগমনের একেকটা দরোজা (‘ইতিহাসের ধারণা প্রসঙ্গে’ (Thesis on the Philosophy of History), ১৮ নং থিসিস)।
লেখক পরিচিতি: পারভেজ আলম একজন বাংলাদেশি লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক কর্মী। প্রকাশিত গ্রন্থ: মুসলিম জগতের জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াই (২০১১), শাহবাগের রাষ্ট্রপ্রকল্প (২০১৪), জিহাদ ও খেলাফতের সিলসিলা: মুসলিম দুনিয়ার ক্ষমতা সম্পর্কের ইতিহাস (২০১৬), Disappearing public spheres: Censorship in Bangladesh (2016), মদিনা (২০২০) ও কাশফ (২০২৫)। ই-মেইল: stparvez@gmail.com
দার্শনিক মাহদিবাদ ও মাহদীয় রাজনীতি