Skip to Content

‘দেলুপি’: কালের ক‍্যানভাসে কালের বয়ান

মনিরা শরমিন
27 সেপ্টেম্বর, 2026 by
মনিরা শরমিন
| No comments yet

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস সম্পর্কে, এমনকি অল্প বিস্তর সন্ধানও যারা রাখেন, তারা জানেন—আদতে এ হলো ঢাকাকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের ইতিহাস। সেই আদি ঢাকাই নবাবি আর সামন্ত পরিবারের ঘরোয়া পরিসর থেকে নির্বাক হয়ে সবাকের দিকে অথবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে পূর্ব পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের কয়েক দশকের চলচ্চিত্রের প্রবল বা দুর্বল যাত্রার ইতিহাসের প্রায় পুরোটুকুই ভীষনভাবে ঢাকাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। অথচ তাওকীর এবং তার দল, ‘দেলুপি’ (২০২৫) চলচ্চিত্রটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে, বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের এই আগ্রাসী ধারাবাহিকতার অংশ হতে অস্বীকৃতি জানান। রাজশাহীর এই নির্মাতাদল তাদের নিজস্ব নির্মাণ প্রকৌশলসহ, খুলনার কিছু অ্যামেচার অভিনেতা নিয়ে, সেই এলাকার দেলুটি ইউনিয়নের তেরো গ্রামের গল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন দর্শক পরিসরে।

ফলে ‘তাওকীর এবং দল’-এর ‘দেলুপি’র মুক্তি, শুধু বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গ্রামীণ পরিসরে দেশ বদলের আকাঙ্ক্ষার গল্প নয়; বরং খোদ এর কাস্টিং, নির্মাণশৈলী, মুক্তি, দর্শক-সংযোগ—প্রায় সবই দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের বাঁক বদলের বয়ান। কারণ চলচ্চিত্রটি প্রথম মুক্তি পায় খুলনার লিবার্টি সিনেমা হলে। তারপর ঢাকা, রাজশাহীসহ সারাদেশে। বলে নেয়া প্রয়োজন, চলচ্চিত্রটির প্রিমিয়ার শো হয় ‘দেলুপি’ গল্পের মূল পাত্র-পাত্রী, অর্থাৎ খুলনার দেলুটি ইউনিয়নের তেরো গ্রামের মানুষদের নিয়ে, একটি স্কুলকে প্রেক্ষাগৃহ বানিয়ে। ফলে ঢাকার বাইরে চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক এসব ঘটনার প্রায় সবগুলোই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য একেবারেই নতুন। এখানে স্পষ্ট যে, ঢাকার মুভি বাফ, বড় বড় অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান, ঢাকাকেন্দ্রিক সুশীল দর্শকের থেকে ‘দেলুপি’র অবস্থান অনেখানি ফারাকে। আর এখানেই দেশি চলচ্চিত্রের ইতিহাসের বাঁক বদলের স্বাক্ষী হয়ে থাকে তাওকীর ও তার দল নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’। আরও বলা যায়, বাণিজ্য নয়—বরং আমজনতার সাথে সংযোগের আকাঙ্ক্ষাই এই শিল্পোদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।  

বাংলাদেশে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে দেশের একটি ভয়াবহ ও দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের দেশ ও দলের কর্মীদের ছেড়ে নির্লজ্জ পলায়নের ঘটনা। সারাদেশ তখন খুনির এই পলায়ন এবং পতনের আনন্দে উন্মত্ত। আর ঠিক এর পরেই আগস্টের মাঝামাঝি দেশজুড়ে নেমে আসে ভয়াবহ বন্যা। এমনি এক পটভূমি ও ক্ষণেই ‘দেলুপি’ চলচ্চিত্রের সূত্রপাত ঘটে। এরপর একটি মিষ্টি প্রেম আর নিজগ্রাম বাঁচানোর জন্য গ্রামবাসীর একটি নতুন বাঁধ তৈরীর আকাঙ্ক্ষার গল্প পাশাপাশি নিয়ে সিনেমা অন্তিমে গড়ায়। চলচ্চিত্রটির প্রথম অঙ্কজুড়ে বৃষ্টি আর বন্যার ঘনঘটা। আর শ্লোগান—‘পলাইসেরে পলাইসে, সাবিনা পলাইসে’। বলাই বাহুল্য, এই সময়ে চলচ্চিত্রটির প্রায় সকল দর্শকই এই শ্লোগান ও এই নির্দিষ্ট সময়টির সাথে প্রবলভাবে পরিচিত বোধ করে, এবং নিশ্চিতভাবে দর্শকের প্রায় বড় অংশই এই অভ্যুত্থানের অংশীজন হওয়ায় চলচ্চিত্রটিকে তার নিজ বয়ান বলেই মনে হতে থাকে।

ছবি: ‘দেলুপি’ মুভির একটি দৃশ্য

এরপর গল্পটি এগিয়েছে ৫ আগস্টের পরের সূত্র ধরেই। মজার ব্যাপার হলো, এখানেই চব্বিশ-পরবর্তী গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রগুলোর থেকে ‘দেলুপি’র গঠন এবং বয়ান আলাদা হিসেবে দর্শক পরিসরে হাজির হয়। কারণ এই সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত আর সকল চলচ্চিত্রের মূল মনোযোগ কেন্দ্রীভূত ছিলো চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান হয়ে ওঠার কারণ এবং পূর্ববর্তী পটভূমিকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে ‘দেলুপি’ কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশ, মানুষ এবং খোদ যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আলাপ করতে এবং বোঝাপড়া সারতে চাইছে।

ছবি: ‘দেলুপি’ মুভির একটি দৃশ্য 

ফলে অভ্যুত্থান-পরবর্তী জাকির চেয়ারম্যান এবং জনতা পার্টির উত্থানের একটি বিশদ চিত্রায়ন আমরা দেখতে পাই। বহুদিন নির্বাসিত এবং বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত জাকির চেয়ারম্যান দেলুপিতে ফিরে আসেন পয়সা না দিয়ে নৌকা পার হয়ে এবং নৌকার বাঁশ চুরির মধ্য দিয়ে। বলাই বাহুল্য, জাকির চেয়ারম্যানের চলচ্চিত্রে ইন্ট্রোই এটা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তার কোনো অবদান ছিলো না, শুধুমাত্র পালিয়ে নিজেকে রক্ষা করা ছাড়া। অথচ পট-পরিবর্তনের পরে তিনি বিড়াল থেকে বাঘে পরিণত হন। এবং বহু নারীতে আসক্ত জাকির চেয়ারম্যান নিজের পুনরুত্থানের সাথে সাথে নানাবিধ বাটপারি, দখলদারি এবং পার্টি ফান্ডের জন্য গ্রামের মানুষের থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য নানাবিধ পাঁয়তারা শুরু করেন। আমরা যারা দেশের সনাতনী রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা দেখে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এই দৃশ্য অত্যন্ত পরিচিত ঠেকে। বলতে বাধা নেই, অভ্যুত্থান-পরবর্তী এমন অনেক ঘটনাই আমরা ঘটতে দেখেছি, ফলে চলচ্চিত্রের এই বয়ানের সাথে আমদর্শক একাত্মতা বোধ করতে থাকে।

তবে এটা অনস্বীকার্য যে, ‘দেলুপি’ আশাজাগানিয়া গল্প। পনেরোর ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, আঠারোর প্রথম দফা কোটা সংস্কার আন্দোলন, অতঃপর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান—এই ঘটনাপ্রবাহ এদেশের তরুণদের ওপর আমাদের রাজনৈতিকভাবে আস্থা রাখতে শিখিয়েছে। সনাতনী রাজনৈতিক দলগুলোর গলদ আর ‍দুর্নীতিকে প্রশ্ন করা এখন হাল আমলের তরুণ নারী-পুরুষের মজ্জাগত অনুষঙ্গ। বিগত রেজিমের মত কোনো ডেমিগড বা প্রবল আইকন হিসেবে ব্যক্তির আবির্ভাবকে নতুন প্রজন্ম ভয়াবহ সন্দেহের চোখে দেখতে চাইছে। ফলে একক ক্ষমতার যে নিরঙ্কুশ প্রবনতা, তা এখন ভেঙ্গেচুরে খানখান। ‘দেলুপি’র মধ্যেও এই প্রবণতা প্রবল। মিহির (আন্দোলনের সাথে সরাসরি যুক্ত একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী)-সহ নতুন প্রজন্মের বিপ্লবীরা জাকির চেয়ারম্যানের বাটপারি ইমেজকে বারবার প্রশ্ন করছে। সবার সামনে ভেঙ্গে পড়ছে জাকির চেয়াম্যানের এককভাবে ক্ষমতা আত্মসাৎ করতে চাওয়ার জমিন।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট হলো নেতৃত্বের বিকেন্দ্রিকতা। পুরো আন্দোলনে আমরা থোকা থোকা আন্দোলনকারীকে প্রাকৃতিক এবং তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি হওয়া নেতৃত্বের অধীনে কাজ করতে দেখেছি। আগেই বলেছি, তাওকীরদের নির্মাণ পদ্ধতিও কিন্তু এর থেকে ফারাকে নয়। প্রথম কাজ ‘শাটিকাপ’ (২০২২) তৈরির সময়েই তাওকীররা বলেছিলেন, ভিজ্যুয়ালটি বানানোর সময়ে দলের প্রায় প্রত্যেকেই প্রত্যেকটি কাজ করেছেন। যিনি আজ ক্যামেরার কাজ করেছেন, পরের দিনে তিনি পরিচালক হয়েছেন, আবার এরপরের দিন তিনি লাইটের কাজ করেছেন। ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণ শেষে কাজটি আর একজনের থাকেনি, সবার হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের শাকিব খানসহ দক্ষিণ এশিয়ার যাবতীয় ‘খান’দের ধুন্ধুমারের জমানায় এমন একটা চলচ্চিত্রকে আপাত নিপাট নিরীহ দেখালেও, এর রাজনীতি এবং সময় বদলের আকাঙ্ক্ষা অনেক গভীরে প্রোথিত। 

চলচ্চিত্রটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বিশ্ব চলচ্চিত্রের বিবিধ রেভ্যুলুশনারি ওয়েভের সাথে এর নির্মাণশৈলীর মিল আছে। এটা বাস্তব, যেকোনো ক্রিয়েটিভ কাজই মূলত বিগত সময়ের ইতিহাসের পাটাতনেই নির্মিত হয়, এর সাথে যুক্ত হয় সময়ের দাবী। তাই শুধু কন্টেন্টে নয়, বরং এই চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলীতেও কেন্দ্রমুখীনতা আর পরিচালকের একক দেবত্ব থাকছে না। সিনেমাটা হয়ে উঠছে ‘তাওকীর এবং দল’-এর। এই চলচ্চিত্রের মূল জায়গা তাই ইম্প্রোভাইজেশন। যখন সিনেমা বানাবে বলে নির্মাতা দল দেলুটি পৌঁছান, তখনও তারা জানতেন না যে, গল্পটি আদতে কী দাঁড়াবে? এমনই ইম্প্রোভাইজেশনের গুরু ছিলেন ফরাসী নির্মাতা জ্যঁ লুক গদার। তিনি ছিলেন ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের পুরোধা ব্যক্তি। চলচ্চিত্রের স্টুডিও নির্মাণের ধারণা ভেঙ্গেচুরে, স্ক্রিপ্ট তাৎক্ষণিকভাবে তৈরী করে, সিনেমার ধারণাই বদলে দিয়েছিলেন তিনি—একেবারে বিকল্প হয়ে ওঠার মতো। 


  • ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ (French New Wave বা Nouvelle Vague) হলো ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে ফ্রান্সে উদ্ভূত একটি বৈপ্লবিক চলচ্চিত্র আন্দোলন, যেখানে তরুণ নির্মাতারা—প্রধানত গদার, ট্রুফো প্রমুখ—প্রথাগত স্টুডিও সিনেমার বিরোধিতা করেন। তারা সনাতন ধারার স্টুডিও সিনেমার বদলে হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরা, জাম্প কাট, বাস্তব লোকেশন এবং স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণে এক নতুন ও বাস্তবধর্মী ধারার জন্ম দিয়েছিলেন।

ছবি: গদারের মাস্টারপিস ‘ব্রেদলেস’ (১৯৬০)-এর একটি পোস্টার

একইভাবে বর্তমানে তরুণদের একটা অংশ বিকল্প হয়ে উঠতে চাইছেন। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ আন্দোলন শেষে তাদের প্রতিষ্ঠানে বা শিক্ষাকেন্দ্রে ফিরে গেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এদের আবারও অ্যা-পলিটিকাল (রাষ্ট্র ও ক্ষমতা প্রশ্নে) মনে হলেও, এখনও যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ইস্যুতে আবার তাদের সরব হতে দেখা যাচ্ছে। আনন্দের কথা, গেলো একবছরে এই পরিবর্তনের দাবীদার প্রতিটি তরুণ নারী-পুরুষই কিন্তু সময়মতো আবার কথা বলে উঠেছেন। বিষয়টা এমন নয় যে, সবসময়ই তা যৌক্তিক ছিলো; তবে আপাত মোরালিটির সাথে তাদের যে বোঝাপড়া, সেই অবস্থান থেকেই নিজ স্বাধীনতাকে তারা নজরদারির বলয়ে রেখেছেন। তাওকীররাও এই প্রজন্মের তরুণ, তারা চব্বিশ-পরবর্তী দেশের স্বাধীনতাকে তাদের মতো করে নজরদারিতে রাখতে চাইছেন। চব্বিশের লড়াই এবং আকাঙ্ক্ষার মেলবন্ধন আসলেই ঘটছে কিনা—সেই প্রশ্ন চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে জারি রাখতে চাইছেন।

মজার বিষয় হলো, তাওকীরদের চলচ্চিত্রে সময় (টাইম) এবং স্থান (লোকেশন)—দুই-ই ভিজ্যুয়ালের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে হাজির থাকে। তাওকীর এবং দলের এর আগের জনপ্রিয় ভিজ্যুয়ালগুলোতে ‘সময়’ গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হিসেবে হাজির থাকলেও, ‘দেলুপি’ চলচ্চিত্রে নূপুর, মিহির বা পার্থ নন—বরং সময়ই মূল প্রটাগনিস্ট। সময়টাকে ধরে রাখা, সময়ের বয়ান তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। নির্মাতা নিজেই দাবী করেন, ফিকশনের মাধ্যমে মোমেন্ট ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা তাদের ছিলো। এমন মোমেন্ট বা ক্ষণ ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই সোভিয়েত ফিল্ম মেকার ঝিগা ভের্টভ (Dziga Vertov, 1896–1954) শুরু করেছিলেন কিনো-আই (Kino-Eye) মুভমেন্ট। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, মানুষের চোখের মতোই ক্যামেরার মেকানিক্যাল চোখও সবই দেখতে পায় এবং নির্দিষ্ট ক্ষণ ধরে রাখার সক্ষমতা রাখে। তবে ভের্দব নন-ফিকশনাল মোডে তার চলচ্চিত্র তৈরী করেছিলেন; অর্থাৎ তাঁর আগ্রহের জায়গা ছিলো ডকুমেন্টারি। তবে তাওকীরের দাবি ফিকশনও সময়ের আলাপটুকু সেই নির্দিষ্টি সময়ে এবং নির্দিষ্ট অবস্থানে থেকে ক্যাপচার করতে পারার সক্ষমতা রাখে। আর সেখান থেকেই এমন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সূত্রপাত। 

ছবি: ঝিগা ভের্টভ

ঠিক এমনই, তাদের প্রথম জনপ্রিয় সিরিজ ‘শাটিকাপ’-এর মূল চরিত্র ছিলো লোকেশন। এটা বলতেও বাধা নেই—লোকেশন নিয়ে এত দূর্দান্ত কাজ বাংলাদেশে ‘শাটিকাপ’ই বোধহয় প্রথম। ‘ধোবিঘাট’ (২০১১) চলচ্চিত্রের ক্যামেরার কাজে আমির খান একজন পশ্চিমা ক্যামেরাপার্সন ব্যবহার করেছিলেন, যিনি প্রথম মুম্বাই দেখছেন। আদতে নির্মাতা দেখাতে চেয়েছিলেন, একজন বাইরের মানুষের চোখে মুম্বাই কেমন দেখায়? তাওকীরদের ‘শাটিকাপ’-এর  ক্ষেত্রে ঘটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়—ক্যামেরার সাথে লোকেশনের এত ভালো বোঝাপড়া ছিলো যে, এক পর্যায়ে দর্শকের মনে হয়েছে সে নিজেই রাজশাহী শহরের অলিগলিতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। রাত-সকাল-ভোর-মধ্যরাত, পদ্মার এপার-ওপার, লোকাল ভাষা, খিস্তি—সবমিলিয়ে এক ধুন্ধুমার অবস্থা। একথাও নিঃসন্দেহে বলা যায়—এত খিস্তিসহ এর আগে বাংলাদেশে কোন ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট মুক্তি পায়নি। ‘শাটিকাপ’কে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফার্নান্দো মেয়ারলেস (Fernando Meirelles, b. 1955) এবং কাতিয়া লান্দ (Kátia Lund, b. 1966) পরিচালিত বিখ্যাত ব্রাজিলিয়ান চলচ্চিত্র ‘সিটি অব গড’ (২০০২)-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখালেও, ‘শাটিকাপ’-এর প্রকরণ এর থেকে বিস্তর আলাদা; কেবল ড্রাগ এবং শহরের ঘিঞ্জি গলি-ঘুপচির প্রেজেন্টেশনের কারণে ভিজ্যুয়াল দুটিকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই রকম দেখায়। তবে একথা সত্য যে, ২০২২-এ ‘শাটিকাপ’ রিলিজ হবার মধ্য দিয়ে তাওকীররা যে বাংলাদেশের প্রথম ‘নিও-নোয়ার’ (Neo-noir) জনরার একটা সিরিজ বানিয়ে ফেললেন—সেই বিষয়টি আপ্লুত হবার মতোই ছিলো বৈকি। একটু অত্যুক্তি হলেও বলা চলে, তাওকীররা ‘শাটিকাপ’-এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের একজন ‘টারান্টিনো’ পাবার আকাঙ্ক্ষা দর্শকমনে কিছুটা হলেও জাগিয়েছিলেন। এর কারণ অবশ্য ‘পাল্প ফিকশন’ (১৯৯৪)-এর লোকাল ডায়লেক্ট, গালি-গালাজ এবং ড্রাগ বিজনেস-কেন্দ্রিকতার সাথে ‘শাটিকাপ’-এর অদ্ভুত মিল। 

ছবি: ‘সিটি অব গড’ মুভির একটি দৃশ্য

তবে, তাওকীরের বয়ানে জানতে পারি—তার ‘দেলুপি’ একটি ইনসিডেন্টাল চলচ্চিত্র (incidental film)। অর্থাৎ খুব অল্প বাজেটে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, এক্সপেরিমেন্টাল এবং সাহসী পদক্ষেপ নেয়া। মূলত ইনসিডেন্টাল চলচ্চিত্র নিয়ে ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি বলেছেন, “চলচ্চিত্র স্বল্প বাজেটে তৈরী করতে হবে যেনো এক্সপেরিমেন্ট সফল না হলে কাগজের মত তাকে মুচড়ে ফেলে নতুন করে শুরু করা যায়”। ‘দেলুপি’র মাঝেও সেই প্রবণতা বিদ্যমান। তাওকীর এবং দলের জবানিতেই জানতে পারি, নিজেদের চলচ্চিত্র বানাবার কৌশলটিকে তারা বলছেন—ছিপ দিয়ে মাছ ধরার মতো করে বানানো সিনেমা। কারণ তারা বরশি ফেলেছেন আঁতকা, শেষ অবধি কী উঠে আসবে তা তাদের অজানা। চলচ্চিত্রটি ঠিক হবে কিনা, সে ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়েই ‘দেলুপি’ চলচ্চিত্রের দল পানখালির এক গ্রামে (যেখানে কোমর কাদায় উনাদের আটকে যেতে হয়েছিলো) শ্যুটিং ইউনিট নিয়ে আস্তানা গেড়েছিলেন। একথা বলা যায়, রাজশাহীতে ক্যামেরার কাজের যে মুন্সীয়ানা বা দর্শককে একেবারেই রাজশাহীর মাদকপল্লীর মধ্যে হাজির করার যে সক্ষমতা ‘শাটিকাপ’-এ দেখা গেছে, খুলনাকে কেন্দ্র করে বানানো ‘দেলুপি’তে তা দেখা যায় নাই। তবে একথাও ফেলে দেয়া যাবে না যে,  নিও-নোয়ার সিরিজ থেকে ইন্সিডেন্টাল চলচ্চিত্র, ওটিটি থেকে প্রেক্ষাগৃহ—সব জায়গায়ই সফল হয়ে উঠছেন নতুন প্রজন্মের তাওকীররা।  

ছবি: কুইন্টিন টারান্টিনোর কাল্ট ক্ল্যাসিক ‘পাল্প ফিকশন’-এর একটি দৃশ্য

তাওকীর এবং দলের ভিজ্যুয়ালের মজা হলো, ভিজ্যুয়ালে বর্তমানকে বিভিন্ন আঙ্গিকে তুলে আনার চেষ্টা। ফ্যাসিবাদী রেজিমে ভয়াবহ পুলিশি পৌরুষের কালে ‘শাটিকাপ’-এ তিনি অফিসে বসে পুলিশের গাঁজা খাবার দৃশ্য এবং দুর্নীতি দেখিয়েছেন। আবার চব্বিশ-পরবর্তী অভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষার হিসেব যে ঠিক মিলছে না—এমন কথাও বলেছেন নির্দ্বিধায়। ‘দেলুপি’র মূল চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের যাত্রাপালার সাথে সম্পৃক্ত প্রান্তিক এক সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রশান্ত এবং তার পরিবার, যারা কিনা পূর্ববর্তী রেজিমে নিজেদের শেষ সম্বল জমিটুকু দিয়েছিলো তৎকালীন তপন চেয়ারম্যানকে, বিনিময়ে পেয়েছিলো একমাত্র ছেলে পার্থর চাকুরীর নিশ্চয়তা। সেই নিশ্চয়তা তো এখন নেই-ই, আবার তপন চেয়াম্যানের লোক ব’লে, বর্তমানে জাকির চেয়ারম্যানও তাকে কোনঠাসা করতে চায়। এর পাশাপাশি চলেছে পার্থ এবং পার্থদের থেকে একটু উচুঁকূলের মেয়ে নূপুরের প্রেম এবং বিয়ের গল্প। তবে সব মিলিয়ে গল্পটা এগিয়ে চলেছে দেলুপি ইউনিয়নের জন্য একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। একদিকে বেড়িবাঁধ নির্মাণ নিয়ে জাকির চেয়ারম্যানের নোংরা রাজনীতি এবং তার বিপরীতে জেনারেশন জেডের জারি থাকা প্রতিরোধের গল্প আমাদের বর্তমান সময়ের সমান্তরালেই আটকে রাখে। চলচ্চিত্রের শেষটা অবশ্য সুন্দর, যেমনটা আকাঙ্ক্ষা ছিলো আমাদের। মিহিরের নের্তৃত্বে জেনারেশন জেডের তরুণ নারী-পুরুষসহ গ্রামবাসী এবং জাকির চেয়ারম্যান একসাথে মিলে সরকারের উদ্দেশ্যে যে মানববন্ধনটা করেন, তা আশাজাগানিয়া। পাশাপাশি, রাবণবধের যাত্রাপালাটাও দর্শক অনেক আগ্রহ নিয়ে দেখেছে। আবার একদল সম্পূর্ণ অ্যামেচার অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে (কেবল জাকির চেয়ারম্যানের চরিত্রে মো: জাকির হোসেন ছাড়া বাকি সকলেই ছিল অ্যামেচার) এতবড় একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলাও চাট্টিখানি কথা নয়। ‘দেলুপি’র আগে ওটিটিতে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সিনপাট’ (২০২৪)-এও ড্রাগ ডিলার হিসেবে একজন ডাকাতকে কাস্ট করেছিলেন নির্মাতা। তিনি অসাধারণ অভিনয় করেন। কিন্তু ‘সিনপাট’ প্রিমিয়ারের দিন জানা যায়—তিনি আবার হাজতে, তাই প্রোগ্রামে উপস্থিত হতে পারছেন না। নির্মাণ নিয়ে এমন এক্সপেরিমেন্ট করেন যারা, তাদের বলা গল্প দর্শক এবং সময়কে ছুঁয়ে যাবে—এতে আর সন্দেহ কী!

ছবি: তাওকীর ও দল

সর্বশেষে বলে নিতে চাই, বিভিন্ন টকশো ও সিনে আলাপে মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের একক উপস্থিতি ওদের চলচ্চিত্রের মূল স্পিরিটের সাথে একটু বেখাপ্পা ঠেকেছে। যেহেতু কন্টেন্ট এবং মেকিং দুই ক্ষেত্রেই নির্মাতারা দল হিসেবে নিজেদের হাজির রাখতে চাইছেন, সেক্ষেত্রে পাবলিক পরিসরে এবং প্রচারণায় তাদের বড় অংশের একত্র উপস্থিতি আমাদের মনে আরও বেশি আশা জাগাতো নিঃসন্দেহে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটি সৎ রাজনৈতিক বয়ানের শিল্পোদ‍্যোগ হিসেবে মানুষ ‘দেলুপি’কে মনে রাখবে নিশ্চয়ই। ‘ফ্রগ’স আই ভিউ’ থেকে নিজ সময়টাকে দেখতে পারার বা দেখাতে পারার সৌভাগ্য নিয়ে এদেশের সিনে-দর্শকরা জন্ম নেননি। সেক্ষেত্রে তাওকীরদের ‘দেলুপি’ নিঃসন্দেহে ২০২৫ বা এই সময়টাকেও ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের এক টুকরো বাংলাদেশকে আটকে রাখলেন রিলে; আর সাথে আমাদেরও বন্দি করে নিলেন সময়ের ফ্রেমে। এই বা কম কিসে!  


লেখক পরিচিতি: মনিরা শরমিন। শিক্ষক, চলচ্চিত্র গবেষক ও সমালোচক। ই-মেইল: pritu.ru@gmail.com

মনিরা শরমিন 27 সেপ্টেম্বর, 2026
Share this post
Sign in to leave a comment